আরামবাগ এখন জঙ্গিদের কাছে নিরাপদে থাকার একমাত্র আস্তানা। ভৌগোলিক কারণে জঙ্গি কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়ার সহজ রাস্তা আরামবাগ। গত দশ — বারো বছর আগে যেখানে একমাত্র মাওবাদীরা তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়ার নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করেছিল, আজ সেখানে আলকায়দা ও জেএমবি-র মুক্তাঞ্চল তৈরি হচ্ছে। এখানেই পুলিশ প্রশাসনের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।আলকায়দা ও জে এম বি জঙ্গি ধরা পড়ার পরই পুলিশ কর্তারা নড়েচড়ে বসেছেন।
বিশ্বস্ত সূত্রে খবর, ইতিমধ্যে আরামবাগে জঙ্গিদের গোপনে বেশ কয়েকবার জরুরি বৈঠক হয়ে গেছে। এটি জানার পরই পুলিশ কর্তাব্যক্তিদের ঘুম কেড়েছে জঙ্গিরা। আরামবাগ এরইমধ্যে জঙ্গি খবরের শিরোনামে এসেছে। আরামবাগকেই জঙ্গিরা নিরাপদ আশ্রয়স্থল বেছে নেওয়ার কারণ কী? পুলিশ কর্তাব্যক্তিদের মতে একমাত্র ভৌগোলিক কারণ। নিরাপদ করিডর এই মুহূর্তে জঙ্গিদের কাছে। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও পশ্চিম মেদনীপুর হয়ে ঝাড়খণ্ড ও অন্ধ্রপ্রদেশে গা ঢাকা দেওয়ার সহজ উপায়। এখানে মুখ্য করিডর হল জঙ্গলমহল। আসলে আরামবাগ এমনই একটি ভৌগোলিক অবস্থানে আছে যেখান থেকে জঙ্গি কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়া অনেকটাই সহজ। তাছাড়া আলকায়দা কিংবা জেএমবি জঙ্গিরা সংখ্যা লঘুদের ছত্রছায়ায় থাকার সুযোগ পাচ্ছে। এখানে সংখ্যালঘুদের সংখ্যাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। জঙ্গিরা সংখ্যালঘুদের বাড়ি সহজে ভাড়ায় থাকার সুযোগ পাচ্ছে। আর সেখান থেকেই জঙ্গি কার্যকলাপ চালানো সহজ হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কাণ্ডে জড়িত থাকার দুই ফেরার জেএমবি জঙ্গি কদর কাজী ও হাবিবুর ওরফে সাজ্জাদকে আরামবাগের ডোঙ্গল এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছিল এন আই এ। তারা রাজমিস্ত্রি সেজে দীর্ঘদিন এলাকায় গা ঢাকা দিয়েছিল। কেই রাজমিস্ত্রি, কেইবা লেপ – বালিশের কারিগর অথবা বিভিন্ন ধরনের হকার সেজে দিনের পর দিন গা ঢাকা দিয়ে তাদের গোপনে কার্যকলাপ এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। খুব সহজে কলকাতা, বর্ধমান ও হাওড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলিতে মানববোমা দিয়ে বিস্ফোরণের ছক কষছে। এখানেই চিন্তায় ফেলেছে পুলিশ গোয়েন্দাদের। জেলা ইন্টিলেজেন্স ব্রাঞ্চ সূত্রে খবর আরামবাগকে করিডর করে কেবল এ রাজ্যে নয়, ভিন রাজ্যেও বড়ো ধরনের হামলার ছক কষছে। এখানেই তৎপর হয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। সম্প্রতি,আলকায়দা জঙ্গি কাজী আহসানউল্লাকে গ্রেফতার করে এস টি এফ। বাড়ি আরামবাগের সামতা গ্রামে। লক্ষ্য ছিল কিশোর ও তরুণদের মগজ ধোলাই করে ‘মানববোমা’ বানানোর ছক।
আলকায়দা ইন ইণ্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট-এর সেই চক্রান্ত বানচাল করল রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স। গত শনিবারে মুম্বাই ও ডায়মণ্ডহারবার থেকে যে দুজন জঙ্গিকে গেফতার করেছে তারা হল সাদ্দাম হোসেন ও সমীর হোসেন। এদের দুজনেরই আরামবাগের সঙ্গে যোগ আছে বলে সন্দেহ করছে গোয়েন্দারা। নড়েচড়ে বসেছে গোয়েন্দারা। এখন নজর আরামবাগের উপর। এজন্য একটি বিশেষ দলও গঠন হয়েছে। যারা সর্বক্ষণ নজরদারি চালিয়ে যাবে। উল্লেখ্য, সংখ্যালঘু অধ্যূষিত এলাকায় লজ, হোটেল ও ভাড়াটিয়াদের উপর বিশেষ নজর রাখছে পুলিশ। ইতিমধ্যে আরামবাগে পুলিশ ঘোষণা করেছে যে কেউ ভাড়াটিয়া রাখলে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিচয়পত্র থানায় জমা দিতে হবে। বাড়ি, হোটেল ও লজ যেখানেই হোক না কেন তা থানায় মালিকদের যোগাযোগ করতে হবে। এমনকী কোনও সন্দেহভাজন কাউকে ঘোরাঘুরি করতে দেখলে তাও যেন থানায় জাননো হয়।
প্রসঙ্গত, আরামবাগের ছ’টি ব্লক মূলত গ্রাম্য প্রধান এলাকা। প্রায় অর্ধেক সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মানুষের বসবাস। বর্তমানে লোকসংখ্যা প্রায় পনেরো লক্ষের কাছাকাছি। চারটি থানা, দুটি ফাঁড়ি ও ছ’টি ক্যাম্প আছে। প্রধানত নদীবাহিত এলাকা হওয়ায় এক থানা থেকে আর এক থানার দূরত্ব কোনো কোনো জায়গায় ২৫ থেকে ৩০ কিমি.। সেখানে পুলিশ কর্মী ও গাড়ির সংখ্যা নগণ্য। ফলে এরকম একটি ভৌগোলিক অবস্থানে আরামবাগ হওয়ায় পুলিশের পক্ষে নজরদারি চালানাটাও মুশকিল হচ্ছে। দুষ্কৃতিরা যেমন সহজে গা ঢাকা দিচ্ছে, একইভাবে জঙ্গিরাও পাশের জেলা ও রাজ্য হয়ে জঙ্গলমহলে পালিয়ে যাচ্ছে। যা পুলিশের অধরা থেকেই যাচ্ছে। এখন পুলিশের মুখ্য মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান আলকায়দা ও জেএমবি জঙ্গিদের আরামবাগে ডেরা নিয়ে। তাই পুলিশ প্রশাসনও আঁটোসাটো করছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা।