যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে। বুঝতে পারছি। আঞ্চলিক দলগুলোর প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়ছে। আমাদের গ্যাস-গপ্পি ধরা পড়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সেজন্য আমাদের একটা আইকন চাই। আমরা সাভারকরকে ধরেছি, দীনদয়ালকে ধরেছি, শ্যামাপ্রসাদকে ধরেছি। বিশেষ কাজ হয় নি। আসমুদ্র হিমাচল প্রভাব এঁদের নেই। তারপর ধরলাম বল্লবভাই পটেলকে। প্রচার করার চেষ্টা করলাম জওহরলাল তাঁকে লেঙ্গি মেরে কুরসি দখল করেছেন। বিশাল একটা মূর্তি বানিয়ে দিলাম পটেলের। তাতেও বিশেষ কাজ হল না। বাঙালির প্রতি আমাদের বিশেষ বিদ্বেষ। তবু কবিগুরু আর স্বামীজিকে ধরার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাঁরা ফস্কে বেরিয়ে গেছেন। তাঁদের আইকন করার খেলা খুব একটা জমে নি।
তাই শেষমেষ এলাম তোমার কাছে। তোমার প্রভাব কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা। ভারতবাসীর মনে রোমাঞ্চ হয়ে জেগে আছো তুমি। তাছাড়া, তোমাকে কংগ্রেস যে বঞ্চনা করেছে, সেটাও কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছি। বামেরা তোমার প্রতি যে অবিচার করেছিল, সেটাও জলদগম্ভীর কণ্ঠে মানুষের কাছে বলেছি। এই দেখো, তুমি মুচকি হাসতে শুরু করেছ। আরে বাবা, আমাদের দলের নীতি-আদর্শের সঙ্গে তোমাকে যে আঁটানো যাবে না, সে কথা আমরা জানি। জানি, তোমার বুদ্ধি, সাহস, আত্মত্যাগ এবং দেশপ্রেম আমাদের নেই। জানি, তুমি ধর্মপ্রাণ হলেও আমাদের মতো ধর্মকে রাজনীতির দাবার ঘুঁটি করতে চাও নি। তোমার আজাদ হিন্দ ফৌজে সব ধর্মের মানুষ ছিল। তোমার কমরেড-ইন-আর্মস ছিল মুসলমানরা। সেসব তো জানি আমরা। তবে মানি না, এই যা।
এসব জেনেশুনেও আসছি তোমার কাছে। আসতে বাধ্য হয়েছি। ভোট যে বড় বালাই। একটু দয়া করো, একটু ক্ষমা-ঘেন্না করে দাও নেতাজি। তুমি যদি বলো, — ‘ক্ষমা কোথা মনে মোর / করেছ এ চিত্ত মোর কুলিশ কঠোর’, তাহলে খুব হতাশ হবো। দেখো, নিজেদের পজিশন বাঁচানোর জন্য একটু-আধটু মিথ্যে কথা বলতে হয়। আমরাও বলেছি। যেমন আমাদের আর এস এসের মোহন ভাগবত বললেন, ‘নেতাজির যা লক্ষ্য, সেই একই লক্ষ্য আর এস এস-এর’। আমরা বলার চেষ্টা করেছি হিন্দু মহাসভার বীর সাভারকরের পরামর্শে নেতাজি ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অক্ষশক্তির সঙ্গে আঁতাত করেছিলেন। এর মধ্যে আবার তোমার মেয়ে অনিতা বসু পাফ বলে বসল যে তোমার আদর্শের সঙ্গে আর এস এস-এর আদর্শের কোন সম্পর্ক নেই। সে কথা আমরা জানি। কিন্তু স্বীকার করতে পারি না। তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ যে, তোমার অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি তুলে ধরা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
তবে কি না আমাদের প্রতি তোমার কৃতজ্ঞতা থাকা উচিৎ। আমরা তোমার জন্য যা করেছি, তা এর আগে কেউ করে নি।
২০১৮ সালে আন্দামান সফরের সময়ে আমাদের মোদিসাহেব রস আইল্যান্ডের নাম তোমার নামে নামাঙ্কিত করেছেন। আন্দামান নিকোবরের ২১টি দ্বীপের নাম পরমবীর চক্র প্রাপকদের নামে করা হয়েছে।
ঘটা করে তোমার জন্মদিন পালন করা হচ্ছে। আর এস এস সেদিন কুচকাওয়াজের আয়োজন করেছে। আন্দামান নিকোবরে তোমার জীবনভিত্তিক এক মিউজিয়ম তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছি আমরা।
তোমার ৩০৩টি গোপন ফাইল আমরা সংগ্রহ করেছি। তোমার অন্তর্ধান রহস্যের সমাধান আমরা করবই। তবে কবে সেটা হবে, তা বলতে পারব না। সেটা হওয়ার আগে আমরা যদি বিদায় নিই, তবে আমাদের দোষ দিও না। চেষ্টাতো করেছি আমরাই। কংগ্রেস তো সব চাপা দেবার চেষ্টা করেছিল। আমরা ওদের মতো ফাঁপা নই।
এবার চলো দিল্লি। ইন্ডিয়া গেট থেকে ১৫০ মিটার পূর্বে সি-হেক্সাগনের কেন্দ্রে যে ৭৩ ফুট ছাউনি আছে সেই গ্র্যাণ্ড ক্যানোপির তলায় আমরাই তোমার ২৮ ফুট মূর্তি তৈরি করেছি। তোমার হলোগ্রাম মূর্তির পরিবর্তে এই মূর্তি আমাদের শ্রদ্ধার নিদর্শন। ২৮০ টন গ্র্যানাইট পাথর দিয়ে খোদাই করা মূর্তি। তেলেঙ্গানার খাম্মাম থেকে বহু কষ্ট করে আনিয়েছি পাথর।
তিন সত্যি করে বলছি শ্রীরামচন্দ্রকে আমরা যেমন নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেছি, তেমনি তোমাকেও বিশ্বময় ছড়িয়ে দেবো। একটু ক্ষমা-ঘেন্না করে তুমি শুধু আমাদেরই আইকন হয়ে যাও। দেখবে তখন বিজেপি শন শন করে ছুটে বেড়াবে ভারতময়।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক