ঋতু আসে, ঋতু যায়। মনের যাপনে মরুতে মরুদ্যান। প্রজাপতির ঝিলিমিলি পাখায় রোদের আল্পনা। সময়ের সাথে বাজতে থাকে মনের সেতার। সে সুরসপ্তকে ঝালার কাজ মুদারায়। কাঁচের গ্লাসে উপচে পড়া রঙিন পানীয়ের ফোয়ারায় ভেজে উচ্ছল জীবন। খুশির হাসি খানখান হয়ে ছড়িয়ে প’ড়ে তুলো হয়ে ভেসে ওঠে নীল আকাশের গায়ে। হাওয়ায় হাওয়ায় তাকে ডাক পাঠায় কাশের বন। সখ্যতায় জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার ঢেউ তোলে। ঢেউয়ে ঢেউয়ে আনন্দের সুর। মেনকা দিন গোনে। বছরের পর বছর পার করে উত্তেজনা থিতু হলেও চোরাবানে নদী কূল ছাপিয়ে যায়। দিন যাপনের আঙুল মৃদুলয়ায় খেলে চলে। দিন শেষের কাজে সুরসপ্তকের তারায় স্মৃতিমেদুরতা আবেশ জড়ায়।
সেবার ভাদ্রের শেষ রজনীতে তারার জলসায় সোহিনী রাগের আলাপনে রটেছিল, সে আসছে। এমন আনন্দঘন খবরে বর্ষাশেষের যুবতী প্রকৃতি শিহরিত হতেই শিউলি ঝরল মাটিতে; সুগন্ধে মাতাল হল ত্রিভুবন। লজ্জা পেল মাটি, তবুও তার আসার অপেক্ষায় প্রহর গোনার ছলে শিউলির আল্পনায় এঁকে দিল পথ। আশ্বিনের প্রথম ভোরে আকাশজোড়া পূবের কুসুমভাঙা রোদ যখন আশাবরীর ছড় টানল ঠিক তখনই হাসপাতালের প্রসূতিগারে মায়ের নিরাপদ জঠর থেকে উন্মুক্ত ধরাধামে বাসা বদলের অভিঘাতে তারস্বরে প্রতিবাদ জানালো এক মেয়ে।
শারদসকালে ফুটফুটে নবজাতিকাকে মায়ের কোলে তুলে দিয়ে ধাত্রী সেবিকা বলেছিল, “এ যে উমা।” জানলার শার্সী বেয়ে আড়মোড়া ভাঙা নরম রোদ গায়ে জড়িয়ে মা-মেয়ের প্রথম দেখা। দুর্গাপুজোর ঠিক আগেই এ এক মহোৎসব; জীবনভর মেতে ওঠা আনন্দলহর।
সমাজ মুখ বেঁকিয়েছিল আদিখ্যেতায়। কন্যাসন্তানের এত আদর! স্রোতের বিপরীতে স্বপ্নসুখে বিহ্বলা মা স্নেহের আশীষে মুড়েছিল আত্মজাকে। ভালোবাসার কবচকুণ্ডল জড়িয়ে চিনিয়েছিল আলোর তারতম্য। ভোরের আদুরে আলো, দুপুরের খরতাপ, মিঠে বিকেলের কনে-দেখা আলো। আলোর সমুদ্রে ভাসতে থাকা ভেলায় মা দক্ষ কাণ্ডারী।
জীবনের প্রথম কান্না ভেঙে মেয়ের অন্তরে মা বিশ্বাসের সুতোয় বুনেছিল মমতার গালিচা। প্রতি বছর এদিনটা ঘিরে মা-মেয়ের জীবনে চলে ভালোবাসার উদযাপন। মেয়ে হয়ে ওঠে বিশেষ থেকে বিশেষতর। শুধুমাত্র ওর জন্যই বর্ষাশেষের আকাশটা ঘন নীল হয়ে ওঠে, মেঘবলাকার দল খুশির ডানা মেলে দেয় সুদূরের হাতছানিতে। সোনা রোদে সবুজ ছাওয়ায় শ্যামলা মাটি রূপটান দেয়। নিজেকে বড় শুচিস্নিগ্ধ মনে হয় মেয়ের। চারদিকে এত আয়োজন তো ওকে ঘিরেই!
পুজোর আগেই নতুন জামা পড়ার আনন্দে মেয়ের খুশি মায়ের বুকে আলো জ্বালে। আলোর গন্ধ শোঁকে মেয়ে। মেয়ের শরীর জুড়ে পায়েসের ঘ্রাণ।
সময় গড়িয়ে চলে। কালের নিয়মে মা হারিয়ে যায় তারাদের দেশে। তবুও তারারা লিখে চলে কাব্য। কবেকার হারিয়ে যাওয়া আশ্বিনের প্রথম প্রভাত আজও ফিরে ফিরে আসে। মেয়ের কানে কানে বলে বিশ্বাসের মন্ত্র জড়ানো মায়াভরা ভালোবাসার রূপকথা। আশ্বিনের প্রথম ঊষার হিমেল হাওয়ার আশাবরী টোনে মেয়ে শোনে আগমনীর ডাক।
এ এক একলা আনন্দযাপন। প্রকৃতির নিবিড় সৌন্দর্যের মাঝেই তার জন্য ছড়িয়ে আছে ভালোবাসার রক্ষাকবচ। আনন্দময়ী ঊমার আবাহনে সে নিজেই এক আগমনী সুর। মায়ের ইচ্ছের স্বর্গীয় প্রসাদে তার জীবনজুড়ে এক পৃথিবী ভালোবাসা।
অর্ধশত আশ্বিনের রোদমাখা মেয়ের মন আজও বিশেষ হয়ে উঠতে চায় বছরের এই একটি দিনে। জাঁকজমকে নয়, রত্নাকরের গহীনতায়। ভৈরবী বাতাসে ডাক আসে। কফির কাপ হাতে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায় মেয়ে। ছেঁড়া মেঘের ফাঁক গলে আকাশে ছড়িয়ে পড়া ছাই ছাই আলোয় দুটি চোখ খুঁজে বেড়ায় শিশিরস্নিগ্ধ এক মমতাময়ীকে। আকুতিভরা প্রাণফোয়ারা থেকে অজান্তেই বেরিয়ে আসে, “মা গো”! ফুলের সৌরভে মিশে যায় সে শব্দ। হাওয়ার দোলায় পাড়ি দেয় অচিনলোকে।
অন্তরতম গোপন সুখের বেদীতে নিরন্তর জ্বলতে থাকা পিদিমের সলতে উসকে দিয়ে মেয়ে মন-কুলুঙ্গিতে একলাটি আসনপেতে বসে। এই অপার্থিব আলোর ওম্ তাকে ঘিরে রাখে সবসময়। এ যে তার বড় আপনার। দূর আকাশে চোখ রাখতেই আজ কেন যেন ওর মনে গুনগুনিয়ে উঠল রবিঠাকুরের গান, “জড়ায়ে আছে বাধা ছাড়ায়ে যেতে চাই ছাড়াতে গেলে ব্যথা বাজে”।
“হ্যাপী বার্থডে মা।” একটা কচি কন্ঠ কলকলিয়ে উঠে কোমর জড়িয়ে ধরে মেয়ের। একলা ঘরের সুখের মোহ ছেড়ে বাস্তবে ফেরে ও। দেখে সেই মুহূর্তে আরও এক মেয়ে ওকে বিশেষ করে তুলেছে। খুশির শিহরণে আপনভোলা মেয়ে কোলে তুলে নেয় আত্মজাকে। আজ আরও একবার নরম রোদের চাদরে মোড়া মা-মেয়ের মিলনে থমকে দাঁড়ায় সময়। অনুরাগের চেতনায় ভাসে আগমনীর সুর।।
তোমার লেখায় পেলাম পুজোর গন্ধ- কাশের রূপ, শিউলির গন্ধ, নীল আকাশের ঔজ্জ্বল্য আর মা মেয়ের অপার মায়া বন্ধনের খবর । বড় মায়াময় লেখা
কি মিঠে ভাষা!শরতের আলোর মত উজ্জ্বল , মালিন্য হীন এ লেখা।