অতি অতীত কাল থেকেই ভক্তি নিবেদনের নানা বিধ পন্থা। ভক্তির নৈবেদ্য অবশ্য আচার, উপাচার আর মৌখিক কথায়। অন্তরের যে চাহিদা, সেই বিপুল চাহিদা বরাবরই জাগতিক। জাগতিক চাহিদা না নিয়ে কে আর কবে ঈশ্বরের দরবারে গেছে, একেবারে হাতে গোণা কয়েক জন ছাড়া!

প্রকৃতি পূজা, অজানা ক্ষমতাকে তুষ্ট করার হোম, ইত্যাদির আদি যুগ পার হয়ে সংগঠিত ধর্মেরা যখন আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে পৃথিবীতে আসতে শুরু করল, তখন পরপর আসতে শুরু করলেন ধর্মগুরু ও ধর্মের প্রচারক বাহকেরা। নিজস্ব ও দলীয় প্রচারের জোরে সাধারণ মানুষ ও ঈশ্বরের মাঝে তাঁদের ভূমিকা হল মিডল-ম্যানের মতো। তাঁদের মূল লক্ষ্য গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ। এক ও একাধিক গোষ্ঠীকে বশে রাখার জন্য তাঁরা সৃষ্টি করলেন পরলোক নামক আর এক কল্পিত ইহলোককে-ই, যেখানে ভয়াবহ অগ্নি ও প্রমোদের কানন পাশাপাশি। সেই কল্পিত লোক জাগতিক ইহলোককে দমিত ও নিয়ন্ত্রণ করবে, পরোক্ষে গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণে থাকবে ধর্মের। মিডল-ম্যান ও তাদের চ্যালা ও শিষ্য-পরম্পরা সাধারণের ভক্তি, চাহিদা, প্রার্থনা ও প্রসাদ পৌঁছে দিতে থাকবে ঈশ্বরের দরবারে। প্রায় সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মেই এই রীতির প্রচলন যুগের পর যুগে, বিশ্বাস যাতে নিরেট থাকে তাই পথ জুড়ে মন্দির মসজিদ গির্জা সিনাগগ।

আর এসব যত বেড়েছে তত ভেদ বেড়েছে এক ধর্মগোষ্ঠীর সঙ্গে আর এক ধর্মগোষ্ঠীর। ‘আমরা ওরা’-র বিভেদের পাচিল উঁচু হয়েছে ক্রমশ। ধর্ম-যুদ্ধের হানাহানিতে এ পর্যন্ত যত লোক মরেছে, ধর্ম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে যত প্রাণ গেছে, দুই বিশ্বযুদ্ধ ছাড়াও বিগত কয়েক শতাব্দীর যুদ্ধে তত প্রাণ যায়নি। আর এত সব উন্মাদনার চাপে ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে ঈশ্বর বা স্রষ্টা নামক অভিন্ন এক সত্তার কাছে ব্যক্তির একক নিবেদনের পরিসর। ব্যক্তির নিভৃত প্রার্থনা কোণঠাসা হয়েছে গোষ্ঠীর সংগঠিত উচ্চরব নিনাদের কাছে। বিনম্র ব্যক্তি সমাজে একা হয়ে গেছে।

এসব কথার অবতারণা এই কারণে যে, এখনও পৃথিবীর দু একটি কোণায় এমন কিছু বিশ্বাস টিঁকে আছে, যেখানে নিবেদন পৌঁছে দেওয়ার জন্য মধ্যবর্তী ধর্মগুরুরা নেই। কবি আলাওল কবে লিখে গেছেন, ‘মুর্শিদ তোমার পথ ঢেকেছে মোল্লাতে পুরুতে’। মধ্যবর্তী যাজকরা বিদায় নিলেই ব্যক্তি ও ঈশ্বর মুখোমুখি। স্পেনের পার্বত্য এলাকা, লাটিন আমেরিকা ও ইরাকের দুরুহ মরু অঞ্চলে এমতো দু একটি ধর্ম-বিশ্বাস অত্যন্ত সংখ্যালঘু হয়ে টিঁকে আছে এখনও। যেখানে ব্যক্তি তার কল্পনার স্রষ্টার কাছে সামনাসামনি।

হিমালয়ের কুমায়ুন এলাকায় সম্প্রতি দেখা ও শোনা হল ‘গলু দেওতা’র কথা, যে দেবতার কাছে ভক্তরা সরাসরি মনের কথা জানান। এবং মনের কথা জানিয়ে আসেন স্রষ্টাকে খোলা চিঠি দিয়ে। গলু দেওতার ভজনালয়টি রাণীক্ষেত এলাকার কাছাকাছি, ছোট্ট নির্জন এক পাহাড়ি জনপদের প্রান্তে। ভক্তরা হাতে লিখে, যারা লিখতে পারেন না তারা অন্যদের দিয়ে লিখিয়ে, কখনও বা দূর শহর থেকে টাইপ করিয়ে চিঠি নিয়ে আসেন। তারপর ভজনালয়ের দেওয়াল বা ঘন্টা বা দড়ির গায়ে নিঃসঙ্কোচে ঝুলিয়ে দিয়ে যান। সমস্ত ধর্ম সম্প্রদায়ের অবাধ যাতায়াত গলু দেওতার কাছে। ভক্তরা অনেকেই আসেন দূর পাহাড় থেকে পায়ে হেঁটে, দিনে যে একটি মাত্র বাস চলে কেউ কেউ সেই বাসে। সম্পন্নরা আসেন মটর গাড়ি ভাড়া করে।
অফিস ও আদালতের টেবিলে দরখাস্তের ফাইল জমা হওয়ার মতো স্রষ্টার সামনে আবেদন নিবেদনের চিঠি স্তূপ হয়ে ওঠে।
আমার মনের কথাগুলোই আপনি লিখেছেন দাদা , খুবই ভালো লাগল
ধন্যবাদ সত্যবান।
এত দ্রুত কেন শেষ হয়ে গেলো লেখাটা? ঈশ্বরকে খোলা চিঠি পাঠিয়ে কতশত মানুষ তাদের ফরিয়াদ পৌঁছে দিচ্ছেন সেসব নিয়ে জানা অজানা আরো কথা পড়তে চাই। হৃদয়কে স্পর্শ করে গেছে একদম।
Thanks a lot.