একজন শিক্ষক তাঁর নিজের বিদ্যা-বুদ্ধি ও শ্রম দিয়ে ছাত্রকে গড়ে তোলেন। নিজেকে সেই ছাত্রের আলোকিত জীবনের গর্বিত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ছাত্রও তাঁর শিক্ষা জীবন এমন কি ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে, সাফল্যে শিক্ষককে স্মরণ করেন। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের এই ঐতিহ্য যুগ যুগান্তের। এই সম্পর্ক একই সঙ্গে খুবই সাবলীল, মধুর, স্বতঃস্ফুর্ত। একজন আদর্শ ছাত্র চিরকাল তাঁর শিক্ষককে শ্রদ্ধার সঙ্গেই স্মরণ করেন। বিরল হলেও এমন নিদর্শন আজও মেলে। যেমনটা দেখা গেল বর্ধমানে মঙ্গলকোটের মজিগ্রাম বিশ্বেশ্বরী উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষণা অনুযায়ী ১৬ অগাস্ট থেকে শুরু হয়েছে দুয়ারে সরকার ক্যাম্প। প্রসঙ্গত গত বৃহস্পতিবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী এমনটাই জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ১৬ অগাস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুয়ারে সরকার ক্যাম্প হবে। ১৮টি প্রকল্পের সুবিধা পেতে ক্যাম্পে আবেদন করা যাবে। ঘোষণার পর ভিড় উপচে পড়ে বর্ধমানে মঙ্গলকোটের মজিগ্রাম বিশ্বেশ্বরী উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে।
ক্যাম্পের টেবিলগুলির সামনে বহু মানুষ লাইন দিয়েছেন বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা পেতে। এদিকে আবহাওয়ার যা অবস্থা-কখনও রোদ্দুর আবার কখনও বৃষ্টি। তার মধ্যেই মানুষ ভিজে পুড়ে ঠায় দাড়িয়ে রয়েছেন লম্বা লাইনে। দুয়ারে সরকার ১৮টি প্রকল্পের মধ্যে একটি হল কৃষক বন্ধু। সেই প্রকল্পের সুবিধা পেতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন এক বৃদ্ধ। স্বভাবতই তিনি রোদে পুড়ে বৃষ্টির জলে ভিজে নাকাল হচ্ছিলেন। আচমকা সেই বৃদ্ধকে দূর থেকে দেখে সামনে এগিয়ে আসেন মঙ্গলকোটের বিধায়ক অপূর্ব চৌধুরী।

ওই ভিড়ের মধ্যে কয়েক হাজার মানুষ দেখলেন এলাকার বিধায়ক জুতো খুলে এক বৃদ্ধের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন। বৃদ্ধ এলাকার বিধায়কের দিকে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর অপূর্ববাবু বলেন, ‘মাষ্টারমশায় আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি অচল’। এরপরেই বৃদ্ধ তাঁকে চিনতে পেরে জড়িয়ে ধরেন। ছাত্রের এমন আচরণে বৃদ্ধ শিক্ষক তাঁর চোখের জল আটকে রাখতে পারেন নি। কুশল বিনিময়ের পর শিক্ষক তাঁর বিধায়ক ছাত্রকে জানান, তিনি কৃষক বন্ধু-র জন্য তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে এসে লাইনে দাড়িয়েছেন। এর আগের বার যখন দেওয়া হয়েছিল তখন তিনি অসুস্থতার জন্য আসতে পারেন নি। এরপরই মঙ্গলকোটের বিধায়ক অপূর্ব চৌধুরী তাঁর শিক্ষককে লাইন থেকে বের করে আনেন। নিজেই কৃষক বন্ধু-র আবেদনপত্র নিয়ে কাউন্টারে জমা করেন। অপূর্ববাবু তাঁর শিক্ষককে আশ্বাস দেন খুব তাড়াতাড়ি যাতে তিনি এই সুবিধা পান তার জন্য তিনি চেষ্টা চালাবেন।
মঙ্গলকোটের বিধায়কের থেকেই জানা যায় বৃদ্ধ শিক্ষকের নাম অভয়চরণ রায়। তিনি থাকেন কোঁয়ারপুর গ্রামে। একসময় তিনি মঙ্গলকোট ক্ষীরগ্রাম শ্রী যোগাদ্যা বাণীপীঠ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। আর সেই স্কুলের ছাত্র ছিলেন আজকের মঙ্গলকোটের বিধায়ক অপূর্ব চৌধুরী (অচল)। অনেক দূর থেকে দেখেও ছোটবেলার মাষ্টারমশায়কে চিনতে ভুল করেন নি। আজ পুরনো দিনের অনেক কথাই তাঁর মনে পড়ছে। বিশেষ করে তাঁর স্কুল জীবনের কথা।

মঙ্গলকোট ক্ষীরগ্রাম শ্রী যোগাদ্যা বাণীপীঠ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জানান, অপূর্ব চৌধুরীদের বাড়ির সব ছেলেদেরই তিনি সেই সময় পড়য়েছিলেন। তবে তাঁর ছাত্র অপূর্ব যে আজ বিধায়ক সেকথা তিনি জানতেন না। আজ জেনে তিনি গর্ব অনুভব করছেন। মঙ্গলকোটের বিধায়ক সংশ্লিষ্ট দফতরের আধিকারিকেও জানিয়ে দেন যাতে তাঁর মাষ্টারমশায়ের আবেদন খুব তাড়াতাড়ি কার্যকর হয় এবং সেই সুবিধা যাতে তিনি তাড়াতাড়ি পান।
প্রযুক্তির দ্রুত ধাবমান উন্নয়নে মানুষের জীবন থেকে অনেক কিছুই খুব দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। তবু মানুষ তার আবেগকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে এই যন্ত্রশাসিত জীবনযাপনে। মানুষের সেই বেঁচে থাকা আবেগের একটি উদাহরণ হল শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্ক। যার একটি অন্যতম নিদর্শন স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করল মঙ্গলকোটের মজিগ্রাম বিশ্বেশ্বরী উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে দুয়ারে সরকার প্রকল্পের সুবিধা পেতে আসা মানুষ।
সত্যি এই যন্তশাসিত জীবনযাপনে। মানুষের বেচেঁ থাকার আবেগ।
????????????