শেষ রাত্রে বাড়ি ফেরার পর পঙ্গু স্বামীটার সঙ্গে রোজ গন্ডগোল লাগে নিশির। গন্ডগোলের বিষয় নেহাৎই সাধারণ নয় বলে সে এই মানুষটাকে সহজে এড়িয়ে যেতে পারে না। নিশির ঠুঁটো স্বামীর মানসম্মান আর সামাজিক অবস্থানও এর সঙ্গে জড়িত, এমনটাই তিনি বর্ণনা করে থাকেন। কিন্তু নিশির মতে কোনো কাজই ছোট নয়। রোজকার মতোন আজও গভীর রাতে নিশি ঘরের চৌকাঠে পা রাখতেই অবশ্যম্ভাবী তর্কযুদ্ধের আবেশে তার দেহমন তিক্ত হয়ে এলো। হ্যাঁ, সে যেমনটা ভেবেছিল! লোকটা আজও জেগে আছে। দরজা খোলার শব্দ পাওয়ামাত্র নাকের ডগায় চশমা ঠেসে হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে সে আগেভাগেই রণে ভঙ্গ দিয়েছে।
— এসেছ? আমি তো ভাবলাম আজ আর আসবেই না।
আশরাফের কথার অন্তর্নিহিত শ্লেষ নিশির গায়ে যেন অগ্নিসংযোগ করে। কড়া কোনো উত্তর দিতে গিয়েও সে চুপ করে যায়। একটু পর শীতল কণ্ঠে আশরাফকে শুধোয়,
— খেয়েছ?
— ননাহ্,তোমার বুয়ার রান্না আমি খাই না এটা নিশ্চয় জানো। রোজ রোজ একই প্রশ্ন না করলেই পার।
নিশি তাও কড়া কোনো উত্তর দেয় না। একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে নিজের কক্ষে গিয়ে চটপট নিজের আধুনিক সাজসজ্জা ত্যাগ করে। এরপর লম্বা একটা সাওয়ার নিয়ে গায়ে গলিয়ে দেয় দীর্ঘায়ত রাত্রিপোশাক। এই রাত্রিপোশাকে নিশির সৌন্দর্য যেন দ্বিগুণ বর্ধিত হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন হলো আশরাফকে এই সৌন্দর্য আর বিমোহিত করে না। বদলে একধরনের অন্তরিত বিসদৃশ তিক্ততা তার ভেতরে দানা বাঁধতে থাকে। কেন এই তিক্ততা? বউয়ের কামাই গলাধঃকরণ করে বলে? নাকি বউয়ের কামাইয়ের উৎসটা গায়ে হূলবিদ্ধ করে বলে?
— আমি বাইরে থেকে কিছু খাবার এনেছি। খেয়ে ঔষধ খেয়ে নাও৷ আশিক কি খেয়ে ঘুমিয়েছে?
বিছানায় ঘুমন্ত ছেলেটার গায়ে আলতো হাত বোলাতে বোলাতে শেষ কথাটা শুধায় নিশি।
আশিক হলো নিশি আর আশরাফের একমাত্র ছেলে। বয়স চার। শ্যাম গায়ের রং। চ্যালাকাঠের মতোন রুগ্ন শরীর। অবিকল বাবার মতো চোয়াল-উঠা ভাঙা ভাঙা চেহারা।
— হ্যাঁ খেয়েই ঘুমিয়েছে।
আশরাফের কণ্ঠস্বর থমথমে। নিশি বুঝল, আশরাফ কোনো কিছু বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও বা সে বিলক্ষণ জানে আশরাফ কী বলতে চলেছে তথাপি সে নির্বিকারে প্রমাদ গুণে। একসময় আশরাফ মেঘমন্দ্র গলায় বলে উঠে,
— দেখো নিশি, আমি আর পারছি না। লোকে নানান কথা বলছে। তুমি তো ঘরে থাকো না, শুনোও না কিছু। সব আমাকেই শুনতে হয়। আমি চাই, তুমি এসব থার্ডক্লাস কাজ থেকে সরে যাও। বিয়েবাড়িতে গিয়ে…একটু ঢোক গিলে আশরাফ, ‘বিয়েবাড়িতে গিয়ে নেচে-গেয়ে মানুষকে আমোদিত করা কোনো ভদ্রঘরের মেয়ের পক্ষে সাজে না। এগুলা তারাই করে যাদের কোনো ঘরসংসার, পরিবার পরিজন নেই। তোমার সবই আছে, তুমি কেন এসব করবে?
— হ্যাঁ থেকেই তো যত মুশকিল হয়েছে, নিশি চটে উঠে অকস্মাৎ, এতই যখন সবকিছু বুঝ তাহলে নিজে কিছু করো না কেন? বউকে কেন বাইরে পাঠাও রোজগার করতে? বই পড়তে পড়তে চোখ খেয়েছ, এখন তো দেখি মাথাটাও খেয়েছ।
— নিশি!
‘দেখো আশরাফ, তুমি যা ভাবছ সেটা নয়। আমি একটা ব্যান্ড দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। আমরা শুধু বিয়েবাড়িতে গান করি না। বিভিন্ন ফাংশনে গান করি। আর সেখান থেকে যা পাই তা-ই এই সংসারে ঢালি।’ রাগে নিশির ফর্সা মুখমণ্ডল লাল হয়ে উঠে, বড় বড় দু’একটা নিশ্বাস নিয়ে সে আবার ঝংকার দেয়, ‘প্রতিদিন ক্লান্ত হয়ে ফিরি আর তোমার এসব ঘ্যানরঘ্যানর শুনতে হয়। কেন? আমিও তো মানুষ নাকি! যন্ত্র তো না!’
‘কিন্তু পঙ্গু বলে আমিও তো আর অমানুষ হয়ে যাইনি। তোমার নামে নানান কথা শুনতে শুনতে আমার কান তো পঁচে যাবার জোগাড়!’
‘কে বলে আমার নামে নানান কথা? কে বলে? যারা বলে ওরা কি তোমার সংসারে একবেলা ভাতের জোগান দেয়? দেয় না। আমি দিই। আমি। তো? তোমার তো লোকের কথা গায়ে মাখবার কোনো দরকার নেই!
আশরাফ বিদ্রুপাত্মক হেসে কিছু একটা বলতে মুখ খুলতেই পরক্ষণে সে হাওয়া গিলে নিল। বাথরুমে পানির ছলছল শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। নিশ্চয় মা বুলবুলি খাতুন তাদের দুজনার চিরাচরিত বাগ্বিতণ্ডা শুনে জেগে গেছেন। আশরাফ আর কিছু বলে না। পরিশ্রান্ত শরীরটা হুইলচেয়ারে এলিয়ে দেয় আলগোছে। আর নিশি ফোঁস করে একটা ক্রোধব্যঞ্জক নিশ্বাস ফেলে বিছানায় ছেলের পাশে তার ক্লান্ত দেহটা ছেড়ে দেয়। দুচোখের পাতা একে-অপরকে আলিঙ্গন করার আগমুহূর্তে নিশির মানসপটে ভেসে উঠে কিছু বারোভূত সোনালী অতীত — যে অতীতে আশরাফ পঙ্গু ছিল না। যখন আশরাফের মনে নিশির জন্য কোনো ক্রোধ-ঘৃণা বাসা বাঁধেনি; সেই সময়কার গতিময় চিত্র! সেই সোনালী সময়গুলোতে ওদের কেউ কি স্বপ্নেও ভেবেছিল, এমন একটা দয়ামায়াহীন বিভীষিকাময় দিন তাদের জন্য অপেক্ষা করছে?
নিশির সঙ্গে আশরাফের বিয়েটা হয় পারিবারিকভাবে। আজ থেকে ছয় বছর আগে। সেই সময় নিশিদের পারিবারিক অবস্থান বেশ খানিকটা উঁচুতে থাকলেও আর্থিক স্বচ্ছলতা তাদের তেমন একটা ছিল না। সেই হিসেবে কোলমোছা কন্যাকে উচ্চবিত্ত ঘরে বিয়ে দেবার উচ্চাকাঙ্খা তাদের মাঝে ছিল না। কাজেই মধ্যবিত্ত ঘরের সদ্য পড়াশোনা সাঙ্গ করে চাকরি নেওয়া একটা ছেলে পেয়ে তিনি দিনগত পাপক্ষয় করতে চাইলেন না। খুবই সামান্য আয়োজনে আশরাফের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেন। নিশি ছিল বাবা-মায়ের ছোটমেয়ে। মা আগেই পটল তুলেছেন। ছোট মেয়ে নিশির বিবাহের কয়েক মাস পর বাবাও ভবলীলা সাঙ্গ করেন। সেই থেকে নিশি একাত্মে সংসারধর্ম পালন করে যাচ্ছিল। বিয়ের দেড়বছরের মাথায় তার কোল জুড়ে ছেলেসন্তান আসে। নিশি বড় আহ্লাদিত হয়ে বাবার নামের সঙ্গে মিলিয়ে ছেলের নাম রাখে আশিক। ব্যস তার সুখ ওই পর্যন্তই। ছেলের বয়স যখন দুইমাস তখন আশরাফ আলী ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে এক্সিডেন্টে তার উভয় পা হারায়। দিশেহারা পরিবারটি সংসারের জমাপাতি যা ছিল সমস্ত তার চিকিৎসায় ব্যয় করে ফতুর হয়। এরপর শারিরীক, মানসিক কিংবা আর্থিক — কোনোভাবেই আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি আশরাফ। পরিবারের বড় ছেলে ছিল সে৷ মেঝো ভাইটা আরব-আমিরাত প্রবাসী। ছোটভাইটা মদিনা ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করছিল। প্রথমদিকে ভাইয়ের দূরাবস্থায় প্রবাসী মেঝো ভাই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিলেও স্বার্থোন্মত্ত স্ত্রীর প্ররোচনায় একসময় যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় সে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সকলের সহানুভূতি অবহেলা আর বিরক্তিতে রূপ নেয়, মুখ ফিরিয়ে নেয়। অগত্যা গ্রামের বাড়ি থেকে কিছু জমানো অর্থ নিয়ে জননী বুলবুলি খাতুন গাঁয়ে ফিরে যাওয়ার ফরিয়াদ নিয়ে আসে। আশরাফ রাজি হয়। কিন্তু নিশি রাজি হয়নি। গাঁয়ে গেলেও যে সংসারের দুর্গতির কোনোরূপ পরিবর্তন আসবে না তা সে ভালো করেই জানতো। উপরন্তু, শহরের মেয়ে সে। গাঁয়ের লোকের সারল্য ছাপার অক্ষরে পড়ে জানা থাকলেও বাস্তবে তাদের সংকীর্ণ সমাজ-সংস্কারের কথাও সে বিলক্ষণ জানতো। তাছাড়া, দশজনের দয়াদাক্ষিণ্যের ওপর ভর করে জীবিকা নির্বাহের কোনো স্পৃহাই তার ছিল না। আশরাফ আর নিশির মধ্যকার ভালোবাসা তখনো অতলান্ত দরিয়ার মতো উচ্ছলিত; সাঁঝের আকাশের শুকতারার মতো ধ্রুব ও উদ্ভাসিত। স্ত্রীর অনীহার কারণ বুঝতে পেরে আশরাফ আর অনুরোধের পুনরাবৃত্তি করেনি। ভগ্নচিত্তে বুলবুলি খাতুন গাঁয়ে ফিরে গেলেন। কিন্তু দুইমাস পরেই গাঁয়ের এক ছেলেকে নিয়ে পুনরায় ফিরে এলেন ঢাকায়৷ মেঝো বউয়ের নির্যাতনের চিহ্ন তখন তার গায়ে দগদগ করছে! গাঁয়ের ছেলেটি সম্পর্কে আশরাফের দূরসম্পর্কীয় মামাতো ভাই। সে মেঝো বউয়ের জল্লাদিপনার বিশদ বর্ণনা দিল আশরাফের কাছে৷ শুনে আশরাফ নিস্ফল ক্রোধে ঘন্টাখানেক মূক হয়ে থেকে অভ্যন্তরীণ সমস্ত আক্রোশ ঝাড়তে ফোন দিল মেঝো ভাইয়ের কাছে। টানা একঘণ্টা বাগবিতণ্ডা শেষে সে বউয়ের পক্ষাবলম্বন করল। আশরাফের আর কিছু বলার রইল না। নিশি তখন একটা মোবাইল শো-রুমের পার্টটাইম চাকরির পাশাপাশি হেথাহোথা ইন্টারভিউ দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে কোনো ফল হচ্ছিল না। ঘরে ফিরে এই ঘটনা শুনে সে থ বনে গেল। পাড়াগাঁয়ের অশিক্ষিত পুত্রবধূ থেকে এর থেকে বেশি কী আশা করা যায়,ভাবল সে,ভালোই হয়েছে ওই রায়বাঘিনীর সঙ্গে এক ছাতের তলায় থাকতে যায়নি।
কিন্তু উদারপন্থী নিশি তাৎক্ষণিকভাবে এই অভাব-অনটনের মাঝে শ্বাশুড়ির বেগার অন্নধ্বংসের কথা চিন্তাও করেনি। যেভাবে চলছিল,সেভাবেই আবার চলতে লাগল টানাপোড়েনের সংসার। দিনের আর্ধেক সময় মোবাইল শোরুমে মেকি হাসিতে ক্রেতাদের বিমুগ্ধ করে বাকি সময়টা নগরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চাকুরির সন্ধানে কেটে যাচ্ছিল তার। চাকুরি মিলছিল না। কদাচিত মিললেও বড় সাহেবদের লালায়িত দৃষ্টি আর অনৈতিক প্রস্তাবের মুখে হতভম্ব, বিহ্বল হয়ে তাকে ফিরে আসতে হচ্ছিল। এদিকে একদিন অকস্মাৎ বুলবুলি খাতুন ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হসপিটালে নিয়ে আসা হলো। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার এক পর্যায়ে জানা গেল ব্যাধিমন্দিরের এক দুরারোগ্য ব্যাধির কথা,যেটি আমৃত্যু বুলবুলি খাতুনকে ভোগাবে। ঔষধ কেবলই সাময়িক উপশম, প্রতিষেধক নয়। সে ঔষধের দাম আবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। দুশ্চিন্তায় জর্জরিত হয়ে আশরাফ নিশিকে বলেছিল,
— মেঝো মিয়াকে খবর দিই, কী বলো? ও হয়তো কিছু টাকাপয়সা দিতে পারবে!
নিশি সায় দেয়নি এই প্রস্তাবে। মায়ের ওপর বউয়ের পাশবিক নির্যাতনের পরও যে ব্যাটাছেলে উঁচু গলায় বাগ্বিতণ্ডা করতে পারে বউয়ের পক্ষাবলম্বন করে, সে আর যাইহোক ভালো মানুষ না। তাছাড়া এতকিছু ঘটে যাওয়ার পর চিকিৎসার জন্য হারামখোর মেঝো ছেলের দ্বারস্থ হয়েছে শুনলে বুলবুলি খাতুন হার্ট অ্যাটাক করেই পগারপার হবেন।
এরপর একদিন নগরীর পথে দেখা নিশির বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা। বন্ধুর নাম ইয়াসিন। উঁচা-লম্বা কৃষ্ণকায় বিশালবপু। মাথাভর্তি কোঁকড়ানো ঝাঁকড়া চুল, মুখভর্তি তথৈবচ দাড়িগোঁফের অরণ্য। গায়ে ঝুলছে ঢলঢলে একটি টিশার্ট। টিশার্টের বুকে সদ্য-আলোচিত কোনো বিষয়ের দুই লাইনের লেখা। ফুটওভার ব্রিজে রাস্তা পার হবার সময় সে-ই প্রথমে নিশিকে দেখেছিল। ডাক দিয়েছিল পেছন থেকে,
— এ্যাই নিশি! —তুই এখানে? আছিস কেমন? —ঠিক আগের মতোই আছিস তুই। দেখে মনেই হয় না তুই এক বাচ্চার মা!
নিশি কিছু বলল না। এই হোঁদল কুতকুতের গ্যারাগলে পড়ে নিশি সত্যিই বিরক্ত হলো। উপরন্তু, অনেকদিন পর দেখা। হুট করে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই বলে সে হাসার চেষ্টা করে বলল,
— আমি ভালো আছি। কিন্তু তুই তো দিনদিন মোটাই হচ্ছিস।
— তা হচ্ছি। ফ্রি আছিস? বসবি কোথাও?
একটা লোকের সঙ্গে চাকুরি নিয়ে দীর্ঘ আলাপের পর এইমাত্র বাসায় ফিরে যাচ্ছিল নিশি। কিন্তু কেন জানি সহসা ওর প্রস্তাবটা প্রত্যাখ্যান করতে পারল না। একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসল ওরা। খাবার অর্ডার দিয়ে ইয়াসিন বলল,
— কই বললি না তো এদিকে কোথায় এসেছিস! জানামতে, এদিকে তোর কেউ নেই!
নিশি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে সত্যি কথাটাই বলল,
— একটা চাকরির ব্যাপারে কথা বলতো এসেছিলাম।
— চাকরি! তুই? — কেন?
নিশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল। খুব ঘনিষ্ঠ ক’জন বান্ধবী বাদে আর কেউ জানে না তার এই দুর্গতির কথা। না চাইতেও সে ইয়াসিনকে সংক্ষেপে বলল আগাগোড়া ঘটনাটি। শুনে ইয়াসিন বাস্তবিকপক্ষেই ব্যাথিত হয়ে বলল,
— আ’ম স্যরি, আমি জানতাম না এসব। এজন্যই সোশ্যাল মিডিয়ায় তুই একেবারে নাই হয়ে গিয়েছিলি।
— হুম
— তো চাকরিবাকরি হবে কিছু? রেসপন্স কেমন?
— বাজে। দুই এক জায়গায় হয়েছিল। কিন্তু স্যালারি এত কম যে আমায় পোষাবে না,তাই জয়েন করিনি। শুনলিই তো সব। কত খরচ!
খাবার এলো। ঈষদুষ্ণ চিকেল মোগলাই। ইয়াসিন চামচ হাতে গোগ্রাসে গিলতে শুরু করল। নিশি চা নিল শুধু। চায়ের কাপে উদাসীন চুমুক দিতে দিতে সে ভাবনার অরণ্যে হারিয়ে গেল। ভোঁতা,ভাসাভাসা সব চিন্তা মস্তিষ্কতটে উর্ণনাভের মতো জাল বুনে চলেছে। আচমকা একটা শব্দে হৃৎপিণ্ডটা ধক করে উঠল তার,চায়ের কাপ চলকে চা উপচে পড়ল টেবিলে। শব্দটা করেছে ইয়াসিন,টেবিলে চাপড় দিয়ে।
— আমার একটা প্রস্তাব আছে।
নিশি চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বলল,
— কী?
— ভার্সিটিতে থাকাকালীন তুই কেমন গান পাগল ছিলি মনে আছে?
— থাকবে না কেন?
— তুই অনেক ভালো গান গাইতিস তখন। গানে তোর প্রতিভা অনন্য। মঞ্চ নাটকে গানের পার্টগুলো তুই করতি। দর্শক অভিভূত হয়ে যেত। এছাড়া আড্ডার আসরে…
— আমার সময় নেই, যা বলবি সোজাসাপটা বল ইয়াসিন৷
ইয়াসিন জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাল। নড়েচড়ে বসে বলল,
— তুই তো জানিস আমি একটা ব্যান্ড দলের সঙ্গে যুক্ত আছি। এমনিতে আমরা সোলো গানই করি। কিন্তু ওইযে বিয়েটিয়েতে একটু হট গান করার জন্য লেডিস লাগে। তো আমাদের লেডিস ভোকালিস্টটা বেঈমানি করে চলে গেছে। এখন চাইলে তুই আমাদের সঙ্গে কাজ করতে পারিস। একটু চর্চা করলেই তুই আবার ভালো করবি আমি জানি। তাছাড়া, ভার্সিটি প্রোগ্রামে তোর পূর্ব অভিজ্ঞতা…
— টাকা কেমন আসবে?
— তোর জন্য এনাফ। একেকসময় একেক রকম৷ তুই যদি একনিষ্ঠ হয়ে কাজ করতে পারিস তাহলে ধীরে ধীরে দাম বাড়তে থাকবে৷
— ঢাকা শহরে ব্যাঙের ছাতার মতো ব্যান্ডদল গজিয়েছে। এসবের দাম নাই এখন।
— আচ্ছা যদি দাম নাই মনে করিস তাহলে চলে আসিস। দল ছাড়তে চাইলে তো কেউ বেঁধে রাখতে পারবে না! তাছাড়া আমাদের এক লাখ সাবস্ক্রাইবারের ইউটিউব চ্যানেল আছে। কাজকাম না থাকলে গান কভার করব। তোর মতো সুন্দরী লেডিস ভোকালিস্ট যদি দেখে তড়তড়ায়া সাবসক্রাইবার না বাড়ে তাইলে আমার কান কাইটা কুত্তারে খাওয়ামু বইলা দিলাম। আর তাছাড়া, তোর যা চেহারাসুরত মিউজিক ভিডিওতে এমনিতেই তোর জায়গা কনফার্ম।
নিশি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইল মিনিট খানেক। মাথার ভেতর একের পর এক চিন্তাস্রোত আছড়ে পড়ছে। আচানক কী করা উচিত বুঝতে না পেরে সে ইয়াসিনকে অপেক্ষমাণ রেখেছিল বটে; কিন্তু এরপর দ্রুতই তার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল সে। কারোর মতামতের তোয়াক্কা না করেই অর্থের জরুরতে নিশির শুরু করেছিল তার অন্য জীবন। একটা সময় নিশি নিজের জাদুকরী কণ্ঠের দ্বারা গোটা বন্ধুমহল, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানগুলো মাতিয়ে রাখলেও কেউ কখনো ভাবেনি সেই বহুমুখী সুরেলা কণ্ঠকে পুঁজি করেই তাকে পেটের দায় মেটাতে হবে! প্রথম পাঁচ-ছ’মাস নিশির এই কাজ সম্পর্কে পরিচিতজনদের কেউ জানল না। কিন্তু এটি এমন একটি পেশা যেখানে নিজেকে আড়াল করে রাখার কোনো পথ-পন্থা নেই। মঞ্চ নাটকের অকিঞ্চিৎকর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ইয়াসিনের কথামতো একটা গল্পহীন স্থিরধর্মী মিউজিক ভিডিওতে অভিনয় করার মধ্যদিয়ে বছরখানেকের মধ্যেই সকলেই নিশির এই কাজের কথা জেনে গেল; যদিওবা মিউজিক ভিডিওটি আশানুরূপ সাফল্য লাভ করতে পারেনি। তথাপি কেউ ছিঃ ছিঃ করল আবার কেউ বলিহারি দিল। প্রশংসা কিংবা ঘৃণা কোনটিই বিশেষ গায়ে মাখেনি নিশি। সে-ই তো শুরু…
শেষ রাত্রির ঘুম ঘুম আবেশে আশরাফের সঙ্গে কাটানো পুরনো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে নিশির। একসময় নিশির কণ্ঠের একাগ্র সমঝদার ছিল সে। অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত দেহটা যখন সোফায় এলিয়ে দিত আশরাফ, নিশি তখন রান্নাবান্না ইস্তফা দিয়ে লেবুর শরবত নিয়ে হাজির হতো। আশরাফ সেই শরবতের দিকে ভ্রুক্ষেপমাত্র না করে প্রস্থানোদ্যত নিশির হাত পাকড়াও করে একটি গান শোনানোর নীরব আকুতি জানাতো। নিশি ধানাইপানাই করে শুনিয়ে দিত একটি গান। গান শুনে তৃপ্ত আশরাফ মজা করে বলতো,
— তোমাকে গৃহিণী হতে কে বলেছে হাঁ? গায়িকা হলেই পারতে!
প্রত্যুত্তরে নিশিও বলতো,
— গায়িকা হলে তোমাকে বিয়ে করতাম কোন্ দুঃখে? অবশ্যই কোনো হ্যান্ডসাম গায়ককে বিয়ে করতাম।
দুই
সকাল দশটা। এরিমধ্যেই ঘুমটা বারকয়েক টুটে গিয়েছিল নিশির। প্রতিবারই দৈহিক আলস্যকে জয়ী করে আবারো ঘুম নেমে এসেছে চোখে। আধোঘুমের মধ্যেই নিশি শুনতে পায়,পাশের ঘরে ছেলেকে বর্ণপরিচয় শেখাচ্ছে আশরাফ। অ আ, ই ঈ….। আশিকের একঘেয়ে কণ্ঠটা কেমন একধরনের ভোঁতা যন্ত্রণার উদ্রেক করে নিশির আধো-জাগরুক মস্তিষ্কে।
বালিশের পাশে ফোনটা বেজে উঠে তারস্বরে। চমকে মাথা তুলে মুখে বিরক্তিসূচক চ কারান্তের শব্দ করে প্রথমে সাইড বাটন টিপে আওয়াজটা বন্ধ করে। এরপর ফোনটা রিসিভ করে নিশি। ওপাশ থেকে একটি ঝরঝরে কণ্ঠস্বর ভেসে আসে।
— গুডমর্নিং। এখনো শুয়ে?
কণ্ঠটা চিনতে পারে সে। আন্দালিব হাসান। তাদের ব্যান্ডের কর্ণধার,ভোকালিস্ট এবং গীতিকবি। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে নিশি বলল,
— মর্নিং। হুম শুয়ে৷
আন্দালিব তাড়া দিয়ে বলল,
— চটপট রেডি হয়ে চলে এসো। কাল আরেকটা বিয়েতে শো আছে। প্রেকটিস করতে হবে।
— আচ্ছা আসছি একটু পর। তোমরা শুরু কর।
ফোনটা নামিয়ে রেখে আরেক দফা চোখ মুদল নিশি। কিন্তু এইমাত্র ফোন করা আন্দালিবকে নিয়ে মাথার ভেতর ঘুরতে থাকা অগুনতি চিন্তারাশি তাকে আর ঘুমাতে দিল না। একটা বড় নিশ্বাস ছেড়ে বিছানায় উঠে বসল সে। বাইরে তখন রোদ্দুরের চোখধাঁধানো ঔজস্যে দৃষ্টি রাখা দায়। তবুও জোর করে আধখোলা গবাক্ষ গলে দূরে দৃষ্টি বিছিয়ে দিল নিশি। আবারো তার ভাবনাজুড়ে জায়গা করে নিল আন্দালিব! মাঝারি উচ্চতার,বৈশিষ্ট্যহীন সহজসরল অথচ দারুণ ব্যক্তিত্ববান একটি ছেলে। ব্যান্ড দলের অপরাপর সদস্যদের মতো তাকেও একই বিবেচনায় রেখেছিল নিশি। কিন্তু দিনকয়েক যেতেই তার বহুমুখী প্রতিভা, কর্মনৈপুণ্যতা, সীমিত অথচ নিদারুণ বাগ্বিধি, নেতৃত্বসুলভ গুণাবলি সবকিছু মিলিয়ে নিশির চোখে আন্দালিব অন্যমানুষ হয়ে গেল। পুরনো নিশিকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে শান দেওয়ার পেছনেও এই মানুষটা ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত ছিল৷ প্রথম প্রথম কয়েকটি প্রোগ্রাম নিশির আনাড়িপনার কারণেই ফলপ্রসূ হয়নি। কিন্তু আন্দালিবের বরাবরই বিশ্বাস ছিল নিশি একসময় দারুণ ছন্দে ফিরে আসবে। এসেছিলও। তবে যাইহোক, নিজের দুঃস্থ পরিবারকে বাঁচাতে,নিজে বাঁচতে নিশির প্রয়োজন ছিল শুধু টাকা। সেটুকুও অপূর্ণ রাখেনি আন্দালিব। যতটুকু পাওনা তারচে বেশি দিয়েই বরং তাকে সাহায্য করেছিল নানা সময়ে। একসময় যখন আশরাফ জানতে পারল তার কাজের কথা,তখন সে বেঁকে বসল। সেই বিষাদময় সময়গুলোতে আন্দালিবই বন্ধুর মতো হাত বাড়িয়ে তার দুঃখগুলোকে বাষ্পের মতো হালকা করে দিয়েছিল। পর্বতপ্রমাণ যুক্তি খাড়া করিয়ে,ঘন্টার পর ঘন্টা সময় ধরে নিশিকে সে বুঝিয়েছিল, যা হচ্ছে তা-ই স্বাভাবিক। রক্ষণশীল কোনো পরিবারের এমন বিরূপ প্রতিক্রিয়াকে ধীরেসুস্থে সামাল দিতে হবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো,আশরাফ কখনোই বুঝতে চায়নি; কেন সে এই পথে নেমেছে। বুঝতে চায়নি,ঘরকন্না ফেলে নর্তকী হয়ে লোকের মনোরঞ্জনের কোনো অভিলাষ তার ছিল না!
কিন্তু সময় যতো গড়িয়ে গেল নিশির চোখের যবনিকা ততই সরতে আরম্ভ করল। তার প্রতি আন্দালিবের বাড়তি মনোযোগের কারণ এখন নিশির কাছে প্রভাতের অস্ফুট আলো জমাটবদ্ধ আলো-আঁধারির মতোন। দেখেও যেন অদেখা,বুঝেও যেন দুর্বোধ্য,শুনেও যেন অশ্রাব্য…। নিশি সেই কদর্য পথে পা বাড়াতে আগ্রহী নয়। তার একটি সন্তান আছে,একটি পরিবার আছে, একজন মাতৃতুল্য শ্বাশুড়ি আছে;যাদের জন্য সে গভীর রাতে নিজের কণ্ঠকে পুঁজি করে হাজারো লোলুপ দৃষ্টির মুখে সহাস্যে দাঁড়িয়ে যেতে দ্বিধান্বিত হয় না। বখাটে শ্রোতাদের মুখে তার দেহ নিয়ে তীর্যক ব্যাঙ্গকে হাসিমুখে বরণ করে নিতে হয়। কিন্তু যাদের জন্য এতকিছু তারাই কেন পায়ে ঠেলে দেয় তাকে? সকাল সকাল মনটা বেজার হয়ে গেল নিশির। বিছানা থেকে নামতেই সে শুনতে পায় আশিক পড়া থামিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করছে,
— আব্বু, মা রাতে কই থাকে?
আশরাফ একটু সময় নিয়ে জবাব দেয়,
— থাকে। কাজে।
— মা নাকি বিয়েবাড়িতে নাচে,গান গায়? আমাকে নেয় না কেন?
আশরাফের বুঝতে বাকি থাকে না আশিককে কথাগুলো কে বলেছে! পাশের ভাড়াটিয়া বউটি তার ছেলেকে দু-চোখে দেখতে পারে না। নিজের ছেলের সঙ্গে মিশতে দিতে চায় না, পাছে তার ছেলেটি নষ্ট হয়ে যায়। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ফুসলিয়ে বের করে দেয় তাদের ঘর থেকে। দীর্ঘশ্বাস গোপন করে আশরাফ বলে,
— কারণ তুমি ছোট।
— আমি তাহলে বড় হলে যেতে পারব?
— না, ওখানে যাওয়ার তোমার দরকার নেই। তুমি ভদ্রলোকের ছেলে ভদ্র কাজ করবে। পড়াশোনা করে, মানুষের মতো মানুষ হতে হবে।
আশিক অনেক্ষণ ভেবে জ্ঞানীর মতো করে বলে,
— মা তাহলে ভদ্র না?
নিশি আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে এবার। তেরছা গলায় বলে,
— দাও এবার জবাব। ছেলেকে এখনি এসব বলে টক্সিক করার কোনো মানে হয়?
আশরাফের কণ্ঠ ধীর ও শান্ত,
— সকাল সকাল শুরু করো না। — বাড়িওয়ালা এসেছিল। এই মাসেই বাড়ি ছেড়ে দিতে বলেছে।
— মানে কী! বললেই হলো না-কি। এখন হঠাৎ বাড়ি কই পাব?
— জানি না। ভাড়াটিয়ারা হয়তো আমাদের নামে একজোট হয়ে অভিযোগ করেছে। রাতবিরেতে ঘরে ফেরা, কলোনির পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে,বাচ্চাদের ওপর খারাপ প্রভাব পড়ছে। এসব অভিযোগ।
— আমি কথা বলছি বাড়িয়ালার সঙ্গে।
বলেই বেরিয়ে যাচ্ছিল নিশি। আশরাফ বাধা দিয়ে বলল,
— যেও না। শুধুশুধু অপমানিত হবে। এমনিতেই সকাল সকাল আমাকে কথা শুনিয়ে গেছে।
হতোদ্যম হয়ে ফিরে আসে নিশি। ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে বসে পড়ে টেবিলের চেয়ারটা টেনে।
স্টুডিও ঘরটাতে ঢুকতেই বিবিধ বাদ্যযন্ত্রের মাঝে বসে থাকা মানুষগুলোকে দেখে বিক্ষিপ্ত মনটা শান্ত হয়ে আসে নিশির। মুখে একটা হাসির রেশ টেনে ওদের সঙ্গে যোগ দেয় নিশি। চেনা গানগুলোকে নিজের কণ্ঠে ঝালিয়ে নেয় নতুন করে। মাঝেমধ্যে চলে আড্ডা, হাসিঠাট্টা আর ধোঁয়া-উঠা চায়ের কাপে একে অপরের জীবন-ব্যবচ্ছেদ করে দেদারসে মজা লুটা। খারাপ লাগে না নিশির। সংসারের গুরুদায়িত্বসহ যাবতীয় টানাপোড়েনের বোঝা যখন তার মাথায় তখন এই মানুষগুলোই তার ঠোঁটে হাসি ফোটানোর একমাত্র উৎস।
কিন্তু এই আনন্দ-উৎসেও ভাটির টান পড়ে আন্দালিবের বিমুগ্ধ দৃষ্টির বাগুরিক উন্মাদনায়! থেকে থেকে মানুষটার বাড়তি যত্নে নিশির স্তিমিত হৃৎপিণ্ডে কেমন অস্থিরতা আর ত্রাস ছড়িয়ে যায়। পতঙ্গ যেমন ধ্বংস অনিবার্য জেনেও আগুনের লেলিহান শিখার পানে ছুটে যায় বারংবার, তেমনিভাবে নিশিও আন্দালিব-নামক অগ্নিকুণ্ডের দিকে বিভ্রান্ত হয়ে ছুটে যায় বারংবার। এই যেমন সেদিনও নতুন বাসার জন্য উদ্ভ্রান্ত হয়ে ছুটোছুটি করে অবশেষে আন্দালিবকে জানাতেই সে দু’দিনের মধ্যে স্বল্প মূল্যের দারুণ একটি বাসা ঠিক করে দিল। অফ সিজনে যখন টাকার দরকার হয় আন্দালিবের কাছে গেলে খালি হাতে ফিরতে হয় না। এমন আরো কত কী! কিন্তু সবকিছুর পেছনে যে গুহ্য কোনো অভিলাষ আছে তা দিনের আলোর মত দেদীপ্যমান। দু’জনের ঘুণেধরা অন্তর সে বিষয়ে সচেতন! তবুও সামাজিকতা আর লোকলজ্জায় অদৃশ্য এক দূরত্ব বজায় রেখে চলে ওরা। কিন্তু মন নামক বুনোঘোড়াকে কাঁহাতক লাগাম দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়? সেই বুনোঘোড়াটি দিকবিদিকশুন্য হয়ে ছুটতে ছুটতে অবশেষে তার চূড়ান্ত পরিণতিতে গিয়ে থামল। এক বর্ষাস্নাত দিনে নিভৃত,নির্জন,নিস্তরঙ্গ স্টুডিও ঘরে একটি অসংযত আলিঙ্গন,একটি প্রলম্বিত উত্তপ্ত চুমু সেই পরিণতিকে পূর্ণতা দান করলো। এরপর ছিটকে সরে এলেও যে দূরত্ব ঘুচে গিয়েছিল দুর্মদ কামনার বশে সে দূরত্ব সহজে আর ঘনীভূত হয়নি।
ধীরে ধীরে সবাই কেমন করে যেন বিষয়টা ধরতে পারে। কানাকানি শুরু হয় দলের সদস্যদের মাঝে,
‘আন্দালিবের সঙ্গে নিশির বোধহয় একটা সেটিং চলছে!’ ‘চলুক,ভালো মানাবে দু’জনকে।’
‘ওর না জামাই-বাচ্চা আছে!’
‘থাকুক, পঙ্গু একটা মানুষ, তার ওপর নিমকহারাম।’
‘আমিও শুনেছি, ওর গান গাওয়াকে সমর্থন করে না। আরে বেটা তোদের জন্যই তো সংসার ছেড়ে গান গাইতে নেমেছে। শোকর করবি না!’
‘তারচে বড় কথা, ওই ব্যাটা নিশিকে শেষ কবে ‘স্বর্গসুখ’ দিতে পেরেছে সে নিজেও জানে না।’
‘চুপ কর শালা,বেয়াদ্দব। আন্দালিব শুনতে পেলে তোর স্বর্গসুখও লাটে উঠবে।’
অনেকদিন পর আদিরসাত্মক কোনো প্রসঙ্গ পেয়ে হো হো করে হেসে উঠে সবাই৷ আন্দালিব আর নিশি সবার এই কানাকানি,ঠারাঠারি বিলক্ষণ বুঝতে পারলেও কিচ্ছুটি বলে না। বস্তুত, সেদিনের অপ্রত্যাশিত কাণ্ডের পরে কী এক সংকোচে দুজনাতে বাতচিত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল প্রায়। কিন্তু মনে মনে কথাবার্তা যেন ঠিকই চলছিল।
এককান দু’কান করে বিষয়টা কেমন করে যেন আশরাফের কানে পৌঁছে যায়। যথারীতি একদিন রাত্রে একটা প্রোগ্রাম শেষ করে নিশি ঘরে ফিরে দেখে রণোন্মত্ত আশরাফ তার অপেক্ষায় জেগে আছে। নিশি অবশ্যম্ভাবী এই দাম্পত্য কলহটা প্রাণপণে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে। সাওয়ার নিয়ে, জামাকাপড় ছেড়ে বিছানায় যাবার আগে অগত্যা আশরাফকে সে বলল,
— কী হয়েছে?
আশরাফ নির্বিকারে বলল,
— তুমি মুভ অন করতে চাও?
ধক করে উঠল বুকের তল,
— মানে?
— মানে খুব সোজা। আন্দালিব নামের একটা ছেলের কথা আমি জেনেছি।—দেখো, এই সংসারে না আছে সুখ,না আছে শান্তি৷ যে কারণেই হোক,তুমি আমাকে সহ্য করতে পার না,আর আমি তোমাকে৷ তোমাকে নয় অবশ্য, তোমার কর্মকাণ্ডকে। আচ্ছা,শেষ কবে আমরা হেসে কথা বলেছি? শেষ কবে তুমি আমার কোনো কিছুতে স্বেচ্ছায় একটু হাত বাড়িয়েছ! মনে নেই। এরচেয়ে বরং তোমার পছন্দের মানুষকে নিয়ে সংসার করলে তুমি ভালো থাকবে৷ আমি চাই, তুমি ভালো থাকো। যেটা হয়তো আমার দ্বারা আর সম্ভব নয়।
নিশি ব্যথিতভাবে বলল,
— এতগুলো বছর কাদের জন্য কষ্ট করলাম তাহলে? এই তার প্রতিদান!
আশরাফ মাথা ঝুঁকিয়ে একটু চুপ করে থেকে জলদগম্ভীর স্বরে বলল,
— তোমার কষ্টের কথা অস্বীকার করছি না৷ কিন্তু তুমি কি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে অস্বীকার করতে পারবে যে, আন্দালিবকে তুমি ভালোবাস না?
নিশি ফোঁস করে চোখ নামিয়ে নিল। ধিকিধিকি জ্বলছে ওর চোখদুটো, তদুপরি সেই জ্বলাতে কীসের জন্য পর্যুদস্ত দুর্বলতা!
— নিশি আমি একটু সতেজ নিশ্বাস নিতে চাই। এইখানে চারদেয়ালের মাঝে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আমি গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাব। মরার আগে বাবা যেই জমিটা কিনেছিল সেটা ভাগবাটোয়ারা করে, আমার অংশটা বিক্রি করে আমি একটা দোকান দেব। ওতেই আমার বাকিটা জীবন চলে যাবে। আর আশিক — ওকে নিয়ে কোনো আইনি ঝামেলায় যাব না। ও তোমার কাছেও থাকবে। আমার কাছেও থাকবে। ভালো হবে না?
বলেই আলতো করে হাসল আশরাফ। সেই তীক্ষ্ণধার হাসি যেন বিষমাখা ছুরি হয়ে নিশির কলজের মাঝখানে গিয়ে বিঁধল।
ভাই আপনার লেখা মানে শব্দের বাহারি সমাহার।
বিশেষণে সম্ভাষিত প্রতিটি রূপক শব্দ। আর শব্দ বুননকৌশল এক কথায় অসাধারণ ।
ধন্যবাদ, ভাই।