ডাঃ রায়ের কথা লিখতে গিয়ে, প্রফুল্লচন্দ্র সেনের কথা এসে গেল। প্রফুল্লদার সংগে ঘনিষ্ঠতা হয়, ২৪ পরগণা জেলা কংগ্রেসের অফিসে, মৌলালীর মোড়ে। প্রফুল্লদা প্রায়ই ওখানে আসতেন। ১৯৪৭-এর আগের থেকেই অতুল্য ঘোষ, হুগলী ব্যাঙ্কের ধীরেন মুখার্জি, ও প্রফুল্লদা খুব চেষ্টা চালাচ্ছেন কংগ্রেসের মধ্যে হুগলী গ্রুপ’-কে চাঙ্গা করার জন্য। বীরভূম কংগ্রেসে মিহিরলাল চট্টোপাধ্যায় গণপরিষদের সদস্য, প্রফুল্ল ঘোষের ডান হাত ছিলেন। মিহিরদাকে ‘কবজা’ করতে পারলে গোটা বীরভূম জেলা কংগ্রেসকে ‘হুগলীগ্রুপ’-এর মধ্যে আনতে পারবেন। তাই প্রফুল্লদা বারে বারেই সিউড়ি যেতেন। একদিন বসে আছেন ২৪ পরগণা জেলা কংগ্রেস অফিসে। বেশ খোস মেজাজে গল্প করছেন। আমি ঢুকতেই বললেন—এই যে এসে গেছে বীরভূমের ছেলে। জানো এদের কালচার বলে কোন জিনিষ নেই। সব সাঁওতালী কালচার। কলাই-এর ডাল, পোস্ত আর কচু-ডিংলের তরকারি, এই হলো ওদের ‘সব চেয়ে ভালো ডিস’। আর জানো ৫/৭ সের পাকা রুইমাছ ধরেছে তো কী করবে জানো? তেতুল দিয়ে টক। ৫/৭ দিন ধরে পচিয়ে পচিয়ে খাবে। রুক্ষ জায়গা, শুধু ধুলো আর ধুলো। বীরভূম সম্বন্ধে আরও নিন্দে-মন্দ করে, বেশ খুশ মেজাজেই এমনভাব নিয়ে থামলেন, যেন আরামবাগের মত জায়গা ভূ-ভারতে নেই। আরামবাগকেই কেন্দ্র করে প্রফুল্লদার সংগঠন। প্রচুর কাজ করেছেন। ওঁর নাম-ই হয়ে গিয়েছিল-আরামবাগের গান্ধী। আর আরামবাগকে নিয়ে প্রফুল্লদার খুব গর্ব। আমি ভাবছি, সবার সামনে তো আচ্ছা করে ঠুকে দিলেন, বীরভূম-কে। কী করা যায়, কী করা যায়। তারপর বল্লাম প্রফুল্লদা, আরামবাগ সম্বন্ধে একটা গল্প আছে, জানেন কী? —কী গপ্পো?
সুরু করলাম। সিউড়িতে এক মুনসেফ্ কোর্টে বসে আছেন, পিয়ন একটা চিঠি দিলো। সেরেস্তাদার দেখলো, চিঠি পড়তে পড়তে মুনসেফ কাঁদছেন। চোখের জল মুছছেন। উঠে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-হুজুর, বাড়ীর থেকে কোনো খারাপ খবর এসেছে? -না না আমার বদলির চিঠি এসেছে। সেরেস্তাদার বল্লো-তা হুজুর ৩ বছর হয়ে গেল এখানে, বদলির চিঠি তো আসবেই। -না, না, তারজন্য নয়। বীরভূমে এসেছি একটা খর সৌন্দর্যের দেশ, ইষ্টবেঙ্গলে বদলি করলে সেটা হলো জলের দেশ তার রূপও আলাদা। আর আমাকে বদলি করলো কী না আ-রা-ম-বা-গে। একটা জলো প্যাচ্প্যাচে জায়গা, গরম, মশা, রাস্তায় চলা দায় প্রতি পদে পদে খানাখন্দ। যাইহোক মুনসেফ্ তো গেলেন আরামবাগ। পরের দিন একটা রিকশায় চেপে কোর্টে যাচ্ছেন। রাস্তায় অনেক জায়গায় খানা-খন্দ জলে ভর্তি। রিকশা থেকে নেমে নেমে সেগুলো পার হন, জুতো খুলে, প্যান্টে কিছু কিছু কাদার ছিটেও লাগে। কোর্টের শেষে পিয়নকে জিজ্ঞেস করলেন-হ্যাঁ হে এতো দেখছি রোজ ৪ আনা করে রিকশা ভাড়া দিতে দিতে তো ফতুর হয়ে যাবো। আর ধোপার খরচও তো খুব হবে। সস্তায় কিছু হয়না? পিয়ন, মাথা চুল্কে বল্লো-সস্তায় আর কী হুজুর, এই ১০ পয়সা দিয়ে একটা গামছা কিনবেন, সেটা পরে জোলো জায়গা খানাখন্দ গুলো পেরোবেন তারপর জামাটামা পরে নেবেন। শুনেই তো মুনসেফের আক্কেল গুরুম। ব্যাটাকে জিজ্ঞেস করলাম, সস্তায় কনভেন্স কী, বলে কি না গামছা। কী জায়গারে বাবা।
কয়েকদিন পরে ক্লাবে গিয়ে শুনলেন, এখানে খুব ভালো জুতো তৈরী হয়, আর দামও খুব সস্তা। এবং টেঁকে অনেকদিন। একদিন বাজারে একটা জুতোর দোকানে ঢুকলেন। হাকিম-কে দেখে দোকানদার তো গদ গদ। ছেলেকে বল্লো-চা নিয়ে আয়। চা-এলো। হাকিম চা খেলেন। তারপর দোকানদার বল্লো-হুজুর একবার বগলটা তুলুন। মুনসেফ ভ্যাবাচ্যাকা। ভাবলেন বগল তুলতে বলছে কেন? কী আর করেন, তুললেন বগলটা। দোকানী ছেলেকে বল্লো-ফিতেটা দে। বগলটা মাপলো, ছেলেকে বল্লো- লেখ সওয়া তিন ‘জ’। হুজুর বাঁ বগলটা। মাপার পর দোকানী বল্লো-ঠিক আছে হুজুর, সাত দিন পরে, আমার ছেলে কোয়ার্টারে গিয়ে জুতো দিয়ে আসবে। হতভম্ব মুনসেফ্ আর্তকণ্ঠে বললেন-সে কী পায়ের মাপ নিলেন না? দোকানী মুচকি হেসে বল্লো-পায়ের মাপ আর কী নেবো হুজুর, জুতো এখানে পরবেন কোথায়? সব তো খানাখন্দ, জলা, ওতো বগলেই রাখতে হবে। আবার ডান বগলটা ভেড়ে গেলে বাঁ বগলে রাখবেন বলে সেটার মাপও নিয়ে রেখেছি। সবাই হোঃ হোঃ করে হেসে উঠ্লেন। প্রফুল্লদার মুখ খুব গম্ভীর। ভাবলাম এই রে প্রফুল্লদা হয়তো সিরিয়াসলি চটে গেলেন। তাড়াতাড়ি বল্লাম-প্রফুল্লদা, বীরভূম নিয়েও একটা গপ্পো আছে বলি? প্রফুল্লদা ঘাড় নাড়লেন।
শুরু করলাম। —সকাল ৭টা ৩৫ মিনিটে কিউল প্যাসেঞ্জার ছেড়েছে। একটা কামরায় দুটি ছেলে পাশাপাশি বসে। একজন হুগলীর আর একজন বীরভূমের। দুটি ছোকরার নানান্ কথাবার্তা হতে হতে, শুরু হলো, কোন জেলার লোক বাড়িয়ে কথা বলতে পারে অর্থাৎ একজাজারেসন করে। দুজনেই চেঁচাচ্ছে, আমাদের জেলা বলে এবং উত্তেজিত হয়ে উঠছে। কামরায় বসা এক মাতববর বল্লেন-বাবা সকল, এরপর তো হাতাহাতি শুরু করবে। তার চেয়ে তোমরা একে একে কথা বল, আমরা পাঁচজন শুনে রায় দেবো, কোন জেলার লোক বাড়িয়ে কথা বলতে পারে। টস হলো। টসে বীরভূম জেলার ছেলেটি জিতেছে, সেই আগে কথা বলবে। থাই-এর ওপর থাবড়া মেরে, ছেলেটি বল্লো-আমাদের জেলায় একবার এক ভদ্রলোক। যেই না বলা, দড়াম করে হুগলীর ছেলেটা ওর পায়ে পড়ে বল্লো-কী বললে ভাই, শা-লা বীরভূম জেলায় ‘ভদ্রলোক’? তুমিই জিতেছো। আমাদের জেলার লোক অত বাড়িয়ে বলতে পারবে না। সবাই হেসে উঠ্লেন, সেইসঙ্গে প্রফুল্লদার মুখটা হাসিতে প্রফুল্লময় হয়ে উঠলো। হাঁপ ছেড়ে ভাবলাম, যাক বাঁচা গেল। প্রফুল্লদা বল্লেন-তুখোড় ছেলে আছো বাবা, আরামবাগ সম্বন্ধে বলে আমাকে খোঁচালে, তারপর নিজের জেলাকে খুচিয়ে আমাকে ঠাণ্ডা করে দিলে, বাহাদুরী আছে। আরে আমি তোমাকে দেখলেই ওইসব বলি। সেকী সত্যিই? বীরভূম একটা ছোট্ট জেলা কিন্তু দেখ দেকিনি, পাঁচ পাঁচটা পীঠস্থান। জয়দেব, চণ্ডীদাস, নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর জন্মস্থান। আর রবীন্দ্রনাথ তো জীবনের একাশি বছরের মধ্যে পঞ্চাশ বছর তো বীরভূমেই কাটালেন। যা বল্লে, এগুলো লিখে ফ্যাল, ভাল রসরচনা হবে। ১৯৫৩/৫৪ সাল হবে। আমি তখন সচিত্র সাপ্তাহিকের সম্পাদক। একটা সংখ্যায় বেশ গুছিয়ে ‘আরামবাগের জুতো’ নাম দিয়ে ছেপেছিলাম। প্রফুল্লদা তখন মন্ত্রী। একদিন কোয়ার্টারে গিয়ে দিয়ে এসেছিলাম। বল্লেন-কয়েকবছর পরে লিখলে। তোমার গপ্পোটা ২/৪ জনকে বলেছিলাম, কিন্তু তোমার মতো করে বলতে পারিনি। ভালোই হলো, এবার এটা পড়তে দেবো। প্রণাম করলাম। বল্লেন-অনেকদিন দেখিনি তোমাকে, মাঝে মধ্যে দেখা দিও।
আনন্দগোপাল সেনগুপ্ত-র লেখা আমি ও ঘোড়া করো ভগবান গ্রন্থের অংশবিশেষ