প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্যের তখন অল্প বয়স। তাঁর কলেজ স্ট্রিটের স্টুডিয়োতে এসেছিলেন ‘নবজীবনের গান’-স্রষ্টা কিংবদন্তী শিল্পী জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র। সেদিন স্টুডিয়োয় বেজেছিল বীটোফেনের সিমফনি। একদিকে ছবি আর অন্য দিকে সুর-মূর্ছনার মধ্যে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র একটি কবিতা রচনা করেন। শিরোনাম ‘শ্রীমান শুভাপ্রসন্নকে’। ‘…দিকে দিকে/ আকীর্ণ ধূসর-রং- তার ওপারেই সূর্য/ বর্ণ ঢালে পাহাড়ে পলাশে-/ প্রাগৈতিহাসিক সত্তার কত বিচিত্র আভাসে!/ এ সবই বিচিত্র রং- স্বরলিপি যেন-/ বর্ণে বর্ণে মৃত্তিকার মনের অঙ্গনে/ চিরকালের আকাশটা আঁকে- সুরে বর্ণে/ অরণ্যের ফুল রং পাখি আর মানুষের গানে-/ অগণ্য ও অসীম সিমফনি।।’ পাহাড় ও পলাশে সূর্য যে বর্ণ ঢালে, সেই বর্ণের দীপ্তিকে নানা ভাবে ক্যানভাসে রূপ দিয়েছেন শুভাপ্রসন্ন। নশ্বর জগতে যে আলো-আঁধারের খেলা প্রতিনিয়ত ঘটছে তা নানা বিন্যাসে রূপ পেয়েছে তাঁর চিত্রচর্চায়। বাস্তব কিংবা তার সম্প্রসারণ নিপুণ ভাবে বিভিন্ন শৈলীতে ধরেছেন শুভাপ্রসন্ন।

তিনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রী তো বটেই, সেই সঙ্গে ছবি, আখ্যান, সিনেমা, থিয়েটার, কাব্য প্রভৃতি বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের বহুস্বর ব্যঞ্জনাকে তিনি শিল্পের এক অন্তর্বলয়ের অন্তর্গত করতে চেয়েছেন বার বার। অন্যান্য শিল্পীদের ছবিচর্চাকেও একই মৃত্তিকার অঙ্গনে নিয়ে আসতে চেয়েছেন।

দৃশ্য মাধ্যম (visual medium) নিয়ে কাজ করার জন্য তিনি ভেবেছেন ‘আর্টসএকর’-এর মতো সংস্থার কথা। ১৯৮৪ সালের ৩ মার্চ আর্টসএকর-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর। ১৯৮৭ সালের ১১ জানুয়ারি, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কবি, ঔপন্যাসিক এবং চিত্রশিল্পী গুন্টার গ্রাসের ছবির প্রদর্শনী আয়োজন করে যাত্রা শুরু হয় আর্টসএকর-এর। গুন্টার গ্রাস ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মৃণাল সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অরুণ মিত্র, অন্নদাশংকর রায়, সতীশ গুজরাল, মনজিত বাওয়া, চিন্তামণি কর, এনএস বেন্দ্রে, সন্তোষকুমার ঘোষ, গৌরকিশোর ঘোষ প্রমুখ দিকপালগণ।
সেই আর্টসএকর এখন ফুলে পল্লবে বিকশিত হয়ে মহীরুহের আকার নিয়েছে। ২০১৪ সালের ৬ মার্চ এক নক্ষত্র সমাবেশের মধ্যে নবনির্মিত আর্টসএকর-এর উদ্বোধন করেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম প্রধান মিউজিয়াম স্থাপিত হয়েছে আর্টসএকর-এ। সঙ্গে রয়েছে কনজারভেশনের বিশাল ল্যাবোরেটরি। ওয়ার্কশপ, আর্ট ক্যাম্প, আলোচনাসভা নিয়মিত আয়োজন করা হচ্ছে। ১৫-টি আবাসিক স্টুডিয়ো রয়েছে। দুই-কামরা বিশিষ্ট ১৮-টি অতিথি নিবাস গড়ে তোলা হয়েছে। ১০০০ বর্গফুট থেকে শুরু করে ৪০০০ বর্গফুটের বিশাল বিশাল প্রদর্শশালা নির্মাণ করা হয়েছে। গড়ে উঠেছে ৪০০ আসন বিশিষ্ট সরলা-বসন্ত বিড়লা প্রেক্ষাগৃহ। চিত্রকলা, গ্র্যাফিক্স, সেরামিক্স- এগুলি নিয়ে নিয়মিত কর্মশালা হচ্ছে। ফটোগ্রাফি এবং ফিল্ম বিষয়ও কর্মশালা আয়োজন করা হচ্ছে। গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল লাইব্রারি। চিত্রকলা ও ভাস্কর্য তো বটেই, এছাড়াও বিভিন্ন শিল্পকলায় উৎসাহী মানুষ যাতে ভাবনার আদানপ্রদান করতে পারেন সে বিষয়েও উদ্যোগী আর্টসএকর। উত্তর পূর্বাঞ্চল ছাড়াও গোটা ভারতবর্ষে এরকম শিল্পকেন্দ্র কটা আছে, এটা কিন্তু বড়ো প্রশ্ন।