কান্দিরপাড় টাউন হলের সামনে জড়ো হয়ে আছে জনা ত্রিশেক গা-খাটা শ্রমিক। তাদের মধ্যে জজু একজন। সে আজ বারো তেরো দিন হলো শহরে এসেছে। বাড়ি, জেলার উত্তরে একটি অজপাড়া গ্রামে। তার পরিবারে বউ আর তিনটি সন্তান। তার উপর বড় মেয়ে সোমত্ত। পেটের দায়ে তাকে শহরে চলে আসতে হয়েছে। গ্রামে কৃষিকাজের আকাল তাই গ্রামের অধিকাংশ দিনমজুরেরাই বিভিন্ন শহরে চলে গেছে গা-খাটতে। কুমিল্লায় এসেছে সে শাহাদতের সাথে। শাহাদত আগে থেকেই কুমিল্লায় গা-খাটা শ্রমিকের কাজ করে। সে গ্রামে গিয়ে দেখেছে জজুর দুরাবস্থা তাই সে জজুকে সাথে নিয়ে এসেছে। রোজ সকালে সূর্য উঠার আগে তারা মাটিকাটার ঝুড়ি আর কোদাল নিয়ে কান্দির পাড়ে এসে জমা হয়। খদ্দেররা দরদাম করে তাদের নিয়ে যায়।
জজু মিয়া নিজের পকেট থেকে একটি বিড়ি বের করে জ্বালায়। আরেকটি বিড়ি সে সাধে শাহাদতকে। শাহাদত জজু মিয়ার হাত থেকে বিড়ি ও দেশলাই নিয়ে জ্বালায়। সকাল, এখনো আলো ফোটেনি। খদ্দের তেমন কেউ আসেনি এখনও। শাহাদতের কাঁধে হাত রাখে জজু মিয়া। বলে, ‘খুব ঠান্ডা পড়ছেরে শাহাদত। মাফলারেও কাম অয় না।’ শাহাদত কোনো কথা বলে না। ঠান্ডা মাথায় বিড়িতে টান দেয়। আঙুলে হালকা টোকা দিয়ে বিড়ির ছাঁই ফেলে। জজু মিয়া আবারও বলে, ‘শাহাদত, আউজগা যুদি ডেইনের কাম পড়ে তইলে করতাম না। যেই ঠান্ডা আউজগা, শইল জইম্মা যাইবো।’ শাহাদত জানে তাদেরকে আজকেও ড্রেনের কাজেই হয়তো যেতে হবে। তাই সে চুপ থাকে।
পুবালী চত্তরে এরা জনা ত্রিশেক মানুষ ছাড়া আর কোনো মানুষ নেই। টাউনহলের গেটে একটা চা দোকান আছে। সারারাত থাকে। সকাল সাতটা আটটার দিকে চলে যায়। জজু দু-একদিন চা খেয়েছে এই দোকানে। দোকান চালায় সন্তুষ। বয়স চল্লিশের উপরে। তবুও তার চালচলনে, কথাবার্তায় কেমন তাগড়া তাগড়া ভাব, আধিপত্য আধিপত্য ভাব। জজু আলাপ জমানোর চেষ্টা করে সন্তুষের সাথে। সন্তুষ প্রথম প্রথম পাত্তা দিত না জজুকে। এখন অবশ্য দু-একটি কথা মুখ ফুটে বলে। জজু এতেই গর্ব বোধ করে। সন্তুষ এখানে তিন বছর যাবৎ দোকানদারি করছে। কান্দির পাড়ের মাস্তান-গুন্ডা-ভালোমানুষ তার চেনা। তার সাথে ভাব জমাতে পারলে কোনো একটা সুবিধা করা যাবে, এমনটা ধারণা জজুর।
শাহাদত অবশ্য জজুকে সতর্ক করে দিয়েছে, ‘নতুন শ’র আইছো ভাই। হগলতের লগে বালা ব্যবহার কইরো। কিন্তুক কেউইর লগে খাতির করতা যাইয়ো না। শ’র বালা-মন্দ হগল রহমের মানুষই আছে। কেডা যে কি মতলব লইয়া ঘুরে, কওন যায় না। এই শ’র কিন্তুক ধান্ধাবাজের অভাব নাই।’ জজু শাহাদতের কথায় হাসে, বলে, ‘চিন্তা কইরো না শাহাদত ভাই, আমি কুনু কিচ্চু তুমারে না কইয়া করতাম না।’ এমনটি বললেও সে গত কিছুদিন যাবৎ একটি কাজ শাহাদতের অমতে করে আসছে। সকালে এসে সে সন্তুষের দোকানে তিন চার কাপ চা খায়। খরিদ্দার আসার আগ পর্যন্ত তিনচার বার সে সন্তুষের দোকানে যায়। চা খায়, মাঝে মাঝে পান খায়। সন্তুষের সাথে কি যেনো বলে। অনেক সময় খদ্দের এলে শাহাদত তাকে ডাকে। জজু সন্তুষের চা-পানের দাম চুকিয়ে দৌড়ে যায়।
শাহাদত জজু মিয়াকে বুঝিয়েছে, ‘ভাই, গরীব মানুষ, গতর খাডনের লাইগ্যা আইছো। এত চা বিড়ি খাও কেরে?’ জজু হেসে জবাব দিয়েছে, ‘যেই ঠান্ডারে শাহাদত! চা না খাইলে শইল জইম্মা যাইবো।’ শাহাদত জজুর একবছরের ছোট। গ্রাম সম্পর্কে তারা ভাই ভাই। জজু শাহাদতকে কখনো তুমি, কখনো তুই করে ডাকে। শাহাদত জজুকে তুমি সম্বোধন করে।
জজু সন্তুষের দোকানে ঘন ঘন যাওয়ার পেছনের কারনটি উর্মিলা। জজুরা সকালে যখন আসে তখন উর্মিলা সন্তুষের দোকানের সামনে তার বাঁধা রিক্সা দাঁড় করিয়ে চা খায়। রিক্সার ড্রাইভারও চা খায়। ড্রাইভার উর্মিলাকে বেয়াইন বলে সম্বোধন করে। উর্মিলা হেসে হেসে কথা কয়। সন্তুষও হাসি হাসি মুখে চায়ের কাপ তুলে দেয় উর্মিলার হাতে। কাপ দেয়ার সময় ইচ্ছে করেই ছুঁয়ে দেয় উর্মিলার হাত। উর্মিলা মৃদু স্বরে বলে, ‘বদমাইশ।’ সন্তুষ হাসে।
আজও উর্মিলা এসেছে। সন্তুষ মিষ্টি জর্দা দিয়ে পান বানিয়ে তুলে দিচ্ছে উর্মিলার হাতে। জজু মিয়া আড় চোখে দেখে। শাহাদতকে বলে, ‘দ্যাহো না, কেমুন ঢং করে।’ শাহাদত বলে, ‘হেই ফাইল চউখ দিয়ো না জজু ভাই, তইলে বাড়িত হগলতে না খাইয়া মরবো। জজু নিজেকে লুকায়, ‘ধুর, আমি কি হেইফাইল চউখ দিছি? এমনিই চউখ পড়ছে আতকা।’ জজু শাহাদতের কাছে নিজেকে লুকায় ঠিকই কিন্তু নিজের কাছে লুকাতে পারে না। তার চোখ চলে যায় আবার উর্মিলার দিকে। সে শাহাদতকে বলে, ‘আহ্, গলাডা হুগাই গেছে ভাই, যাই এককাপ চা খাইয়া আই। তুমি কি যাইবা শাহাদত ভাই? শাহাদত ডানে বামে মাথা নাড়ে। জজু সন্তুষের দোকানের দিকে এগিয়ে যায়। সে যেতে যেতেই উর্মিলা রিক্সায় উটে পড়ে। টুং টুং বেল বাজিয়ে রিক্সা চলে যায় জজু মিয়ার চোখের সামনে দিয়ে।
জজু সন্তুষকে চা দিতে বলে। তারপর বলে, ‘আফনেও এক কাপ চা খান, দাদা। ট্যাহা আমিই দিয়াম। সন্তুষ বলে, ‘চা খাইতে অইব না। আমি একটা পাইলট সিগারেট খাই। তুই পাঁচ টেকা বেশি দিয়া দিস।’ জজু খুশি হয়। সন্তুষকে সে এর আগেও চা সিগারেট খাওয়াতে চেয়েছে। কিন্তু সন্তুষ খায়নি। চায়ে চুমুক দিতে দিতে জজু সন্তুষের কাছে এসে দাঁড়ায়। সকালের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। সন্তুষের ভ্রাম্যমান চায়ের দোকানে এক দুজন মানুষ। জজু বলে, ‘দাদা, একটা কথা কইতা চাইছিলাম।’ সন্তুষ কিছুটা উৎসুক মুখে জবাব দেয়, ‘ক।’ জজু কাচুমাচু করে, তারপর বলে, ‘হুর পরিডা কেডা?’ কঠিন হয়ে যেতে যেতে সন্তুষের মুখে হাসি ফুটে উঠে। বলে, ‘তোর লাগবো?”
২.
কোমর সমান নর্দমার জলে কাজ করছে জজু আর শাহাদত। সকালে সিটি কর্পোরেশনের লোক এসে তাদেরকে কিনে নিয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব লোক আছে। তবুও কোনো কারনে অতিরিক্ত লোক লাগলে সকালে এসে কান্দিরপাড় থেকে লোক নিয়ে যায়। তারা কাজ করছে পূর্ব রেসকোর্স, ডিসি রোডে। শহরের পয়নিস্কাশনের এটি একটি প্রধান নালা। কালো ঘন পানিতে ময়লাম পরিমান এতোটাই যে সেটিকে আর জলীয় বলে ভাবা যাচ্ছে না। উৎকট গন্ধ। মশাদের রাজ্য হয়ে আছে নালাটি। কর্পোরেশন থেকে তাদেরকে নালা পরিষ্কারের সরঞ্জামাদি দেয়া হয়েছে। কাজ শেষে তারা আবার এসব জমা দিয়ে যাবে সিটি কর্পোরেশনে।
মশাদের সাথে সাথে মাছিদের উৎপাতেরও ক্ষান্তি নেই। জজুর কানের চারপাশ দিয়ে ভনভন করে ঘুরছে মাছি। নাকে মুখে এসে বসছে। জজুর কেমন ঘিন ঘিন করছে শরীর। একটি মাছি তার চোখের পাতার উপর বসে। হাত তুলে তাড়াতে যায় মাছিটিকে। মাছিটি আবার তার অপর চোখের পাঁপড়িতে বসে। এমন সময় তার পিঠে যেনো একসাথে হুল ফুটায় পাঁচ সাতটা মশা। জজু খেকিয়ে উঠে, ‘হালার মুশা মাছির জ্বালায় অক্করে শেষ।’ তারপর মাথায় বাঁধা পাগরির খুট থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করে। খচ করে একটি বিড়ি জ্বালায়। শাহাদতও সাথে কাজ করছে। সে তেমন ধুমপান করে না কাজের সময়। তবুও জজু মিয়া শাহাদতকে বিড়ি সাধে। শাহাদত মাথা নেড়ে না করে।
বিড়ি টানতে টানতে জজু মিয়ার মনে পড়ে উর্মিলার কথা। সন্তুষ তাকে বলেছে আজ রাত দশটার দিকে দেখা করতে। উর্মিলাকে ব্যবস্থা করে দিবে। জজু উচ্ছসিত হয়েছে। সে টাকার কথা জিজ্ঞেস করেছে। সন্তুষ বলেছে, ‘পাঁচশো টেকা লাগবো। থাকলে অহনই দিয়া যাও।’ জজুর কাছে এতো টাকা তখন ছিলো না। ট্যাঁকে দুইশোর মতো টাকা ছিলো। তাই সে সন্তুষের কাছে দিয়ে এসেছে। নর্দমা পরিষ্কার করতে করতে একবার উর্মিলার চেহারাটা চোখে ভাসায় জজু। পান খাওয়া লাল ঠোঁটগুলো কমনীয় হয়ে ফুটে উঠে তার মানস আয়নায়। জজু মনে মনে হাসে, ‘আইজ অইব।’
দিনের শেষে ক্লান্তদেহে বাসায় আসে শাহাদত আর জজু। ধর্মপুর পশ্চিম চৌমুহনীতে একটি রুম ভাড়া করে তারা আটজন থাকে। বাইরে ইট দিয়ে চুলা বানিয়ে সকলের একসাথে রান্না হয়। তারা নিজেরাই রান্না বান্না করে। একদিন একেকজনের উপর পরে রান্নার দায়িত্ব। আজ জজুর উপর রান্নার দায়িত্ব নেই। সে অনেক্ষণ ধরে গোসল সারে। গায়ে ঘসে ঘসে লাইফবয় সাবানটার ফেনা তোলে। কালো চকচকে দেহ থেকে খড়ি উঠে। লুঙ্গির নিচের মাথাটা উল্টিয়ে সে নুয়ে নুয়ে শরীর মাজে। মাজতে মাজতে তার উর্মিলার কথা মনে হয়। আজ উর্মিলাকে সে পাবে। সন্তুষ কথা দিয়েছে তাকে। রাত দশটার সময় যাবে সে।
রাত দশটা যেনো আর বাজতেই চায় না। জজু সাড়ে নয়টার দিকে ঘর থেকে বের হয়। চৌমুহনী থেকে ব্যাটারি চালিত অটো রিক্সায় উঠে। কান্দিরপাড় নেমে সে কেমন ভরকে যায়। শহরে নতুন এসেছে। যতটুকুই বাইরে বেরিয়েছে তা শাহাদতের সাথেই। আজই সে প্রথম একা একা রাতের বেলা কান্দিরপাড় এসেছে। তার ভয় ভয় লাগে। পুবালী চত্তর পাড় হয়ে সে টাউনহলের গেটে যায়। সন্তুষ তার দোকান সাজিয়ে বসে আছে। দোকানে লোকজন প্রচুর। সন্তুষের সাথে আরও একজন চা বানাচ্ছে। সন্তুষ গুনে গুনে টাকাগুলো কাঠের চিটচিটে বাক্সটাতে রাখে।
জজু গিয়ে কাছে দাঁড়ায়। গলা খাকাড়ি দেয়। সন্তুষ তাকে বলে পরে আসতে। জজু আশ্চর্য হয়। পরে মানে? তাহলে কি সন্তুষ তার দুইশ টাকা মেরে দিবে? জজু যায় না। ঘুরঘুর করে। সন্তুষ জজুকে ডেকে কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলে, ‘দেখোস না, কতো লোকজন? একটু পরে আইবো। ঘন্টাখানেক পরে।’
জজুর ঘন্টাখানেক আর কাটে না। অবশেষে রাত বারোটার দিকে তার স্বপ্নের হুরপরী এসে নামে রিক্সা থেকে। সন্তুষ জজুর কাছ থেকে আগেই বাকি তিনশো টাকা নিয়ে নিয়েছে। সে উর্মিলাকে পাশে ডাকে। কি যেনো বলে অনেক্ষণ ধরে। জজুর আর অপেক্ষা সইছে না। সে গলা খাকাড়ি দেয়, ডাকে, ‘ও দাদা!’ সন্তুষ ধমকে উঠে, ‘দাঁড়া।’ অবশেষে জজু উর্মিলার সাথে রিক্সায় উঠে। তারা কোথায় যাচ্ছে জজু মিয়া তা জানে না। শুধু জানে সে উর্মিলার সাথে যাচ্ছে। আকাশে তখন একটা ফ্যাকাসে আলো। সে আলোতে একজন গা-খাটা শ্রমিক নেশাভরা মোহের চোখে তাকায় আরেকজন গা-খাটা শ্রমিকের লাবণ্য-লোভন দেহের দিকে।
লেখক : মো. আরিফুল হাসান, প্রভাষক বাংলা, বরকোটা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দাউদকান্দি, কুমিল্লা, বাংলাদেশ