ক্ষমতায় এসে ‘আচ্ছে দিন’-এর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। ক্রমে তা দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠল। তারপর আওয়াজ তুললেন ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’। একে একে ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’, ‘সবকা সাথ সবকা বিশ্বাস’; সেসবও একদিন হয়ে গেল ফাঁকা বুলি। বিশ্বাস বা আস্থা অর্জনের আর কোনও অলিগলি না পেয়ে ‘আত্মনির্ভর’ করে গড়ে তোলার জন্য ‘আত্মনির্ভর’ ভারতের কথা বললেন। নতুন কথা, কিন্তু সেই লক্ষ্য নিয়ে দেশ এমনভাবে এগিয়ে চলতে শুরু করলো যে ১০৬টি দেশ অন্তত মানুষকে দু’বেলা খেতে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের থেকে এগিয়ে গেল। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স ২০২২ অনুযায়ী, ১২১টি দেশের মধ্যে ভারত রয়েছে ১০৭ নম্বরে। হিসাব অনুসারে বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ৬ র্যাঙ্ক পিছিয়ে গেল ভারত। এটা ‘আত্মনির্ভর’ হওয়ার পথে সাফল্য বলে মনে হতেই পারে। কিন্তু এই সাফল্য বা আত্মনির্ভরতা নিয়ে কি আমরা আমাদের কোনো প্রতিবেশি দেশের দিকে তাকিয়ে গর্ব করতে পারবো? না, কারণ সব প্রতিবেশি দেশের থেকেই আমরা এ ব্যাপারে পিছিয়ে আছি। প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল এবং মায়ানমার যথাক্রমে ৬৪, ৮৪, ৮১ এবং ৭১ স্থানে রয়েছে। সবাই রয়েছে ভারতের উপরে। এমনকি পাকিস্তানের থেকেও অনেকটা পিছিয়ে। কিন্তু পাকিস্তানের থেকেও পিছিয়ে এ কথা কি বলা যাবে? বললেই তো পাকিস্তানি প্রেমিক বলে দাগিয়ে দেওয়া হবে। আর পাকিস্তানি প্রেমিক মানেই দেশবিরোধী বলতেও দ্বিধা থাকবে না। কিন্তু মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দিতে পাকিস্তান যা করতে পেরেছে আমরা তা পারিনি। এ কথা বলছে বিশ্ব ক্ষুধা সূচক।
‘আত্মনির্ভর’ ভারত জঙ্গি নিকেশ করে, সন্ত্রাস দমন করে। পাকিস্তান সেই জঙ্গিদের আঁতুড়ঘর। তাই পাকিস্তানকে শায়েস্তা করতে আমরা সদা সর্বদা প্রস্তুত। আমদের লড়াই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। ওই দেশটির বিরুদ্ধে আমাদের সামরিক শক্তি নিয়ে গর্বের অন্ত নেই। ভোট এগিয়ে এলেই আমরা আরও বেশি পাকিস্তান বিরোধী হাওয়া তুলতে দেশপ্রেমী হয়ে উঠি, কিন্তু সেই গর্ব বা ক্ষমতা নিয়ে ক্ষুধা সূচকে পাকিস্তানকে হারাতে পারি না। এই হারাতে না পারার জন্য আমাদের রাগও হয় না, লজ্জাও হয় না। বরং কেউ যদি সে কথা তোলে তবে তার উপর কেবল রাগ বা ঘৃণা নয়, তাকে দেশবিরোধী দাগিয়ে দিতে দ্বিধা করি না। অন্তত একবারও নিজেদের মনকে প্রশ্ন করিনা কেন আমরা ক্ষুধা সূচকে পাকিস্তানের থেকে পিছিয়ে পড়ছি। আত্মনির্ভর ভারতের গল্পটি তাহলে কেমন!

প্রসঙ্গত, বিশ্ব ক্ষুধা সূচক মূলত চারটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করেই নির্ধারণ করা হয়। এক, অপুষ্টি। দুই, দেশে পাঁচ বছরের নীচে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা, অর্থাৎ উচ্চতা অনুপাতে যাদের ওজন বেশ কম। তিন, পাঁচ বছরের কত জন শিশুর উচ্চতা তাঁদের বয়সের অনুপাতে অনেক কম। ক্রনিক অপুষ্টিতে ভোগার জন্য কত জনের ক্ষেত্রে এমন হচ্ছে? এবং চার, পাঁচ বছরের নিচে কত জন শিশু মারা যাচ্ছে? আমাদের দেশে ৩৫.৫% শিশু খর্ব, ৩২.১% শিশুর ওজন অনেক কম। পঞ্চম জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার (এন এফ এইচ এস-৫) তথ্য অনুযায়ী, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি খারাপের কারণে আমাদের দেশের গ্রামীণ অঞ্চলে বসবাসকারী শিশুদের খর্বতার হার ৩৭.৩% আর শহর অঞ্চলে ৩০.১%। অর্থাৎ শরের তুলনায় গ্রামে অনেকটাই বেশি। এই সব শিশুদের খর্বতা দূর করতে হলে শিশু জন্মের পর থেকে শিশুর জীবনের প্রথম চার মাস পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে তার স্বাস্থ্য ও খাদ্যের জন্য যা কিছু জরুরি তা পূরণ করা হয়না। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রসবের পর এক ঘণ্টায় প্রাথমিক স্তন্যদানের হার ভারতে ৪১.৮%, অর্থাৎ প্রতি পাঁচ জন মহিলার মধ্যে মাত্র দু’জন জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে সন্তানকে স্তন্যপান করাতে সমর্থ হন। মাত্র ৬৩.৭% মহিলাই তাদের শিশুদের জন্মের পর প্রথম ছ’মাস শুধু মাত্র স্তন্যপান করান এবং ছ’মাস পরে পরিপূরক স্তন্যদানের হার ৪৫.৯%-এ নেমে আসে, যার মধ্যে ১১.৩% (প্রতি দশ জনে এক জন) শিশু সর্ব নিম্ন গ্রহণযোগ্য খাদ্য বা মিনিমাম অ্যাকসেপ্টেবল ডায়েটের উপরে নির্ভরশীল। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা কেন ভারতের ক্ষুধার মাত্রাকে “serious” বলে অভিহিত করা হয়েছে।
আরও একটি পরিসংখ্যান, ভৌগোলিক অঞ্চলের নিরিখে; মেঘালয় ৪৬.৫%, বিহার ৪২.৯%, উত্তরপ্রদেশ ৩৯.৭% এবং ঝাড়খণ্ডের ৩৯.৬% মতো রাজ্যগুলিতে শুশুদের খর্বতার হার অনেক বেশি লক্ষ করা গিয়েছে। অন্য দিকে সিকিম ও পন্ডিচেরির মতো রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই হার সর্ব তুলনায় কম যথাক্রমে ২২.৩% ও ২০%। এন এফ এইচ এস-৪ এবং এন এফ এইচ এস-৫-এর পরিসংখ্যানের তুলনা করলে দেখা যাবে যে, গুটিকয়েক রাজ্যে, যেমন; মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ডে শিশুদের খর্বতার হার অন্তত পক্ষে ৬ শতাংশ হারে হ্রাস পেয়েছে এবং রাজস্থানে এই হ্রাসের পরিমাণ ৭.৩ শতাংশ। দেশের প্রায় সব রাজ্যেই পুষ্টির হার বৃদ্ধি পেলেও রাজ্যগুলির মধ্যে পুষ্টির হারে অসামঞ্জস্য রয়েছে। যে দু’টি রাজ্যে ২০১৫-১৬ সালে (এন এফ এইচ এস-৪) সব থেকে কম খর্বতার হার লক্ষ করা গিয়েছিল এন এফ এইচ এস-৫ সমীক্ষা অনুযায়ী খর্বতার হার উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেগুলি হল গোয়া ২০.১% থেকে ২৫.৮% এবং কেরল ১৯.৭% থেকে ২৩.৪%।
আশার কথা দেশে ১৯৯৮ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত শিশু মৃত্যুর হার অনেক কমেছে। কিন্তু ক্ষুধার সূচকে এখনও অনেকটাই পিছিয়ে ভারত। বিশ্ব ক্ষুধা সূচক আরও জানাচ্ছে যে, ভারতে শিশু নষ্ট হয়ে যাওয়ার হার সচেয়ে বেশি। ১৯৯৮-১৯৯৯ সালে শিশু নষ্ট হয়েছে যে হারে, তার তুলনায় এখন এই সংখ্যা আরও বেড়ে গিয়েছে।