ছোটোবেলায় রথযাত্রার দিনে রথের সারথিটি বেশ চোখ টানত! কেমন সুন্দর গোঁফওলা, মাথায় পাগড়ি, মুখে মুচকি হাসি। হাতেধরা দড়ির গোছা নিয়ে ঘোড়াদের বশ করে।
ভক্তদের টানাটানিতে তিন ভাইবোন প্রায়শই পড়োপড়ো, কিন্তু রথচালক তার নিজের জায়গাতে অটল। ফুলের মালা, ধূপের ধোঁয়ার আড়ালে দারুব্রহ্ম কে বিশেষ দেখতে পেতাম না। তাই সারথিকেই জগন্নাথ মনে করে বেশ কয়েকবার পেন্নাম ঠুকে দিতাম। দেবদেবীদের অবশ্য কিচ্ছু বিশ্বাস নেই। কে জানে, স্বয়ং নিজের আসন থেকে তিনি নেমে সারথির দেহে ভর করেন কি না! বেশ খোলামেলায় চারদিক দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। উচ্চাসনে বসে, ফুলের মালা, ধূপের ধোঁয়ার জাল কেটে কি তাঁর সত্যিসত্যি ভক্তের সঙ্গে মিলন হয়?

তবে রথ মানেই গরিমা। রথযাত্রা যেন বিজয়ের পথে গড়বড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া। সেই যে রাবণ সীতার মত সুন্দরী কে হরণ করে পুষ্পক রথে চড়ে সোজা লঙ্কায় পৌঁছলেন, জটায়ু তার কিচ্ছুটি করতে পারল না! একি যে সে রথ! আকাশপথে তরতরিয়ে উড়ে যাওয়া এ রথ স্বয়ং বিশ্বকর্মার তৈরী। সৎভাই কুবেরের কাছ থেকে এ মহার্ঘ্য যানটি ছিনিয়ে নিয়ে বিজয়ীরাবণ সেদিন দশমুখে অট্টহাসি হেসেছিলেন। সে হাসি আমরা যাত্রাপালায়, টিভির পর্দায় বহুবার দেখেছি।
এমন আকাশে ওড়া চমৎকার রথ অযোধ্যাতেও ছিল না। রাবণের এই অভিনব পুষ্পকরথটি রামচন্দ্রের তাই বড় পছন্দ হল। লঙ্কা জয় করে অযোধ্যা ফেরবার সময় রামচন্দ্র সোনার লঙ্কা থেকে কিচ্ছুটি নিলেন না। শুধু পুষ্পক রথে চড়ে পতিব্রতা স্ত্রীকে সঙ্গে করে তিনি আকাশবিহারী হলেন।
ঐযে বললাম, কখন ইচ্ছে হয় তাঁর রথী হতে কখনো সারথি। মহাভারতের যুদ্ধে ফতোয়া দিয়ে দেন যুদ্ধ করবেন না অথচ সখা পার্থর রথের সারথি হয়ে যান।বেকায়দায় রথের চাকা বসে যাওয়া বেচারী কর্ণকে মেরে ফেলার ইঙ্গিত করেন বন্ধুকে। রথে বসেই “কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন” বলেটলে জীবনের সার কথা শুনিয়ে যান।

কখনো কখনো তাঁর বালগোপাল হয়ে প্রতিদিন রথে চড়তে ইচ্ছে করে। এই কথাই শুনেছিলাম কর্ণাটকের উদিপীর কৃষ্ণমঠে। মন্দিরপ্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে এক ভক্ত বলেছিলেন। ছটফটে, দুষ্টুছেলের নাকি সারাদিন একঠাঁই বসে থাকতে ভালো লাগে না। তাই সন্ধ্যেবেলা তাঁর প্রতিদিন রথযাত্রা।
কর্ণাটকে উদিপীতে হাজার বছরের পুরনো এই মঠ এবং তারসঙ্গে জড়িত এই আশ্রমটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জগতগুরু শ্রী মাধবাচার্য। সেই মন্দির চত্বরে তিনটি অদ্ভুতদর্শন বিশাল রথ রাখা আছে। সচরাচর আমরা যে রথ দেখে থাকি, তার সঙ্গে এগুলির কোনও মিল নেই। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামেগঞ্জে দেখা ধানের মরাইয়ের মত এর আকার। কাঠের তৈরী এই রথগুলিতে খোদাই করা সুন্দর অলঙ্করণ ও সাজসজ্জা।

মন্দির প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে দেখলাম, সন্ধ্যেবেলা প্রদীপের আলোয় সেজে উঠল গোটা চত্বর। রথের সামনে ঝাঁটপাট দিয়ে রঙ্গোলী আঁকা হল। সানাই, শিঙা, ঢাক বেজে উঠল। সোনার চতুর্দোলায়, লাল মখমলের গদিতে, পুরোহিতদের কাঁধে চেপে বালগোপাল মন্দির থেকে বেরোলেন। তরতরিয়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে রথারূঢ় হলেন। মন্দিরের চাকার সামনে নারকেল ফাটল। ভক্তদের গোবিন্দ গোবিন্দ জয়ধ্বনির সঙ্গে রথ চলল গড়গড়িয়ে। পেছনে পেছনে বাদ্যির দল তাঁর মনোরঞ্জন করতে লাগল।
উদিপীর কৃষ্ণমঠের বিশেষ রথযাত্রাটি হয় মকরসংক্রান্তির দিনে। তার একসপ্তাহ আগে থেকে চলে একসপ্তাহ ব্যাপী সপ্তোৎসব। পৌষসংক্রান্তির পবিত্রদিনে ভগবান অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন এ মন্দিরে, তাই এই বাৎসরিক উৎসবের মহা আয়োজন, রথযাত্রা বা ‘তিরুমেরু’।

মকর সংক্রান্তির আলোকিত সন্ধ্যেয় শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর তিন সঙ্গী মুখ্যপ্রাণ, চন্দ্রমৌলীশ্বর এবং অনন্তেশ্বর গর্ভগৃহ থেকে চতুর্দোলায় চেপে মাধব সরোবরে যান। সেখানে তাঁদের সুসজ্জিত নৌকায় তিনবার প্রদক্ষিণ করানো হয়। তারপর তাঁদের রথারোহণ। রথগুলির নাম যথাক্রমে ব্রহ্মরথ, গরুড়রথ এবং মহাপূজা রথ।
আলোর মালায় সজ্জিত হাজার হাজার ভক্তের সম্মেলনে ধীরে ধীরে পথ পরিক্রমা করে তিনটি রথ। সঙ্গে আলোর মশাল, বাজনাবাদ্যি আর আতশবাজি। রথের দড়ি স্পর্শ করে পাপস্খালন হবে, এই বিশ্বাসে রথের দড়িতে টান পড়ে। জ্ঞান, ভক্তি, সংস্কৃতির পীঠস্থান উদিপী দক্ষিণের বারাণসী বলে খ্যাত। সংক্রান্তির উৎসবে জনতাজনার্দনের পাদধূলির স্পর্শে উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে এই পুণ্যভূমি।
Bah…khub bhalo story..????????????