ছিমছাম পরিবেশ। পকেট থেকে কলম পড়লেও শব্দ স্পষ্ট কানে আসবে। ভোক্তার আগমন খুব কম। যারা আসে তারা প্রায়ই আসে। বসে কিছু একটু খাওয়া আর কথা বলার জন্য এমন নিরিবিলি পরিবেশই দরকার। নিনন বেশ কিছুক্ষণ আগেই এসেছে। রুহিনীর আসার খোঁজ নেই। রুহিনীর সময়জ্ঞান সম্বন্ধে একটু জেনেই গেলো। কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিলে দেরি হওয়ার কথা না। যার তার উপর রাগ করা যায় না, তাই রাগ করা থেকে বিরত থাকলো নিনন।
একটু পরেই রুহিনী আসলো। আসলো, বসলো, হাসলো। দেখে নিনন ভাবলো, অনুতাপবোধ নেই ভেতরে। দেরি করার জন্য সরি শব্দটিও উচ্চারণ করলো না। সৌজন্যতাবোধের অভাব লক্ষণীয়।
রুহিনী বিনাসঙ্কোচে বললো, চিনে আসতে কষ্ট হয়নি তো? আমি অবশ্য প্রায়ই আসি।
নিনন না শব্দ উচ্চারণ করলো আর ভাবলো, এমন দামি রেস্তোরেন্টে প্রায়ই আসে? বন্ধু-বান্ধবরা মিলে তবে ভালোই আড্ডা চলে। এমন বাউণ্ডুলিপনা মেয়ে নিয়ে ঘর-সংসার করা যাবে না।
মেনুকার্ডটা রুহিনীর হাতে দিয়ে নিনন বললো, কি খাবেন?
রুহিনী কয়েক সেকেন্ডে মেনুকার্ডটা দেখে নিয়ে বললো, এটা নতুন। এটা অর্ডার করেন।
অর্ডার প্রেরিত হলো। নিনন নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন করতে থাকে, মেনুকার্ডটা পড়ে আমি কিছুই বুঝি না, সেখানে রুহিনীর মেনুকার্ডের সব মেনু ইতিপূর্বে খাওয়া শেষ? এসব অভিজাত রেস্তোরেন্টে যার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস, আসা যাওয়ার অভ্যাস আমার ছোট্ট জগতে সে কি করে সংসার পাতবে? আমি তো সেই ঘরণী চাই যে পাশের ক্ষেত থেকে শাক কুড়িয়ে এনে রান্না করে আমায় খাওয়াবে!
তারপর মুখে উচ্চারণ করে বললো, গতকাল আপনাকে মেসেজ দিয়েছিলাম, আপনি দেড় ঘণ্টা পরে সিন করেছেন। সিন করলেও উত্তর দেননি।
রুহিনী নির্বিকার চিত্তে বললো, ব্যস্ত ছিলাম।
নিনন শুনলো কিন্তু উত্তরে সন্তুষ্ট হলো না, তবে তা প্রকাশ করলো না। শুধু ভাবলো, কি এমন ব্যস্ততা যে, যার সাথে আপনার বিয়ের কথা চলছে তার মেসেজ সিন করার সময় থাকে না, তার প্রশ্নের উত্তর করার সময় থাকে না?
রুহিনী তীর্যক চোখে চেয়ে বললো, গত বছর আপনার এক সহকর্মীকে নিয়ে আমাকে আমার বাসায় দেখতে গিয়েছিলেন। এক বছর পর আবার কেন আমার বিষয়ে আগ্রহী হলেন?
প্রশ্নটা শুনে নিনন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। তাৎক্ষণিক বুদ্ধিতে উত্তর দিলো, সেদিন জেনেছিলাম আপনি চারুকলাতে পড়েন।
রুহিনী সবেগে প্রশ্ন ছুঁড়লো, চারুকলাতে পড়া দোষ? কোন বিষয়ে পড়ে সেই বিষয় বিবেচনা করে মানুষকে বিচার করা ঠিক?
নিনন বললো, না, না, সেটা আমার ভুল ছিল।
রুহিনী তা শুনে বললো, গেলেন, দেখলেন, অপছন্দ করে চলে আসলেন। জানলেন না, বুঝলেন না। আপনি কি জানেন যে মেয়েকে দেখতে যাওয়া হয় তার এবং তার পরিবার কত আশা নিয়ে থাকে? আপনার কোন দোষ নেই, কিন্তু আপনাকে কেউ অপছন্দ করে চলে গেলো। আপনার কেমন লাগবে?
নিনন এমন প্রশ্ন শুনে অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। নীরব পরিবেশটা আরো একটু নীরব হয়ে গেলো। নিনন সরকারি চাকরি করে। ভেতরে একটু অহমিকা আছে, রুহিনীর প্রশ্নে দমে যাওয়ার জন্য আসেনি ও। এবার নিজের পছন্দের মেনু অর্ডার করলো। দীর্ঘক্ষণ রেস্তোরেন্টে বসে বসে কথা বললে কর্তৃপক্ষ কিছু মনে করতে পারেন। আর এজন্য কিছুক্ষণ পরপর কিছু একটা অর্ডার করা যুক্তিযুক্ত। রুহিনী কৌণিক চোখে খাবারের দিকে চাইলো। নিনন বললো, বিয়ের পরপরই সংসারে ঢুকতে হবে। ঢাকা থেকে তো পড়াশোনা করা যাবে না।
রুহিনী চ্বকিত চেয়ে বললো, আমি পড়াশোনা বাদ দিয়ে কেন সংসারে যাবো? আপনি পড়াশোনা করেছেন, চাকরি করছেন, আমার স্বপ্নে আঘাত হানার শখ কেন?
নিনন প্রতিউত্তরে বললো, পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পেতে পেতে বেশ দেরিই হয়ে গেছে। চাকরি পাওয়ার পর ঘর-বাড়ি করতে, পাশাপাশি কিছু সঞ্চয় করতে আরো সময় গেছে। দ্রুত সংসারে প্রবেশ, দ্রুত বাচ্চা গ্রহণ এগুলো অনিবার্য আমার জন্য। আপনার পড়াশোনাতে ব্যাঘাত ঘটানো আমার উদ্দেশ্য নয়-ই।
রুহিনী মাথা ঝাঁকিয়ে নিয়ে বললো, আপনার অনেক ইচ্ছা থাকতেই পারে আপনার বাস্তবতায়। আপনার ইচ্ছা অন্য কেন মানবে? আপনার ইচ্ছার কারণে অন্যের অনেক ইচ্ছার মৃত্য হতে পারে। আর এসব জেনে বুঝে কেউ কেন আপনার হাত ধরবে?
নিনন বিব্রতবোধ করে বললো, বিয়ের পর দুজনের ইচ্ছা এক স্রোতেই বয়। কেউ কারো ক্ষতির জন্য এক ছাদের নিচে বসবাস শুরু করে না। দুজনেরই কিছু না কিছু স্বপ্নের বিসর্জন দিতে হয় দুজনের মঙ্গলের জন্য।
রুহিনী উত্তর শুনে বললো, আমার জন্য এমন কি বিসর্জন দিবেন যা আমার মঙ্গলের কারণ হবে?
নিনন বললো, নিজেকে গড়েছি সুখের জন্য। রোজগার করি সুখের জন্য। আমার সুখের অংশীদার হবেন আপনি। অভাব-অনটন থেকে অনেকটা দূরেই থাকবেন। নিজেকে গড়তে, রোজগার করতে পুরুষের কষ্ট অনেক বেশি। সংসারে পুরুষের ত্যাগ, বিসর্জন কেউ বোঝেও না, কেউ দেখেও না।
রুহিনী বুঝে নিলো নিননের ভেতরের সবটুকু। কিন্তু সেসব প্রকাশ করলো না।
আধিপত্য বিস্তারের যে মন-মানসিকতা নিননের ভেতর প্রবল তা বুঝতে বাকি থাকলো না রুহিনীর। রুহিনী মুখ নিচু করে থাকলো। নিনন কথা বলার বিষয় পরিবর্তনের চেষ্টা করলো, বললো, আপনি দেখতে সুন্দর।
রুহিনীর ঠোঁটের কোণে একটু হেসে বললো, সৌন্দর্য দেখার না, সৌন্দর্য উপলব্ধির বিষয় ।
এবার নিনন হাসলো আর বললো, সৌন্দর্য অবলোকন করে বিদগ্ধ হয়েই বলছি, আপনি সুন্দর।
রুহিনী বললো, আমার বন্ধুরা বলে যে আমার হাত দুটো বড্ড চিকন। মুখের থেকে কালো। পায়ে লম্বা লোমশ কারোরই তা পছন্দ না।
নিনন আশ্চর্য হয়ে বললো, বন্ধুরা অবয়বেই সৌন্দর্য খোঁজে। আপনাকে প্রকৃত অর্থেই যে গ্রহণের উদ্দেশ্যে আসবে সে মনের সৌন্দর্য খুঁজবে।
রুহিনী আবারও একটু হাসলো। বৈজ্ঞানিক চোখে সে হাসি পরখ করলো নিনন। তারপর বললো, আপনার হাসিও ভালো। এমন একটা হাসিমুখ আমি হারাতে চাই না।
রুহিনী শুনামাত্রই হাসি থামিয়ে নিলো। তারপর বললো, মনে হাসি থাকবে না, মনে আনন্দ না থাকলে। মন থেকে না হাসতে পারলে মুখের হাসি সুন্দর থাকবে না। হাসতে জানা মানুষগুলোও মলিন হয়ে যাবে প্রতিষ্ঠা না পেলে।
নিনন বললো, আপনি অন্যমনস্ক হয়ে কথা না বলে আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। আপনার হাসি মুখে হাসি রাখার ভার আমাকে দিন।
রুহিনী কিঞ্চিৎ ভ্রূ কুঁচকে বললো, সংসার করা সুখের জন্য। সুখের জন্য দুটি সমমনস্ক মানুষের দরকার। বিপরীত ধ্যান-ধারণার মানুষের সাথে সাময়িক সময় তর্ক করা যায়, সংসার সাগর পাড়ি দেয়া যায় না।
নিননের রাগ চাপলো, কিন্তু নিজেকে সংযত করলো। তারপর বললো, আপনি বাচ্চা মানুষ। বাস্তবতা জানেন না। বন্ধু সার্কেলে থাকেন। রঙিন মন। উড়ন্তপনা করে বেড়ান। সুখী হওয়ার জন্য যে সঙ্গী কল্পনাতে সাজান, বাস্তবে সেই সঙ্গী অনুপযুক্ত।
রুহিনী সশব্দে বলতে চাইলো। কিন্তু পরিবেশের যে গাম্ভীর্যতা তা তাকে বাধা দিলো। ধীরলয়ে বললো, আমি আপনার কোন দোষ খুঁজিনি, কিন্তু তার মানে এই না আপনার দোষ আমার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে! আমি কিছুই বলতে চাই না সে বিষয়ে। আপনার মানসিকতার সাথে আমার মানসিকতা যাচ্ছে না, এটা বড় পরিতাপের।
নিনন বললো, তবে এখানে আসার পূর্বে বলেননি কেন? বেকারদের মত আমার সময়ের দাম নিতান্ত নয়।
রুহিনী বললো, কর্ম না থাকলে ক্ষণিক বাদে বাদে এমন হেয় কথা শুনতে হয়। কর্ম থাকলে কেউ কথা বলার সাহস পায় না। আমার প্রতিষ্ঠা দরকার, আত্ম-প্রতিষ্ঠা, অর্থ-প্রতিষ্ঠা।
নিনন উঠে দাঁড়ালো আর বললো, এ সংসারে অজস্র নজির আছে সন্তান মানুষের জন্য মা চাকরি ছেড়েছে। সংসারে নারীর ভূমিকা অনেক। কাউকে হেয় করা আমার আদর্শ না। কারো উপর আধিপত্য বিস্তার আমার আদর্শ না। আমার ঘরণী চাকরি করবে না, চাকুরীজীবীর চেয়ে আমার সংসারে সে সম্মান ও অর্থ কম পাবে না।
নিনন চলে যাচ্ছে, আবার একটু ফিরে এসে বললো, চলুন, আপনাকে বাসায় পৌঁছে দেই।
রুহিনী অনিচ্ছা প্রকাশ করলো। নিনন বললো, আপনার আন্তরিকতার অনেক অভাব। এই মানসিকতায় আমাকে না, কাউকেই পাবেন না।
রুহিনী প্রতিউত্তর না করে চুপ থাকলো। নিনন যেতে যেতে আবার ফিরে এসে বললো, রুহিনী, আপনাকে আমার ভালো লেগেছে। এই ভালো লাগাটা অনেক দিন মনে থাকবে।
নিনন বাসায় এলো। বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন দেখলি?
নিনন রাগতস্বরে বললো, দেখতে ভালো না। হাত দুটো চিকন। হাতে পায়ে বড় বড় লোমশ। কথায় কথায় জিহ্বা কাটে। উড়না গলায় ঝোলে। পুরুষালী কণ্ঠ।
নিনন দ্রুতপদে হেটে ঘরে চলে গেলো। বাবা আবারও চিন্তিত হলেন, ছেলের বিয়ে দেয়াটা তাঁর জন্য অনিবার্য। কিন্তু কোনভাবেই তা হয়ে উঠছে না।
ওদিকে রুহিনী বাড়ি যেতেই তার মা বললেন, ছেলেটা কেমন?
রুহিনী বললো, ভালো। স্মার্ট। রুচিশীল। আন্তরিক। আমার জন্য আগ্রহটা ভালোই মনে হলো।
মা বললেন, তোর বাবাকে তবে যোগাযোগ করতে বলি?
রুহিনী বললো, সংসারে প্রবেশ মানেই বাচ্চা নেয়া, চাকরি করতে না দেয়া বিষয় দুটি অন্য সব গুণগুলোকে ম্লান করে দিয়েছে। তাছাড়া তাঁর বয়সও অনেক।
রুহিনী নিজ ঘরে চলে গেলো। আজকের আড়াই ঘণ্টা আলাপ তার মনে শুধুই বাজছে। কেউ একজন আজ তার হাসির প্রশংসা করেছে ভাবতেই ওর ভালো লাগছে। কেউ একজন তার রূপের প্রশংসা করেছে যা তাকে ভালোলাগার আবেশ দিয়ে যাচ্ছে। কেউ একজন বলেছে তাকে ভালো লেগেছে যা তার মনে আনন্দদায়ক অনুভূতি দিচ্ছে। এ কাত ও কাত করছে ও, স্বস্তি পাচ্ছে না। ফোন দিলো নিননকে, বললো, ঠিক মত পৌঁছেছেন?
নিনন বললো, হ্যাঁ, পৌঁছেছি। বাবা মাকে বলেছি আপনি দেখতে মন্দ। বলার সময় গলা কাঁপছিলো। বলেছি, আপনার ভেতর পুরুষালী ভাব আছে।
রুহিনী হতবাক হয়ে বললো, কেন বলেছেন? কারো অনুপস্থিতিতে তার প্রশংসা করতে হয়, নিন্দা না।
নিনন বললো, আপনি তো আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কথা তো বলা যায় না। তাই আপনার নিন্দা করে এ যাত্রায় বাবা মাকে বোঝালাম।
রুহিনী বললো, বাড়ি আসার পর থেকে আপনার কথা মনে পড়ছে। আজকের আড়াই ঘণ্টা হৃদয়ে দাগ কেটে থাকবে।
নিনন দীর্ঘশ্বাস কেটে বললো, চাকরি পাওয়ার আগে থেকে, চাকরি পাওয়ার পরও অনেক মেয়ে দেখেছি। নানা কারণে রিজেক্ট হয়েছি। প্রথম প্রথম আমারও খুব খারাপ লাগতো প্রত্যাখ্যাত হলে। অনেক আশা নিয়েই দেখা করতে যাই, দেখতে যাই, হয়ত তাঁরা ছোট্ট কোন কারণে না বলে দেন। কতটুকু গুরুত্ব দিয়ে চাই, কেউ কোনদিন সেটা উপলব্ধি করেনি। ভালো থাকবেন, অনেক ভালো।
দুটি মনের জন্য দুটি মনেই কাতরতা জন্মালেও দুটি মনের ভিন্ন কিছু আশাতে অমিল থাকাতে আড়াই ঘণ্টার আলাপে সৃষ্ট বন্ধন বাস্তবতার আলো পেলো না।
গদখালী, ঝিকরগাছা, যশোর, বাংলাদেশ থেকে।