| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আরোগ্য নিকেতনে সেকাল ও একাল লিখেছেন ড. অলোক রায়

Reporter
ড. অলোক রায় / ১৫০৫ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২৩ জুলাই, ২০২১

উপন্যাস হিসেবে শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘যুগান্তর’ (১৮৯৫) এমন কিছু মনোযোগ দাবি করে না, কিন্তু উনিশ শতকে বাঙালি সমাজের যুগান্তরের স্বরূপকে কাহিনীর মধ্যে ধরে দেওয়ার প্রয়াস হিসেবে দেখলে উপন্যাসটির কিছু মূল্য আছে। শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন-বঙ্গসমাজ’ (১৯০৪) বইটিতেও পরিবর্তমান সমাজের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ইতিহাসগ্রন্থে শুধু তথ্যের কালানুক্রমিক বিবরণ যথেষ্ট মনে হলেও উপন্যাসে ‘নবযুগের আবর্ত’কে শিল্পরূপ দেওয়া সহজ নয়। ‘যুগান্তর’ উপন্যাসের সমালোচনাকালে রবীন্দ্রনাথ এই ধরনের উপন্যাস লেখার সমস্যা সবিস্তারে আলোচনা করেছেন, “সাহিত্যের চিত্রপট স্থিতি অপেক্ষা গতি আঁকা শক্ত। যাহা পুরাতন, যাহা নানা দিকে নানা ভাবে সমাজের হৃদয় হইতে রসাকর্ষণ করিয়া শ্যামল সতেজ এবং পরিপূর্ণ হইয়া দাঁড়াইয়া আছে, তাহাকে সত্য এবং সরলভাবে পাঠকের মনে জাজ্জ্বল্যমান করিয়া তোলা অপেক্ষাকৃত সহজ। কিন্তু যাহা নূতন উঠিতেছে, যাহা চেষ্টা করিতেছে, যুদ্ধ করিতেছে, পরিবর্তনের মুখে আবর্তিত হইতেছে, যাহা এখনও সর্বাঙ্গীণ পরিণতি লাভ করে নাই, তাহাকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করিতে হইলে বিস্তর সূক্ষ্মবিশ্লেষণ অথবা ঘাতপ্রতিঘাত ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়া বিচিত্র নাট্যকলা প্রয়োগ আবশ্যক হয়। কিন্তু সেরূপ করিতে হইলে রচনার বিষয় হইতে রচয়িতার নিজেকে বিশ্লিষ্ট করিয়া লইতে হয়। অত্যন্ত কাছে থাকিলে, মণ্ডলীর কেন্দ্রের মধ্যে বাস করিলে, সমগ্রের তুলনায় তাহার অংশগুলি, ব্যক্তির তুলনায় তাহার মতগুলি, কার্যপ্রবাহের তুলনায় তাহার উদ্দেশ্যগুলি যেরূপ বেশি করিয়া চোখে পড়ে—তাহাতে রচনা সত্যবৎ হয় না, তাহার পরিমাণসামঞ্জস্য নষ্ট হইয়া যায় এবং বাহিরের নির্লিপ্ত পাঠকদের নিকট কিরূপে বিষয়টিকে সমগ্র এবং সপ্রমাণ করিতে হইবে তাহার ঠাহর থাকে না।” তারাশঙ্করের বিভিন্ন উপন্যাসে দেখা যাবে স্থিতি অপেক্ষা গতিকে ধরার দিকে তাঁর ঝোঁক। কিন্তু অনেক সময়ই সে প্রয়াস সফল হয়নি, তার কারণ ১. ‘বিস্তর সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ অথবা ঘাত-প্রতিঘাত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়া বিচিত্র নাট্য-কলা’ প্রয়োগের অভাব। ২. ‘রচনার বিষয় হইতে রচয়িতার নিজেকে বিশ্লিষ্ট’ করার অক্ষমতা।

অনেকেই জানিয়েছেন আরোগ্য নিকেতন উপন্যাস ছিল তারাশঙ্করের সবচেয়ে ‘প্রিয় বই’। এক ধরনের অধ্যাত্মবোধ, যাকে তারাশঙ্কর কখনও বলেন ‘ঐতিহ্যবোধ’—আরোগ্য নিকেতনের মধ্যে অনেকে তার প্রকাশ দেখেছেন। সমালোচকের মনে হয়েছে, “যে দেশে অধ্যাত্মরহস্যকে অনুভূতিগম্য করিবার জন্য সাধনার শেষ নাই, দিব্যদৃষ্টি যেখানে স্থূল বিশ্লেষণকে উপেক্ষা করিয়া ভগবৎ-প্রকৃতির স্বরূপ প্রত্যক্ষ করিয়াছে, যেখানে দেহাভ্যন্তরস্থ আত্মাকেই পরম সত্য বলিয়া গ্রহণ করা হয়, সেখানে বিংশ শতাব্দীর ঔপন্যাসিক যে জীবনবেষ্টনকারী চরম তত্ত্বকে প্রত্যক্ষগোচর করিতে চেষ্টা করিবেন, জীবনের যে খণ্ডাংশগুলির মধ্য দিয়া ওপারের আলো আংশিকভাবে বিকীর্ণ হইয়াছে সেইগুলির প্রতি বিশেষভাবে মনোনিবেশ করিবেন, দার্শনিকের তত্ত্ব জিজ্ঞাসা লইয়া জীবন-রস-আস্বাদনে অগ্রসর হইবেন তাহা প্রাচীন ঐতিহ্যের সার্থক অনুবর্তন ও সম্প্রসারণরূপেই গণনীয়।” (শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়)। কিন্তু একালের পাঠক শুধু ‘প্রাচীন ঐতিহ্যের সার্থক অনুবর্তনে’ খুব বেশি আগ্রহ বোধ করেন না। অন্তত এপারের মানুষ ‘ওপারের আলো’ দেখার জন্য খুব ব্যস্ত নন। আবার সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো কারও মনে হয়েছে “আরোগ্য নিকেতনে অবৈজ্ঞানিক বিশ্বাস প্রাধান্য পেয়েছে। এটা উপন্যাসটির আংশিক ত্রুটি অথচ তারাশঙ্কর অবৈজ্ঞানিক বিশ্বাস মনে পোষণ করলেও তাকে প্রচার প্রতিষ্ঠা দেওয়ার জন্য আরোগ্য নিকেতন লিখেছেন, একথা মনে করা কঠিন। আসলে আরোগ্য নিকেতন পড়বার সময় কোন্ কথাটার উপর আমরা বেশি জোর দেব, সেটাই বিচার্য। উপন্যাস হিসাবে আরোগ্য নিকেতন সর্বাঙ্গসুন্দর বা সার্থক রচনা নয়। কিন্তু শুধু চমক সৃষ্টি করা বা পাঠক-মনোরঞ্জনের জন্যও উপন্যাস লেখা হয়নি। তারাশঙ্করের চরিত্র পরিকল্পনায় ত্রুটি থাকতে পারে। তত্ত্বের আরোপও কখনো আপত্তিকর মনে হয়। কিন্তু দেশকালের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগ সব উপন্যাসেই ধরা আছে, আর দেশকালের গতিময় রূপ তাঁর উপন্যাসকে দিয়েছে সামাজিক তাৎপর্য। আরোগ্য নিকেতন-এ জীবন-মৃত্যুর তত্ত্ব ব্যাখ্যা যদি তারাশঙ্করের অন্যতম উদ্দেশ্য হয়েও থাকে, তবু সেখানেই উপন্যাসের তাৎপর্য নিহিত নেই। অন্যদিকে যাঁরা মনে করেন আরোগ্য নিকেতন-এর বর্ণনীয় বিষয় ‘এ্যালোপ্যাথি বনাম আয়ুর্বেদের ঝগড়া’, তাঁরাও মনে হয় জীবনমশাইয়ের চরিত্র পরিকল্পনার ব্যর্থতাকেই উপন্যাসের একমাত্র পরিচয় বলে গ্রহণ করায় উপন্যাসে কালকালান্তরের রূপকনির্মাণের প্রয়াসকে যথোচিত মূল্য দেননি।

অথচ তারাশঙ্করের আরোগ্য নিকেতন শুধু কাল-চিহ্নিত রচনা বলে নয়, কালান্তরের তাৎপর্য বহন করে বলেই বাংলা উপন্যাসধারায়  বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে। জীবন দত্ত এবং প্রদ্যোৎ বোসের বিরোধ যেমন ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, তেমনি প্রাচীন আয়ুবের্দ ও আধুনিক পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিরোধও নয়। প্রকৃতপক্ষে বর্তমান শতাব্দীতে পরিবর্তমান সমাজজীবনে দুই স্বতন্ত্র মূল্যবোধের বিরোধ অবলম্বনে গড়ে উঠেছে উপন্যাসের কাহিনী। এই বিরোধের পরিণাম তত্ত্বের আরোপে সামাজিক কার্য-কারণ-সূত্রের অনুসরণ করেনি, সেখানে উপন্যাসের ত্রুটি। কিন্তু বিরোধের সামাজিক কার্যকারণ লেখকের অজ্ঞাত ছিল না, তার রূপায়ণে লেখকের বাস্তবতাবোধের পরিচয় মেলে।

আরোগ্য নিকেতন উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদের প্রথম বাক্য কাহিনীকাল নির্দেশ করছে—”উনিশ শো পঞ্চাশ সাল—বাংলা তেরশো ছাপ্পান্ন সালের এক শ্রাবণ-অপরাহ্ণে জীবনমশায় এমনি করেই তাকিয়েছিলেন আকাশের দিকে।” আরোগ্য নিকেতন অর্থাৎ চিকিৎসালয় ‘স্থাপিত হয়েছিল প্রায় আশি বৎসর পূর্বে।’ তাহলে ১৮৭০ সালে স্থাপিত আরোগ্য নিকেতনের তথা চিকিৎসার আদর্শের সঙ্গে ১৯৫০ সালের চিকিৎসাপদ্ধতি তথা চিকিৎসকের জীবনদৃষ্টির একটা তুলনা এসে যায়। যদিও জীবনমশায়ের পিতা জগবন্ধু কবিরাজমশায় উপন্যাসের প্রধান বর্ণনীয় বিষয় নন। পুত্রের উপর পিতার প্রভাব ছিল প্রগাঢ়, কিন্তু কালান্তরে পুত্রের পরিবর্তনটুকুও লক্ষণীয়। সেকাল আর একালের দ্বন্দ্ব নিয়ে তারাশঙ্কর আগেও লিখেছেন, তবে আরোগ্য-নিকেতন-এ ব্যাপকতর সামাজিক প্রেক্ষাপট ব্যবহারের ফলে দ্বন্দ্বের তীব্রতা অনেক বেশি। উপন্যাসের ‘সূচনা’ থেকেই দ্বন্দ্বের উপস্থাপনা—

“দেখতে পাবেন ভাঙাগড়ায় বিচিত্র গ্রামখানিতে পুরাতন-নূতনের সমাবেশ।”

“এ সব দেখে থমকে দাঁড়াবেন না। নতুন গঠনের মধ্যে আশা আছে, ভবিষ্যৎ গড়ছে—সুতরাং মনে মোহের সঞ্চার হবে, স্বপ্ন জেগে উঠবে মনশ্চক্ষুর সম্মুখে; সেই স্বপ্নে ভোর হয়ে পড়বেন, আরোগ্য-নিকেতন পর্যন্ত যেতে আর মন উঠবে না।”

“শ্রীহীন গ্রাম দেবীপুর, দারিদ্র্যের ভারেই শুধু নিপীড়িত নয়, কালের জীর্ণতাও তাকে জীর্ণ করে তুলেছে। লক্ষ্য করলে দেখবেন—গ্রামের বসতির উপরে যে গাছগুলি মাথা তুলে পল্লব বিস্তার করে রয়েছে তার অধিকাংশই প্রবীণ, প্রাচীন, নতুন গাছের লাবণ্যময় শোভা কদাচিৎ চোখে পড়বে। জীবনের নবীনতার ধ্বজা হল নতুন সতেজ গাছের শ্যামশোভা।”

গণদেবতায় যেমন চণ্ডীমণ্ডপ, এখানে তেমনই ‘মশায়ের কোবরেজখানা’। একালে চণ্ডীমণ্ডপের যেমন ভগ্নদশা, আরোগ্য-নিকেতনেরও তেমনই দুরবস্থা—“এখন ভাঙা-ভগ্ন অবস্থা; মাটির দেওয়াল ফেটেছে, চালার কাঠামোটার কয়েক জায়গাতেই জোড় ছেড়েছে—মাঝখানটা খাঁজ কেটে বসে গেছে কুঁজো মানুষের পিঠের খাঁজের মতো। কোনো রকমে এখনও খাড়া রয়েছে—প্রতীক্ষা করছে তার সমাপ্তির; কখন সে ভেঙে পড়বে, সেই ক্ষণটির পথ চেয়ে রয়েছে।” এখানে আরোগ্য-নিকেতনের রূপক তাৎপর্য অস্পষ্ট থাকে না। আরোগ্য-নিকেতন ও জীবনমশায় দুজনেরই বিদায়ের কাল আসন্ন—‘জীর্ণ পতনোন্মুখ ঘরখানির’ মতো জীবনমশায়ও আজ ‘স্থবির, ধূলি-ধূসর—দিক্-হস্তীর মতো প্রাচীন।’ অথচ “সেকালে অর্থাৎ যখন আরোগ্য-নিকেতন প্রথম স্থাপিত হয়েছিল তখন ধারা ছিল অন্যরকম। দেশের অবস্থাও ছিল আর-এক রকম।” গোলায় ধান ছিল, গোয়ালে গাই ছিল, ভাঁড়ারে গুড় ছিল, পুকুরে মাছ ছিল। লোক এক হাতে পেট পুরে খেত—দুহাতে প্রাণ-পণে খাটত। দেহে ছিল শক্তি, মনে ছিল আনন্দ। সে মানুষেরাই ছিল আলাদা। একালের মতো জামা জুতো পরত না; হাঁটু পর্যন্ত কাপড় পরে অনাবৃত প্রশস্ত বক্ষ দুলিয়ে চলে যেত।” সেকালের জন্য এই দীর্ঘনিঃশ্বাস হয়তো একধরনের পিছুটানের জন্ম দেয়, লেখকের পক্ষপাত যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মনে পড়বে ‘আমার কালের কথা’র অন্তিম পরিচ্ছেদরি কথা—

আমার কাল সে-কাল আর এ-কালের সন্ধিক্ষণের কাল।

“আমার কালের কথা স্মরণ করতে গেলেই মনে পড়ে আমার কালের সে-কালকে। ধরাশায়ী বিশালকায় ঘনপল্লব বনস্পতি।….সে কালকে শ্রদ্ধা করি, প্রণাম করি, তার মহিমার কাছে আমি নতমস্তক। তার ত্রুটি-বিচ্যুতি অপরাধ, তার স্খলন আমি সবই জানি আমার পৈতৃক চরিত্রের ত্রুটির মত।….যে ত্রুটি জীবনে ছিল, তার প্রায়শ্চিত্ত করতে আদেশ দিয়ে গেছেন। তাই তো শ্রদ্ধা ছাড়া অবজ্ঞা বা ঘৃণা করতে পারি না সে-কালকে। তাই তো বলতে পারি না সে-কাল ছিল ভ্রান্ত।”

অথচ অন্যদিকে ‘আমার কালের অপদার্থ-নূতন-কাল’কে অস্বীকার করা যায় না। মনে পড়বে তরুণ জীবন দত্ত প্রবীণ জগদ্বন্ধু দত্তের কথা মতো ব্যাকরণ শেষ করে আয়ুর্বেদ পড়তে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন ডাক্তারি পড়তে, কারণ “দেশে তো ডাক্তারিরই চলন হতে চলল। কবিরাজিতে লোকের বিশ্বাস কমে যাচ্ছে।” কাজেই আয়ুর্বেদকে ধরে থাকা আর সম্ভব নয়। নতুন সতেজ গাছের শ্যামশোভাকে স্বীকার করে নিয়েই আরোগ্য-নিকেতন। তাই কবিরাজি ও এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার বিরোধ নয় (রঙলাল মুখুজ্যের কাছে ডাক্তারি শেখা সম্পূর্ণ না হলেও এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা পরিহার করেননি জীবনমশায়)—আরোগ্য-নিকেতন যখন স্থাপিত হয়েছে “তখন কালান্তর হয়েছে। এক নতুন কাল শুরু হয়েছে। দেশের কেন্দ্রস্থলে নগরে নগরে তার অনেক আগে শুরু হলেও এ অঞ্চলে তখন তার আরম্ভ।” শতাব্দীর সূচনা থেকেই পল্লীবাংলার পরিবর্তনের সূচনা—“দেশে সত্যই তখন ডাক্তারি অর্থাৎ এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা রাজকীয় সমারোহে রথে চড়ে আবির্ভূত হয়েছে। কলিকাতায মেডিক্যাল কলেজ, হাসপাতাল, বর্ধমান মেডিক্যাল স্কুল, জেলার সদরে সদরে হাসপাতাল, চ্যারিটেব্ল ডিসপেনসারি, ইংরেজ সাহেব ডাক্তার, দেশী নামজাদা ডাক্তারদের পোশাক গলাবন্ধ কোট, প্যাণ্টালুন, গোল টুপি, গার্ডচেন, বার্নিশ-করা কাঠের কলবাক্স; ঝকঝকে লেবেল-আঁটা সুন্দর শিশিতে ঝাঁঝালো রঙীন ওষুধ তৈরির সংক্ষিপ্ত প্রক্রিয়া সব মিলিয়ে সে যেন এক অভিযান।” জীবনমশায়ের কৈশোর ও যৌবনের সন্ধিক্ষণে এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া কোনো ব্যক্তিগত অভিমান বা উত্তেজনার প্রকাশ নয়—এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে ‘পুরনো কাল থেকে বাস্তব বর্তমানে’ যাত্রার ইতিহাস।

অবশ্য জীবনমশায় “সে আমলের ডাক্তার, তাও পাস-করা নয়। আসলে হাতুড়ে। এখনকার চিকিৎসা কত উন্নতি হয়েছে। সে সবের কিছুই জানে না।” “নিজের জীবনে আক্ষেপ থেকে গেল, ডাক্তারি পড়া তাঁর হয় নি। হলে—এ বয়সেও এ অস্ত্র  নিয়ে ব্যাধির সঙ্গে সংগ্রাম করতেন তিনি।” আসলে অন্য এক কালের মানুষ জীবনমশায়—রঙলাল ডাক্তারের সঙ্গে এই এক বিষয়ে তাঁর মিল আছে—“স্কুল কলেজে না পড়েও, বিস্ময়কর সাধনা। তেমনি সিদ্ধি।” জীবনমশায় ডাক্তারি, কবিরাজি, মুষ্টিযোগ কোনোটাই ছাড়েননি। এখানে তাঁর, হয়তো সেই ক্রান্তিকালের, সীমাবদ্ধতা। রঙলাল ‘ডাক্তার’ও ছিলেন ‘প্রচ্ছন্ন তান্ত্রিক’। শেষ পর্যন্ত জীবনমশায়ের জীবন ও মৃত্যু নিয়ে চিন্তা, তাও অনেকটা যেন রঙলাল ডাক্তারেরই পরিণাম— “এইবার শুধু পড়ব আর ভাবব। জীবন এবং মৃত্যু। লাইফ এ্যাণ্ড ডেথ, তার পিছনের সেই প্রচণ্ড শক্তি—তাকে ধারণা করবার চেষ্টা করব।”

১৯৫০ সালে জীবন দত্ত ‘সেকালের মানুষ’। কিন্তু এই সেকাল-একালের সীমারেখা সব সময় সাল তারিখের নিরিখে বিচার্য নয়। এখানে ব্যক্তিচরিত্রের বৈশিষ্ট্যের কথা ভাবতে হয়। রঙলাল ডাক্তার প্রথমদিকে জীবনমশায়কে বলেছিলেন, “তুমি যদি ডাক্তারি পড়তে হে! বড় ভালো করতে। তোমার মধ্যে একজন জাত চিকিৎসক রয়েছে। কবিরাজি শাস্ত্র  কিছু নেই একথা আমি বলছি না। কিন্তু আমাদের জাতের মতো শাস্ত্র ও কালের সঙ্গে আর এগোয় নি। যে কালে এ  শাস্ত্রর সৃষ্টি—চরম উন্নতি—সে কালে কেমিস্ট্রির এত উন্নতি ছিল না। তাছাড়া আরও অনেক কিছু আবিষ্কার হয় নি। তারপর ধরো, কত দেশ থেকে কত মানুষ আমাদের দেশে এসেছে। তাদের সঙ্গে তাদের দেশের রোগ এ দেশে এসেছে—জল বাতাস মারি পার্থক্যে চেহারা নিয়েছে। তাছাড়া আয়ুর্বেদ আগন্তুক ব্যাধি বলে যেখানে থেমেছে, ইউরোপের চিকিৎসা-বিদ্যা মাইক্রোসকোপের কল্যাণে জীবাণু আবিষ্কার করে অনুমান ও উপসর্গের সীমানা ছাড়িয়ে চলে এসেছে বহু দূরে এগিয়ে।” কিন্তু জীবনমশায়ের পক্ষে পুরোদস্তুর আধুনিক চিকিৎসক হওয়া সম্ভব ছিল না। শুধু মড়া-কাটা নিয়ে আপত্তিবোধ নয়, রোগ ও রোগীর সম্বন্ধে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে স্বতন্ত্র। এখানে পিতা জগদ্বন্ধুমশায়ের প্রভাব অপ্রতিরোধ্য—“তোমার বাবা তোমার ধাতুকে পুড়িয়ে পিটিয়ে শক্ত করে গড়ে গিয়েছেন—তাকে নতুন করে না গালিয়ে আর নতুন কিছু করা যাবে না।” তাই রঙলাল ডাক্তার ঠিকই বলেছেন, “তোমার ডাক্তারি শেখাটা বোধহয় ঠিক হল না জীবন। ওই সব বিচিত্র অবিশ্বাস্য মুষ্টিযোগ নিয়ে যদি গবেষণা করতে পারতে। কিন্তু তাও ঠিক পারতে না তুমি। তোমার সে বৈজ্ঞানিক মন নয়। কার্য হলেই তোমার মন খুশি। কেন হল—সে অনুসন্ধিৎসা তোমার মনে নেই।”

জগৎমশায় ছিলেন যথার্থ সেকালের মানুষ। “জগৎমশায় শিক্ষার মধ্যে বারবার উল্লেখ করতেন অদৃষ্টের, নিয়তির, ভগবানের; এবং সমস্ত বক্তব্যই যেন রোগবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা ছাড়াও অন্য এক ভাব-ব্যাখ্যা-জড়িত মনে হত, যেন কথার অর্থ ছাড়াও এক ভাব থাকত।” জগৎমশায়ের বিশ্বাসের জগৎ ভাববাদী দর্শনের সমর্থনপুষ্ট শুধু নয়, এরই মধ্যে রয়েছে ঐতিহ্য তথা অধ্যাত্মবোধের বীজ। যে নাড়িজ্ঞানের জন্য জীবনমশায়ের সুনাম বা দুর্নাম, তার পিছনে আছে জীবন ও মৃত্যু সম্বন্ধে এক বিশেষ ধারণা—“মৃত্যু অন্ধ, মৃত্যু বধির। রোগই তার সন্তানের মত নিয়ত তার হাত ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে নিয়ম—কাল। যার কাল পূর্ণ হয়, তাকে যেতে হয়। অকাল মৃত্যুও আছে। নিজের পাপে মানুষ নিজের আয়ুক্ষয় করে কালকে অকালে আহ্বান করে। আমাদের যে পঞ্চমবেদ আয়ুর্বেদ—তার শক্তি হল, কাল যেখানে সহায়ক নয় রোগের, সেখানে রোগকে প্রতিহত করা। রোগ এমন ক্ষেত্রে ফিরে যায়, তার সঙ্গে অন্ধ-বধির মৃত্যুও ফিরে যায়। কিন্তু কাল যেখানে পূর্ণ হয়েছে, সেখানে আক্রমণের বেগে নাড়ীতে যে স্পন্দন-বৈলক্ষণ্য দেখা দেয় তা থেকে বুঝতে পারা যায়, মৃত্যু এখানে কালের পোষকতায় অগ্রসর হচ্ছে। এমন কি কত ক্ষণ, কয় প্রহর, কয় দিন, কয় সপ্তাহ, পক্ষ বা মাসে সে গ্রহণ-কর্ম শেষ করবে, তাও বলা যায়—এই নাড়ী পরীক্ষা করে।” বলাবাহুল্য ‘কাল’ কোথায় পূর্ণ হয়েছে আর কোথায় হয়নি, সে সম্বন্ধে আয়ুর্বেদের নির্দেশ প্রাচীন কবিরাজেরা একভাবে গ্রহণ করতেন—এর মধ্যে তাঁদের নিজেদের ব্যাখ্যাও কিছুটা কাজ করতো, যেমন অতি প্রবীণ বা বৃদ্ধকে চির পঙ্গু অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। মৃত্যু যেখানে অপ্রতিরোধ্য, সেখানে মৃত্যুকে সহজভাবে গ্রহণ করার মধ্যে একধরনের বীরত্ব আছে ইত্যাদি। জগদ্বন্ধুমশায়ের এই বিশ্বাসের জগতের উত্তরাধিকার বর্তেছে জীবনমশায়ের উপর। কিন্তু জীবনমশায় সেকালের মূল্যবোধে লালিত হয়েও একালের মানুষ। তাই সত্তর বছর বয়সী জীবনমশায়ের সমস্যা জটিল, আর এই সমস্যা হয়তো জীবনমশায়ের একার নয়, তাঁর মতো আরও অসংখ্য মানুষের, যারা প্রাচীন-নবীনের দ্বন্দ্বে জর্জর।

মতির মায়ের পা ভেঙেছে—জীবনমশায়ের মনে হল মতির মায়ের এবার যাওয়াই ভালো। এখানেই আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা তথা হাসপাতালের ডাক্তারের সঙ্গে তাঁর প্রথম বিরোধ বাধলো। প্রদ্যোৎ বোসের মনে হয়েছে এই ‘নিদান হাঁকা’ হল ‘ইনহিউম্যান—অমানুষিক।’ কিন্তু একালে চিকিৎসা শুধু ব্যয়বহুল তাই নয়। আধুনিক নানা পরীক্ষা বা সার্জারির সুযোগও গ্রামের মানুষ পায় না। তাই কিছুটা নিরুপায় হয়েই রাণার মতো মানুষেরা জীবনমশায়ের আশ্রয় নেয়।—“দরিদ্র দেশ, দরিদ্র মানুষ, টাকা পাবে কোথায় ? ডাক্তারেরাই বা করবে কী ? তারাই বা খাবে কী ?” এমনকি প্রদ্যোৎও  জানে, “দরিদ্র মানুষ—সরল গ্রামবাসী অসহায়ভাবে সর্বস্বান্ত হয়ে এই লোলুপতার খড়েগর নিচে ঘাড় পেতে দিতে বাধ্য হচ্ছে। শুধু দামই নয়, বাকির খাতায় বাকি বেড়েই চলে। এদের পীত পাণ্ডুর চোখের দৃষ্টি দেখলে প্রদ্যোতের করুণাও হয়, রাগও ধরে। এক এক সময় মনে হয়—মরুক, এরা মরুক, মরে যাক। শেষ হয়ে যাক! নির্বোধ মূর্খেরা নিজেদের অজ্ঞতা মূর্খতা নির্বুদ্ধিতা কিছুতেই স্বীকার করবে না।” জীবনমশায় এদের ছাড়তে পারেন না, এরাও জীবনমশায়কে ছাড়বে না। মতির মাকে নিদান হাঁকার জন্য প্রবল আলোড়ন হয়, জীবনমশায় ভাবেন, “কী বলবেন ? আমল পালটেছে, চিকিৎসা-শাস্ত্র এগিয়ে গিয়েছে। তিনি পিছিয়ে পড়েছেন। নইলে—আগের চিকিৎসা অনুযায়ী তাঁর নিদান ভুল নয়, বুড়ির যাওয়ার কথা, নিশ্চয় যাওয়ার কথা এই আঘাতের ফলে। তবে একালের সার্জারির উন্নতি, এক্সরে আবিষ্কার এ সব তাঁর অজানা নয়; কিন্তু সে চিকিৎসা ব্যয়সাধ্য। তাই সে হিসেব তিনি করেন না। আর একটা কথা,—বুড়ির এই সময় যাওয়াটা ছিল সুখের যাওয়া, সমারোহের যাওয়া। স্বেচ্ছায় যাওয়াই উচিত। তাঁর বাবা বলতেন—।”

গ্রামে মানুষ অনেক অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে জীবন কাটায়—কবচ-মাদুলি জরিবুটি চরণামৃতের উপর তাদের একান্ত নির্ভরতা। এর মধ্যে মূর্খতা নির্বুদ্ধিতা থাকতে পারে, কিন্তু অর্থনৈতিক দুরবস্থা অনেক সময় আত্মপ্রতারণার কারণ। (রাণা কেন হাসপাতালে যায় না তার কারণ সবিস্তারেই বর্ণনা করা হয়েছে)। অন্যদিকে আধুনিক চিকিৎসক নব্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাহায্যে কবিরাজের দেওয়া ‘নিদান’ কে ব্যর্থ করতে সক্ষম—“নতুন কাল। বিজ্ঞানের যুগ। অদৃষ্ট নিয়তি নির্বাসনের যুগ। ব্যাধিকে জয় করবে মানুষ। মৃত্যুর সঙ্গে সে যুদ্ধ করবে। মৃত্যুর মধ্যে অমৃত খুঁজেছে মানুষ—অসহায় হয়ে। এবার জীবনের মধ্যে অমৃত সন্ধানের কাল এসেছে। একালে অনেক আয়োজন চাই। অনেক কিছুর আয়োজন। সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন—এই লোকগুলির নির্বাসন। এই জীবনমশায়দের। নিদান! নিদান! মৃত্যুর সঙ্গে যেন একটা প্রেম করে বসে আছে এদেশ! গঙ্গার ঘাটে গিয়ে জলে দেহ ডুবিয়ে মরাই এখানে জীবনের কাম্য। মতির মায়ের এক্সরের রিপোর্ট পেয়ে প্রদ্যোৎ যেন প্রেরণা পেয়েছে একটা।…..সেই রিপোর্ট পড়ে প্রদ্যোতের মুখে ব্যঙ্গ হাস্য ফুটে উঠেছিল—তার সঙ্গে বিরক্তিও জমা হয়েছিল। পড়ে গিয়ে বুড়ীর একটা পায়ের গাঁঠে আঘাত লেগেছে, খানিকা হাড়ের কুচি ভেঙে সেখানে থেকে গিয়েছে, সেই হেতুই বৃদ্ধার এই অবস্থা। ওই জায়গাটা কেটে হাড়ের কুচিটাকে বের করে দিতে হবে এবং হাড়ের যদি আর কোনো অংশ বাদ দিতে হয় দিতে হবে, দিলেই বুড়ি সেরে উঠবে। এতে আশঙ্কার কোনো কারণ নেই।”

অন্যান্য অনেক পদ্ধতির মতো চিকিৎসাপদ্ধতিও পরিবর্তিত হয়। এদিক থেকে মানবজ্ঞানের অন্য অনেক ক্ষেত্রের মতো চিকিৎসাবিজ্ঞানও সমাজতত্ত্বের অঙ্গ—একথা তারাশঙ্কর জানতেন। একশো বছর আগের চিকিৎসাপদ্ধতি একশো বছর পরে অচল। কিশোর যখন বলে, “ইনিই আমাদের মশায়। তিন পুরুষ ধরে এখানকার আতুরের মিত্র। আতুরস্য ভিষঙমিত্রং। এই ভাঙা আরোগ্য-নিকেতনই একশো বছরের কাছাকাছি আমাদের হেল্থ সেণ্টার ছিল,” তখন তার মধ্যে শুধু অতীত-প্রীতির প্রকাশ নয়, সমাজেতিহাসের এক দিক ধরা পড়ে। অন্যদিকে জীবনমশায় কৈশোরে একদিন যেমন পৈতৃক কবিরাজি চিকিৎসা ছেড়ে আধুনিক এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা শিখতে চেয়েছিলেন, তেমনই জীবনের প্রান্তভাগে পৌঁছেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি সশ্রদ্ধ মনোভাব প্রকাশ করেছেন। উপন্যাসের মধ্যে বারবার তাঁর মুখে এই ধরনের কথা শুনি— “সে নাড়ি দেখার আমল চলে গিয়েছে রতন। এ আমল এ কাল আলাদা। আজ কত ওষুধ কত চিকিৎসা আবিষ্কার হয়েছে। এখন কি আর সে আমলের বিদ্যেতে চলে ? ধরো ম্যালেরিয়ার জ্বর, আমার বিদ্যেতে ন দিনে জ্বর ছাড়বে, কিন্তু এখন ইনজেকশন বেরিয়েছে, প্যালুড্রিন এসেছে, তিন দিনে জ্বর ছেড়ে যাচ্ছে। টাইফয়েড দেখে আমরা বলব আঠারো দিন, একুশ দিন, আটাশ দিন, বত্রিশ দিন, আটচল্লিশ দিন। অথচ নতুন ওষুধে দশ-বারোদিনে জ্বর ছেড়ে যাবে। আজ নাড়ি দেখে আমি কী বলব ? আজতো ডাক্তারেরা আসছেন, তাঁদের জিজ্ঞাসা করো।” “মৃত্যুকে জয় করা যাবে না, কিন্তু মানুষ অকাল মৃত্যুকে জয় করবে। নিশ্চয় করবে। ধন্য আবিষ্কার! ইউরোপের মহাপণ্ডিতদের প্রণাম করেছিলেন। হ্যাঁ—আজ বেদজ্ঞ তোমরাই!” “কীর্তিমান যোদ্ধা প্রদ্যোৎ ডাক্তার। এযুগের আবিষ্কার বিচিত্র বিস্ময়কর। আর না। তাঁর কাল গত হয়েছে। আর না। কালকের সংকল্পটা মনে মনে দৃঢ় করলেন তিনি। আর না।” উপন্যাসে জীবনমশায়ের সাধনা ও সিদ্ধির পাশাপাশি প্রদ্যোৎ ডাক্তারের নিষ্ঠা ও শক্তির কথাও বলা হয়েছে। তারাশঙ্কর বলবেন “আমার সেকাল আর একালের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নাই। চিরকল্যাণের এক ধারা তার মধ্যে আমি দেখতে পাই। কোন কালে ওপারে ফুটেছে ফুল—কোন কালে এপারে ফুটেছে ফুল। আমি সকল কালের সকল ফুলের মালা গেঁথেই পরাতে চাই মহাকালের গলায়।”

কিন্তু তা কি সম্ভব ? প্রদ্যোৎ ডাক্তার ও জীবনমশায়ের বিরোধের মধ্য দিয়ে নবীন ও প্রবীণের সংঘাত দেবীপুর গ্রামে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, তার সামাজিক-ঐতিহাসিক তাৎপর্য কি তারাশঙ্কর ধরতে পেরেছেন ? তারাশঙ্কর দেখেছেন এই বিরোধ সমাজতত্ত্বের সংঘাত-সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে এক অনিবার্য পরিণামের দিকে অগ্রসর হয়েছে। বিশ শতকের শেষ পাদেও সমাজতাত্ত্বিক কারণেই অতীত বিশ্বাস ও মূল্যবোধের বিলুপ্তি ঘটেনি, অন্যদিকে আধুনিক বিজ্ঞান এখনও ভারতবর্ষের মাটিতে দৃঢ়মূল হল না (মাদুলি কবচ পাথরের হাত থেকে মুক্তি কোথায় ?)। জীবনমশায় বয়সে প্রবীণ হলেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানকে কখনও অগ্রাহ্য করেননি— “এ চিকিৎসা-শাস্ত্র বিপুল গতিবেগে এগিয়ে চলেছে। অণুবীক্ষণ যন্ত্র খুলে দিয়েছে দিব্যদৃষ্টি। বীজাণুর পর বীজাণু আবিষ্কৃত হচ্ছে। রোগোৎপত্তির ধারণায় আমূল পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। আজ সবই প্রায় আগন্তুক ব্যাধির পর্যায়ভুক্ত হয়ে গেল। সবের মূলেই বীজাণু। বীজাণু জীবাণু, কৃমিজাতীয় সূক্ষ্মকীট—তারপর আছে ভাইরাস। খাদ্যে জলে বাতাসে তাদের সঞ্চরণ। মানুষের দেহে তাদের প্রবল বিস্তার। ….প্রতি জ্বরের কারণ আজ ওরা অণুবীক্ষণে প্রত্যক্ষ করছে। কত নতুন জ্বর। এইতো কালাজ্বর ধরা পড়ল তাঁর আমলেই। কালাজ্বরের ওষুধ ব্রহ্মচারী সাহেবের ইনজেকশন। প্রণ্টুসিল, সালফাগ্রুপ, তারপর পেনিসিলিন, টেরামাইসিন, ওষুধের পর নতুন ওষুধ।” তিনি জানেন রাণাকে সারাতে পারতো প্রদ্যোতেরা। শুধু মতির মা নয়, অহি সরকারের নাতিকে বাঁচিয়েছে প্রদ্যোৎ ডাক্তার।

কবিরাজি চিকিৎসা আর এ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা, এমনকি অবৈজ্ঞানিক সংস্কার আর বৈজ্ঞানিক বুদ্ধির বিরোধ বর্ণনা তারাশঙ্করের উদ্দেশ্য ছিল না। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় প্রথম প্রকাশকালে উপন্যাসের নাম ছিল ‘সঞ্জীবন ফার্মাসী’, পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশকালে নতুন নামকরণ আরোগ্য-নিকেতন কোনো আকস্মিক ব্যাপার নয়। আসলে সঞ্জীবন তথা আরোগ্য সম্বন্ধে ধারণার মধ্যেই বিরোধের বীজ নিহিত আছে। জগদ্বন্ধুমশায় বলতেন ‘লাভানাং শ্রেয় আরোগ্যম্’। —এ লাভ পয়সার লাভ নয়, অথচ ওটাই সংসারের শ্রেষ্ঠ লাভ। জগদ্বন্ধুমশায়ের ভাষায “এক পক্ষের লাভ আরোগ্যলাভ, অন্যপক্ষের লাভ সেবার পুণ্য….বিশ্বসংসারে আরোগ্যলাভই হল শ্রেষ্ঠ লাভ।” প্রদ্যোৎ ডাক্তার এক সময় বলেছে, “আপনার কাছে হয়তো আমার ত্রুটি হয়ে থাকবে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, সে আমি ইচ্ছে করে করি নি। আপনার চিকিৎসাপদ্ধতি আর আমার পদ্ধতিতে অনেক প্রভেদ। আমার মত ছেড়ে আপনার মতে আমি বিশ্বাস করতে পরি নি। তাতে আমাকে বিব্রত হতে হয়। আমার চিকিৎসা করা চলে না। তবে হ্যাঁ—মতির মায়ের নিদান হাঁকার কথা শুনে আর ওর সেই কান্না দেখে আমার রাগ হয়েছিল। আজ অবশ্য দেখলাম—মতির মা মরলেই ওর পক্ষে ভালো হত। কিন্তু আমরা তো ঠিক ওই চোখে দেখি না।” এখানে চিকিৎসাপদ্ধতির কথা বলা হলেও সেটা বড়ো কথা নয়, রোগ ও রোগীকে চিকিৎসক কোন্ চোখে দেখেন সেটাই বড়ো কথা। জীবনমশায়ের দৃষ্টিভঙ্গিকে একালের ডাক্তার মানতে পারেন না—“আমরা সেকালে ওই চোখেই দেখতাম। বিশেষ করে পরিণত বযসের রোগী হলে, আর রোগ কঠিন হলে রোগের যন্ত্রণা উপশমের চেষ্টাই করতাম, মৃত্যুর সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে বাঁচাবার চেষ্টা করতাম না। বলে দিতাম, ইঙ্গিতেও বলতাম, স্পষ্ট করে বলতাম, আর কেন ? অনেক দেখলে, অনেক ভোগ করলে, এইবার মাটির সংসার থেকে চোখ ফিরিয়ে উপরের দিকে তাকাও। সাধারণ মানুষ আকাশের নীলের মধ্যে তো ধরবার কিছু পায় না,  তাই বলতাম তীর্থস্থলে যাও, সেখানকার দেবতার মন্দিরের চূড়ার দিকে তাকিয়ে বসে থাক। তবে অবশ্য যে প্রবীণ,  যে বৃদ্ধবয়সেও বহুজনের আশ্রয়, বহু কর্মের কর্মী, তাকে বাঁচাতে কি আর মরণের সঙ্গে লড়ি নি ? লড়েছি।”

“মশায়ের সাহায্যের চেয়ে ভালবাসা বড়”—প্রদ্যোৎ ডাক্তারের মুখে একথা শুনেছি, অবশ্য সেই সঙ্গে—“ওটা বোধহয় প্রবীণের ধর্ম।” এই ভালোবাসা দিয়েই গড়ে উঠেছিল জীবনমশায়ের আরোগ্য-নিকেতন। কিন্তু আরোগ্য-নিকেতন ভেঙে চ্যারিটেব্ল ডিসপেনসারি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, তারপর হাসপাতাল—সমাজবিবর্তনের এই অনিবার্য প্রক্রিয়া তারাশঙ্কর জানেন—” এখানে দেখবেন বিচিত্র দৃশ্য। নতুন বাড়িঘর, একেবারে নতুন কালের ফ্যাশ্যন, নতুন কালের ইঞ্জিনীয়ারিং-এর নিদর্শন। ক্যানেল আপিস তৈরি হয়ে গেছে। আশেপাশে ছোট ছোট কোয়ার্টার। এদিকে নতুন ক্যানেল তৈরি হচ্ছে। এর পরই পাবেন আর এক দফা বাড়ির সারি; গুটিকয়েক ছোট ইমারতকে ঘিরে বড় বড় ইমারত তৈরি চলেছে। চারিদিকে ভারা বাঁধা, রাজমজুর খাটছে, মজুরনীরা গান গাইছে আর ছাদ পিটছে। হ্যাট-কোট-প্যণ্ট-পরা ইঞ্জিনীয়ার ঘুরছে সাইকেল হাতে নিয়ে। ওই ছোট বাড়িগুলি এখানকার হাসপাতাল। ছোট হাসপাতাল, ডাক্তার-কম্পাউণ্ডারের ছোটখাটো দুটি কোয়ার্টার; আরও ছোট কয়েকটি কাঁচা-বাড়ির বাসা, এখানে থাকে নার্সেরা। একটু দূরে একটা ছোট ঘর দেখবেন—সেটা মোতিয়া ডোমের বাড়ি। আর ওই অর্ধসমাপ্ত বড় ইমারত—ওটিও হাসপাতালের ইমারত, এ অঞ্চলের স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে।” অর্থাৎ এক কথায় পল্লীবাংলায় “চারিদিকে দেখতে পাবেন কালান্তরের সুস্পষ্ট পরিচয়।” কিন্তু কালান্তরের গতিপ্রবাহে তারাশঙ্কর নিজেকে মিলিয়ে নিলেও তাকে যথোপযুক্ত নাট্যরূপ দিতে পারেন না। রূপকধর্মী রচনার এই সীমাবদ্ধতা আরোগ্য-নিকেতন-এর মতো উপন্যাসের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে স্মরণীয়। সেই সঙ্গে বিষয়ের সঙ্গে বিষয়ীর দূরত্ব রক্ষা—আরও কঠিন কাজ। এ যেন লেখকের নিজেরই দীর্ঘশ্বাস—“দিন যায়, ফেরে না। দিনের সঙ্গে কাল যায়। কালের সঙ্গে গতকালকার নূতনের বয়স বাড়ে, পুরনো হয়, জীর্ণ হয়, যা জীর্ণ তা যায়। তাঁর খ্যাতিও গিয়েছে। তাতে আক্ষেপ নেই, কিন্তু দুঃখ একটু হয় বৈ কি। উপেক্ষা সহ্য হয় না। তাঁকে উপেক্ষা করলেও তিনি দুঃখ পেতেন না। এ যে বিদ্যাকে উপেক্ষা!” কিন্তু বৃদ্ধ জীবনমশায়ের এই পরিণাম যুগান্তরের অনিবার্য পরিণাম, এ নিয়ে ট্রাজেডি রচনা করা যায় না। অথচ তারাশঙ্কর জীবনমশায়ের ব্যক্তিজীবনের মধ্যে সামাজিক ট্রাজেডিকে প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছেন, “সেই অন্ধকারের মধ্যে তিনি আরণ্যগজের মতো বেরিয়ে পড়েন মৃত্যুগহ্বরের সন্ধানে। জনহীন দিকহারা প্রান্তর খাঁ-খাঁ করছে, অথবা গভীর নিবিড় মহা অরণ্য থম থম করছে; অসংখ্যকোটি ঝিল্লীর ঐকতান ধ্বনিত হচ্ছে; মৃত্যুর মহাশূন্যতার মধ্য দিয়ে জীবনপ্রবাহ চলেছে জন্ম থেকে জন্মান্তরে; সেইখানে উল্লাসধ্বনি করে সেই মহাগহ্বরে ঝাঁপ দিয়ে পড়েন নবজন্মের আশায়।” বলাবাহুল্য, এ প্রয়াস সার্থক হয়নি। মৃত্যুরূপী নায়িকার সঙ্গে নায়ক জীবনমশায়ের মিলন যেন আরোপিত তত্ত্বের ভারে ইতোভ্রষ্ট ততো নষ্ট। আরোগ্য-নিকেতন উপন্যাসে যুগান্তরের স্বরূপসন্ধান তাৎপর্যপূর্ণ, কিন্তু উপন্যাস হিসেবে পাঠকের অতৃপ্তির কারণ।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev