পুরনো কলকাতার গ্রুপগুলিতে কলকাতা ততটাই পুরনো যতটা সময় কলকাতা ব্রিটিশশাসিত। ব্রিটিশপূর্ব কলকাতার কোনও খবর, কোনও লেখা কেউ পোস্ট করে না। অদৃষ্টের পরিহাস এটাই যে ব্রিটিশদের আগে আর্মেনিয়ান সম্প্রদায় কলকাতায় প্রবলপ্রতাপে ব্যবসাবাণিজ্য করেছে।
কলকাতা যে জোব চার্নকের ব্রেনচাইল্ড নয়, এটা এতদিনে পরিষ্কার। চার্নক আসার আগেই সাবর্ণরায়চৌধুরীদের একটা জনপদ ছিল এখানে। বলার মত কোনও শহর বা নগর না থাকলেও, জনবসতি ছিল। ১৬৯০-এ পাকাপাকিভাবে এখানে আসার আগে আরও দুবার এখানে এসেছিলেন চার্ণক
সাহেব। ১৬৮৬তে শেষবার এখানে এসে কিছু মাটির চালাঘর করে গিয়েছিলেন। তার দেখভাল করার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন একজন বিশ্বস্ত লোককে।
‘কলিকাতা-দর্পণ’-এর লেখক রাধারমণ মিত্র বহু যুক্তির অবতারণা করে দেখিয়েছেন, জোব চার্ণকের আগে কলকাতায় কোনও আর্মেনীয় ছিল না। ব্র্যাবোর্ন রোডের ন্যাজারেথ সমাধিক্ষেত্রে রেজাবিবে নামক আর্মেনীয় মহিলার ১৬৩০ খ্রিস্টাব্দের সমাধিফলক যে আর্মেনীয় জালিয়াতি,তা তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যক্ত করেছেন। আর্মেনীয় লেখক তথা ঐতিহাসিক মেসরোভ জ্যাকব সেথকে তো বটেই, সঙ্গে সঙ্গে আর্মেনীয় উপনিবেশের প্রবক্তা আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কেও তিনি ভুল ইতিহাস লেখার দায়ে কাঠগড়ায় তুলেছেন। সতেরো শতকের প্রথম দিকে যে কলকাতায় কোনও আর্মেনীয় উপনিবেশ থাকা সম্ভব নয়, রাধারমণবাবু তা বুক বাজিয়ে বলে গেছেন।

তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় কিছু চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছি। জোব চার্ণক ১৬৮৬-তে এখানে যে চালাঘরগুলি তৈরি করেছিলেন তার কেয়ারটেকার হিসেবে নিযুক্ত করেন বরকুদার মালিক নামে এক ব্যক্তিকে। বাঙালি ঐতিহাসিকরা এই বরকুদার মালিককে ‘বৃকোদর মল্লিক’ ভেবে থাকেন। যদিও তার কোনও ভিত্তি নেই। রাধারমণ মিত্র ‘কলিকাতা-দর্পণ’-এ লিখেছেন, — “এটা কোনও ব্যক্তিবিশেষের নাম নয়, তাঁর উপাধিমাত্র। সুবেদার বা নবাবের নীচেই যে সরকারি কর্মচারী থাকতেন, তাঁকে অথবা নবাবের প্রতিনিধিকে বলা হত মালিক বরকুদার’।
১৬৯০-এর ২৪ আগস্ট পাকাপাকিভাবে সুতানুটিতে পদার্পণ করার সময় জোব চার্নকের জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন ব্রুক সাহেব। তিনি তাঁর ডায়েরিতে যা লিখে গেছেন তার তর্জমা করলে দাঁড়ায়, — “আমরা পূর্ববারে এই সুতানুটির মধ্যে যে দুএকখানি কুঁড়েঘার রাখিয়া গিয়াছিলাম, তাহার চিহ্নমাত্র নাই। আমরা এ স্থান ত্যাগ করিবার পরই, মল্লিক বরকুদার (Mallick Barcoodar) ও স্বদেশী লোকেরা চালাঘরগুলি জ্বালাইয়া দিয়াছে এবং বাঁশ বেড়া প্রভৃতি যাহা ছিল, সকলই লইয়া গিয়াছে।”
অতি সম্প্রতি অনুসন্ধান করে দেখলাম ‘Melik Barkhudar’ এক আর্মেনীয় ব্যক্তির নাম। তিনি কলকাতায় ছিলেন জোব চার্নকের অনেক আগে থেকেই। এই মেলিক বারখুদার সম্ভবত মুঘলদের ব্যবসাসঙ্গী হয়ে কলকাতায় এসেছিলেন। আর্মেনীয় ইতিহাসে এঁদের বংশপরিচয় খুব উজ্জ্বল। বাঙালি বৃকোদর মল্লিক নন, চার্নকের কেয়ারটেকার ছিলেন আর্মেনীয় বারখুদার মেলিক। এঁকেই মুঘল রাজকর্মচারি বরকুদার মালিক বা বাঙালি বৃকোদর মল্লিক বলে চালানো হয়েছে, কেয়ারটেকার বলে হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ইতিহাসে। (আর্মেনীয়) বারকুদার মেলিক তথা বরকুদার মালিকের কথা ও তাঁর স্বজাতির কথা লিখে গেছেন এক ইংরেজ সাহেবই। জোব চার্নকের আগে থেকেই সুকিয়াস, অ্যারাটুন, অ্যারাকিয়েল, সার্কি,ভাসাক, সেথ, সাতুর, আপকার প্রভৃতি আর্মেনীয় পদবিধারী লোকের কলকাতায় বসবাসের চিহ্ন প্রবল। আর্মেনীয় উপনিবেশ হয়ত এখানে ছিল না, তবে আর্মেনীয় মহল্লা থাকা অবশ্যই সম্ভব ছিল।

শ্রদ্ধেয় লেখক রাধারমণ মিত্র ‘কলিকাতা-দর্পণ’-এ প্রশ্ন তুলেছেন, “আরমানিরা কলকাতায় ১৬৩০ থেকে ১৭২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ৯০ বছর স্ত্রীপুত্র পরিবার নিয়ে বাস করল, অথচ তাদের মধ্যে আর একটি লোকও মরল না, এটা কী করে সম্ভব হতে পারে? যদি মরত তবে নিশ্চয় কবর থকত এবং যদি বাস করত নিশ্চয়ই মরত।”
বস্তুত কলকাতার প্রাচীনতম আর্মেনীয় চার্চের (বড়বাজারের হোলি ন্যাজারেথ চার্চ) সমাধিক্ষেত্রে রেজাবিবে নাম্নী আর্মেনীয় মহিলা সমাহিত হয়েছিলেন ১৬৩০-এ। তার পরের সমাধি ফলকটি ১৭২০-র। তাহলে ৯০ বছরের শূন্যতার রহস্যটা কী? এক্ষেত্রে আমাদের ভেবে দেখতে হবে আর্মেনীয় জনসাধারণের জাতিগত ও ধর্মগত পরিচয় কী ছিল। ৩০১ খ্রিস্টাব্দে আর্মেনিয়া (এশিয়ার ইউরোপ সংলগ্ন প্রান্তিক দেশ) সরকারিভাবে খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণ করে। তার আগে আর্মেনীয়রা ছিল মূলত জোরাস্ট্রিয়ান বা পাগান। আরবের ইসলামী আগ্রাসনের সময় অনেক খ্রিস্টান আর্মেনীয় ইসলামধর্মে কনভার্টেড হন। খ্রিস্টপূর্ব ৮২৫ অব্দে অ্যাসিরিয় যুদ্ধসম্রাজ্ঞী সেমিরাসের সঙ্গে আর্মেনীয়রা প্রথম ভারতে আসে। তারপর ৩২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিক সম্রাট আলেকজান্দারের সঙ্গে বেশ কিছু আর্মেনীয় ভারতে আসে। শের শাহের আক্রমণে মুগল সম্রাট হুমায়ুন পারস্য তথা ইরানে পালিয়ে যান। শের শাহের পতনের পর তিনি ভারতে ফিরে এলে বহু আর্মেনীয়কে তিনি সঙ্গে করে ভারত তথা দিল্লিতে নিয়ে আসেন। আকবরের সঙ্গে আর্মেনীয়দের সম্পর্ক খুব ভাল ছিল। কিন্তু আকবরপুত্র জাহাঙ্গির বহু আর্মেনীয়কে জোর করে ইসলামধর্মে দীক্ষিত করেন। প্রাচীন কলকাতার আর্মেনীয়রা অনেকেই মুসলিম আচার-অনুষ্ঠানে অভ্যস্ত ছিল। বিশেষত আকবর তথা জাহাঙ্গিরের সেনাপতি মানসিংহ ও রাজস্বমন্ত্রী টোডরমলের সময় মুঘলবাহিনীর সঙ্গে আর্মেনীয়রা এ বাংলা তথা কলকাতায় এসেছিল বলে তাদের মধ্যে মুঘল সংস্কৃতির ছাপ পড়ার সম্ভাবনা ছিল প্রবল। প্রাচীন কলকাতার পার্সিরা ছিল জরাথ্রুস্টপন্থী বা অগ্নিউপাসক। তারা কেউ মারা গেলে মৃতদেহ উঁচু জায়গায় বা টাওয়ার অফ সাইলেন্সে রেখে দিত সৎকারের জন্যে। শকুনিরা বাকি কাজটুকু সারত।

আর্মেনীয়দের মধ্যে যারা জরাথ্রুস্টপন্থী ছিল, তারা টাওয়ার অফ সাইলেন্স ব্যবহার করত মৃতদেহ সৎকারের জন্যে। আবার যারা ইসলামে বিশ্বাস করত, তাদের মৃতদেহ মুসলমান কবরস্থানে যেত। ফলে আর্মেনীয় চার্চে শূন্যতা সৃষ্টি হল। ১৬৩০ থেকে ১৭২০ র মধ্যে কোনও মৃতদেহ সমাধিক্ষেত্রে না সমাহিত হওয়ার আরও কারণ ছিল।ভাগীরথী ওইসময় বড়বাজার ও পোস্তার উপর এগিয়ে এসেছিল। স্ট্র্যান্ড রোড অঞ্চল ও বড়বাজারের আর্মেনীয় চার্চের পুরনো সমাধিক্ষেত্র তখন জলের নীচে ছিল। সুতরাং রাধারমণ মিত্র যাই বলুন না কেন, শুধু আর্মেনীয় সমাধির সময়কাল ধরে বিচার করলে কলকাতায় আর্মেনীয় উপনিবেশের অস্তিস্ত্ব নিয়ে সুবিচার হয় না।

ফলত রাধারমণ মিত্রের হিসেবে জল মিশেছে। তিনি সত্যের ধারেকাছ দিয়েও যাননি।
এটা একেবারে দিনের আলোর মত সত্য যে কলকাতার বুকে আর্মানি জনবসতি ছিল জোব চার্নক আসার আগেই।