আরামবাগ মহকুমার কথা এলেই সবার প্রথম উল্লেখ করতে হবে এখানকার ভূমিপুত্র রাজা রামমোহন রায়ের নাম। তাঁর হাত ধরেই উনবিংশ শতকের বাংলায় তথা ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে এখানকার সামাজিক সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব বৌদ্ধিক বিকাশ ঘটেছিল। ইতিহাসে যাকে নবজাগরণ আখ্যা দেওয়া হয়। সেই নবজাগরণের মূল মন্ত্র ছিল যুক্তিবাদ। আর এই যুক্তিবাদের একনিষ্ঠ সৈনিক রামমোহন তাঁর সমাজ সংস্কারের প্রথম লড়াইটা শুরু করেছিলেন পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে। অর্থাৎ মূর্তি পূজা চলবে না। এই নিয়েই স্থানীয় পণ্ডিত সমাজ এমনকি মা-বাবারও চোখের বালি হয়ে উঠেছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে রামমোহনের অনুসারী নবজাগরণের শামিল উচ্চশিক্ষিত বিজ্ঞানমনস্ক মধ্যবিত্ত যুব সমাজ তাই কিছুটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন প্রতিমা পুজো থেকে। কিন্তু তার প্রায় একশ বছর পরে স্বদেশী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সেই যুব সমাজই আবার নতুন করে অন্যরকম এক পুজোয় মেতে উঠেছিল। কার্যত এবার সমাজ সংস্কারেরই হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল এই সব পুজো। আরামবাগ মহকুমার বিভিন্ন প্রান্তে নতুন নতুন শারদোৎসবের সূচনা হয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের হাত ধরে। ভাবনার অভিনবত্বে সামাজিক অবদানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে সেই সব উদ্যোগ। তেমনি এক দুর্গা পুজার আশ্চর্য গল্প শোনাবো আপনাদের, যা গুরুত্বের দিক থেকে আরামবাগের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলা যায়।
১৯৪২ এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের তীব্রতা কিছুটা কমলে ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে গান্ধীজীর নির্দেশে বেশ কিছু গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করল স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। তার মধ্যে হরিজন আন্দোলন ছিল অন্যতম। তখন সমাজে খুব ছুতমার্গ ছিল। মুচি মেথর বর্গ ক্ষত্রিয় ইত্যাদি জাতির লোকেদের ছায়া পর্যন্ত মারাত না ব্রাহ্মণ কায়স্থ ইত্যাদিরা। জাতিপ্রথার এই দুর্লঙ্ঘ প্রাচীর ভেঙে সব মানুষকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেওয়াই ছিল হরিজন আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য। প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের আগ্রহে আরামবাগের হরাদিত্য এলাকায় তখন স্বদেশীদের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরি হয়েছিল। অহল্যাবাই রোডের ধারে ঘন-জঙ্গলে ঢাকা এই গ্রামে বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী আত্মগোপন করে থাকতেন। এখানকার হরাদিত্য পল্লী সংস্কার সমিতির উদ্যোগে শুরু হলো দুর্গাপুজো। মূল উদ্যোক্তা হলেন মহাদেব মুখার্জি, তাঁর সঙ্গে রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায়, সতীশ মল্লিক, দুলাল কুন্ডু, মেথর চন্দ্র পান, বিভূতিভূষণ রায়, সুকুমার সাঁতরা প্রমুখ। এরা প্রত্যেকেই সরাসরি স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই পুজো তো আর নিছকই প্রতিমা পুজো নয়, বরং দেশমাতৃকার পুজো। এর আসল উদ্দেশ্য হল সমাজ সংস্কার।
বিতর্ক শুরু হলো একেবারে প্রথম থেকেই। তখনকার প্রচলিত নিয়ম ছিল, ব্রাহ্মণদের বাড়ির ছেলেমেয়েরাই পুজোর ফুল তোলা থেকে শুরু করে সমস্ত রকম জোগাড় যন্ত্র করবে, এখানে অব্রাহ্মণদের ছোঁয়াছুঁয়ি চলতো না। আর তথাকথিত নিম্ন বর্ণের মানুষ যেমন চর্মকার, বর্গক্ষত্রিয়, তারা তো মন্দিরে উঠতেই পারত না। তারা দূর থেকে পুজো দেখতো। এই নিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হল তরুণ দল। তারা ঠিক করল, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবাই পুজোর জোগাড়ে অংশগ্রহণ করবে। খবর শুনেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো গ্রামের ব্রাহ্মণ সমাজ। এ কী অনাচার! তাদের কথায়, “অজাত কুজাতের লোকেরা নৈবেদ্য সাজালে তা দেবতাকে উৎসর্গ করা যাবে না।” পুজো করতে অস্বীকার করলো সবাই। শুধু এই গ্রামেই নয় আশেপাশের গ্রামে খোঁজ করে কোথাও এই পুজোর জন্য পূজারী পাওয়া গেল না। উদ্যোক্তাদের মাথায় হাত। তবে কি শুরুতেই ধাক্কা খাবে তাদের এই উদ্যোগ? খবর পেয়ে তাদের ডেকে পাঠালেন মানিকপাট গ্রামের অনুকূল চক্রবর্তী। তিনি একজন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন, বহুবার কারাবরণ করেছেন। হুগলি বিদ্যামন্দির থেকে প্রফুল্লচন্দ্র সেন আরামবাগে আসার একেবারে প্রথম দিন থেকেই তিনি তার সহায় হয়ে উঠেছিলেন। অনুকূল বাবু তাঁর ঘনিষ্ঠ আর এক স্বাধীনতা সংগ্রামী দিবাকর চক্রবর্তীকে রাজি করিয়ে এই পুজোর পৌরহিত করতে পাঠালেন। খবর শুনে রাজি হয়ে গেলেন তাঁর বাবাও। শালেপুর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে হরাদিত্য গ্রামে পুজো করতে আসছেন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী, এই খবর পেয়ে দলে দলে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা উপস্থিত হতে লাগলেন সেখানে। তাঁদের অনেকেই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে বারবার কারাবরণ করেছেন। তাই গ্রামের বিরোধী মানুষরা অবজ্ঞা করে সেই পুজোকে আখ্যা দিল, “জেল খাটাদের পুজো”। নিন্দে করে রটিয়ে দেওয়া এই নামটাই যেন রাজটিকা হয়ে উঠলো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কপালে। আনন্দে ভরে উঠল সারা গ্রাম। ঠিক যেন সত্যি সত্যি ঈশ্বরের বাগান। গ্রামের সমস্ত মানুষ জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে যোগ দিল এই আনন্দ অনুষ্ঠানে।
আরো একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটলো এই পুজোকে কেন্দ্র করে। তখন আরামবাগ মহকুমায় চুল দাড়ি কাটার অর্থাৎ সেলুনের দোকান ছিল না। লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চুল কাটবেন পরামানিকরা। এখানেও তীব্র জাতিপ্রথার প্রচলন ছিল। যারা নিম্ন বর্ণের বাড়িতে চুল কাটতেন তাদের প্রবেশাধিকার ছিল না উচ্চ বর্ণের বাড়িতে। হরাদিত্যর যুবসমাজ ঠিক করলো এর বিরুদ্ধে কিছু করার দরকার। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। পুজোর আগে এক লাইনে বসিয়ে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বর্গ ক্ষত্রিয়, চর্মকার, সবার চুল দাড়ি কাটার উদ্যোগ নেওয়া হল। পল্লী সংস্কার সমিতির পক্ষ থেকে বিভূতি পরামানিক (মাল) নামে এক ক্ষৌরকারকে ডাকা হল। তিনি পরপর সকলের চুল দাড়ি কেটে দিলেন। এদিকে তিনি যে উচ্চ বর্গের মানুষের চুল দাড়ি কাটতেন। তারা ব্রাহ্মনসমাজের নেতৃত্বে বয়কট করলো বিভূতি পরামানিককে।
পুজোর ঠিক আগে এই এই ঘটনায় মহাবিপদ দেশের উপস্থিত হল সেই ক্ষৌরকারের সামনে। তখন পল্লী সংস্কার সমিতির ছেলেদের মাথায় এক বুদ্ধি এলো। তারা একটি গাছ তলায় তাল পাতার ছাওয়া একটি ঘর, হাতল দেওয়া চেয়ার আর সুদৃশ্য একটি আয়না জোগাড় করে শহুরে কায়দায় একটি সেলুন তৈরি করে দিল। সেটাই আরামবাগ মহাকুমার প্রথম সেলুন। যেন এক বিপ্লব শুরু হয়ে গেল। দলে দলে ছেলেরা সেখানে চুল কাটতে লাইন দিল। এমনকি, গ্রামের পন্ডিত সমাজের বাধা অগ্রাহ্য করে তাদের পরিবারের ছেলেরাও সেই লাইনে এসে দাঁড়ালো। সেবারের পুজোয় সেটাই হয়ে উঠল ফ্যাশন। আবারো জয় হল পল্লী সংস্কার সমিতির, জয় হল মানবতার।
পেজফোরনিউজ ২০২৪ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত