| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সৌমেন দেবনাথ-এর ছোটগল্প ‘অন্য জীবন কথন’

Reporter
সৌমেন দেবনাথ / ৮৫৭ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২ জুন, ২০২২

জমিরন ভাবী বড় ভালো। মায়াবী ডানা দিয়ে আগলে রাখে ছেলেটাকে। ছেলের মুখ না দেখেই নজর মিয়া শ্রমিক হিসেবে দুবাই গেছে সংসারের চাকা সচল করার জন্য। একটু আগে বেশক্ষণ স্বামীর সাথে কথা বললো জমিরন ভাবী। মুখে একটু হাসি জেগেছে। আমাকে দেখতে পেয়েই হাসি থামালো। বললো, কবে এলে ভাই?

আমি বললাম, গতকাল।

কটাক্ষ হেসে ভাবী বললো, ডিম পেড়ে ঘরে তা দিচ্ছিলে? গতকাল এসেছো আজ দেখলাম!

তারপর তীর্যক চোখে চেয়ে বললো, বিয়ে করবে না?

বললাম, পড়াশোনা শেষ না করে?

ভাবী বললো, বয়স তো কম হলো না। এই বয়সেও যারা বিয়ে করে না হয় তাদের শারীরিক সমস্যা, নতুবা দুই নম্বর কাজ করে।

বলেই ভাবী হেসে দিলো। ভাবীর রসালো কথার উত্তর না করে বলি, ভাবী, নজর ভাইকে না দেখে কিভাবে থাকেন?

ঠোঁটে হেসে ভাবী বললো, এত এত দেবর থাকতে ভাইয়ের লাগে? দেবররা তো পায় বরের পরের স্থান। বর এড়িয়ে চললেও দেবররা এড়িয়ে চলে না। দেবররা তো সব জবর। যেভাবে চেয়ে দেখে বরও ওভাবে চেয়ে দেখতে জানে না।

আমি নিজেকে সংযত করে বাজারে গেলাম। সৌদি আরব ফেরত বাদশার গাল-গল্প জনা বিশেক লোক শুনছে। গুরুত্ব না দিয়ে বাজার করে ফিরছি। বেশ রাত হয়ে গেছে। মূল রাস্তা দিয়ে না যেয়ে পায়ে হাটা রাস্তা দিয়ে ফিরছি। জদুর বৌ জদুকে গরম দিচ্ছে, তিন তিনটে বাচ্চা, আর না।

জদু বিশ্রী একটা শব্দ উচ্চারণ করে বললো, সদূর মালয়েশিয়া থেকে কেন এসেছি বুঝিস না?

আমি ওদের একান্ত কথা না শুনে বাড়ি ফিরছি। জমিরন ভাবী হারিকেনের আলোয় কাঁথা সেলাই করছে। বাচ্চাটা বিরক্ত করতে করতে ঘুমিয়ে গেছে। শহর চাচা ভাবীর সাথে কি কথা বলছে, জানার আগ্রহ কাজ করলো। ভাবী দেখলাম বিরক্ত হয়ে বললো, বলেছি না রোববার আসতে!

দুই জনের আন্তরিক ভাব দেখে সন্দেহ হলো। আশিককে ফোন দিলাম। ও আমার বন্ধু। গ্রামেই থাকে। গ্রামে কি ঘটছে না ঘটছে ওর কাছ থেকে সব জানি। বললাম, শহর চাচা জমিরন ভাবীর সাথে রাতে কি গল্প করে?

আশিক বললো, জমিরন ভাবী থেকে সাবধান। যাকে তাকে দাওয়াত দেয়।

আমি শুনে থমকে গেলাম। ভাবীর সম্বন্ধে এক সেকেন্ডে ধারণা পরিবর্তন হয়ে গেলো। তবুও বললাম, মজার ছলে বলে! দেবরদের সাথে ভাবীরা তো কত মশকরা করে!

আশিক বললো, মজার ছলে কেউ নিজের ইজ্জত অন্যের কাছে বিলায় না।

পরেরদিন নজর ভাইয়ের বাড়ির দিকে গেলাম। না গেলে ভাবী আবার বলবে ডিমে তা দেয়ার কথা। দেখলাম আতিকের বৌ জমিরন ভাবীর সাথে গল্প করছে। তার আঁচল ধরে কান্না করছে চার বছর বয়সের ছেলে। পাঁচটা টাকা নেবে তাই। আমি আতিকের ছেলেকে নিয়ে খেলা করছি। জমিরন ভাবী আতিকের বৌকে বললো, দেখতে তো বেশ সুন্দরী হচ্ছিস!

আতিকের বৌ বললো, স্বামীর বাহানা নেই তো তাই!

জমিরন ভাবী বললো, কবে আসবে দেশে আতিক ভাই?

আতিকের বৌ বললো, এখনো এক বছর থাকবে।

জমিরন ভাবী বললো, এই এক বছরে তো একেবারে সতের বছরের যুবতী হয়ে যাবি। স্বামী এলে যে কী খুশি হবে!

আতিকের বৌ লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। তারপর ছেলেকে নিয়ে চলে গেলো। চোখ দুটো যেন জলে ভাসবে ভাসবে। স্বামীর কথা মনে হয় খুব মনে পড়েছে। দূরত্বের কারণে স্বামীর প্রতি টান বেড়েছে দশ থেকে বিশ গুণ। ভালোবাসার খাঁদ আগুনে পুড়ে খাঁটি হয়েছে।

জমিরন ভাবী আমাকে ডাক দিলো। বললো, এভাবে তো পাড়া বেড়িয়ে বেড়ানো ঠিক না। ভাবীদের দেখে দেখে নিজের মনেও জ্বালা বাড়বে, ভাই শূন্য ভাবীদেরও জ্বালা বাড়বে।

আমি বললাম, ভাইয়েরা তো দখল রেখে গেছে, দখলদারিত্ব তো ছেড়ে যায়নি।

জমিরন ভাবী শুনে হেসে বললো, কত সাদা কাগজ সামনে পড়ে, ব্যবহার অযোগ্য ভেবে তো নির্বিঘ্নে চলো।

চমকে উঠলাম আর বললাম, মনে খুব কষ্ট বুঝি ভাবী?

ভাবী বললো, মুখে হাসি বুকে জ্বালা। মুখের হাসি সবাই দেখে, বুকের জ্বালা কেউ দেখে না।

আমি কি বলবো না বুঝতে পেরে চুপ থাকলাম। ভাবী ডাকলো আর বললো, আসো। দুটো খেয়ে যাবে আজ।

আমি ভাব বেগতিক দেখে বললাম, না ভাবী, আজ না অন্যদিন।

ভাবী বললো, বড় ভাইয়ের ঘরে কি ছোট ভাই খায় না?

আমি হন্তদন্ত হয়ে বললাম, জ্বি খায়। ভাই আসুক তখন খাবো।

আমার ভেগে পড়া দেখে ভাবী কলকলিয়ে হেসে উঠলো।

পরের দিন জানালা দিয়ে চেয়ে দেখি জমিরন ভাবী নজর ভাইয়ের সাথে কথা বলছে। সংসার খরচ চেয়ে নিচ্ছে। পরক্ষণেই নাদের আমাকে ফোন দিলো। বললো, বাড়ি গিয়েছিস নাকি?

বললাম, হ্যাঁ।

নাদের বললো, দুই ভাই আমরা। বাইরে থাকি। বয়স্ক মা, ভাবী আর পিচ্চিটারে একটু দেখে রাখিস।

আমি বললাম, আচ্ছা।

নাদের আমার বন্ধু। যা বললো দেখতে গেলে তো ফেসে যাবো। যে ভাবীরে!

বলতে না বলতেই জমিরন ভাবী আমার ঘরে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামের ছবি দেখে ভাবী বললো, ঘর তো সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছো। আর একলা নয়, এবার দুকলা হও। মনেরও তো খাদ্য দরকার!

আমি বললাম, কাজ-কাম না করলে কোন বাপ কি তার মেয়েকে আমার হাতে দেবে? মেয়ের বাপের ঘরে তো মেয়ে বেশি হয়ে যায়নি।

বলেই ভাবীর দিকে তাকালাম। নিজেকে গোছানোর যেন কোন তাগিদই নেই তার। উত্তাপ ছড়িয়ে উত্তপ্ত করছে। এত আপত্তিকর অবস্থায় কেউ থাকে? অনাঘাতের পুষ্পকলি সকলের কামনার বস্তু। মন ভরানো সৌন্দর্য চোখ ধাঁধিঁয়ে দিলো। হৃদয় প্রসন্ন তাই চেহারায় প্রফুল্লতা, অঙ্গভঙ্গিতে ঈষৎ চপলতা। অতুল্য অবয়বের অষ্টহাস্যময়ী মানবীর মত শারীরিক ছলাকলার মাধ্যমে পুরুষের তৃষ্ণা বাড়িয়ে কর্পূরের মত হারিয়ে যায় না। দৃষ্টিতে নেই মালিন্য, নেই অগ্নি, শুধুই বিস্ময়, শুধুই মুগ্ধতা। ঝর্ণার মত উচ্ছ্বসিত হয়ে উন্মাদের মত চেয়ে আছে। চোখ ফিরিয়ে আর তাকালাম না। দ্বিতীয়বার তাকানোও ঠিক না। ভাবী বললো, যুবতী নারীর যৌবনের খাই কিন্তু জানো না ভাই। বয়স থাকতে বিয়ে করো। না পারলে না পারবে সয়তে, না পারবে কয়তে।

নিজ মনে বললাম, সংসার কি কেবল জৈবিক চাহিদার উপর ভিত্তি করে চলে? আর বয়স গেলেই বা কি? সাপের বয়স বাড়ে, বিষ কমে না।

মুখে বললাম, নাদের ফোন করেছিলো, আপনাদের দেখে রাখতে বলেছে!

ভাবী তাচ্ছিল্যের সুরে বললো, দেখে দেখে রেখো তবে! কী আর দেখে রাখবে! তোমার ভাই টাকা দেয়, টাকা জমে বাক্সে। মন থাকে খালি পড়ে। টাকায় না হয় পেটের খাবার মেলে, মনের খাবার কি মেলে?

বিরক্ত হওয়া সত্ত্বেও বিরক্তি প্রকাশ না করে বললাম, মনকে বশে আনেন, তাকে বোঝান, যা মন চায় কিনে খান, টাকা তো আছে। যেখানে মন চায় ঘুরে আসেন, টাকা তো আছে।

ভাবী বললো, ভাইয়ের প্রয়োজন কি ভাইয়ের টাকা দিয়ে পূরণ হয়? শখের স্বাদ কি পাহাড়, নদী দেখে মেটে?

বললাম, সংসার চালাতে তো টাকা দরকার। ভাই কী এমনি এমনি বিদেশ পড়ে? নিজের উন্নয়ন, সংসারের উন্নয়ন, সর্বোপরি দেশের উন্নয়নে ভাইদের মত মানুষদের কতই না ভূমিকা।

ভাবী বললো, টাকায় কি সব? যে বয়সে যা দরকার বয়স গেলে তা পাবো? ঘূণপোকায় কাঠ কুরে খায়, মনটারে যে কিসে কুরে খায় জানো না ভাই।

আমার ঘর থেকে ভাবী চলে গেলো। মায়ের সাথে কথা বলে বাড়ির পথ ধরলো। আমি কারণ খুঁজে পেয়ে ভাবলাম, ভাবী ছেলেদের সাথে এত কথা বলে তবে এ কারণেই? সারা গ্রাম পায়ের তলে করে। নজর ভাই থাকতে তো কোন পুরুষ ছেলের সাথে কথায় বলতো না। তাছাড়া আমার সাথে এবার তার কথা বলার মাত্রা বেড়েছে। আমার সাথে কখনো তো এত কথা বলেনি! আর কথাও তো খুব সুবিধার না।

মায়ের কাছে গেলাম। মা দেখেই বললো, নজরের বৌ তোর ঘরে গেলো কেন?

বললাম, কী জানি! ভাবী মনে হলো সুবিধার না।

মা বললো, সারা গ্রামে এ বৌয়ের নামে বদনাম আছে। শালীনতার কোন বালাই নেই। যার তার সাথে ঢলে ঢলে কথা বলে।

আমি সাবধান হয়ে গেলাম। চোখের আড়াল মানেই মনের আড়াল। বিদেশ গেলো নজর ভাই, ওমনি আদর্শ ভুলে নিজেকে ভূলুণ্ঠিত করছে ভাবী।

ঘর থেকে বের হলাম না। বসে বসে বই পড়ছি। বাইরে মহিলাদের আলোচনার আসর বসেছে। মনোযোগ না দেয়া সত্ত্বেও মনোযোগ চলে যাচ্ছে। আয়তন ভাবী জমিরন ভাবীর মাথার উঁকুন বেছে দিচ্ছে। উঁকুন বাছার আর জায়গা নেই, আমাদের উঠানেই বসতে হলো। জমিরন ভাবী বললো, কোন দেশে যাচ্ছে আক্কাস ভাই?

আয়তন বললো, জানি না।

জমিরন ভাবী বললো, একটা না, দুইটা না, পাঁচ পাঁচটা বছর। পারবি একা থাকতে?

আয়তন বললো, কষ্ট হলেও থাকতে হবে। গরীবের সংসার। দেশে খেটে পেটের ভাত হচ্ছে না।

জমিরন ভাবী বললো, তোর ভাই বাড়ি এলে আর যেতে দেবো না। দিন যায় গল্পে গল্পে, রাত যায় না। একাত ওকাত করে সারারাত জ্বলি। সুখ টাকায় হয় না, সুখ ছোঁয়ায় ছোঁয়ায়। সঙ্গী ছাড়া থাকা যায়? সঙ্গী ছাড়া কেউ থাকে? বৃষ্টি পড়লে মন খারাপ হয়ে যায়। সোনা ব্যাঙ ডাকাডাকি করে সঙ্গী গোছায়। চাঁদ উঠলে মন খারাপ হয়ে যায়। চাঁদের মত একা থাকি, কান্না করি। ছটফট করি।

তখন নছিরন এলো। কোলে তার দুধের বাচ্চা। এক বছর আগে ছুটি নিয়ে মৈজুদ্দিন দেশে এসেছিলো। জমিরন ভাবী বললো, বছর বছর ছুটি নিয়ে দেশে এলে তো ভালই হয়, নারে?

নছিরন লজ্জা পায়, লাজুক হাসি ঠোঁটে। জমিরন ভাবীও হাসেন। ঠোঁটের মিচকি হাসিটা মারাত্মক।

জমিরন ভাবী বললো, পতিত মাঠ পেলে সবাই খেলতে চায়। গ্রাম জুড়ে মানুষ আমায় নিয়ে আলাপ করে। তোর ভাই বাড়ি থাকলে কেউ সাহস পেত?

আয়তন ভাবী বললো, পুরুষ মানুষের সাথে কথা বলা ঠিক না। যত ভালো কথায় বলি না কেন খারাপ ভেবে নেবে মানুষ। একজনের সাথে কথা বললে অন্যজন কান পাতে।

নছিরন বললো, স্বামী কাছে না থাকলে দুই পয়সা দাম নেই। টিনের চালে কেউ ঢিল মারে, বেড়ার ঘরে কেউ উঁকি মারে। বাজারে গেলে মানুষ ভাবে কার না কার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি, একটু সাজলে ভাবে কার না কার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি।

জমিরন ভাবী বললো, কান কথা আমি মাখি না। আমি কুঁচিয়ে শাড়ি পরে, লিপস্টিকে ঠোঁট রাঙিয়ে ঘুরবো। দেবর সম্বন্ধীয়দের সাথে হেসে কথা বলবো।

উনাদের সুখ-দুঃখের কথা শুনতে আর ভাল লাগছে না। আমি ঘর থেকে বের হলাম। আমাকে দেখেই জমিরন ভাবী বললো, কই যাও ভাই, তোমার তিনটে ভাবী এখানে, চেয়েও দেখলে না। বিবাহিত বলে কি তারুণ্য নেই আমাদের?

মিচকি হেসে বললাম, কি যে বলেন ভাবী। দেখেছি তো আপনারা গল্প করছেন।

জমিরন ভাবী বললো, রঙিন শাড়ি পরায় দেখেছো, মলিন মুখটা তো দেখোনি।

আমি লজ্জায় লালপ্রায়। ভাবী যা বলে উত্তর দেয়ার থাকে না। বললাম, হাসছেন তো সবাই, মুখ মলিন কই?

জমিরন ভাবী হেসে বললো, লজ্জা পাচ্ছো কেন? তাকাচ্ছোও না। আমরা  কি দেখতে খুব খারাপ? পতঙ্গের মত চেয়ে দেখোই না, জ্বলে যাবে। বীরের মত চেয়ে দেখোই না, বীবত্ব যাবে।

আমি ইতস্তত করে বললাম, ভাবী, আমি যাই।

পালিয়ে বেঁচেছি। দূর থেকে কান খাড়া করে শুনলাম, আমাকে নিয়ে তারা তখনও হাসাহাসি করছে। বিয়ে হয়ে গেলে মেয়েদের লাজ-লজ্জা কী কিচ্ছু থাকে না?

এ গ্রামের বেশির ভাগ ছেলে বা বাবা বিদেশ থাকে। সবার মনে স্বচ্ছলতা এসেছে বা আসছে। নাদের লেখাপড়া শিখে বিদেশ যায়। ওর বেতন সবার চেয়ে বেশি। বড় ভাই নজরকেও নিয়ে যায়। ও এক দুই দিন পর বাড়ি আসবে। জমিরন ভাবী সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে। উচ্ছলতা তাকে ছেয়ে রেখেছে। নজর ভাইয়ের ছেলেটা আমাকে কি পেয়েছে জানি না। পাছ ছাড়ে না। ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে জমিরন ভাবী আমাদের বাড়ি এলো। এসেই বললো, ফল-ফসল ফলানো অত সহজ নয়, খুব কষ্টের। অন্যের ফসলে হাত দাও কেন?

ছেলে মায়ের কোলে না যেয়ে আমার সাথেই থাকবে, বললাম, ফল তো আমার না। আমার কাছ থেকে সরে না কেন?

ভাবী হাসতে হাসতে বললো, পরাগায়ন কি ভুল ফুল থেকে হলো!

ভাবীকে বকা দিয়ে ঘরে চলে গেলাম। আনিচা ভাবী মুখ অন্ধকার করে আমাদের উঠান দিয়ে যাচ্ছিলো। জমিরন ভাবী তাকে ডেকে বললো, সব সময় মুখটা হাড়ির তলার মত কালো কেন?

কৃত্রিম হাসি হেসে আনিচা ভাবী বললো, লোকটাকে কত দিন দেখি না!

আনিচা ভাবীর চোখে পানি চলে আসে। ধূসর মরুর তাপে সিদ্ধ সে যেন। অতি কষ্টে, শূন্যতায় কারো কারো হৃদয় ক্ষয়ে যায় আর কারো কারো হৃদয় পাথর হয়ে যায়। আনিচার কথা শুনে তাকে পাথরই মনে হচ্ছে।

জমিরন ভাবী বললো, কাছে থাকলে বকতো, শাসন করতো, দূরে আছে তাই তো মায়া দিয়ে কথা বলে, আদর মাখা কথা বলে। তোকে হারানোর ভয়ে থাকে।

আনিচা ভাবী বললো, ও আমাকে কখনোই বকতো না, শাসনও করতো না।

জমিরন ভাবী বললো, তবে কি শুধুই আদর দিত? পুরুষ তো আদর দিতে আসে শুধু আদর খাওয়ার লোভে। কাজের সময় কাছে টানে না, অবসরের সময় আঁচল ছাড়ে না। বাইরে নিয়ে গেলে নম্র, সাধু; আর ঘরে হিংস্র বাঘ। বাঘ কখনো হরিণকে আদর করে?

আনিচা ভাবী না-সূচক মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, আমার অমতে আমার সাথে জোরাজুরি করতো না। যেদিন যা রান্না করতে বলতো সেদিন তা রান্না না করলে আমার কথা শুনতো না। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করেই তাই ওর পছন্দের রান্না করতাম না!

জমিরন ভাবী আশ্চর্য হয়ে বললো, ও আচ্ছা, এই তবে?

আনিচা ভাবী নির্লজ্জের মত করে বললো, হ্যাঁ, আমার কৃষক, আমার হৃদয়েই তো চাষ করবে!

জমিরন ভাবী বললো, কৃষক এখন ঠিকঠাক খোঁজ-খবর রাখে?

আনিচা ভাবী বললো, বীজ বুনেছে, চারা হয়েছে, পরিচর্চাও করে। এজন্যই তো ও আমার আদর্শ কৃষক।

জলচোখে আনিচা ভাবী চলে গেলো। জমিরন ভাবী মাথা নিচু করে দেখলাম বসে আছে। হয়ত নজর ভাইয়ের কথা মনে পড়েছে। শিখরী এলো। স্বামী শহরে চাকরি করে। বৃহস্পতিবার বিকালে আসে, শুক্রবার সকালে চলে যায়। জমিরন ভাবী হেসে নিয়ে বললো, কেন আসে বুঝি না? বুঝি! বুঝি!

শিখরীর কাজল দেয়া চোখে তারা নাচছে। বললো, ভাবী, দিনেও ছাড়তে চায় না। চোখের আড়ালে গেলেই ডাকে। রান্নাতে গেলেও ডাকে। রান্না রেখে এসে তাকে সন্তুষ্ট করতে হয়। মহাশুশকিল!

জমিরন ভাবী বললো, না মহা-আনন্দ? বলবি, আমি সারারাত তোমার, সারাদিন এ সংসারের। বলবি, আমি তোমার শুধু শখের না, জীবনেরও।

শিখরী দুষ্টু হেসে বললো, কখখনো বলবো না!

জমিরন ভাবী বললেন, তার মানে স্বামীর উত্যক্ত মিষ্টিই লাগে?

দাঁত ঢেকে শিখরী লাজুক হাসে। জমিরন ভাবী বললো, স্বামী সারাক্ষণ কাছে না থাকায় ভালো। সোনা সব সময় কানে দিলে সোনার গুরুত্ব কমে যায়। বেড়াতে গেলে বা দাওয়াতে গেলে সোনা পরলে সোনার মাহাত্ম্য বাড়ে। অপেক্ষান্তে দেখা হলে স্বামীর জন্য দরদ বাড়ে।

শিখরী বললো, না। এক সপ্তাহ একা থাকি তাই দম বন্ধ হয়ে আসে। বিদেশ গেলে তো মরেই যাবো। তাকে রান্না করে খাওয়ানোতে যে শান্তি, তার চোখে চেয়ে থেকে যে শান্তি, তার পরশ পেলে যে শান্তি, অন্য কিছুতেই তা পূরণ হবে না।

জমিরন ভাবী দীর্ঘশ্বাস কেটে বললো, চোখে তাকালে বোঝা যায় মনে কত শান্তি! শান্তি দেয়ার লোক আছে, শান্তি নিচ্ছো।

শিখরী ভাবী বললো, নজর ভাইকে ডেকে নিয়ে আসো। পূর্ণিমা রাতে চাঁদশূন্য থাকা মানায় না। মনের চাহিদাগুলো আর খুন করো না।

জমিরন ভাবী বললো, বুঝি সব। কাছে চাঁদ না থাকলে রাত মায়াবী হয় না। আকাশের চাঁদ দিয়ে কি করবো, দেখতে ভালো লাগে, তৃপ্তি দেয় না, স্বস্তি দেয় না।

বাজার থেকে নদীর পাড় দিয়ে আমি আর রইচ বাড়ি ফিরছি। নদীর পাড়ে বসে বাতাস খাচ্ছে জমিরন ভাবী। যেন রইচের অপেক্ষাতেই ছিলো। খুশি মনে বললো, শিখরীকে নাকি দিনেও বিরক্ত করো?

রইচ না-সূচক মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, মিথ্যা ভাবী।

রইচের ভাব-ভঙ্গি মেপে ভাবী বললো, যে মূলো খায়, তার ঢেকুর থেকে মূলোর গন্ধই বের হয়।

রইচ চুপ হলো। ভাবী বললো, কী চুপ কেন? জোঁকের মুখে লবণ পড়লো?

রইচ বললো, ভাবী, শিখরীর মত ভালো মেয়ে হয় না। আমাকে খুব যত্ন করে।

ভাবী তীর্যক চেয়ে বললো, যার কাছ থেকে যে যত বেশি সার্ভিস পায়, তার প্রতি তত সে অনুগত থাকে।

রইচ বিব্রত হয়ে বললো, সার্ভিস?

ভাবী বললো, বোকা যেন! ক্ষুধার্তকে পর্যাপ্ত অন্ন দিলে ক্ষুধার্ত কি ক্ষুধার্ত থাকে? অন্ন দেয় যে তার প্রতি বিনয়ী থাকে।

বুঝতে পেরে আমাকে টানতে টানতে রইচ চলে এলো আর বললো, জমিরন ভাবী খুব বেফাঁস কথা বলে।

বললাম, একটু খাস মনে মেশা দরকার। আপন থেকে আপন হয়ে যাবে। এত নির্লজ্জ মহিলা জীবনে দেখিনি, মুখে কিছু বাধে না। এগার হাত শাড়ির পাঁচ হাতই বাতাসে উড়ে।

এক মাইক্রো মালামাল নিয়ে আমার বন্ধু নাদের বাড়ি এলো। কত বড় লোক হয়ে গেছে ও। আর আমি এখনো পড়ালেখা করছি। আমাকে ডেকে ওদের বাড়ি নিয়ে গেলো। আমাকে ও অনেক ভালোবাসে। ভাবী জল-খাবার এনে দিলো। নাদের বললো, বস্ তুই, আমি গোসল করবো।

নাদের টিউবওয়েলে গোসলে গেলো। জমিরন ভাবী পানি তুলে দিলো। এক পর্যায়ে নাদেরের শরীরে সাবান মাখিয়ে ডলে ডলে গোসল করিয়ে দিলো। প্রতিবেশিনীরা তা দেখে দাঁত কেটেছে জিভে।

নাদের গোসল সেরে ঘরে এলো। ভাবীও পিছন পিছন এলো। বললো, টাকা কী জিনিস দেখেছো? এখন গ্রামের মানুষ তোমায় ডেকে ডেকে কথা বলে।

নাদের বললো, ভাবী, ক্ষমতাহীন মানুষকে কেউ সম্মান করে না।

ভাবী বললো, টাকা মনুষ্যত্বের মাপকাঠি নয়।

নাদের ভ্রূ কুঁচকে বললো, আমার মনুষ্যত্ব নেই?

ওদের গল্পের মধ্যে আমি কেন? আমাকে নিয়ে কিছু বলছে না। নগণ্য লাগছে নিজেকে, কিন্তু উঠতেও পারছি না। গতকালও কত গুরুত্ব পেয়েছি, একদিনে ভাবী প্রবৃদ্ধ কোণের মত বেঁকে গেছে।

নাদের বাজারে গেলো। ব্যাংক থেকে টাকা আনবে হয়ত। আমি গেলাম চায়ের দোকানে। শহর চাচা আমাকে ডেকে নিয়ে নদীর পাড়ে এলো। উনাকে অস্থির দেখাচ্ছে। বললেন, তোর বন্ধু ঐ নাদের না কাদের, বাড়ি এলো কেন?

বললাম, বাড়ি আসবে না? আর এলো কেন আমি কী জানি?

জমিরন ভাবী নদী পাড়ে গরু নিতে এসেছে। ভাবীকে দেখেই শহর চাচা ভাবীর কাছে গেলো। শহর চাচা জমিরন ভাবীর দিকে তাকিয়ে এমন একটা ভাব করলো নতুন বৌয়ের দিকে তাকিয়ে নতুন বর যেমনটা করে। লাজুক লাজুক ভাব। গোঁফে একটু মিশ্র অর্থের হাসি। আমি দেখলাম, বুঝলাম কিছুটা। শিকারী বিড়াল গোঁফে চেনা যায়। শহর চাচা আড়চোখে চেয়ে বললো, অমাবস্যা কাল থেকে।

অমাবস্যা এলে অন্ধকার আসে। চোর থাকে চুরির অপেক্ষায়। শহর চাচা অমাবস্যার অপেক্ষা করে কেন? উনি তো চোর না। জমিরন ভাবী বললো, আর কোন দিন আশপাশে দেখলে পা ভেঙে দেবো।

শহর চাচা ভয় পেলেন। আমাকে নিয়ে তিনি ফিরলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ভাবীকে অমাবস্যার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন কেন?

বললেন, প্রতি অমাবস্যার দুটি রবিবার আমতলায় পড়ে থাকা আম খেতাম। ও তুই বুঝবি না।

আমি বোঝার চেষ্টাও করলাম না। সোজা বাড়ি এলাম। মা বললো, আর কত দিন ছুটি আছে?

বললাম, সামনের শুক্রবার চলে যাবো।

নাদের ফেলেছে আমাকে আর এক বিপদে। সব সময় কাছে ডাকে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেতে হয়। জমিরন ভাবী নাস্তা দিলেন। নাদেরকে গালে তুলে খাওয়ায়ে দিলো। আর একগাল হেসে বললো, ভাবীর হাতের রান্না কেমন?

নাদের বললো, খুব সুন্দর। সুন্দর না সবুর?

ভাবী বললো, সবুরের ভালো লেগে কী হবে? আমাকে নিয়ে যারা যারা সমালোচনা করে ও তো তাদের সাথে থাকে। খায় ভাবীর কাছে, গায় না গীত, গায় গীবত।

আমাকে ভাবী একেবারে মাটিতে ফেলে দিলো। ভাবী আরো বললো, ওদের বাড়ি যেয়ে গল্প করি, জানালা দিয়ে উঁকি মেরে আমাকে দেখে। আবার বন্ধুদের কাছে আমাকে বিশ্রী করে উপস্থাপন করে। চোখ দিয়ে সৌন্দর্য নেয়, মুখ দিয়ে গরল ঝরায়।

আমি খুব বিব্রত হলাম। কে ভাবীর কানে এসব কথা দিলো? চলে আসতে চাচ্ছিলাম, নাদের আসতে দিলো না। বললো, ওরে ভাবী মজা করছে। জানিস তো ভাবী মজার মানুষ।

ভাবী রান্নাঘর থেকে পাকা পেঁপে কেটে এনে দিলো আর বললো, খাও। তোমার ভাইকে অনেক খাওয়ায়েছি। এবার তোমাকে খাওয়াবো।

আমাকে পেঁপে দিয়ে বললো, দেবরকে একা পাই না। সব সময় সঙ্গ দিতে হয়? আমিও তো তাকে একটু সময় দেবো, নাকি?

ভাবী কথাটি বলে হাসে। নাদেরও হাসে। নাদের এবার আমাকে নিয়ে ভাবীর ঘরে গেলো। নজর ভাই বাড়ি এলে পাকা ঘর উঠাবে। নাদের বললো, ভাবী, পিছনের বেড়া ভাঙা কেন?

ভাবী বললো, কুকুর ঢুকতো। গরম ভাত খেয়ে নিত। আর ঢুকবে না। তুমি এসেছো যে…

নাদের আশ্চর্য হয়ে বললো, আমি এসেছি বলে কুকুর আসবে না?

ভাবী ইতস্তত করে বললো, তুমি বেড়ার ঘর ঠিক করে দেবে।

মনে মনে ভাবলাম, বাড়িতে নাগর থাকলে পাড়ার নাগর ঠাঁই পায় না। ভালো ভালো।

চায়ের দোকানে গেলাম। সবাই নাদেরকে নিয়ে আলোচনা করছে। করবে না কেন? ও আসলো বাড়ি টাকা ‘নিয়ে’, আর আমি আসলাম বাড়ি টাকা ‘নিতে’।

বাদশা বললো, দ্রুত বিয়ে করে ফেল।

আশিক বললো, বিয়ে করবে কেন? ভাবী তো আছেই। ভাবীর সাথে ফুটুস-ফাটুসে মজা বেশি। আর এমন ভাবী কজনের আছে যার মাঝে নেই কার্পণ্য।

শহর চাচা খুব রেগে জবাব দিলো, সারা গ্রাম তুষ্ট রাখতে পারে যে ভাবী, নাদেরকে ভরিয়ে রাখতে পারবে সে।

শহর চাচার এত রাগের কারণ বুঝলাম না। নাদেরের দেখলাম মন খারাপ। বাড়ি ফিরে আসছি। নাদের জোর করে ডেকে নিলো। মাংস রান্না হয়েছে। খেতে হবে। ভাবী ভাত, তরকারি নিয়ে এলো। যে কষ্ট করে রান্না করে, খেতে ভালো না লাগলেও প্রশংসা করতে হয়। খেতে খেতে বললাম, ভাবীর হাতের রান্না খুব স্বাদের। সুন্দর।

নাদের বললো, আমার ভাবী দেখতে কী কম সুন্দর, তার হাতের রান্না অসুন্দর হবে কেন?

ভাবী আড়চোখে চেয়ে বললো, তোমরা তো ভাই শুধু দেখো, তাতে মনে সুখ পাও। একদিন ধরে দেখলে বুঝতে স্বর্গীয় সুখ কী?

নাদের দেখলাম বিরক্ত হলো কথাটি শুনে, বললো, ভাবী যাও, আমরা নিয়ে খেতে পারবো।

সারা গ্রামে মানুষের মুখে মুখে গুঞ্জণ। জদুর বৌ বললো, বেডির শরীলে বেবাক সময় কাত্তিক মাসের জ্বালা।

জদুর বৌকে বাদশার বৌ সমর্থন করে বললো, এত জ্বালা বেল পাতার রস খাইতে পারে না?

কথা শোনার মত না, কান ঢেকে চলে গেলাম। নাদের মন খারাপ করে আমাকে বললো, কী করি বল তো, ভাবী তো পাগল করে দেবে।

মনে মনে বললাম, ওভাবে হরিণী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চোখের মায়াবী চাহনি নিয়ে ধারে ঘেঁষলে পাগল তো হবিই।

নাদের বলেই চলেছে, যেভাবে তাকায়, থাকা দায়। একটু আগে গোসল করে এসে আমাকে বললো, গোসলে শরীর ঠাণ্ডা হয়, মন যে ঠাণ্ডা হয় না, ভাই। ভাবীর লজ্জাহীন প্রগলভ আচরণে আমার ঘুম হারাম। তাকাতে ইচ্ছা করে না। তাকালে বলে, তোমার ভাইয়ের চেয়েও তুমি বেশি নির্লজ্জ।

নাদেরকে অস্থির দেখে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলাম। বললাম, কম পাত্তা দিলেই হলো।

বললো, ভাবী। না করা যায় না। কারণে-অকারণে ঘরে আসে। আমার জ্বর কি জ্বর না কপালে হাত রেখে দেখার দরকার আছে? প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ঘরে এসে আলাপ জমায়। কাছে ঘেঁষবে আর বলবে, যে একবার মজা পেয়েছে, সে স্বাদ ভোলে না, যে মজা পায়নি, সে স্বাদের কিছু জানে না। খুব বিপদে আছি।

বললাম, নজর ভাইকে জানা।

ঘরে ভালো নেটওয়ার্ক পায় না। তাই জমিরন ভাবী আমাদের উঠানে দাঁড়িয়েই নজর ভাইয়ের সাথে বেশি কথা বলে। আজ হয়ত একান্ত আলাপ। তাই আমাদের ঘরের পিছনে গেলো। ভাবীর প্রতি আমার আলাদা কৌতূহল কাজ করে। এ কারণে ভাবীর কথায় কান রাখলাম। ভাবী নজর ভাইকে বলছে, বাঘ ঐ হরিণীটিকেই ধরে যেটির শরীরে মাংস জমে।

উত্তরে নজর ভাই কী বলেছে জানি না। পরক্ষণে ভাবী বললো, পাকা পেঁপেঁতে এলাকার সব পাখি মুখ লাগায়। ফিরে এসো বাড়ি। মানুষের কান কথায় কান দিলে মানুষের হয়ে যাবো। আমার পিছে শত্রু লেগেছে। তুমি জানো তো, বাড়িতে বোন থাকলে বন্ধুর অভাব হয় না, বাড়িতে ভাবী একা থাকলে দেবরের অভাব হয় না। আমি তেলাপোকা সামাল দিতে পারি, মাছি সামাল দিতে পারি না। আর যা ঘটে তারচেয়ে বেশি রটে। আমাদের সুখে গ্রামের মানুষের ঘুম নেই। আমাকে বিশ্বাস করতে পারো না? ও আমার সৌন্দর্যের কারণে আমাকে বিশ্বাস করতে পারো না? একটি মানুষ বছরের পর বছর তোমার পথ চেয়ে থাকে তুমি বোঝো না? দ্রুত বাড়ি চলে আসো। সামনের মাসেও না, এ মাসে। হ্যাঁ, এ মাসে।

ভাবীর কথা থেকে বোঝা গেলো নজর ভাই এ মাসেই বাড়ি আসবে। পূর্ব পাড়া, পশ্চিম পাড়া থেকে দলে দলে মহিলারা জমিরন ভাবীকে দেখতে আসছে। জমিরন ভাবী ক্ষেপে গেলো, বললো, বাড়িটা কী চিড়িয়াখানা? আমি কী কোন জন্তু? সবাই হা করে এত কি দেখছে?

গ্রামের মহিলারা পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসাহাসি করছে। দেখে জমিরন ভাবী রেগে গেলো। ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলছে। নজরের মা নজরের বৌয়ের পক্ষ নিলেন। বৌমা সম্বন্ধে খুব ভালো জানেন। তবুও বৌমার পক্ষে থেকে বৌমার কীর্তিকলাপ ঢাকার চেষ্টা করলেন, বললেন, গ্রামের মানুষ আমার দুই ছেলের মাঝে ভাঙন ধরাবে।

আমি দূর থেকে দেখে কেটে পড়লাম। বাড়ি এলাম। মা বললো, নাদেরদের বাড়ি যাবি না। নজরের বৌর সাথে কথা বলবি না। নাদেরের সাথেও মিশবি না। সারা গ্রামের মানুষ ওদের ছি ছি দিচ্ছে।

মায়ের কথা কি ফেলা যায়? বললাম, ঠিক আছে, মা।

আগামী পরশু দিন আমার ছুটি শেষ।  কাল চলে যাবো। নাদের ডাকলো। ওর ডাক অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। না যাওয়া পর্যন্ত ডাকবেই। নাদের ব্যবসা-বাণিজ্য করবে। আমার কাছ থেকে পরিকল্পনা নিচ্ছে। তখন দরজায় টোকর পড়লো। নাদের বললো, ভাবী? আসো।

ভাবী এসে বললো, আমি যে কিভাবে বুঝতে পারলে?

নাদের বললো, চেনা মানুষের গন্ধ জানা।

ভাবী খুব রেগে গেলো। কর্কশকণ্ঠে বললো, বিদেশ থেকে থেকে লাজ-লজ্জার মাথা খেয়েছো? আমি তোমার বড় ভাবী। শ্লীল-অশ্লীল ভেবে কথা বলবে। কথা বলার সময় মুখে কোন বাছ-বিচার নেই। আর তুমি তুমি করে কথা বলো কেন? আপনি আপনি করে কথা বলবে।

ভাবী রাগ দেখিয়ে চলে গেলো। আমি আর নাদের ভাবীর আজকের আচরণে হতবাক।

নাদের আমাকে নিয়ে বাজারে গেলো। কোথায় দোকান নেয়া যায় জানতে চাইলো। বাসায় ফেরার সময় মিষ্টি কিনলো ও। ভাবীর হাতে দিয়ে বললো, আপনার জন্য।

ভাবী মিষ্টির দিকে তাকিয়ে বললো, ভাইয়ের একমাত্র ছেলের জন্য কিছু আনো না, আমার জন্য মিষ্টি এনেছো, তোমার মতলবটা কী বলো তো?

এ কথা শুনে নাদের চরম অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। নাদের না বুঝলেও আমি বুঝতে পেরেছি। নজর ভাই আসছে, নাদেরের প্রয়োজন শেষ। এখন নাদেরের কিছু আর পছন্দ হবে না।

আমি রাজশাহী চলে গেলাম। মাঝে মাঝে আশিককে ফোন দিয়ে গ্রামের খোঁজ নিই। বিশেষ করে জমিরন ভাবীর কথা কথায় কথায় উঠে। আশিক বললো, নজর ভাই গ্রামে ফিরেছে। টিউবওয়েলের চারদিকে কলার পাতার বেড়া দিয়ে গোসল করে ভাবী। আর নদীতে সাঁতার কাটে না। মাথায় কাপড় দেয়। আঁচলও আর বাতাসে উড়ে না। টেনে টেনে মুখ ঢাকে।

ঠোঁটে একটু হাসি জাগলো আমার। মনে মনে ভাবলাম, জমিরন ভাবীরও তবে লজ্জা আছে!

যশোর, বাংলাদেশ

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev