প্রকৃতির কোলে রোমহর্ষক ট্রেকিং অ্যাডভেঞ্চার, শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের আশ্চর্যজনক দৃশ্য উপভোগ করার অন্যতম সেরা স্থান মহারাষ্ট্রের নাসিকের হরিহর দুর্গ বা হর্ষগড় কেল্লা। ত্রম্বকেশ্বর পর্বত থেকে ১৩ কিমি দূরে বৈতর্ণা বাঁধের কাছে নাসিক জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ যেটি গোন্ডা ঘাটের মধ্য দিয়ে বাণিজ্য পথ দেখার জন্য নির্মিত হয়েছিল। সারাবছর বিশাল খাড়াই কেল্লার উপরে উঠে শান্ত সমাহিত পরিবেশে সহ্যাদ্রি পর্বতশ্রেণির অনির্বচনীয় সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য ছুটে আসেন অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরা!
হরিহর ফোর্ট বেস গ্রাম থেকে এটি ত্রিভুজাকার প্রিজমের উপর নির্মিত বলে মনে হয়। ৩,৬৭৬ ফুটের কেল্লাটির ২০০ ফুট উচ্চতা একেবারে খাড়াই। দূর্গে ওঠার খাঁড়া পাথরের সিঁড়িগুলি প্রাচীন দুর্গটিকে অন্যান্য দূর্গের থেকে আলাদা করে তুলেছে। এই উল্লম্ব ধাপগুলির কারণে, সহ্যাদ্রি রেঞ্জের মধ্যে এই ট্রেকটি সবচেয়ে জনপ্রিয়।
এই কেল্লা ঘিরেই মারাঠা, মুঘল ও ইংরেজ তিন দলেরই যুদ্ধ হয়েছিল। ঐতিহাসিকরা বলেন, যাদব রাজবংশ নবম এবং ১৪ শতকের মধ্যে দুর্গটি নির্মাণ করেছিলেন। মহারাষ্ট্রের এই দুর্গটি গোন্ডা ঘাটের মধ্য দিয়ে যাওয়া বাণিজ্য পথ প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।

হরিহর ফোর্ট ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগে অনেক আক্রমণকারী দ্বারা বারবার আক্রমণ এবং দখল করা হয়েছিল। এটি ছিল আহমেদনগর সালতানাতের মালিকানাধীন কয়েকটি দুর্গের মধ্যে একটি। হরিহর দুর্গের পাশাপাশি, নাসিকের নিকটবর্তী আরও অনেক দুর্গ যেমন ত্রিম্বক, ত্রিংগালভাদি এবং আরও কয়েকটি পুনা (বর্তমানে পুনে) দুর্গ ১৬৩৬ সালে শাহাজি ভোসলে খান জামানের কাছে সমর্পণ করেছিলেন।
বিখ্যাত মারাঠা রাজা ছত্রপতি শিবাজি এই দুর্গকে মুঘলদের সাথে যুদ্ধের সময় ব্যবহার করেছিলেন। ১৬৮৯ সালে এই কেল্লা দখল করেছিল মুঘলরা। পরবর্তীতে মারাঠারা এই দুর্গ আবার দখল করে নেয়। ১৮১৮ সালে ব্রিটিশরা মরাঠাদের থেকে এই কেল্লা দখল করে।
হরিহর দুর্গ পঙ্কজ পাঁচারিয়া (যাদব রাজবংশ, দেওগিরি) আমলে নির্মিত। প্রাথমিকভাবে, এই দুর্গ নিজামশাহী, আহমদনগর সালতানাতের অধীনে ছিল। এরপর এটি শাহজি রাজ ভোঁসলে মহারাজের দখলে চলে যায়। তিনি ত্র্যম্বক এবং অন্যান্য পুনে দুর্গ সহ খান জামামের কাছে হরিহর দুর্গ সমর্পণ করেন।

মরোপন্ত পিঙ্গলে এই দুর্গ জয় করেন এবং মারাঠা সাম্রাজ্য নিয়ে আসেন। বিভিন্ন স্থানীয় শাসকদের দ্বারা দখলের পর, ক্যাপ্টেন ব্রিগস ১৮১৮ সালে এই দুর্গটি দখল করেন এবং এটি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে নেন।
লোকশ্রুতি আছে যে, ক্যাপ্টেন ব্রিগস দুর্গের প্রবেশদ্বার ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং পাথরে খোদাই করা ধাপগুলির আশ্চর্যজনক কাজের কারণে তিনি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছিলেন।
ফোর্টটি নাসিক শহর থেকে ৪০ কিমি দূরে এবং ইগতপুরী থেকে প্রায় ৫০ কিমি–ট্রেনে যে কোন একটি স্টেশনে আসতে হবে। সেখান থেকে বাসে বা গাড়িতে এক ঘন্টার রাস্তা পার করে পৌছাতে হবে ফোর্টের বেস ভিলেজে। হরিহর দুর্গ রুটের পুরো পথটি দুটি ভাগে বিভক্ত : নিরগুড়পাড়া ও হর্ষেওয়াড়ি— দুটো গ্রামের যেকোন একটা থেকে এই ট্রেক শুরু করা যায়। পাহাড়ী গ্রামের ছোট ছোট নুড়ি-পাথরে ভরা রাস্তা ধরে হাল্কা বুনো জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ট্রেকিং শুরু হয়।

নিরগুড়পাড়া ও হর্ষেওয়াড়ির পথ মিলিত হয় চওড়া একটি মালভূমিতে। হালকা খাবার, পানীয় জলের বোতল নিয়ে হাতেগোনা কয়েকটা ছোট ছোট ঝুপড়ির মতো স্থানীয় দোকান এখানে পাওয়া যায়। সামান্য একটু বিশ্রাম নিয়ে আসল পথ চলা শুরু হয় এখান থেকেই।
মালভূমি থেকে পাহাড়টাকে ভালোভাবে দেখা যায়। দুর্গের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো ৮০ ডিগ্রী খাঁড়াই পাথুরে সিঁড়ি। নিচ থেকে উপর পর্যন্ত, এমনকি সিঁড়ির শেষপ্রান্তে দূর্গে যাওয়ার প্রথম দরজা এখান থেকে দেখতে পাওয়া যায়। প্রায় ১১৭ টি খাঁজকাটা পকেটের মতো সিঁড়ি পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় দূর্গের চূড়ায়। প্রায় ৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের পাথর কাটা সিঁড়ি আরোহণকে বেশ কঠিন করে তোলে। বেশ কিছু জায়গায় ধাপগুলো জরাজীর্ণ। ব্যালেন্স রাখার জন্য ধাপগুলির উভয় পাশে খাঁজ/ গর্ত রয়েছে। বৃষ্টির মরশুমে ধাপগুলো বেশ পিচ্ছিল আর বিপদজ্জনক হতে পারে।
সিঁড়ি দিয়ে উঠে দুর্গে প্রথম প্রধান দরজাটি আজও অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। এখান থেকে আশেপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়। দরজার বরাবর সামনে তাকালেই ফণী পাহাড়। পাহাড়ের চূড়া কিছুটা সাপের ফণার মতো দেখতে বলেই, এই রকম নাম। দরজা দিয়ে ঢুকে পরবর্তী রাস্তা পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলেছে। শোনা যায় সিঁড়ি ওঠার পাথর কেটে বানানো রেলিং নাকি ছিল সিঁড়ির ধারে, যা আজ অবলুপ্ত। রাস্তার বাম দিকে ১০০-১৫০ ফুটের গভীর খাদ, ডান দিকে খাঁড়া পাথরের দেওয়াল।সংকীর্ণ রাস্তা খুব সাবধানে পেড়িয়ে আসতে হবে দ্বিতীয় সিঁড়ির মুখে।

দ্বিতীয় সিঁড়িটা প্রথম সিঁড়ির থেকেও ভয়ংকর। এই পথের ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে ওঠার অবলম্বন একমাত্র প্রতিটি সিঁড়ির ভাঁজের গর্ত। সিঁড়ির এই অংশতে আছে একটা গর্ত সাবধানে এই অংশটা পেরোলেই উপর পর্যন্ত সিঁড়ির বাকি অংশ যথেষ্ট ভালো।
সিঁড়ি যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে মারাঠা সাম্রাজ্যের স্বাক্ষীস্বরূপ দণ্ডায়মান এক তোরণ। এই তোরণ পার করার পর পুরো জায়গাটাই সমতল। এখানে ভগবান হনুমান মন্দিরের সামনে রয়েছে মারাঠাদের নির্মাণ করা এক প্রকান্ড জলাধার। বহপূর্বে কেল্লায় জলের যোগান দেওয়া হতো এক প্রকান্ড জলাধার থেকে। পুকুরের পাশেই ছোট্ট একটি শিব মন্দির যার ছাদের উপর গাঁথা লম্বা ত্রিশূল ও পতাকা।
কেল্লার উপরে রয়েছে দু’টি আলাদা ঘরের মতো জায়গা। যাকে বলা হয় দুর্গের রন্ধনশালা। ঘরটির উপরের অংশ গোল গম্বুজের ন্যায়, যা আজও অক্ষত অবস্থায় বিরাজমান। ১০-১৫ মিনিট রক ক্লাইম্বিং করলে ডানদিকে রাস্তা চলেছে দুর্গের সর্বোচ্চ চূড়া বালেকিল্লার দিকে। একটি চমৎকার প্রাকৃতিক দৃশ্যও এখান থেকে দেখা যায়। চূড়ায় একসাথে দুজন মানুষের দাঁড়ানো বেশ কষ্টকর। চূঁড়াতে লম্বা লাঠির উপর বাঁধা মারাঠাদের প্রতীক গেরুয়া রঙের পতাকা হাওয়াতে উড়ছে। তবে এখানে বাঁদরের দলের আক্রমণ থেকে সাবধান।

খাড়া আরোহণ এবং এক পর্যায়ে ৫০০-ফুট নেমে যাওয়ার কারণে, একই পথে অবতরণ অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। সিঁড়ির স্থাপত্য বৈচিত্র্যময় এবং চিত্তাকর্ষক। এখান থেকে নীচের উপত্যকাটি একটি দর্শনীয় এবং কখনও কখনও ভীতিজনক ভাবে দেখা যায়।
হরিহর ফোর্ট ট্রেকের জন্য পর্যটন বা বন বিভাগ থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
হরিহর দুর্গ যাত্রার সময় দুপুর ১২.৩০ থেকে রাত ২টো পর্যন্ত। ন্যূনতম দুই লিটার জল, প্রাথমিক চিকিৎসার কিট, গ্লুকোজ, বেশ কিছু উচ্চ-ক্যালোরি শুষ্ক খাদ্য, এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত ওষুধ বহন করতে হবে। সুতির শার্ট পরা এড়িয়ে চলুন; পরিবর্তে দ্রুত শুকনো টি-শার্ট পরুন। একটি বৈধ ফটো আইডি কার্ড বহন করুন।

ট্রেকিংয়ের জন্য আরামদায়ক জুতা পরুন এবং অতিরিক্ত এক জোড়া মোজা, একটি ক্যামেরা এবং একটি উইন্ডচিটার নিন। একটি বাঁশি বহন করুন যা জরুরি পরিস্থিতিতে দরকার হতে পারে। স্লিপিং ব্যাগ বা সাইড ব্যাগের পরিবর্তে হ্যাভারস্যাক ব্যবহার করলে আরোহণ আরও সুবিধাজনক হবে।
আপনি যদি অ্যাডভেঞ্চার প্রেমী হয়ে থাকেন তবে অবশ্যই এই কেল্লা ও পর্বত কন্দর আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে তার অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে।।
ইতিহাসের সাগর সেঁচে তুলে আনা এক পর্যটনের প্রতিবেদন। খুব ভাল লাগল। শুভেচ্ছা রইল।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।
“অ্যাডভেঞ্চার” প্রেমীদের জন্য আপনি স্বর্গলোক
সৃষ্টি করলেন এই প্রতিবেদনে*চুপকথা হয়ে থাকা
ইতিহাসের রূপকথার সচিত্র বর্ণনা পর্যটন প্রেমী
মানুষেরারা প্রতিবেদনের হাতছানি স্বীকার করে
ধন্য হবেন।
আমরা কতকিছু জানতে পারি আপনার মাধ্যমে পেজ ফোরের পাতায়,সেজন্য ধন্যবাদ।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে এত সুন্দর একটা কমেন্টের জন্য ❤️????
ইচ্ছা থাকল যাওয়ার
অবশ্যই।