নড়বড়ে নয়, একেবারে হুমড়ে পড়া চেহারা। মাথার ওপর ছাদ আছে টালির, টালির গায়ে শ্যাওলার ফুলশয্যা পাতা। ভাঙা টালি চুঁইয়ে রোদ নামে হরদম। টানা বর্ষায় জল আটকানো দায়। তখন সেদিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে পরমেশ্বর। তার যেন কিছুই করার নেই এমন বোবা দৃষ্টিপাত। অথচ কতদিন ভেবেছে দুটো পয়সা জমিয়ে বদলে নেবে টালিগুলো। দোকানের ফুটোফাটা সারাবে। দু-দুটো ছেলে প্রাণপাত করে এই দোকানে। তবু লক্ষ্মী-গণেশের কৃপা হয় না।
কাঠের চুলায় আগুন থাকে সবসময়। খদ্দের আসলে নড়েচড়ে বসে পরমেশ্বর। তখন চোখের তারায় চিকচিকানি ঝিলিক ওঠে। দুটো পয়সার মুখ দেখার জন্য ছটফট করে বুকের ভেতরটায়। তার বুক বলতে গেঞ্জিতে ঢাকা বিঘত দেড়েকের হাড়খাঁচা। সেখানে ঢিসঢিস করে প্রাণপাখি। কাশতে গেলে হাড়ের কাঠামোটা নড়ে। শরীরটার ওপর দিয়ে তখন ঝড় বয়ে যায়। তবু শরীর সামলে দোকান আগলাতে হয় পরমেশ্বরকে। ছেলেদুটোর মতিগতি ভাল নয়। ওরা সুযোগ পেলেই ক্যাশ থেকে পয়সা সরায়। ছোটটা মদভাটির দিকে ঝুঁকেছে। বড়টা হাবেভাবে শান্তশিষ্ট কিন্তু ওর মনমেজাজ বোঝা দায়। তবু ছেলে বলে কথা, পরমেশ্বর ওদের সামনে ভিখারি–রাজা। গলা বাড়িয়ে বলে, “আমি যতদিন আছি, তোদের কোনও চিন্তা নেই।”
ছোটছেলে ঠোঁটকাটা, সে রগড় করে বলে, “মানুষ মরলেও দোকান মরে না। আর দোকান না মরলে আমাদের আর চিন্তা কী! একটা দোকান দশটা মানুষের পেট ভরিয়ে দিতে পারে সহজে।”
পরমেশ্বর মাথা চুলকায়, কপালের রেখা গাঢ় হয়, দু’চোখে ঢুলুঢুলু করে সন্দেহ। দোকান কি কামধেনু না কি যে যখন চাইবি দুধ দেবে? দোকানের পেছনে খাটতে হয়, দোকানকেও ভালবাসতে হয়। গাছ লাগালে ফল হবে এমন কোনও মাথার দিব্যি নেই। গাছের পেছনে না খাটলে গাছ শুকিয়ে যায়। দোকানও হল গাছের মতন। একে ভাল না বাসলে মুখ ঘুরিয়ে নেবে। তখন দশজন কেন একজনেরও পেটের দায়িত্ব সে নেবে না। এখনও সময় আছে, উঠে–পড়ে লেগে পড়। না হলে ভোঁ কাটা ঘুড়ির মতন সব ছেইয়ে হয়ে যাবে। তখন কপাল চাপড়ালেও হারাধন পাবি নে।
ফাঁকা টেবিলের ওপর মাছি ওড়ে ভনভনিয়ে। তাদের ডানার শব্দে কেমন ঝিমুনি আসে পরমেশ্বরের। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঘুমও আড়ি করে চলে গেছে। ভোরের দিকে যেটুকু ঘুম হয় তাও পাতলা ফিনফিনে, পচা সুতোর চেয়েও কমজোরি। ফলে সারাদিন ম্যাজম্যাজ করে গা–গতর। ঠায় বসে থেকে দোকান সামলাতে কষ্ট হয়।
এত কষ্টর মধ্যেও বড়ছেলে বিশেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে পরমেশ্বর। বিশেটার বিয়ে হয়ে গেলে তার বুঝি দায়িত্ব শেষ হয়। ছেলে বিয়ে দিয়ে মেয়ে পার করবে সে। রমার কবে যে বিয়ের বয়স শরীরে পাপড়ি বিছাল সে টেরও পায়নি এতদিন। এ ব্যাপারে সতী যদি না বলত তাহলে কোনওদিন কি পরমেশ্বরের চোখ খুলত!
সতী এমনিতে কম কথার মানুষ। সেদিন রাতে খেতে বসে উশখুশিয়ে সে বলেই বসল, “ছেলে বিয়ে দেওয়ার জন্য যে পাগল হচ্ছ, মেয়েটার দিকে কি কোনওদিন নজর দিয়েছ? ঘরে আগুন নিয়ে তুমি যে কীভাবে শান্তিতে বসবাস কর এ আমি ঠিক বুঝি নে!”
কথা শুনে পরমেশ্বরের গলায় রুটির দলা আটকে যায়। কোনওমতে ঢকঢক জল খেয়ে তবে নিস্তার। সত্যিই তো, রমার কথা সে কোনওদিন ভাবেনি। মেয়েটা ঘরের কাজকর্ম সব করে। দেখতে শুনতে খারাপ নয়, তবু এ যুগে বিনা কড়িতে কি কোনও মেয়েকে ঠেলেঠুলে বিবাহের বৈতরণী পার করা যায়? চিন্তাটা সেই যে বুকে পেরেক পুঁতেছে, এর থেকে এক দিনের জন্যও নিস্তার পায়নি সে। মনে স্ফূর্তি কিংবা দুঃখ থাকলে মানুষ মদভাটিতে যায়। পরমেশ্বরের স্ফূর্তি নেই, মন ভরা শুধু দুঃখ। কাজের শেষে মদভাটি তাকে রোজ টানে। ড্রয়ার খুলে ক’টা টাকা বের করে নিয়ে সে আর দাঁড়ায় না। ছেলেদুটোও জেনে গেছে, নেশা চড়লে বাবাকে আর ঠেকানো যাবে না। ওরাও মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে পথ থেকে।
ঠাকুরদার আমলের চায়ের দোকান। তখন এর সাজসজ্জা, রূপবাহার, ঠাঁটবাট অন্যরকম ছিল। তখন চা–দোকানের পাশাপাশি হোটেল চলত। কাচের আলমারিতে সাজানো থাকত হরেকরকম মিষ্টি। চিনিপাতা দই বিখ্যাত ছিল পরমেশ্বরের দোকানের। খদ্দের মৌমাছি হয়ে উড়ে আসত সবসময়। দুটো কর্মচারী হিমশিম খেয়ে যেত। বাপের সঙ্গে হাত লাগাত পরমেশ্বর। সময় কীভাবে কেটে যেত বোঝা যেত না। পয়সার নেশায় শরীরে তাগত আসত হাতির সমান। পরমেশ্বর ভেবেছিল দিনগুলি বুঝি এভাবেই কেটে যাবে। দোকান শ্রী হারানোর পর থেকে পরমেশ্বরের চেহারাটাও গেছে। পাওয়ার বেড়েছে চশমার। গালের চামড়া ঝুলে গাছের পুরনো ছালের থেকেও কদর্য হয়েছে। শরীর পড়েছে, মন ঝুঁকেছে। গভীর চিন্তায় বার্ধক্যের গভীরে তলিয়ে গেছে সে। তবু দোকানের ওপর সে অভিমান করে থাকতে পারেনি। শরীর না চললেও দোকানে সে একবার আসবেই। পুরনো টেবিলগুলোয় স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কত ভাল–মন্দ লোক পায়ের ধূলি দিয়েছে দোকানে। আবেগ অনুভূতির কতকিছু যেন আটকে আছে টালির ছাদের নীচে। ওগুলোকে ইচ্ছে করলে ধরা যায়, ছোঁয়া যায়, নিজের ভেবে বুকের ভেতর লালনপালন করা যায়। এই চা–দোকান তার কাছে তীর্থস্থান। এখানে যে শান্তি, দুনিয়ার কোথাও গেলেও এই শান্তি সে পাবে না।
আজ একটু সকাল সকাল দোকান খুলেছে পরমেশ্বর। ঝাড়াই–পোঁছাই শেষ করে সে মুখ ফাঁক করে বসে আছে কাঠের চেয়ারে। বিশু আজ বিশেষ কারণে গম্ভীর তবু ওর রক্তে আজ অন্যধারার মাতন। আজ সে বাবার মুখের ওপর একটাও অপ্রীতিকর কথা বলেনি। সে জানে আজকের দিনটা তার। এগারোটার ট্রেনে লোক আসবে তাকে দেখতে। এর আগে সে গিয়ে দেখে এসেছে মেয়েটাকে। আরতির চোখ-মুখের গড়ন ভাল, সবচেয়ে ভাল ওর পাতলা ঠোঁটের হাসি। মাথা ভরা চুল এখন আর মেয়েদের মধ্যে দেখা যায় না। ব্যতিক্রম শুধু আরতি। খোঁপা বেঁধে সে যখন তার মায়ের সঙ্গে এল, সেই প্রাণ ছটফটানো দৃশ্য কি একমুহূর্তের জন্য ভুলতে পেরেছে বিশে? পারেনি। পারা সম্ভবও নয়। আঠাশ বছর বয়সটা বিয়ের জন্য উপযুক্ত। মন একেবারে ডাসা আঙুর। চোখদুটো প্রজাপতির ডানার চেয়েও রঙিন। গাছের পাতাকে মনে হয় সুগন্ধি ফুল। আরতিকে দেখে আসার পর থেকে বিশে মাঝেমধ্যে স্মৃতির গহ্বরে খুইয়ে ফেলে নিজেকে। ভবিষ্যৎ সুখ এসে ঘাই দেয়। পৃথিবীটা কত স্বপ্নিল আর রঙিন মনে হয় তখন।
আজ আরতির বাবা আসবে। সঙ্গে বড়দা এবং আরও দু’জন। ট্রেন থেকে নেমেই প্রথমে ওরা দোকানে আসবে। দোকান থেকে ঘর অবধি নিয়ে যাবে রামেশ্বর। বিশেকে সবার পছন্দ, শুধু দোকান আর ঘরবাড়ি পছন্দ হলেই পাকা কথা বলতে পারবে পরমেশ্বর। এ সম্বন্ধ কিছুতেই হাতছাড়া করতে দেবে না। মেয়েপক্ষ মালদার পার্টি, দেবে থোবে ভাল। বিয়ের বরপণের টাকায় রমা যদি পার হয়ে যায়, মন্দ কী।
দোকানের সামনে পনেরো ফিটের পাকা রাস্তা। বাস–লরি–টেম্পো চলে হরদম। রাস্তার ধুলো হামেশাই হামলা চালায় কাচের আলমারিটার ওপর। দীর্ঘদিন ওদিকে কারও নজর নেই, ফলে ধুলোর আস্তরণে চেহারা বুড়োটে হয়েছে কাচঘেরা আলমারির। পরমেশ্বর ধুতি উঠিয়ে দাপনা চুলকে অর্ডার করল ছোটটাকে, “এই ধানু, আলমারিটা একটু সাফা করে দে বাপ। লোকজন আসছে। দোকানে তো এখন আর কিছু নেই। কেউ এলে প্রথমে ওই আলমারিটাকে দ্যাখে।”
অন্যদিন হলে ধানু অসন্তোষের জলছবি আঁকত চেহারায়। আজ তার মতিগতি কিছুটা শীতল। হাই তুলে সে একটা পুরনো ন্যাকড়া নিয়ে ধুলো ঝাড়ার কাজে মন দিল। বিশেও বসে নেই। সকালবেলায় স্নান সেরে সে ধোওয়া প্যান্ট–জামা পরে এসেছে। অন্যদিন দোকানে আসার সময় সে হাওয়াই চপ্পল পরে, আজ আর সোল ক্ষয়া হাওয়াই চপ্পল তার পায়ে নেই, পুরনো চামড়ার চপ্পলটা সে গলিয়ে নিয়ে দু–বার ব্রাশ বুলিয়ে আয়নায় মুখ দেখেছে বারবার। বহু যত্ন নিয়ে চিরুনি চালিয়েছে চুলে। এমনিতে তার গায়ের রং লাউয়ের খোসার মতো। শরীরটা কিঞ্চিৎ ভারী। মাথায় ঠাসঘন চুল, চোখ–নাক–মুখের দেখন ভাল। তবু মনে মনে সে ভয় পায়, যদি মেয়েপক্ষ তাকে কোনও কারণে পছন্দ না করে। তাহলে ডুবে মরার জল থাকবে না। আর কোনওদিন সে আর কারও সামনে মুখ দেখাতে পারবে না। সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে।
বিশে ভেবেছিল সে আজ কোনও কাজে হাত লাগাবে না, আজ তার আরাম করার দিন। কিন্তু নোংরা ধ্যাড়ধেড়ে পায়া নড়া টেবিলগুলোর দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা মোচড় মেরে উঠল। কোথা থেকে পেরেক নিয়ে সে বসে গেল টেবিলের পায়া ঠিক করতে। ইট আর পেরেকের ঠকঠক শব্দে পরমেশ্বরের হৃদয়ে সুখের ঢেউ খেলে গেল তৎক্ষণাৎ। পান খেতে যাবার নাম করে সে দোকান ছেড়ে সোজা চলে গেল ভাটিখানায়। গলা ভিজিয়ে সে যখন ঢুলুঢুলু চোখে ফিরে এল তখন বেশ ঝলমলে রোদ উঠেছে, শনশনিয়ে হাওয়া বইছে ঘাম শুষে নিয়ে।
পরমেশ্বরের আজকের দিনে মদ খাওয়া বিশের মাথায় আগুন ধরিয়ে দেয়। আগে থেকেই ঠিক ছিল স্টেশনে পাত্রীপক্ষকে আনতে যাবে পরমেশ্বর। ভরপেট মদ গিলে আসার পর সে কি আর এমন মহান কাজের যোগ্য রইল? বিশের মাথার ভেতর কুটকুট করে রাগ, “বাবা, এই কাজটা কি তোমার ঠিক হল?”
পরমেশ্বর ছ্যাঁকা খাওয়া চোখে তাকাল, “কোন কাজটা?” হেঁউ করে ঢেকুর ছাড়ল সে। ঝাঁঝালো, চেনা দুর্গন্ধ নাকে যেতে বিশের গলার কাছে বমি ঠেলে উঠল। কোনওমতে নিজেকে সামলে সে বলল, “আজকের দিনে তোমার মদ গিলে আসাটা উচিত হয়নি। মেয়েপক্ষ কী ভাববে বলো তো? ভাববে এরা মাতালের বংশ, এদের ঘরে মেয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।”
যেন দুঃস্বপ্ন দেখে উঠে বসেছে পরমেশ্বর, কপালটা বাঁ হাতের দু’আঙুলে টিপে ধরা গলায় বলল, “আজকের দিনে এসব ছাইপাঁশ না গিললে ভাল হত। কিন্তু…”
“কিন্তু কী?”
বিশের জিজ্ঞাসায় নড়বড়ে দেখাল পরমেশ্বরকে। সে ঢোক গিলে বলল, “ওরা তো এগারোটার ট্রেনে আসবে, ততক্ষণে আমার মুখে আর গন্ধ থাকবে না। তুই অত ভাবিস নে । যা, আমার জন্য একটা তিনশো জর্দার পান নিয়ে আয়।”
দোকানদারির ফাঁকে ফাঁকে পরমেশ্বর কাঠের চেয়ারে হেলান দিয়ে বিড়ি টানে। ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়িয়ে দেয় বাতাসে। হতশ্রী বুড়ো থুরথুরে দোকানটার দিকে তাকিয়ে তার চোখের তারা করকর করে। কোণের দিকের বেঞ্চিটায় বসে আছে দু’জন গাঁয়ের মানুষ। ওদের চেহারার সাথে বুড়োটে ক্ষয় ধরা দোকানটার অদ্ভুত খাপ খেয়ে যায়। যেমন দোকান তেমন তার খদ্দের। মনে মনে হেসে ওঠে পরমেশ্বর। অথচ ক’বছর আগেই তো এই চা–মিষ্টি জলখাবারের দোকানটা গমগমিয়ে চলত। এখনও যে চলে না তা নয়, তবে তা না চলার মতো। দোকানে খদ্দের না থাকলে পাত্রীপক্ষ বুঝে নেবে এটা দোকান নয়, বুড়ো ঘোড়া। রোজ যে ছোকরাগুলো এ দোকানে আড্ডা মারতে আসে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে, চা খায়— কাল বলা সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত ওরা এল না কেন? এই নিয়ে পরমেশ্বরকে বেশ চিন্তিত দেখায়। ছোকরাগুলোর সাথে কথা হয়ে আছে, আজ ওদের বিনে পয়সায় চা খাওয়াবে সে। বিনিময়ে ওদের একটু ভিড় জমিয়ে থাকতে হবে দোকানে। পাত্রীপক্ষ চলে যাবার পর ওদের ছুটি।
ট্রেন আসতে ঠিক পনেরো মিনিট আগে এল ছেলেগুলো। পরমেশ্বর বড় করে নিশ্বাস নিয়ে উঠে গেল ওদের দিকে। চোখে–মুখে অস্থিরতা।
“আজকে এত দেরি হল?”
“দেরি কোথায় কাকু, এখনও তো পনেরো মিনিট বাকি।”
পরমেশ্বর স্বস্তির চোখে তাকাল, “তোমরা বসো। আমি চা করে দিই। ওদেরও আসার সময় হল।”
“কাকু, একটা কথা বলি?”
পরমেশ্বরের থতমত খাওয়া মুখ, “বলো বাবা।”
রোগা লম্বা ছেলেটা বলল, “এই দোকানটা দেখে কোনও মেয়ের বাবা তার মেয়েকে দেবে না। দোকানে না এনে আপনি যদি ওদের বাড়িতে নিয়ে যেতেন।”
“কেন, দোকানের কী খারাপ দেখলে?”
রোগা লম্বা ছেলেটা একটু কঠোর হয়ে উঠল, “চাল নেই চুলো নেই, এটা আবার দোকান নাকি? এই দোকানের ভরসায় কোনও বাবা তার মেয়েকে জলে ঠেলে দিতে পারবে না। মানুষ এখন আর অত বোকা নেই। হাঁ করলেই মানুষ এখন পেটের ভেতরের সবটা দেখতে পায়।”
হতোদ্যম পরমেশ্বরের কপালে ঘাম ফুটে উঠছে বিন্দু বিন্দু, চোখে–মুখে গভীর ছাপ পড়েছে দুশ্চিন্তার। তবু সে হার মানার লোক নয়। মাথা ঠিক রেখে পাঁচ কাপ চা বানাল সে। বিশে অস্থির হয়ে উঠছিল, ঢোক গিলে বলল, “বাবা, আর দেরি কোরো না। গাড়ি আসার সময় হয়ে গেল।”
“হ্যাঁ যাই।” পরমেশ্বর হাতের তালুতে ঘাম মুছে নিজের দিকে তাকাল। আজকের এই বিশেষ দিনে তার মদ গিলে আসাটা উচিত হয়নি— এই চিন্তাটাই বারবার তার মাথায় ঘুরেফিরে এল। একটা তিনশো জর্দার পান খেয়ে, ধুতি গুছিয়ে নিয়ে সে স্টেশনের দিকে চলে গেল।
এগারোটার ট্রেনটা কুড়ি মিনিট দেরিতে পৌঁছনোর জন্য বিশের চিন্তা বাড়ছিল লাফিয়ে লাফিয়ে। স্কুলের পরীক্ষা ছাড়া জীবনে সে আর কোনও ধরনের পরীক্ষায় বসেনি। আজকের এই দিনটা তার মনে হয় বিশেষ কোনও পরীক্ষার দিন। বুকের ভেতর কেমন যেন একটা করছে, ঠিক আনচান নয়, ধড়ফড়ানি নয়, টানটান উত্তেজনায় সে বুঝি নুইয়ে যাবে। এ সময় আরও কয়েকটা উড়ো খদ্দের এলে ভাল হত। আরও ভাল করে দোকানটাকে সাজাতে পারলে ভাল লাগত। কাচের আলমারিটা ফাঁকা ফাঁকা। দু–চাররকম মিষ্টি যে বানিয়ে রাখবে তেমন পুঁজি নেই।
বিশে দাঁত দিয়ে কড়ে আঙুলের নখ খুঁটতে খুঁটতে দেখল চারজন স্বল্প পরিচিত লোককে নিয়ে দোকানের দিকে এগিয়ে আসছে পরমেশ্বর। ওরা কাছে আসতেই বিশের বুকের ধড়ফড়ানি বেড়ে গেল শতগুণ। সে মনে মনে মা কালীর নাম স্মরণ করে হাসিমুখে এগিয়ে গেল ওদের দিকে।
চারজন মানুষ ধোয়া–পোঁছা বেঞ্চির ওপর বসতেই জলের গ্লাস এগিয়ে দিল ছোট। প্লেট ভরে মিষ্টি সাজিয়ে দিল বিশে। দু–চারটে কথা বলে সে ক্যাশবাক্সের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়াল। পরমেশ্বর বিনীত গলায় বলল, “মিষ্টিগুলো খেয়ে নিন আপনারা। এখানে চা খেয়ে আমরা বাড়ির দিকে যাব।”
পঁচিশ বছরের যুবকটি চায়ের দোকানটাকে দেখছিল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বিশের বুক শুকিয়ে যাবার উপক্রম হল। বাঁকা চোখে যুবকটি কী দেখছে? ওর কি তাহলে দোকানটাকে পছন্দ নয়? যদি অপছন্দ হয় তাহলে বিশেষ কিছু করার নেই। সমস্ত পরিশ্রম তার বৃথা হয়ে যাবে।
বিশে নিজের হাতে দুধ দিয়ে চা বানাল যত্ন নিয়ে। চারজনই একটা করে মিষ্টি খেয়ে আর খেল না। পরমেশ্বর তোষামোদের সুরে বলল, “মিষ্টিগুলো সব খেয়ে নিন। খাঁটি ছানার মিষ্টি। এখানকার মিষ্টির সুনাম আছে।”
ওরা কেউ পরমেশ্বরের কথা শুনল না। বিশে দেরি না করে চায়ের কাপগুলো নামিয়ে রাখল ওদের সামনে। পরমেশ্বর খুশি হল, “আমার দোকানের চায়ের সুনাম এখানকার লোকের মুখে মুখে শুনতে পাবেন। নিজের দোকান বলে বাড়িয়ে বলছি না, আপনারা জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।”
“না না। তা আর জিজ্ঞেস করার কী আছে? সব কিছু তো নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি।”
মেয়ের বাবা জোর করে হাসল। পরমেশ্বর উৎসাহিত হল। “এটা আমার বাবার আমলের দোকান। এ অঞ্চলের সব চাইতে পুরনো দোকান। এমন সুন্দর পজিশনে একটা চা-মিষ্টির দোকান থাকলে ছেলেদের আর চাকরি করার দরকার হবে না। সেই যে বলে না, বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী!”
মেয়ের বাবা শুকনো হাসল। বিশে পান নিয়ে এল চারটে। পরমেশ্বর বলল, “এবার তাহলে ঘরের দিকে যাওয়া যাক, কী বলুন। ঘরে বসেই পাকা কথা হবে।”
ঘরে গিয়েও পাকা কথা বলল না মেয়েপক্ষ। সব দেখেশুনে মেয়ের বাবা বলল, “আমরা এখন যাই। পরে চিঠি দিয়ে জানাব। ছেলে আমাদের পছন্দ। তবে—”
***
জানাশোনার মধ্যে জল যে এতদূর গড়াতে পারে, বুঝতে পারেনি পরমেশ্বর। আশায় বুক বেঁধে ছিল সে। বিশের হার্নিয়া অপারেশন করাতে গিয়ে পাঁচশো টাকা খরচ হল। এতে তার কোনও দুঃখ নেই। ছেলেটা কষ্ট পাচ্ছিল, কষ্টের হাত থেকে তো মুক্তি পেল। তাছাড়া বিয়ের পরে এসব ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লে ভাল দেখায় না। ছেলে-বউ দু-একদিন আরাম করবে। আত্মীয়স্বজনদের ঘরে ঘুরতে যাবে। যত ঝামেলা সব বিয়ের আগেই মিটিয়ে ফেলা ভাল।
চিঠি আসবে আসবে করেও এক মাস পেরিয়ে গেল। রোজই পোস্টঅফিসে যায় বিশে। চেনাজানা পিওনটার মুখের দিকে তাকিয়ে সে কী করে যেন বুঝে যায় আজও চিঠি আসেনি। মুখ নিচু করে ফিরে আসে দোকানে। পরমেশ্বর দাপনা চুলকে বলে, “কী হল কে জানে! ওরা যে এভাবে চুপ করে যাবে ভাবতে পারছি না। দেখি, সময় করে আমাকেই একদিন যেতে হবে। গরজ তো উভয়পক্ষেরই।”
অপারেশনের দাগটার দিকে তাকিয়ে বিশে ভাবে, সেই ঘন চুল, টিকালো নাক, মায়াঘন ছায়াময় মুখের কথা। দাগটা থেকেই গেল শরীরে। আমৃত্যু থাকবে ওটা। দাগটা থাকে থাকুক, যন্ত্রণাটা মিলিয়ে গেলেই স্বস্তি।