মানুষ মাত্রই আশাবাদী। ঈশ্বরের কাছে সন্তানের দুধে ভাতে থাকার আব্দার সেই কোন যুগ থেকে মানুষ করে আসছে। সেই আশা আকাঙ্খা পূরণের লক্ষ্যেই নানাবিধ ব্রত পালন করা। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর বর্ষার শেষে রুখা সুখা মাটিতে ফসলের শস্য-শ্যামলা রূপ দেখতে ও সন্তানের মঙ্গল কামনায় পশ্চিম সীমান্ত বাংলার — বিশেষ করে মানভূম, জঙ্গলমহলে করম ব্রত পালন করা হয়।
এই ব্রতের উপাসিকা হলো সাঁওতাল, ওঁরাও, বীরহড়, খেরওয়ার, হো, শবর, মাহালি, পাহাড়িয়া, হাড়ি, বাগদি, বেদে .. সম্প্রদায়ের মেয়েরা। একসঙ্গে উৎসব পালন করতে দূর দূরান্ত থেকে পোঁটলা কাঁধে, মাথায় লাল ফিতে বেঁধে, গাঁদা ফুল দিয়ে, কালো চোখে কাজলের পোঁচ লাগিয়ে কুটুম বাড়ীতে চলে আসে আত্মীয় পরিজনেরা।
ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতে পালন করা হয় এই ব্রত। উৎসবটি কোথাও পাঁচ বা সাতদিন ধরে চলে। ব্রতিনীরা প্রথম দিন থেকেই আমিষ হলুদ, তেল ও সকল প্রকার মসলা জাতীয় খাদ্য পরিহার করে। ওরা বিশ্বাস করে, খাবার নিয়ম না মানলে ওদের ভাগের জাঁওয়া নষ্ট হয়ে যায়। জাঁওয়া বলতে বোঝায় মাটি, বালি, মুং, কুর্থি, ছোলা ইত্যাদি সহযোগে যে ডালি ওরা পুজোর জন্য তৈরি করে।

শুক্লপক্ষের প্রথম দিন কুমারী মেয়েরা ভোরবেলায় শালের দাঁতন কাঠি ভেঙে নদী বা পুকুরে স্নান করে একটি ডালার মধ্যে মাটি ও বালি ভরাট করে বিভিন্ন শস্যবীজ যেমন — মটর, মুগ, বুট, জুনার, কুত্থির ইত্যাদি কাঁচা হলুদ ও তেল মাখিয়ে রেখে দেয়। তারপর গ্রামের একপ্রান্তে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ডালাগুলিকে রেখে দেয়। এরপর একাদশী তিথি পর্যন্ত প্রতিদিন সন্ধ্যায় কুমারী মেয়েরা জাঁওয়াতে জল দেয়। জাঁওয়ার ডালাটিকে মাঝখানে রেখে ধামসা মাদলের বোলে নৃত্যের তালে প্রায় হারিয়ে যাওয়া ‘ জাওয়া ‘ গানে অঙ্কুর উদ্গত চারাগাছগুলির বন্দনা করে।
ভাদর মাসে করম পরব / মুদের ঘরে ঘরে। / বাঁজা মাটি গাভিন হবেক / বীজের ফ্যোড়ে ফ্যোড়ে।।
একাদশী তিথিতে পালন করা হয় করম ঠাকুরের ব্রত। গ্রামের বয়স্করা করম গাছের ডাল এনে নির্দিষ্ট স্থানে বা বাড়ীতে পুঁতে রাখে। ব্রতের দিন সারাদিন উপবাস থেকে বন থেকে নানান রকমের জংলী ফুল সংগ্রহ করে ব্রতিনরা। ব্রতিনীদের বলা হয় পার্বতী। সূর্যাস্তে তারা সেগুলি তুলসী তলায় রেখে পুকুরে বা নদীতে স্নান করতে যায়। স্নান করার পর পুকুরের পার্শ্ববর্তী ক্ষেত থেকে নতুন ধানের সবুজ পাতা তুলে নিয়ে আসে এবং যে বাড়ীতে পুজোর জন্য করম গাছ পোঁতা হয়েছে সেখানে সবাই একত্রিত হয়।

ব্রতিনীদের সকলের থালায় থাকে একটি করে কাঁকুড়।
কাঁকুড়টি তাদের সন্তানের প্রতীক হিসেবে রাখা হয়। গ্রামের পুরোহিত কে বলা হয় ‘লায়া’।মেয়েরা এরপর পুরোহিতের কাছে ব্রতকথা ও তার উপযোগিতা শোনে। পাঠ শোনার সময়ে হুঁ হুঁ করে সম্মতিও দেয়। তারপর সবাই মিলে বাসি ভাত আর তরকারি খাওয়ার নিয়ম আছে।
করমের ঠাকুরে / ঢাক ঢাক ঝুমুরে, / চপলা পূজেক করে গো / চপলা পুজেক করে।
করম উৎসবের নৃত্যে কেবলমাত্র অবিবাহিত ও প্রথম বছরের নববিবাহিতা মেয়েরাই অংশগ্রহণ করতে পারে।
এই গানের মধ্যে লুকিয়ে থাকে রোজকার জীবনের চাওয়া-পাওয়া, সুখ দুঃখের, প্রেম ভালোবাসার চালচিত্র। ঝুমুর গানের মধ্যে দিয়ে নৃত্যশিল্পীরা অর্ধবৃত্তাকারে হাতে হাত ধরে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে তালে তালে নাচে।
পরের দিন বেলা বাড়লে করম গাছটিকে নদী বা পুকুরের জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। হলুদ চারাগাছগুলি ডালা থেকে নিয়ে ব্রতীর ধানের গোলায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়।ব্রতের শেষে মেয়েরা একে ওপরের হাতে করমডোর বা রাখী পরিয়ে দেয়। এই রাখী বন্ধনের মধ্যে দিয়ে কর্মস্থলে একে ওপরকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। আজ থেকে তারা যে করমসখী। ব্রতিনীদের বিশ্বাস, এই ব্রত পালন করলে পরের বছর তাদের গোলা শস্যে ভরে উঠবে।

করম ঠাকুরের এই ব্রত অনুষ্ঠানের সঙ্গে Garden of Adonis অনুষ্ঠানের একটি সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। শস্য ও সন্তান কামনায় উদ্ভিদদের দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য যাদুক্রিয়া মিশ্রিত এই ধরণের আচার সবচেয়ে বেশি প্রচলিত সিরিয়া, ব্যাবিলন, মিশর প্রভৃতি দেশে। এই দেবতার নাম কোথাও Attis, কোথাও Tammuj বা কোথাও Adonis। শস্যের দেবতা হিসেবে Adonis সমধিক প্রসিদ্ধ। গ্রিস দেশের আদিম মানুষের বিশ্বাস এই Adonis এর কৃপাতেই মৃত্যুর পরও শস্য পুনর্জীবন লাভ করে।
আজ ৬ই সেপ্টেম্বর জঙ্গল মহলের মুলবাসীদের একটি গুরুত্বপূর্ন উৎসব করম পরব। রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রতি বছর করম পরবের দিনে ‘সেকশনাল হলিডে’ ঘোষণা করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে ‘সেকশনাল হলিডে’-এর সঙ্গে বলা হয়েছে, যারা এই উৎসব পালন করেন সেই সম্প্রদায়ের রাজ্য সরকারি কর্মী এবং রাজ্য সরকারের অধীনস্থ ও নিয়ন্ত্রণে থাকা কর্মীরাও এই ছুটি পাবেন।
সাধারণত কোন উৎসব পালন করা হয় কোনো দেবতাকে ঘিরে। এই পরবের মূল অনুসঙ্গ আবর্তিত হয় শুধুমাত্র বৃক্ষকে ঘিরে। মাটির কাছাকাছি থাকা আদিবাসীদের বৃক্ষের সঙ্গে হরিহর আত্মার সম্পর্ক। তাইতো এরা বিভিন্ন আচার আচরণের মাধ্যমে ‘জাওয়া’ কে জাগিয়ে তোলে। নিয়মিত পরিচর্যায় হলুদ বীজগুলো সবুজ চারাগাছে উন্নীত হয়। করম ব্রত কোথাও যেন এক প্রকৃতির বন্দনা। অতিরিক্ত যন্ত্রের ব্যবহারে অক্সিজেনের অভাবে পৃথিবীর ফুসফুস যেখানে জ্বলে যায় দাবানলের ভীষন প্রহারে , তখন এই প্রান্তিক মানুষগুলির উৎসব নতুন ভাবে প্রেরণা দেয় বৃক্ষ রোপনের।।
তথ্য ঋণ : বিনয় মাহাত – লোকায়ত ঝাড়খণ্ড (১৯৮৪) এবং সম্পর্কিত সংবাদ মাধ্যম ও বই।।
একেবারে নতুন এক পার্বণের সম্পর্কে জানতে পারলাম আপনার লেখা থেকে। ধন্যবাদ জানাই।
খুব খুশি হলাম ????❤️
অপূর্ব প্রতিবেদন “করম পরব” অনেককিছু অজানা জানা হয়ে যায় আপনার রচনায়। ধন্যবাদ
পেজ ফোর* এই পরিবেশনের জন্য।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাবেন????