পাহাড়, জল আর অরণ্যের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা ছাড়াও স্বাস্থ্যোদ্ধারে ‘হাওয়া বদল’ করতে বাঙালিরা একসময় ভিড় জমাতেন বিহার অধুনা ঝাড়খণ্ডের পশ্চিম সিংভূম জেলার পর্যটনকেন্দ্র ঘাটশিলায়। তিরিশের দশকে বাংলা কথা সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও অরণ্য বেষ্টিত ঘাটশিলার প্রেমে পড়ে এখানেই আস্তানা গেড়ে নিজের প্রথমা স্ত্রী পরলোকগতা গৌরীদেবীর নামে ‘গৌরীকুঞ্জ’ নামে বসতবাটি তৈরি করেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এই ‘গৌরীকুঞ্জে’ বাস করে লিখে গিয়েছেন ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘আরণ্যক’, ‘ইচ্ছামতী’-সহ বাংলা সাহিত্যের একাধিক কালজয়ী উপন্যাস, গল্প। ঘাটশিলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গৌরীকুঞ্জে’র আকর্ষণে বাঙালি পর্যটকদের ক্রমবর্ধমান পরিভ্রমণে বিভূতিভূষণের ঘাটশিলার নতুন পরিচিতি ঘটে ‘বাঙালির ঘাটশিলা’।
বিভূতিভূষণের স্মৃতি বিজড়িত গৌরীকুঞ্জের টানে এখনও প্রতিবছর প্রায় লাখ খানেক বাঙালি পর্যটক ঘাটশিলা ঘুরতে আসেন। জনসংখ্যার নিরিখে ঘাটশিলার প্রায় পঞ্চাশ শতাংশের বেশি প্রবাসী বাঙালি। বাঙালি অথচ বাংলা ভাষায় লেখা পড়ার কোন সুযোগ ঘাটশিলায় নেই বললেই চলে। সত্তর শতাংশের বেশি মানুষের কথ্য ভাষা বাংলা হলেও স্থানীয় স্কুলগুলিতে হিন্দি, ইংরেজির প্রাধান্য। বাংলা ভাষার কোনো জায়গা নেই। রীতিমত অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে বাংলা ভাষায় পঠনপাঠন। বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ঝাড়খণ্ড সরকার বাংলাকে সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দিলেও কার্যত সরকারি উদাসীনতায় স্কুল স্তরে বাংলা ভাষা পঠন পাঠনের কোন ব্যবস্থাই গড়ে ওঠেনি৷ ফলে বাঙালি হয়েও বাংলার বদলে হিন্দি ও ইংরেজিতে পড়তে বাধ্য হতে হচ্ছে ঘাটশিলার বাঙালি শিশুদের। ঝাড়খণ্ড সরকারের সরকারি স্তরের কাজকর্মেও বাংলা ভাষার কোনো জায়গা নেই৷ সর্বত্র হিন্দি ভাষারই রাজত্ব৷

কয়েক দশক ধরে বাংলা ভাষার এই সঙ্কটে শিয়রে শমন দেখতে পেয়ে বাংলা ভাষা বাঁচাতে এগিয়ে এসেছেন ঘাটশিলার স্থানীয় বাঙালিরাই। ঘাটশিলার স্থানীয় পাঁচটা বাঙালি ক্লাবের সমন্বয়ে গঠিত গৌরীকুঞ্জ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি ও ঘাটশিলার বিশিষ্ট বাঙালি তাপস চট্যোপাধ্যায়ের কথায়, “গত দু’দশকে ঘাটশিলায় বাংলা ভাষার এমন হাল হয়েছে যে, এখানকার বাঙালি ছাত্র ছাত্রীরা বাংলা কথা বলতে পারলেও বাংলা লিখতে ও পড়তে জানে না। অদূর ভবিষ্যতে ঘাটশিলা সহ ঝাড়খণ্ডে বাংলা ভাষা লিখতে ও পড়তে জানা বাঙালি খুঁজতে অনুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন হয়ে পড়বে।” বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বসতবাটি গৌরীকুঞ্জের দেখভালও রক্ষণা বেক্ষণের জন্য ঘাটশিলার পাঁচটা বাঙালি ক্লাবকে নিয়ে ২০০৭ সালে তৈরি হয় গৌরীকুঞ্জ উন্নয়ন সমিতি। ‘গৌরীকুঞ্জে’র দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করার কাজের পাশাপাশি বাংলা ভাষা চর্চার জন্য সমিতির পক্ষ থেকে ঘাটশিলায় ২০১৮ সালে বিভূতিভূষণের ১২৫তম জন্মবর্ষে গৌরীকুঞ্জ প্রাঙ্গনে বিভূতিভূষণের পুত্র তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত ‘তারাদাস’ মঞ্চে ‘অপুর পাঠশালা’ চালু করা হয়।
সপ্তাহের প্রতি রবিবার চলে আসছে অপুর পাঠশালা। অপুর পাঠশালা’র অন্যতম উদ্যোক্তা ও গৌরীকুঞ্জ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি তাপস চট্যোপাধ্যায়ের কথায়, “২০১৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্ম দিবস থেকে সপ্তাহের প্রতি রবিবার তারাদাস মঞ্চে শুরু হয়েছে অপুর পাঠশালার পঠন পাঠনের কাজ। বাংলা পড়তে ও লিখতে উৎসাহী ঘাটশিলার স্থানীয় স্কুলগুলির বিভিন্ন ক্লাশের ৩৫জন ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে পঠনপাঠন শুরু করা হয়। বছর আটেকের মধ্যেই সেই সংখ্যা বর্তমানে একশোর বেশিতে এসে পৌঁছেছে। ঘাটশিলার স্কুলগুলিতে যেহেতু বাংলা ভাষা পড়ানোর চল নেই তাই অপুর পাঠশালার পড়ুয়াদের শুধুমাত্র ‘বর্ণপরিচয়’ ও ‘আদর্শ লিপি ‘পড়ানো হয়। ঘাটশিলায় বসবাস করা স্থানীয় বাঙালিদের মধ্যে ঘাটশিলা কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান সন্দীপ চন্দ্র, সস্ত্রীক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাধুচরণ পাল, সাধনা পাল, অলক চক্রবর্তী, ময়না ক্যুইলা ও ড. ভবানী চক্রবর্তী সহ জনা সাতেক বাঙালি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বিনা পারিশ্রমিকে অপুর পাঠশালা’য় পড়ুয়াদের পড়াতে এগিয়ে এসেছেন শুধুমাত্র বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে।

গৌরীকুঞ্জ উন্নয়ন সমিতির পক্ষ থেকে পাঠশালার পড়ুয়াদের অবৈতনিক পড়ানোর পাশাপাশি বই, খাতাপত্র, পোষাক ও টিফিনের ব্যবস্থা করা হয়। স্থানীয় বাঙালিরাই এই খরচ বহন করে থাকেন। পাশাপাশি গৌরীকুঞ্জে ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছ থেকেও অপুর পাঠশালার জন্য আর্থিক সাহায্য গ্রহন করা হয়।
অপুর পাঠশালা নিয়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্রবধূ ও প্রয়াত তারাদাস বাবুর স্ত্রী মিত্রা দেবীও গৌরীকুঞ্জে অপুর পাঠশালা’ চালানোর ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছেন বলে গৌরীকুঞ্জ উন্নয়ন সমিতির আর এক সদস্য ও গৌরীকুঞ্জে’র কেয়ার টেকার প্রদীপ কুমার ভদ্র জানান। প্রতি রবিবার গৌরীকুঞ্জে অপুর পাঠশালায় হাজির হয় পড়ুয়াদের দল৷ নীচু থেকে উঁচু বিভিন্ন শ্রেণির পড়ুয়ারা সকলেই বাংলা ভাষা শিখতে নিয়ম মেনে পাঠ নিতে আসে৷ ইতিমধ্যে ২০২২ সালে ঝাড়খণ্ডের বাংলাভাষী বিভিন্ন সংগঠন মিলে ঝাড়খণ্ডে বাংলাভাষার অস্তিত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি বাংলাভাষা জানা মানুষের সংখ্যা বাড়াতে সম্মিলিত ভাবে ‘ঝাড়খণ্ড বাংলাভাষী উন্নয়ন সমিতি’ নামে একটি সংগঠন তৈরী করা হয়। সংগঠনের অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক মনোনীত হয়েছেন তাপস চট্যোপাধ্যায়। তাপসবাবু জানান, “ঘাটশিলার গৌরীকুঞ্জে’র অপুর পাঠশালাকে পথিকৃত করে বর্তমানে ঝাড়খণ্ড বাংলাভাষী উন্নয়ন সমিতির পক্ষ থেকে গোটা ঝাড়খণ্ড রাজ্যের ২৪টি জেলার মধ্যে ৯টি জেলা জুড়ে বাংলা ভাষা বাঁচাতে ৬০টির বেশি কেন্দ্রে অপুর পাঠশালা চালু করা হয়েছে এবং সফলতার সঙ্গেই সেগুলি চলছে।”

বাংলা ভাষা রক্ষায় বাংলাদেশ ও আসামের বরাক উপত্যকায় ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্যের সঙ্গে একসারিতে না পড়লেও সেই ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্যের ধারা বয়ে নিয়ে যেতে চাইছে গৌরীকুঞ্জের অপুর পাঠশালা। চাইছেন ঘাটশিলা ও ঝাড়খণ্ডের বাঙালিরা৷
আমি জামসেদপুরের কদমাতে থাকি । এখানে কি “অপুর পাঠশালা”র কোনও শাখা আছে ? থাকলে দযা
করে ঠিকানা এবং ফোন নম্বর দিলে খুশী হব। নমস্কার গ্রহণ করবেন। সুব্রত কুণ্ডু, জামসেদপুর। দুর্ভাগ্য নং..9431756559
এতোটা জানতাম না। সুব্রতবাবুকে অনেক ধন্যবাদ ও অশেষ শুভেচ্ছা ।