‘এপ্রিল ফুল ডে’ বিশ্বব্যাপী উদযাপিত এমন একটি দিন যেখানে মানুষ একে অপরকে নির্ভেজাল ধোঁকা দিয়ে আনন্দ উপভোগ করে। যদিও ফেক নিউজের রমরমায় আজকাল রোজই ‘এপ্রিল ফুল’ হয় মানুষজন। তবুও হার্মলেস প্রাঙ্ক বা নিরীহ দুষ্টুমি করার সুযোগ পেলে হাতছাড়া করতে চায় না কেউই। কিন্তু কেন একটা আস্ত দিন বোকা বানানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে? এ নিয়ে নানামুনির নানা মত থাকলেও খোঁজাখুঁজি করলে দেখা যাবে,এই বোকা বানানোর দিবসটির জন্ম বিদেশে।
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্যমতে প্রাচীন রোমান উৎসব হিলারিয়া (যা উদযাপিত হত ২৫শে মার্চ) থেকেই এপ্রিল ফুল’স ডের উৎপত্তি। জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে বছর শুরু হত ২৫ মার্চ। আর টানা ৮ দিনের উৎসবের শেষ দিন অর্থাৎ এপ্রিলের ১ তারিখ নববর্ষ উদযাপন হত। এরপর ষোল শতকে যখন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার শুরু হয়, তখন নববর্ষ সরে যায় ১ জানুয়ারি। জুলিয়ান ক্যালেন্ডার থেকে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে পরিবর্তনের ফলে, যারা ১লা এপ্রিল নতুন বছর উদযাপন চালিয়ে যাচ্ছিল, তাদেরকে ‘এপ্রিল ফুল’ বা এপ্রিলের বোকা বলে উপহাস করা হতো ।
আবার অনেকে বিশ্বাস করেন যে, ১৫৬৪ সালে ফ্রান্সের রাজা নবম চার্লস পহেলা এপ্রিলের পরিবর্তে পহেলা জানুয়ারিকে নতুন বছর হিসেবে ঘোষণা করেন। তবে অনেকেই এটি জানতেন না বা মানতেন না, ফলে তাদের ‘ফুল’ বা বোকা বানানো হতো।
ইংরেজি সাহিত্যের জনক জিওফ্রে চসার ১৩৯২ সালে ‘নন’স প্রিস্ট টেল’ কবিতায় মার্চ মাসের একটি বত্রিশতম দিনের উল্লেখ করেছিলেন, যা পহেলা এপ্রিল হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
১৬শ শতাব্দীতে স্কুলে পড়ার সময় বাথ বা ‘মিল্ক ডুকিস’ (duck-milking) এর মতো প্র্যাঙ্ক ছিল খুবই সাধারণ। ১৫শ শতাব্দীতে ভিক্ষুরা আপেলের ভেতর জীবন্ত পোকা ঢুকিয়ে ভুতুড়ে কাণ্ড ঘটিয়ে মজার ছলে মানুষকে বোকা বানাতেন।
আবার, এটি নিয়ে মুসলিম নিধনের দুঃখজনক ইতিহাসও প্রচলিত রয়েছে। ১৪৯২ সালে (মতান্তরে ১৫০০ সালের ১লা এপ্রিল) স্পেনের গ্রানাডায় মুসলিম শাসনের পতনের পর, খ্রিষ্টান শাসকরা মুসলমানদের সাথে মিথ্যা প্রেম বা বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে বোকা বানিয়ে কৌশলে হত্যা করেছিল।এই বিশ্বাসঘাতকতাকে স্মরণীয় করতে এই দিনটি পালিত হয়।
এক-এক দেশে এক-একরকম সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ রয়েছে এইসব গল্পগাছার। আমাদের বঙ্গেও এ নিয়ে বহু মজার কাহিনী প্রচলিত আছে। এপ্রিল ফুলের রমরমা আগে বেশি দেখা যেত শুধু বন্ধু-বান্ধব, ভাই বোনের কিম্বা নিজেদের লোকের মধ্যে। এমনকি খবরের কাগজ যারা ছাপেন সেই কাগজের সম্পাদকরাও বোকা বানানোর উৎসবের দিনটায় তাদের প্রাণের পাঠককেও ঘোল খাইয়ে ছাড়তে কসুর করতেন না। যেমন ধরুন —
১৮৭৪ সালের ১লা এপ্রিল নিউইয়র্ক হেরাল্ডের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হলো যে সেন্ট্রাল পার্কে চিড়িয়াখানার পশুরা খাঁচা ভেঙে পালিয়েছে। বাঘ, সিংহ এবং অন্যান্য হিংস্র প্রাণী রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এই প্রতিবেদনটি এতই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে শহরের অনেক মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। এটি ছিল সেই সময়ের একটি অন্যতম সেরা ‘প্র্যাঙ্ক’ বা বোকা বানানোর ঘটনা।
২০১৬ সালের পয়লা এপ্রিলের ঘটনা। সংবাদপত্র আকিলায় প্রকাশিত হলো ৫০০-১০০০ টাকার নোট বাতিলের খবর। যদিও সেই খবরই বাস্তবে পরিণত হয় সেই বছরের ৮ ই নভেম্বরে।
১৯৮৭ সালে ৫ই এপ্রিল অর্থাৎ এপ্রিল ফুলের পরের রবিবার দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত হলো, ‘জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করা একটি বিশাল ধাতব যান কে সনাক্ত করেছেন’। শুধু তাই নয়, শহরের এক কোনায় পড়ে থাকা যে সল্টলেকের তখনো জলা জঙ্গলের অবস্থান। খবরে সুনির্দিষ্টভাবে সেই বিধাননগরকে ফ্লায়িং সসারের অবতারণ স্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। খবরের সত্যতা বাড়াতে সম্পাদকরা আকাশে ভাসমান অজানা উড়ন্ত বস্তু ঝাপসা সাদাকালো ছবিও খবরে জুড়ে দিলেন। স্টেটসম্যানের নিজের কায়দায় অত্যন্ত গম্ভীর এবং বৈজ্ঞানিক ঢঙে লেখা সেই প্রচ্ছদ কাহিনী জনমানসে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল তা নজিরবিহীন।
জানলে অবাক হবেন,কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পয়লা এপ্রিল বা বোকা দিবস উদযাপন করতেন এবং অনেককেই এপ্রিল ফুল বানিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতন আশ্রমে এপ্রিল ফুল বা বোকা দিবস প্রচলনে অগ্রণী ছিলেন গুরুদেব।তাঁর ‘প্রহাসিনী’ কাব্যগ্রন্থে বিভিন্ন ব্যঙ্গাত্মক ও মজাদার কবিতা ছিলো ‘এপ্রিল ফুল’ বা বোকা বানানোর উৎসবের বিষয়টি সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ‘প্রহাসিনী’ কাব্যগ্রন্থে কবি লিখেছেন — “পাকা চুল কেঁচে গেল, বুদ্ধি গেল ফেঁসে —/ যে দেখে আমার দশা সেই যায় হেসে।”
কিশোর বয়সে জ্যোতিদাদাকে সঙ্গে নিয়ে কবি অক্ষয় চৌধুরীকে এপ্রিল ফুল করার ঘটনাও শোনা যায়।
রবীন্দ্রনাথের দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর পড়তেন হিন্দু স্কুলে। সেখানে তার এক সহপাঠী ছিলেন অক্ষয় চৌধুরী।এম এ পাশ করে তিনি অ্যাটর্নীশিপ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু তিনি ভক্ত ছিলেন বাংলা ও ইংরেজী সাহিত্যের।তিনি বিখ্যাত “ভারতী” পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ছিলেন। বাড়ির কয়েকটা ছেলেকে তিনি শেক্সপিয়ার পড়াতেন এবং পড়াতে পড়াতে তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়তেন।
রবীন্দ্রনাথ কিশোর বয়সেই অক্ষয় চৌধুরীর সঙ্গে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে নানারকম আলোচনা করতেন।
একবার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে পয়লা এপ্রিলের দিন অক্ষয় চৌধুরীর আসার কথা ছিলো। সেই সুযোগ রসিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাতছাড়া করলেন না।রবি আগে থেকেই জ্যোতিদাদাকে ম্যানেজ করে রেখেছিলেন অক্ষয় চৌধুরীকে এপ্রিল ফুল করার জন্য। রবি ঠাকুর নকল দাড়ি গোঁফ লাগিয়ে পার্সি সেজে রইলেন অক্ষয় চৌধুরীকে ঠকানোর জন্য।
যথা সময়ে অক্ষয় চৌধুরী এলেন।জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁর বাল্য বন্ধুকে গিয়ে বললেন,বোম্বাই থেকে এক পার্সি ভদ্রলোক এসেছেন তোমার সঙ্গে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করবেন বলে। অক্ষয় চৌধুরী ছিলেন খুব সহজ সিধেসাদা মানুষ। তিনি তো শুনেই আহ্লাদে আটখানা হয়ে পড়লেন।
রবি ঠাকুর নকল দাড়ি গোঁফ লাগিয়ে পার্সি সেজে তার সঙ্গে আলাপ জমিয়ে দিলেন।এই রবীন্দ্রনাথকে তিনি কতবার আগে দেখেছেন, একসাথে আড্ডা মেরেছেন, কত আলোচনা করেছেন। তার কণ্ঠস্বর চেনা অথচ রবীন্দ্রনাথের এই ছদ্মবেশ তিনি একবারও ধরতে পারলেন না।পার্সি ভেবে তিনি কত কিছু গুরুগম্ভীর আলোচনা করলেন। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন জ্যোতিদাদা। তাঁর তো হাসিতে পেট গুড় গুড় করতে লাগলো।
ঠিক এমন সময় বাড়িতে এসে উপস্থিত হলেন তারকনাথ পালিত। তিনি রবিকে ঠিক চিনতে পারলেন। রবির মাথায় এক চাঁটি মেরে বললেন, ‘এ কী রবি! কী হচ্ছে?’
চাঁটি মারতেই রবির নকল দাড়ি গোঁফ খসে পড়ে গেল।
অক্ষয় চৌধুরী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখলেন তিনি এতক্ষণ যাকে পার্শি ভদ্রলোক ভেবে কথা বলছিলেন তিনি আসলে রবি। অক্ষয় চৌধুরী বুঝতে পারলেন তাঁকে রীতিমতো ঠকানো হয়েছে। ঘরের সকলে হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলেন। এটি কবিগুরুর মানবিক এবং রসবোধের একটি অন্যতম দিক।
সব ঠকে যাওয়াই যদি এপ্রিল ফুলের মত নিখাদ মজার হতো,তাহলে মানুষ হয়তো বোকা বনতেই ভালোবাসতো। কিন্তু জীবন কখনো নিখাদ বোকা বানিয়ে চরম আনন্দ দেয়, আবার কখনো জীবনের চরম বাস্তব বুঝিয়ে দেয়। আসলে এপ্রিলফুল শুধু হাসির দিন নয় বড় একে অপরের সাথে সংস্কৃতির বিনিময় ঘটনারও দিন। কারুর ক্ষতি না করে যতক্ষণ হাসি মজা করা যায় ততক্ষণ আনন্দের। তাই এপ্রিল ফুলকে পুরোপুরি বাতিল করা যায় না। “এপ্রিল ফুল বানায়া তো উনকো গুসসা আয়া!” গুসসা আসুক কিন্তু লক্ষ্য রাখবেন হাসি-ঠাট্টার পরে তা যেন আনন্দে পরিণত হয়।চমক থাকুক, কিন্তু ভয় থাকবে না।হাসতে সময় না পাওয়ার ব্যস্ত দিনে এক পশলা হাসির জন্য এই উদযাপন মন্দ কি!!
তথ্যসূত্র: জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি এবং অন্যান্য নিউজ মিডিয়া।
খুব সুন্দর বিষয় নিয়ে আপনার এই লেখাটি পড়ে খুব ভালো লাগলো।,,ধন্যবাদ।।আপনাকে।।।