ভারতের ‘আচ্ছে দিনে’র সরকারের বদান্যতায় ২০২৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি গরুর গলা জড়িয়ে ধরে গো-প্রেমিকদের প্রেমদিবস উদযাপনের কথা ছিল। সারা দেশ জুড়ে এমনটা করতে হবে বলে তেমনটাই সরকারি নির্দেশিকাও জারি হয়েছিল। ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ মন্ত্রগুণে হয়তো হঠাৎ-মনে এল, গরু যদি গুতোয়? তখন! তাই ‘চৌকিদারি’ পরামর্শে গরুর সঙ্গে গলাগলি করার ফরমান শেষ মুহূর্তে তুলে নেওয়া হয়। এই অবসরে নবাবি জেলা মুর্শিদাবাদের শহর বহরমপুর এবারের প্রেমদিবসটাকে ভিন্ন আঙ্গিকে, দীর্ঘকাল স্মৃতিরত্ন হিসাবে মনের মণিকোঠায় সুসংরক্ষিত করে রাখার মতো অনবদ্য প্রচেষ্টায় বিভোর থাকল। একটি হল পাঁচদিন ধরে অভূতপূর্ব আন্তর্জাতিক চিত্রপ্রদর্শনী। অন্যটি কলকাতা প্রেসক্লাব ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে সাংবাদিকতা বিষয়ে প্রথাবহির্ভূত ভাবে তিনদিনের এক অনবদ্য কর্মশালা।

এই নবাবি শহরের শক্তিমন্দির ক্লাবের মাঝারি মাপের ময়দান জুড়ে ম্যারাপ বেঁধে, শামিয়ানা টাঙিয়ে, দেশ-বিদেশের শখানেক শিল্পীর প্রায় দুশোটি ছবি ও ফটোগ্রাফ টাঙিয়ে বহরমপুরের ‘প্যাপিলিও পেইন্টার্স’-এর যোদ্ধাশিল্পীরা ১০-১৪ জানুয়ারি রসপিপাসুদের মাতিয়ে রাখেন। তাঁদের এই শিল্পসাধনায় মুগ্ধ হয়েছেন, আপ্লুত হয়েছেন আগত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রকর ও ভাস্কর আদিত্য বসাক, বিমল কুণ্ডু, প্রদীপ মৈত্র, সোমনাথ মাইতি, অতনু ভট্টাচার্য, কিঙ্কর ঘোষ, নির্মল সাহা, এমসি যোশী প্রমুখ। এ ছাড়াও ছিলেন ফ্রান্স, বাংলাদেশ, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান, জার্মানি, ইন্দোনেশীয় ও আমেরিকা শিল্পীদের।
ইংরেজদের শাসনামল থেকে আর্থিকভাবে ও শিক্ষগত দিক থেকে মুর্শিদাবাদ পিছিয়ে পড়া জেলা, এমন একটি প্রচলিত তকমা নিয়ে বেঁচে আছে। সেই তকমার ঘাড়ে অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্যের উল্কি এঁকে দিয়ে বাজিমাৎ করল এই তৃতীয় আন্তর্জাতিক চিত্রপ্রদর্শনীর রাজসূয়োযজ্ঞ।

প্রদর্শনযোগ্য চিত্র নির্বাচনে উদ্যোক্তারা ছিলেন দিলদরাজ। মুক্তবুদ্ধির সাধক। ঢাউস ক্যানভাসে প্রৌঢ় শিল্পী সলিল দাসের আঁকা মোদী-যোগী লালিত পুরাণ আশ্রয়ী কৃষ্ণ, অর্জুন, বিশ্বদর্শন-সহ মহাকাব্য মহাভারতের নানা ঘটনা শোভা পেয়েছে প্রদর্শনীতে। ফের তাকেই যেন আবার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে নবীন শিল্পী সুজিত মণ্ডলের আঁকা ‘গদি শেঠ’ নামের হালের ‘গোদি মিডিয়া’র অভব্যতা, অশ্লীলতা, অসত্য ও অসাম্যের যাপনচিত্র। লোহালক্কড় দিয়ে শিল্পী মৃগাঙ্ক মণ্ডলের রচিত ইন্সটলেশন দেখে কোনও দর্শকের মনে পড়েছে বিশ্বভারতীতে রক্ষিত রামকিংকর বেইজ নির্মিত ‘কলের বাঁশি’র ভাস্কর্যের কথা। দূরে অতিদূরে বনাঞ্চল ভেদ করে গগনচুম্বি ইটভাটার ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখে বাষ্পচালিত রেলগাড়ি বলে প্রথম দর্শনে বিভ্রম হওয়াই স্বাভাবিক। ফটোগ্রাফার রাজকুমার পালের লেন্স, আলো ও এক্সপোজারের এমনই মুন্সিয়ানা। কলিমুদ্দিন শেখ হাতুড়ি আর বাটালি দিয়ে আস্ত একটা তালগাছের শিকড়সুদ্ধ গুড়িকে কেটে কেটে আফ্রিকার আদিবাসীর জন্ম এমন সুচারু ভাবে দিয়েছেন যে অতিব্যস্ত দর্শকের পক্ষেও দু’ দণ্ড না থেমে উপায় থাকেনি।

মিঠু মণ্ডল পাখিরা আঁকা ‘ট্রি’ সংগোপনে দর্শক মনের গহীন জুড়ে অধিকার করেছে প্রকৃতির শান্ত সমাহিত বিশালত্ব। ‘ট্রি’র বদলে ‘নৈশব্দ’, বা ‘প্রশান্ত’ বলে ডাকলে কি ভুল হবে? প্রদর্শিত প্রায় সব ছবিই নান্দনিকতার বিচারে একে অপরকে টেক্কা দিয়েছে। সুদ্ক্ষ ও ডেডিকেটেড একদল শিল্পীর দলনেতা, তথা প্যাপিলিও পেইন্টার্সের মুখপত্র ‘প্রাহ্ণ’ এর সম্পাদক সুগত সেন এই আয়োজনের ভগীরথ। কবি, গায়ক, লেখক, নাট্যকর্মী ও চিত্রকর সুগত নানা গুণে গুণী। প্রর্দশনীর শেষদিনে, অর্থাৎ প্রেমদিবসে মঞ্চে পাওয়ার পয়েন্ট, ডিজিট্যাল পেনসিল ও স্লেট, সঙ্গে মাইক্রোফোন নিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের প্রতি চিত্রপ্রেম বিলিয়েছেন সগত, মানে বহরমপুরে শুভ। তিনি রেখায়, চিত্রে ও অনুনকরনীয় বাচনভঙ্গিতে সত্যজিৎ রায়ের স্বল্পালোচিত আলতা-তেল-বোরোলীনের বিজ্ঞাপন, সিনেমা চারুলতার পোস্টার, ‘দেশ’ এর নামাঙ্কন, পাগলা দাশুর প্রচ্ছদের মতো অজস্র সৃষ্টি ও সৃষ্টির কাহিনি তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন। সুগত সেনের প্রজেন্টেশন ‘সত্যজিৎ রায়ের চিত্রচর্চা’র পাশাপাশি আত্মমগ্ন তরুণ শিল্পী কার্তিক পালও তাঁর নিজের আঁকা ও বিশ্বখ্যাতদের আঁকা ছবি দেখিয়ে ও আলোচনা করে, জলরঙে আঁকা ‘জলছবি’র মাহাত্ম্য বর্ণনা করে তিনি তাঁর আাগামিদিনের সম্ভবনার কথা উসকে দিয়েছেন।

এই আনন্দযজ্ঞের পাশাপাশি শক্তিমন্দির মাঠ থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে মুর্শিদাবাদ জেলার সাংবাদিকদের নিয়ে শিল্পতালুকে ইউনিসেফ ও কলকাতা প্রেস ক্লাবের ষৌথ উদ্যোগে ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারি তিন দিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়েছে কর্মশালা। ১৯৯০ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজের পিটি হলে সাংবাদিক নাজেস আফরোজ পরিচালিত কর্মশালায় আমার প্রথম প্রবেশ। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আনন্দবাজার পত্রিকার জেলা সাংবাদিকদের ঘণ্টা দুয়েকের কর্মশালায় ছিলেন সাংবাদিক সুমন চট্টোপাধ্যায়, রজত রায়, সুদীপ্ত সেন ও হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়দের মতো খ্যতিমান এক ‘গণ্ডা মিডিয়া-মাস্তান’। বছর চারেক আগে বহরমপুরে প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (পিআইবি) মুর্শিদাবাদ জেলার সাংবাদিকদের নিয়ে ‘বার্তালাপ’ নামে একটি কর্মশালা করেছিল। সেখানেও ছিলাম। কয়েক মাস আগে বহরমপুর টেক্সটাইল কলেজ হলে ‘মুর্শিদাবাদ জেলা সাংবাদিক সংঘ’ আয়োজিত কর্মশালায় বক্তা ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক স্বাতী ভট্টাচার্য। প্রায় ৩৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে এ রকম ডজনখানেক কর্মশালায় থেকেছি। কিন্তু ১৯৯৬ সালের সুমন চট্টোপাধ্যায়ের আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি প্রেসক্লাব ও ইউনিসেফ পরিচালিত তিনদিনের কর্মশালা ছিল অনন্য।

আরও নির্দিষ্ট করে বললে বলতে হয়, প্রেমদিবসের কর্মশালা এ তাবৎ কালের মধ্যে আনপ্যারালাল। ১৩-১৫ ফেরুয়ারি তিন দিনের এই আবাসিক কর্মশালায় সাংবাদিকদের থাকা ও খাওয়ার খরচ বহন করেছে উদ্যোক্তা সংস্থা ইউনিসেফ ও কলকাতা প্রেসক্লাব। ইউনিসেফ বলে কথা। তাই, জাস্ট কৌতুহলবশত ১৪ ফেব্রুয়ারি অংশগ্রহণ করি। পরে বুঝলাম, অংশগ্রহণ না করলে ঠকে যেতাম। উদ্যোক্তাদের সুচারু আয়োজন করেছিলেন আকাশবাণী ও দুরর্দশনের মুর্শিদাবাদ জেলার প্রতিনিধি মামুন ফারুক এবং এবিপি আনন্দের মুর্শিদাবাদ জেলার প্রতিনিধি রাজীব চৌধুরী। এসেছিলেন কলকাতা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও অধ্যাপক স্নেহাশিস শূর, সহ-সভাপতি শৈবাল বিশ্বাস, বরিষ্ঠ সাংবাদিক পুলকেশ ঘোষ, সাংবাদিক অন্বেষা ব্যানার্জী, অধ্যাপক উমশঙ্কর পাণ্ডে, নিতাই মালাকার, মনশ্রী মাইতি। এবং ইউনিসেফের পক্ষে ছিলেন খ্যাতনামা সাংবাদিক সুচরিতা বর্ধন।
সাংবাদিকতা কী, কেন সাংবাদিকতা করব, কী ভাবে করব, ইত্যাকার যাবতীয় দিক সম্পর্কে অতিঅল্প সময়ের মধ্যে স্নেহাশিস শূর খুব প্রাঞ্জল ভাষায়, খুব দরদের সঙ্গে, আন্তরিক ভাবে আলোচনা করেন। গত শতাব্দীর আটের দশকে গৌরকিশোর ঘোষ সম্পাদিত আজকাল পত্রিকার ‘গণবাদী’ মেজাজ মিলেছিল স্নেহাশিস শূরের সহজ, সরল ও আন্তরিক আলোচনায়। এমন পথনির্দেশিকা আত্তীকরণ করতে পারলে সৎ সাংবাদিক হতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ১২ তারিখ, প্রথম দিনেই জেলার সাংবাদিকদের নিয়ে মানবপাচার, বাল্যবিবাহ ও অপুষ্টির মতো বিষয়ভিত্তিক গ্রুপ করা হয়।

১৪ ফেব্রুয়ারি সেই গ্রুপগুলো তাদের বিষয়গুলো পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে প্রেজেন্টে করে। মানবপাচার বিষয়ে অন্বেষা তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। সুচরিতা, পাণ্ডে এবং মনশ্রী মাইতি বিরামহীন ঘড়ির মতো জেলা সাংবাদিকদের মগজে সাংবাদিকতার নিত্যনতুন পাঠ পুরে দিতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। ফেক নিউজ বুঝতে বর্ষিয়ান সাংবাদিক পুলকেশ প্রশিক্ষণ দেন। তবে এই পর্বে সময় ছিল প্রয়োজনের তুলনায় স্বল্প। এক শ্রেণির শিক্ষক ১০টা-৫টা স্কুল আর রুটিন মাফিক ক্লাস নিয়েই নিজের মাস মাইনের দায় সারেন। আর এক রকমের শিক্ষক আছেন, তাঁরা পড়ুয়ার বাড়ি ধাওয়া করেও হালহকিকত জেনে নেন, লেখাপড়ায় অসুবিধা হলে তাঁদের কাছে পড়ুয়াদের যেতে তাগাদা দেন। স্নেহাশিস, সুচরিতা ও উমাশঙ্করদের টিমটি দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষকগোত্রীয়। ইতিপূর্বে আর কোনও কর্মশালায় এমন আকূতি দেখিনি।
কর্মশালার পর্যালোচনা করতে পোডিয়ামে উঠে, আগে জানলে আরও ভাল করতে পারতেন বলে রাজীব চৌধুরী ঘোষণা দেন। ত্রুটিহীন অনুষ্ঠানকে আরও কী ভাবে ভাল করতেন তার নমুনা তিনি পরক্ষণেই পেশ করেন। তিনি বলেন, “এ জেলায় ৮০ বছর বয়সি জেলা সাংবাদিক সংঘকে ভবিষ্যতে এ রকম উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা যায় কিনা…।” মূলত জেলার সাপ্তাহিক ও পাক্ষিকদের নিয়ে গঠিত এই সংঘের কার্যত কোনও কার্যকারিতা সাম্প্রতিক কালে দেখা যায় না, বয়সের অভিজ্ঞাজনিত প্রাজ্ঞতার বদলে বার্ধক্যে ভুগতে থাকা সংঘ যখন মৌরুসিপাট্টা খোয়ানোর ভয়ে নতুন সদস্যপদ দিতে বীতরাগ, তখন সেই সঙ্ঘের দখলদারি ছাড়া আর কী দেওয়ার আছে? সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী ও ‘অনীক’ পত্রিকা সম্পাদক অধ্যাপক দীপঙ্কর চক্রবর্ত্তীর নেতৃত্বে এ জেলায় গড়ে ওঠা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ও বইমেলা একদা সংখ্যা ও ফন্দির জোরে বেহাত হয়ে যায়। ঘরপোড়া গরু তাই ভবিষ্যতে সংঘের সংযুক্তির প্রস্তাবের সিঁদুরে মেঘ দেখে ডরায়! ফলে দুষ্টু এঁড়ের চেয়ে শূন্য গোয়াল ঢের ভাল।