নিজের হাতে গড়া এক লৌহকঠিন ঘেরাটোপের ভেতরে নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলেন অন্নপূর্ণা দেবী। যে জীবন এক নিভৃত অন্তরালের কথাকাহিনি, সেই জীবনের অবসান ঘটলো গত ১৩ অক্টোবর ২০১৮, শারদোৎসবের প্রাক্কালে। বাবা আলাউদ্দিনের জীবন তো আমাদের কল্পনারও অতীত। নানা গুরুর কাছে সংগীতশিক্ষা শেষ করে মধ্যপ্রদেশের ছোট্ট করদ রাজ্যে মাইহার থিতু হন সংগীতাচার্য বাবা আলাউদ্দিন। রাজা ব্রিজনাথ সিংহের দরবারে তাঁর স্থিতি হয়। স্ত্রী মদিনা বেগমকে নিয়ে মাইহারে বসবাস করেন বাবা আলাউদ্দিন। তাঁর দ্বিতীয় কন্যা রোশনারার জন্ম বাংলা ১৩৩৪ সালের চৈত্র পূর্ণিমার রাত্রে (২৩ এপ্রিল ১৯২৭)। রাজা ব্রিজনাথ তাঁকে বোঝান, চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথি দেবী অন্নপূর্ণার পূজার জন্যে নির্ধারিত। অন্নপূর্ণা পূর্ণতার প্রতীক।
প্রথম কন্যা জাহানারার মৃত্যুর পর বাবা আলাউদ্দিন একটু সংশয় বোধ করতেন। কিন্তু অন্নপূর্ণার মধ্যে একেবারে ছোটোবেলা থেকেই সাংগীতিক সম্ভবনার বিকাশ দেখে তাঁর হাতে তুলে দিলেন সুরবাহার। বাবা কন্যাকে কাছে ডেকে বললেন, সংগীতের মধ্যে রয়েছে আধ্যাত্মিক শক্তি। ললিত, তোড়ি, জৌনপুরি বা দরবারি, কেদারা এইসব রাগ বাজালে মনের বিভিন্ন স্তর খুলে যায়। এ এক অনন্ত অনুধ্যান। সেই শুরু হলো অন্নপূর্ণার সংগীতসাধনা। তাঁর ভাই আলি আকবরকে হয়তো বাবা একটি বিশেষ বন্দিশ দিয়েছেন সরোদে তুলে নেওয়ার জন্য। বাবা চলে গিয়েছেন মাইহার রাজার সঙ্গে কোনও আমন্ত্রণে। আলি আকবর মেতে উঠেছেন খেলায়, ঘুড়ি ওড়ানোয়। বাবা যেদিন বাড়ি ফিরবেন, তাঁর আগের দিন আলি আকবরের হুঁশ ফিরলো। এদিকে তিনি বন্দিশটি ভুলে গেছেন। বাবার রাগের কথা সারা মাইহার রাজ্য জানতো। ঠকঠক করে কাঁপছেন আলি আকবর। দাদার করুণ অবস্থা দেখে ছুটে এলেন অন্নপূর্ণা। বাবা রওনা হওয়ার আগে বন্দিশটি যখন আলি আকবরকে শেখাচ্ছিলেন, অন্নপূর্ণা সে সময় মা মদিনা বেগমকে রান্নার কাজে সাহায্য করছিল। তিনি একবার কানে শুনেছেন মাত্র। অনায়াসে দাদাকে বার বার গেয়ে শোনালেন বন্দিশটা। এরকম বহু বৃত্তান্ত সকলকে শুনিয়েছেন কিংবদন্তি সরোদিয়া আলি আকবর খাঁ সাহেব নিজের মুখে।
এর পর মাইহারে এলেন উদয়শঙ্করের ভাই রবীন্দ্রশঙ্কর। রবিশঙ্কর, আলি আকবর এবং অন্নপূর্ণা পাহাড়-ঘেরা মাইহারে বাবার পায়ের কাছে বসে সংগীত শিক্ষা করতে লাগলেন। পৃথিবীতে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে।
রবিশঙ্করের সংগীতশিক্ষার দু-বছরের মাথায় মাইহার ছুটে এলেন বিশ্ববিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্কর। হাজার সিঁড়ি ভেঙে বাবা আলাউদ্দিনকে নিয়ে পৌঁছোলেন শারদা মন্দিরে। সেখানেই রবিশঙ্কর আর অন্নপূর্ণার বিবাহ স্থির করলেন। ১৯৪২ সালে তাঁদের প্রথম সন্তান শুভেন্দুশঙ্করের জন্ম। পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং অন্নপূর্ণা দু-বছর মতো যুগলবন্দী বাজিয়েছেন। অন্নপূর্ণা দেবীর বাঙালি জীবনীকার স্বপনকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তথাগত রায়চৌধুরীকে দুই সময়ে দেওয়া দুটি আলাদা সাক্ষাৎকারে অন্নপূর্ণা জানিয়েছিলেন- ১৯৫৫ সালের ৩০ মার্চ দিল্লির constitution club-এ শ্রী রাগ বাজিয়েছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর এবং অন্নপূর্ণা দেবী। সেদিন রাত্রে খাওয়ার সময় পণ্ডিতজি তাঁকে বলেন, ‘তুমি যখন একটা স্বরে সাপটে লেগে থাকো তখন সেই স্বর থেকে সবটুকু রস নিংড়ে বের করতে পারো। সুরবাহারের মজাটাই ওখানে। অন্নপূর্ণা দেবী বলেন, ‘এ তো বাবার শিক্ষা যে প্রত্যেকটা স্বরে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ানো’। পণ্ডিত রবিশঙ্কর বলেন, ‘সেতার বেচারি inferiority complex-এ ভোগে’।
এর পর অন্নপূর্ণা নিজেকে সরিয়ে নেন সমস্ত প্রকাশ্য অনুষ্ঠান থেকে। একটি রেকর্ড বেরিয়েছিল তাঁর এবং পণ্ডিত রবিশঙ্করের দ্বৈতবাদনের। সেটিও প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য রেকর্ড কোম্পানিকে চিঠি লেখেন। অথচ অন্নপূর্ণা দেবী সম্মানিত হয়েছেন সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার, পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, সরস্বতী সম্মান ইত্যাদি পুরস্কারে। আরও বিস্ময়ের হলো, এই ঘরানার সংগীতশিল্পীদের মধ্যে রয়েছে নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, পান্নালাল ঘোষ, বাহাদুর খাঁ, হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া প্রমুখ। এঁরা অনেকেই শিখেছেন অন্নপূর্ণা দেবীর কাছে।
এই দেবীপ্রতিমার বিসর্জন হলো দুর্গা চতুর্থীর দিন।
আমার খুবই ভাল লেগেছে, বিশেষ করে বাবা আলাউদ্দিন আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান,