লোকসভা নির্বাচনের বিজেপির ফল একেবারেই আশানুরূপ হয়নি, জোট করে সরকার গড়তে হয়েছে, তার এক মাস পর যে ৭ রাজ্যের ১৩টি বিধানসভার উপনির্বাচনেও জোর ধাক্কা খেতে হল। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোট ১০ আসনে জিতেছে আর বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের ভাগ্যে মাত্র ২ আসন। বাকি অন্যটি পেয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থী। এর আগে বাংলা, তামিলনাড়ু, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাব, উত্তরাখন্ড ও হিমাচল প্রদেশের ১৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি, কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস — প্রতিটি দলের দুটি করে আসন ছিল আর একটি করে ছিল উত্তর প্রদেশের বহুজন সমাজ পার্টি (বিএসপি), বিহারের জনতা দল (ইউনাইটেড), তামিলনাড়ুর দ্রাবিড়া মুনেত্রা খাজাগম (ডিএমকে) এবং একটি ছিল আম আদমি পার্টির (আপ)। বাকি তিনটি আসন ছিল স্বতন্ত্র। কিন্তু উপনির্বাচনের পর একেবারেই অন্য ছবি উঠে এসেছে। প্রায় সবকটি আসন জিতে নিয়েছে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, ডিএমকে-সহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আর বিজেপির ঘরে গিয়েছে মাত্র দুটি আসন।
উল্লেখ্য, লোকসভা নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এনডিএ জোটের জন্য ৪০০ পারের আর বিজেপির জন্য ৩৭০-এর লক্ষ্য স্থির করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল পদ্ম শিবির ২৪০ আসনেই থমকে গিয়েছে। বোঝা গিয়েছিল বিরোধীরা লোকসভায় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে আর এখন বোঝা যাচ্ছে উল্টোদিকে শাসকদল তার পরের পরীক্ষাতেই ডাহা ফেল। বাংলাতেই কলকাতার মানিকতলা, নদীয়ার রানাঘাট দক্ষিণ, উত্তর ২৪ পরগনার বাগদা ও উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ আসনে তৃণমূল কংগ্রেস চার শূন্য। লোকসভায় এ রাজ্যে বিজেপি ১২টি আসন আর তৃণমূল কংগ্রেস ২৯টি আসন পেয়েছিল। এবার বিজেপির ৬টি আসন কমলো। এই আবহে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের শক্তি যে বৃদ্ধি হল তা বলাই বাহুল্য। অন্যদিকে বাংলার রাজনীতিতে আরও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ল নরেন্দ্র মোদীর গেরুয়া দল। কারণ সদ্য লোকসভা নির্বাচনে বাংলায় ধরাশায়ী হয়েছে পদ্ম শিবির, তার উপর চার কেন্দ্রের উপনির্বাচনেও পরাজয়ের মুখ দেখতে হল বঙ্গ–বিজেপিকে। এটা তাদের পক্ষে অস্তিত্বের সংকট তো বটেই।
লোকসভার আগে অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণকে বিরাট ‘ইস্যু’ করে তুলতে বিজেপির তরফে চেষ্টার কসুর ছিলনা। ভোটের আগে মন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা, তারও আগে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ঘরে ঘরে গিয়ে চাল সংগ্রহ, এমনকি বুথফেরত সমীক্ষাতেও গোটা উত্তরপ্রদেশজুড়ে গেরুয়া হাওয়া বইয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু লোকসভা ভোটের ফলাফলে ফৈজাবাদ লোকসভা কেন্দ্রে লালু সিং-এর পরাজয় বিজেপিকে সম্পূর্ণ নিরাশ করে। বোঝা যায় যে রামমন্দির কেন্দ্রে বিজেপি আর অপরিহার্য নয়। বিজেপি ভাবেছিল রামমন্দিরের কাঁধে চেপেই তারা উত্তরপ্রদেশে গেরুয়া সুনামি ঘটাবে। তা যেমন হয়নি তেমনি উত্তরাখণ্ডের বদ্রীনাথে বিধানসভার উপনির্বাচনেও ঘটলো পদ্মের হার। বদ্রীনাথ আসনটির জয় নিয়ে বিজেপি মরিয়া ছিল, কিন্তু কংগ্রেস সেই আসনটি এবার উপনির্বাচনেও ধরে রাখতে পারলো। লোকসভায় অযোধ্যা যেমন বিজেপির দিক থেকে মুখ ফিরিয়েছিল বিধানসভা উপনির্বাচনে বদ্রীনাথে একই ঘটনা ঘটলো।
উল্লেখ্য, এই উপনির্বাচনের আগে এই ১৩টি আসনের মধ্যে চারটি আসন ছিল বিজেপির দখলে আর বাকি ৯টি আসনের মধ্যে পাঁচটি ছিল বিরোধীদের বা জোট ‘ইন্ডিয়া’র দখলে, তিনটি নির্দল এবং একটি বিএসপির। তাহলে সঠিক বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া একমাত্র বিহারেই এনডিএ আসন হারিয়েছে। অন্যদিক থেকে দেখলে বাকি রাজ্যগুলির মধ্যে হিমাচল প্রদেশ এবং মধ্যপ্রদেশে বরং বিজেপি তাদের হারা আসন ফের নিজেদের দখলে এনেছে। এবার কংগ্রেসের দিক থেকে দেখলে দেখা যাচ্ছে হারা তিনটি আসন কংগ্রেস এবার জিতেছে ঠিকই কিন্তু মধ্যপ্রদেশের অমরওয়াড়াতে ঘটেছে উলটপুরাণ। কারণ, কংগ্রেসের জেতা আসনে থাবা বসিয়েছে বিজেপি। যে কারণে রাজনৈতিক মহলের একাংশ কিন্তু মনে করছেন না যে এই উপনির্বাচনে বিজেপির ভরাডুবি হয়েছে। বরং বলা যায়, এই উপনির্বাচনে বিজেপি তাদের নিজেদের আসন সংখ্যা আরও বাড়িয়ে নিতে পারতো কিন্তু তারা সেই সুযোগ হাতছাড়া করেছে।
বিজেপি হতাশা বাড়িয়েছে বাংলায়, রানাঘাট দক্ষিণ; ২০২১ সালে এই আসনে বিজেপি প্রার্থী হিসেবে জিতেছিলেন মুকুটমণি অধিকারী৷ লোকসভা নির্বাচনের আগে তিনি তৃণমূলে যোগ দেন এবং তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে উপ-নির্বাচনে তিনি বিজেপির মনোজকুমার বিশ্বাসকে ৩৯ হাজার ৪৮ ভোটে হারান৷ বাগদায় ২০২১ সালে জিতেছিলেন বিজেপির বিশ্বজিৎ দাস। তিনিও পরে তৃণমূলে যোগ দেন৷ উপ-নির্বাচনে এখানে তৃণমূল প্রার্থী করে ঠাকুরবাড়ির মেয়ে মধুপর্ণা ঠাকুরকে, তিনি বিজেপির বিনয়কুমার ৩৩ হাজার ৪৫৫ ভোটে হারিয়েছেন। এই উপনির্বাচনের ফলাফল থেকে বিজেপির পতনের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কারণ, উপনির্বাচনের ফলাফল বুঝিয়ে দিচ্ছে যে নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের চার শূন্য ফলাফলকে বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজ্যে যে দল ক্ষমতায় থাকে, তারা যদি চেষ্টা করে, তাহলে উপনির্বাচনে তাদের জেতার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। এক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। তবে বিধানসভা ভোট অনেক দেরি আছে। এখন তা নিয়ে কিছু বলার সময় আসেনি।