১৯৬৪ সালে জাপানের ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা (Yasunari Kawabata) নোবেলপুরস্কার পান সাহিত্যে। কাওয়াবাতার অন্যতম প্রেরণা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিরিশ বছর পরে, ১৯৯৪ সালে, আবার নোবেল পেলেন যে জাপানি সাহিত্যিক, তিনি হলেন কেনজাবুরি ওয়ি (Kenzaburō Ōe, 31 January 1935-3 March 2023)। তাঁর সৃষ্টি হল : আ পার্সোনাল ম্যাটার, হিরোশিমা নোটস, দ্য সাইলেন্ট ক্রাই, প্রাইজ স্টক, দ্য ক্যাচ ইত্যাদি।
কাওয়াবাতা বা অন্যান্য জাপানি লেখকদের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য আছে। ঐতিহ্যের সঙ্গে তিনি প্রগতিকে মেলাতে চেয়েছিলেন। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসি সাহিত্য পাঠ তাঁর চোখ খুলে দেয়। ঠিক যেমনটি ঘটেছিল আমাদের দেশের নবজাগরণে। হোমার, মিলটন না পড়লে মধুসূদনের পক্ষে ‘মেঘনাদবধ’ বা ‘বীরাঙ্গনা’ লেখা সম্ভব ছিল না। তবে অন্ধ অনুকরণ আর প্রভাব এক কথা নয়। কেনজামুরি পাশ্চাত্য প্রভাবকে অঙ্গীকার করেই নতুন সাহিত্য সৃষ্টি করেছিলেন।
তাঁকে পুরস্কার প্রদানের কারণ হিসেবে নোবেল কমিটি লিখেছেন, ‘কাব্যিক শক্তির প্রতিফলন ঘটিয়ে কল্পনার এমন এক জগৎ নির্মাণ করেছেন, জীবন ও কাল্পনিক আখ্যান যেখানে বর্তমান কালের দুর্দশার বিব্রতকর ছবি তুলে ধরতে ঘনীভূত সত্তা নিয়ে হাজির’। বোধহয় সচেতনভাবে তিনি চেতনাপ্রবাহ রীতিটিকে গ্রহণ করে উপন্যাসের কায়া নির্মাণ করেছেন, যেখানে কোন গোল গল্প নেই।

Yasunari Kawabata
আরও একটা কথা। পারিবারিক সংকট তাঁকে লেখক হবার প্রেরণা দিয়েছে। তাঁর প্রতিবন্ধী ছেলে হিকারী দিনের পর দিন যন্ত্রণাদগ্ধ করেছে তাঁকে। ছেলেকে মেরে ফেলার, বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবার কথাও ভেবেছেন। পারেন নি। মমতা তাঁর পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু শুধু পারিবারিক সংকট নয়, তাঁকে লেখক হবার প্রেরণা দিয়েছে হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমাবিধ্বস্ত মানুষের আর্তনাদ। তাই তো তিনি আজীবন যুদ্ধের বিরুদ্ধে, পরমাণুশক্তির চর্চার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। ২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক দুর্ঘটনার পরে তিনি ‘নিউইয়র্কার’ পত্রিকার এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘পারমাণবিক চুল্লি তৈরি এবং তা প্রদর্শন করার মধ্য দিয়ে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে মানবজীবনের প্রতি অসম্মান দেখানো হবে হিরোশিমার আণবিক বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের প্রতি নিকৃষ্টতম বিশ্বাসঘাতকতা’। জাপানের যুদ্ধ পরিহার করার সংবিধানে তিনি আস্থা রেখেছেন এবং এর ব্যতিক্রম দেখলে প্রতিবাদ করেছেন ; জাপানকে পরমাণুমুক্ত করার নাগরিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন।
যুদ্ধবিরোধী, গণতন্ত্রপ্রিয়, মানবতাবাদী সেই লেখক মার্চ মাসের ৩ তারিখে মৃত্যুবরণ করেছেন।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক