“কীটেদের মতো
হব কি আহত
ঘাসের আঘাতে!
বেদনার সাথে
সুখ পাব!” (পিপাসার গান : ধূসর পাণ্ডুলিপি)
জীববিজ্ঞানে জীবজন্তু-কীটপতঙ্গের নাম, তাদের পর্ব, গণ প্রভৃতি আলোচিত হয়ে থাকে। তাদের আচরণ অভ্যাস বসবাস প্রজনন প্রভৃতি নানাদিক আলোচনা জীববিজ্ঞানের একটি মূল উদ্দেশ্য। সেই জীববিজ্ঞানের কিছুটা উদ্দেশ্য যদি কোনও কবি পূরণ করেন, তাঁকে আমরা কি বলবো? কীটবিজ্ঞান-কবি? জীববিজ্ঞান-কবি? তাঁকে আমরা বিজ্ঞানী বলার ধৃষ্টতা না করলেও অনায়াসে জীবপ্রেমী-কবি বলতে পারি। এবং এটি শুধু ‘রূপসী বাংলা’ কাব্য থেকেই প্রতিপন্ন করা যায়। কেননা সেখানে যে অজস্র পাখি, পোঁকা, মাছের অবস্থান তা দেখে বলা যায়, জীবজগতকে গভীর অনুধ্যানে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের বর্ণনা বা তাদের অনুভূতি-আচরণ-অভ্যাসের সঙ্গে নিজের অনুভূতিকে যুক্ত করে দেওয়া একজন জীবপ্রেমীর পক্ষেই সম্ভব। জীবনানন্দ সেই জীবপ্রেমী। নিজের আনন্দ অনুভূতি, হতাশা আকাঙ্ক্ষা, অভিজ্ঞতা অনুসন্ধান পর্যবেক্ষণ প্রকাশে সেসব জীবজন্তু কীটপতঙ্গরা বিশেষভাবে কবিকে প্ররোচিত করে থাকবে। বাংলার মাঠে প্রান্তরে, ঘরে দুয়ারে, পুকুরে নদীপাড়ে, গাছে-গাছে দিনে রাতে যেসকল জীবের চলমানতা তার নানা উদাহরণ রূপসী বাংলা কাব্যটি। কবি এখানে মূলত পর্যবেক্ষক। পরে সেই পর্যবেক্ষণ তাঁর কবিতার উপকরণ যেন। কবির সেই পর্যবেক্ষণের সমীকরণটি ধরা আছে রূপসী বাংলা’র ৫৭ নং কবিতায় —
“ঘাসের ভিতরে যেই চড়ায়ের শাদা ডিম ভেঙে আছে — আমি ভালোবাসি…
বহুক্ষণ চেয়ে থাকি; — তারপর ঘাসের ভিতর
শাদা-শাদা ধুলোগুলো পড়ে আছে দেখা যায় : খইধান দেখি একরাশ
ছড়ায়ে রয়েছে চুপে; নরম বিষণ্ণ গন্ধ পুকুরের জল থেকে উঠিতেছে ভাসি;
কান পেতে থাক যদি — শোনা যায়, সরপুটি চিতলের উদ্ভাসিত স্বর
মীনকন্যাদের মতো : সবুজ জলের ফাঁকে তাদের পাতালপুরীর ঘর
দেখা যায় — …
বহুক্ষণ চেয়ে থাকি একা;
অপরাহ্ন এল বুঝি? — রাঙা রৌদ্রে মাছরাঙা উড়ে যায় — ডানা ঝিলমিলে;
এখুনি আসিবে সন্ধ্যা, — পৃথিবীতে ম্রিয়মাণ গোধূলি নামিলে
নদীর নরম মুখ দেখা যাবে — …” শুধু প্রকৃতিকে নয়, প্রকৃতির জীবকে তিনি নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করেছেন। বাংলার গাছগাছালি, ঘাস ফুল, ধান, সকাল দুপুর বিকেল সন্ধ্যা রাতকে যেভাবে লক্ষ্য করেছেন, বাংলার জীবজগতও সেখানে সমান গুরুত্ব পেয়েছে। চড়ায়ের ডিম কিভাবে ধুলোতে ভেঙে থাকে, শাদা ধুলো খইধান ছড়িয়ে থাকে, পুকুরের জলের গন্ধ, কান পেতে শোনা যায় মাছের স্বর, দেখা যায় পাতালপুরী, মাছরাঙার ঝিলমিল ডানা, সন্ধ্যা নামলে নদীর নরম মুখ — এসব পর্যবেক্ষণ কবিকে জীব জগতের রূপকার করে তোলে। তাঁর বহু কবিতায় এই দেখার চোখ, শোনার কান, অনুভূতির স্পর্শ, গন্ধের আয়োজন আছে৷ আছে পঞ্চইন্দ্রিয়ের অবস্থান —
ঘ্রাণ — “নরম ধানের গন্ধ — কলমির ঘ্রাণ,
হাঁসের পালক, শর, চাঁদা-সরপুটিদের
মৃদু ঘ্রাণ,” (রূপসী বাংলা ৬ নং)
শোনা — “ভিজে পেঁচা শান্ত স্নিগ্ধ চোখ মেলে কদমের বনে
শোনাবে লক্ষীর গল্প — ভাসানের গান নদী শোনাবে নির্জনেঃ” (রূপসী বাংলা ৫ নং)
স্পর্শ — “আমি এ ঘাসের বুকে শুয়ে থাকি — শালিক নিয়েছে নিঙড়ায়ে
নরম হলুদ পায়ে এই ঘাস;…
কাঁচের মতন পাখা এ ঘাসের গায়ে
ভেরাণ্ডাফুলের নীল ভোমরারা বুলাতেছে — ” (রূপসী বাংলা ৯ নং)
দেখা — “সেখানে মানুষ কেউ যায়নাকো — দেখা যায় বাঘিনীর ডোরা
বেতের বনের ফাঁকে, — জারুল গাছের তলে রৌদ্রে পোহায়
রূপসী মৃগীর মুখ দেখা যায়, — ” (রূপসী বাংলা ৩১)
স্বাদ — “মউমাছি চাক আজও বাঁধে না কি জামের নিবিড় ঘন ডালে
মউ খাওয়া হয়ে গেলে…
মধুর চাকের নিচে — মাছিগুলো উড়ে যায়…ঝড়ে পড়ে…মরে থাকে ঘাসে — ” (রূপসী বাংলা ৬০ নং)
জীবনানন্দ যেভাবে জীবজন্তু কীটপতঙ্গকে রূপসী কবিতায় তুলে ধরেছেন, তাতে বাংলার প্রকৃতি যেমন ধরা দিয়েছে, তেমনি সেসব জীবেরা কবির বিভিন্ন অভিব্যক্তি ব্যক্ত করছে। কবি তাদের নানারূপে উপস্থাপন করেছেন। তাদের গতিপ্রকৃতিতে জীববৈচিত্র্যের কর্মশালা হয়ে উঠেছে রূপসী বাংলা। আমাদের বনফুলের ‘ডানা’ উপন্যাসের কথা মনে আসতে পারে, কিন্তু সেখানে শুধুমাত্র পাখি আছে। এখানে আছে পাখি পোঁকা মাছ পশু। আছে বাংলার রূপ। ‘ডানা’ পাখির সংগ্রহ। ‘রূপসী বাংলা’ জীবকুলের মানবিক ছবি যেন। তারা প্রত্যেকে যেন কবির কথায় আমাদের মানবিক অনুভূতির বাহক হয়ে উঠেছে। একই পাখি, কাক, একই পেঁচা, শালিখরা সেখানে উঠে আসছে নানাভাবে। যেমন কাক পাখিটি রূপসী বাংলাতে কেমন ভাবে উঠে আসছে দেখা যেতে পারে —
“ঠোঁট-ভাঙা দাঁড়কাক ঐ বেলগাছটির তলে
রোজ ভোরে দেখা দিত — অন্য সব কাক আর শালিকের হৃষ্ট কোলাহলে
তারে আর দেখি নাকো; — ” (৫৪ নং)
“একদল দাঁড়কাক ম্লান গুঞ্জরনে
নাটার মতো রাঙা মেঘ নিঙরায়ে নিয়ে সন্ধ্যার আকাশ
দু-মুহূর্ত ভরে রাখে — ” (৩৭ নং)
“কাকের তরুণ ডিম পিছলায়ে পড়ে যায় শ্যাওড়ার ঝাড়ে।” (৪৭ নং)
এই কাব্যের ৪৬ নং কবিতায় কাকের রঙ হয়েছে নীল। ২৮ নং কবিতায় কবি শুনছেন ‘করুণ কাকের ক্লান্ত ডাক’। আবার ২৪ নং কবিতার নামকরণ দাঁড়কাক। ১১ নং কবিতায় সন্ধ্যায় নীড়ে ফিরে আসার গতি আছে — ‘সন্ধ্যায় যে দাঁড়কাক উড়ে যায় তালবনে — মুখে দুটো খড় / নিয়ে যায় — ’। একইভাবে পেঁচা ‘ভিজে শান্ত স্নিগ্ধ চোখ মেলে’ তাকিয়ে থাকছে। কখনও শোনাচ্ছে গান কখনও গল্প। কখনও তারা ঘাসে ঘসে নিচ্ছে পাখনা। হয়ে উঠছে ‘ধানের গন্ধের মতো অস্ফুট, তরুণ;’ লক্ষী পেঁচা কথা বলে, কবির ভালো লাগে ‘শীত রাতে — পেঁচার নম্রতা;’ ‘পেঁচা কাঁদে নিম — নিম — নিম’ বলে —
“পেঁচা যে খড়ের চালে নেমে আসে পৌষের রাত্রির দুপুরে
সেই সুরে শান্তি আছে — শেষ আছে — মৃত্যু আছে জানি,
তবু সেই সুর ভালো।” (নিরীহ, ক্লান্ত ও মর্মান্বেষীদের গান)
এভাবে কখনও হাঁস, শালিক, গাঙচিল উঠে এসেছে। কাক পেঁচা তাদের পুরনো লোকপরিচিতি ছাড়িয়ে নতুন করে কাব্য পরিচিতি পেয়েছে জীবনানন্দের কলমে, আমাদের ধারণার বিপরীতে গিয়ে। সেখানে এসেছে নানা কীটপতঙ্গ। যাদের সঙ্গে কবি বাংলার প্রকৃতিকে উপভোগ করতে চান। ঘুমিয়ে থাকতে চান কাঁচপোকা সাপমাসী পোকার সঙ্গে। যেখানে জলে ভাসে চাঁদা-সরপুঁটি মাছ। পাওয়া যায় তার ঘ্রাণ। উঠে আসে মৌরলা মাছ। গুবরে পোকার ক্ষীণ গুমরানি শোনের রোদের দুপুরে। মরা প্রজাপতির নরম পাখার রেণু ঘাসে ফেলে দেয় পিঁপড়ে। এমনকি বোলতার হৃদয়েও যে আনন্দ উৎসব থাকতে পারে সেসব জীবনানন্দই প্রথম দেখালেন বাংলা কবিতায়। তাদের বাসা, বাসস্থান, দৈহিক বিবরণ দিলেন জীবনানন্দ। অজস্র কীটপতঙ্গ, পাখি, মাছ এনে জীবনানন্দ তাদের জীবন চলাচলের, প্রাকৃতিক অভ্যাসের যেসব কথা বললেন তাতে বোঝা যায় তাঁর চোখ যেমন সজাগ ছিল, অনুসন্ধানী ছিল, তেমনি তাদের যে অন্তর আছে, তাদেরও যে জৈবিক ক্রিয়া ছাড়া জীবনের স্রোত আছে সেসব বোঝা গেল কাব্যের পাতায়। বাংলার কীটপতঙ্গ বাংলার জীবকুল আমাদের গোচরে এল। গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য, যতীন বাগচির কথা মনে রেখেও বলা যায় জীবনানন্দের মতো তাঁরা এতো আন্তরিক করে কীটপতঙ্গদের তুলে ধরতে পারেন নি।
জীবনের আনন্দ, নিরাশা, আকাঙ্ক্ষা, বিষ্ময়, জিজ্ঞাসা প্রভৃতি আঁকতে গিয়ে জীবনানন্দ ওইসব পাখি পশু কীটদের অন্যন্য ভঙ্গিমায় তুলে ধরলেন। তাদের কথায় সান্দ্র হয়ে গেল কবির নিজের হৃদয়। বনলতা সেন কাব্যের ‘হায় চিল’ কবিতায় যে কান্নার সুর সেখানে কবির বিষাদ মিশে যাচ্ছে —
‘হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে-উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে।’ কখনও জেগে উঠেছে প্রেমিক চিলপুরুষের শিশির-ভেজা চোখ। বুনো হাঁসের উড়ে যাওয়া দেখে কবির মনে পড়ে অতীতের অরুণিমা সান্যালের মুখ। বুনো হাঁসের মতো যে কবির জীবন থেকে চলে গেছে দূরে আরও দূরে। কবিতার নামকরণ করছেন হায় চিল, বুনো হাঁস, হরিণেরা, বেড়াল। আবার প্রকৃতির স্বরূপ তুললে গিয়ে আনছেন তাদের —
“ভোর;
আকাশের রঙ ঘাসফড়িঙের দেহের মতো কোমল নীল :
চারিদিকে পেয়ারা ও নোনার গাছ টিয়ার পালকের মতো সবুজ।…
সূর্যের আলোয় তার রঙ কুঙ্কুমের মতো নেই আর;
হয়ে গেছে রোগা শালিকের হৃদয়ের বিবর্ণ ইচ্ছার মতো।
সকালের আলোয় টলমল শিশিরে চারিদিকের বন ও আকাশ
ময়ুরের সবুজ নীল ডানার মতো ঝিলমিল করছে।” (শিকার) প্রকৃতি ও জীবের এরকম সহবস্থান জীবনানন্দ ছাড়া আর কোথাও নেই। সেখানে কবির প্রাণের মিথস্ক্রিয়া মিশে থাকে। এমনকি মৃত্যুকে তুলে ধরতেও সেসব জীবের আবাহন। জীবের মধ্যে আমাদের জীবনের লীলাকে মিশিয়ে দিয়েছেন কবি। দুজন কবিতায় চিলের সোনালি ডানা খয়েরি হয়ে যাওয়া, ঘুঘুর পালক ঝরে যাওয়া, শালিকের হলুদ ঠ্যাং উঁচু করে ঘুমানোর মধ্যে যে মৃত্যুর ছবি, সেখানেই জীবনের গূঢ় কথা বলে নিলেন কবি — ‘ঝরিছে মরিছে সব এইখানে — বিদায় নিতেছে ব্যপ্ত নিয়মের ফলে।’
সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জীবনানন্দের কাব্যে জীবজন্তুরা আরও জীবনযন্ত্রণাঘন চেহারা নিয়ে উপস্থিত হতে থাকে। ধূসর পান্ডুলিপি রূপসি বাংলাতে যে কীটদের পাখিদের আমরা একটা মেদুর মিষ্টি বিষাদঘন কখনও প্রেমযুক্ত চেহারা নিয়ে দেখেছি, তারা কবির হাতে পরবর্তীতে আরও কঠোর হয়ে দেখা দিচ্ছে যেন৷ মহাপৃথিবী-র শব কবিতায় মশা মাছের রঙে লাগল মৃত্যুর ছোঁয়া। আট বছর আগের একদিন কবিতায় রক্ত ফেনা মাখা ইঁদুর, গলিত ব্যাঙ, রক্তক্লেদে বসে থাকা মাছি, মরণের সঙ্গে ফড়িঙের লড়াই তৎকালীন সময়ের ছবিকে তুলে ধরল। জীবনে বেঁচে থাকার সমীকরণ, মৃত্যুর ঘনঘটা, সেখানে মানুষের মতো জীবজন্তু এমনকি কীটপতঙ্গরাও সমান। তাদের মাধ্যমে আমাদের জীবনের নানা কথা বলা হলেও, সেখানে তাদের জীবনচক্রকে আমরা পাচ্ছি। যদিও তারা কবিতার আধারে আমাদের সঙ্গে লিপ্ত হয়ে গেছে। তবু অজস্র জীবের গতিপ্রকৃতিতে জন্ম-মৃত্যুর আলেক্ষ্য রচনা করেছেন জীবনানন্দ। আমরা বিভিন্ন রূপকথার গল্পে অজস্র জীবজন্তু কীটপতঙ্গকে পেয়েছি। যেমন নবনীতার রূপকথার গল্পে। সেখানে তারা কথা বলেছে, শুভকামী জীবনের জয়গান গেয়েছে। কিন্তু জীবনানন্দের হাতে তারা অতি বাস্তব হয়ে হাজির হয়েছে। তারা সেভাবে কথা বলেনি, কিন্তু তাদের চালচলনে, তাদের জীবনযাত্রার মাধ্যমে জীবনানন্দ যেন জীবজন্তু কীটদের মানুষের প্রতিলিপি করে তুলছেন। যে অনবদ্য বোধে তাঁর জীবমণ্ডল কাব্যময় ঘোরাফেরা করে তারা সময়কে আরও স্পষ্ট করে দেয়। সেখানে প্রকৃতি জীব ও সময়ের রসায়নে গড়ে ওঠে কবিতা। জোনাকি ফড়িঙ হাঁসের ডানার বাহার যেমন দেখা যায়, তেমনি বাঘ হরিণের লুকোচুরি, শেয়াল শকুনের নখ থাকে, থাকে সিংহের হুঙ্কার। দেয়ালি পোকা মরে পড়ে থাকে ঘাসে, শিকারির গুলির আঘাতে মরে যায় বালিহাঁস। তারা কখনও রহস্যঘেরা রূপে হাজির হয়, কখনও দর্শনীয় হয়ে ওঠে। তবে সেসব জীবের সংরক্ষণের কোনও কাব্যিক প্রকাশ দেখা যায় না। জীবনের সহজ ধর্মে তাদের জীবনচক্রকে কবি মেনে নিয়েছেন, গেঁথে দিয়েছেন আমাদের জীবনকে। তবে তারা সংকেতবাহী হয়ে উঠেছে থেকে থেকে। সে ভূমিকা পালন করেছে বাঘ সিংহ শকুন । কীটেরা তাদের স্বল্প আয়ুর জীবন নিয়ে কবির চোখে ধরা দিয়েছে বারেবারে। তাদের গন্ধ স্পর্শ জীবনানন্দের চেতনায় যেভাবে উঠে এসেছে সেভাবে বাংলার জীব-বৈচিত্র্য আর কোথা পাওয়া যায়! তাদের অন্তরকে যেভাবে বর্ননা করা হয়, তাদের প্রেম, তাদের দিনরাতের কর্ম যেভাবে উঠে আসে তা আর কোথা!
জীবনানন্দ বাঙালি কবি, বাংলার কবি। বাংলার প্রকৃতি মানুষ জীবনচর্চা তুলে ধরার নিরিখে জীবনানন্দ অগ্রগণ্য ও বিবিধতার সমন্বয়কারী। সেখানে ঘাস পাতা গাছ, আকাশ নদী মাঠ তারা যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে সকাল দুপুর গোধূলি সন্ধ্যা ভোর রাত্রি। জীবজগতের অবস্থান বাংলার মুখকে ফুটিয়ে তুলছে। তাদের অবস্থানে কবিতা হয়ে উঠছে চলমান। এমনকি বাংলার প্রাচীন গল্প, লোকপার্বন, গার্হস্থ্য অভ্যাসে সেসব জীব দূরে থাকেনি। আমাদের মাঠে ঘাটে আকাশে গাছে তারা গেয়ে উঠেছে, ছুটেছে, উড়েছে, পাশে বসেছে, একে অপরকে কাছে ডেকেছে। সেই অপার জীবজগতকে আমরা যদি গণনা করি তাহলে তাদের একটা বিভাগ করা যেতে পারে। যেমন —
পশু, পাখি, মাছ, কীট
অথবা এদেরকে খেচর, স্থলচর, জলচর, উভচর শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে। তাঁর কাব্য থেকে দেখে নেওয়া যেতে পারে তাদের প্রায় সমানুপাত অবস্থান। সংখ্যা গণনায় তারা প্রায় সমানে সমানে অবস্থান করছে। আবার কবিতার গায়ে তাদের অনুপাতও দেখে নেওয়া যেতে পারে। যেখানে তাঁর সমগ্র কাব্যময় তাদের আনুপাতিক অবস্থান জীবনানন্দকে জীবপ্রেমী হিসাবে দেখতে বাধ্য করে। জীবনানন্দের বরিশালের ঘর, মাঠ বা কলকাতার যে বাড়িতে তিনি বেশি থেকেছেন বা যখন হেঁটেছেন তখন এসব জীবের চলাচল কবিকে নিশ্চয় আলোড়িত করে থাকবে। যে জীবন মনস্তত্ত্ব নিয়ে তাঁর জীবন চলেছিল, তারই প্রতিচ্ছবি হয়তো ওসব জীবকীটের মধ্যে দেখেছিলেন তিনি। বেঁচে থাকার নিরিখে সব প্রাণী এক, এটাই যেন জীবনানন্দ বোঝাতে চেয়েছেন। আমাদের মতই পাখিদের মধ্যে প্রেম, আমাদের মতই জীবজন্তুর মধ্যে বেঁচে থাকার লড়াই, আমাদের মতই প্রকৃতির নীলে ডুবে যাওয়ার ইচ্ছা ওসব প্রাণীর মাঝে খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনানন্দ। তাদের অন্তরের কথা যেন তিনি বুঝতে পারতেন। তাদের হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে যেতেন কবি, মিলিয়ে নিতেন আমাদের সঙ্গে —
“হেমন্তলক্ষীর সব শেষ অনিকেত আবছায়া তারাদের
সমাবেশ থেকে চোখ নামায়ে একটি পাখির ঘুম কাছে
পাখির বুকে ডুবে আছে, —
চেয়ে দেখি; — তাদের উপরে এই অবিরল কালো পৃথিবীর
আলো আর ছায়া খেলে — মৃত্যু আর প্রেম আর নীড়।” (হেমন্তরাতে)
এর থেকে জীবনের সামগ্রিক মূল্যায়ন আর কি হতে পারে! এভাবেই কি জীবকুল অর্থাৎ মানুষ পশুপাখিকীট এক হয়ে যায় না! জীবনের যাত্রাপথে! গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যকে আমরা যদি বাংলার কীটপতঙ্গ নিয়ে বাঙালি জীববিজ্ঞানীর পথিকৃৎ বলে থাকি, তাহলে জীবনানন্দকে কি বাঙালি জীবপ্রেমী কবি বলা অসঙ্গত হবে! কেননা জীববৈচিত্র্যের সম্ভারে, জীবকুলের জীবনছন্দে তাঁর যে পর্যবেক্ষণ, অনুসন্ধান, অভিজ্ঞতার প্রকাশ তা আর কোন্ কবির কলমে পাওয়া যায়! একটা উদাহরণ দিয়ে আমরা সেটা কিছুটা তুলে ধরতে পারি, যেখানে কবির পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ আছে, কল্পনা আছে, আছে জীবনানন্দীয় চেতনা —
‘খয়েরি শালিকগুলো খেলছে বাতাবিগাছে — তাদের পেটের শাদা রোম
সবুজ পাতার নিচে ঢাকা পড়ে একবার পলকেই বার হয়ে আসে,
হলুদ পাতার কোলে কেঁপে-কেঁপে মুছে যায় সন্ধ্যার বাতাসে।
ও কার গরুর গাড়ি রয়ে গেছে ঘাসে ঐ পাখা মেলে ফড়িঙের মতো।
হরিণী রয়েছে বসে নিজের শিশুর পাশে বড়ো চোখ মেলে;
আাঁকাবাঁকা শিং ছুঁয়ে তাদের মেরুন গোধূলির
মেঘগুলো লেগে আছে; সবুজ ঘাসের ’পরে ছবির মতন যেন স্থির;…
মানুষ যা চেয়েছিল সেই মহাজিজ্ঞাসার শান্তি দিতে আসে।’ (মানুষ যা চেয়েছিল)
জীবনানন্দের বহু বহু কবিতায় এর অজস্র উদাহরণ ছড়িয়ে আছে, তা সে কাব্য রূপসী বাংলা হোক বা হোক বেলা অবেলা কালবেলা বা অগ্রন্থিত কবিতা। জীবনবোধে সদাজাগ্রত কবি কিভাবে তাদের পাশ কাটিয়ে যাবেন! কিভাবে যেতে পারেন! কেননা তিনি যে জীবনানন্দ! জীবনের আনন্দ খুঁজতে গিয়ে, জীবনের ব্যথা-বেদনা, হতাশাকেও যিনি নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছিলেন। এসব নিয়েই চেয়ে দেখেছিলেন নীল আকাশ, বাংলার মাঠ, ধুলো। যেখানে ছিল জীবনের সামনে জীবনকে দাঁড় করানোর অভিপ্রায়, তাদের প্রতি আন্তরিকতা —
‘কোথাও পাবে না শান্তি — যাবে তুমি এক দেশ থেকে দূরদেশে?
এ মাঠ পুরনো লাগে — দেয়ালে নোনার গন্ধ — পায়রা শালিক সব চেনা?…
ফড়িং অনেক দূরে উড়ে যায় রোদে ঘাসে — তবু তার কামনা অবাধ
অসীম ফড়িংটিকে খুঁজে পাবে প্রকৃতির গোলকধাঁধায়?
***
ছেলেটির হাতে বন্দী প্রজাপতি শিশুসূর্যের মতো হাসে;
তবে তার দিন শেষ হয়ে গেল;…
অলঙ্ঘ্য অন্তঃশীল অন্ধকার ঘিরে আছে সব;
জানে তাহা কীটেরাও, পতঙ্গেরা, শান্ত শিব পাখির বানাও;
বনহংসীশিশু শূন্যে চোখ মেলে দিয়ে অবাস্তব
স্বস্তি চায়; — হে সৃষ্টির বনহংসী, কী অমৃত চাও?’ (দেশ কাল সন্ততি) জীবনানন্দ বাংলার জীবকুলকে আমাদের নিবিড় সংস্পর্শে এনেছেন। তাদের করে তুলেছেন একান্ত বাংলার জীববৈচিত্র্য, জীবনের দোসর।
লোকসংস্কৃতির নানা দিক অন্বেষণ ও প্রবন্ধের জগতে পরিচিত হয়ে উঠেছেন লেখক। কবিতা লেখা ও বিভিন্ন কবির কবিসত্বা বিশ্লেষণ তাঁর সাহিত্য সাধনার আরেক দিক।