সৌম্য সিংহ
অতিবড় নিন্দুক কিংবা সমালোচক,তা সে যে-ই হোন না কেন,একটা কথা কিন্তু সকলেই স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে হাওড়ার বুকে নয়া রাজ্য সচিবালয় ‘নবান্ন’ প্রতিষ্ঠা করে কলকাতার এই যমজ নগরীকে বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৫০০ বছরের বেশি বয়স হওয়া সত্ত্বেও যে হীনমন্যতা মাঝেমধ্যেই অবসাদগ্রস্ত করে তুলত এই শিল্পনগরীকে,যে অবহেলা আর বঞ্চনায় প্রায় প্রতিনিয়তই আহত হতো শহরের বনেদিয়ানা। মমতা বন্দোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েই কিন্তু তা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন হাওড়ার মানুষকে। তাঁর দুঃসাহসী সিদ্ধান্তের সাফল্য আপ্লুত করেছে সাধারণ মানুষকে।
২০১৩ বছরের শেষার্দ্ধ এই শহরের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কারণ,এই সময়ই রাজ্য সচিবালয় মহাকরণ থেকে ধাপে ধাপে স্থানান্তরিত হয়েছিল নবনির্মিত নবান্নে। আর তারপরেই আমজনতার রায়ে দীর্ঘ বামজমানা থেকে মুক্তি পেয়েছিল হাওড়া পুরসভা। বলতে দ্বিধা নেই, তৃণমূল পুর-পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েই কিন্তু ‘কুলিটাউন’ অপবাদ থেকে মুক্তি দিয়েছে হাওড়াকে। সেই আবর্জনার পাহাড়,দুর্গন্ধ, কঙ্কালসার অন্ধকারাচ্ছন্ন অপরিসর রাস্তা-এ সবই আজ স্মৃতি। আলোয় ঝলমল ঝাঁ চকচকে শহর দেখলে প্রশ্ন জাগতেই পারে –এই সেই হাওড়া? তাই নবান্ন আজ আর শুধু রাজ্যের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্রই নয়,হাওড়ার উন্নয়নের আইকনও বটে। সেই চমকপ্রদ উন্নয়নকে সামনে রেখেই আবার পুরনির্বাচনের মুখোমুখি হাওড়া। ইস্যুও সেই একটাই – উন্নয়ন।
শীতের উত্তরে হাওয়ার পর্ব চুকিয়ে দখিণ হাওয়া জেগে উঠবে ঠিক কবে তা এখনই সঠিকভাবে বলার সময় না এলেও ভোটের মৃদুমন্দ হাওয়া কিন্তু শহরে বইতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। আর এই পরিবেশে প্রস্তুতিপর্ব দ্রুত সেরে নিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। ২০১৩তে পুরসভার ৫০টা ওয়ার্ডের মধ্যে ৪৩টাই দখল করেছিল তৃণমূল। এছাড়া ৩টে গিয়েছিল কংগ্রেসের দখলে। বিজেপি এবং সিপিআইএম পেয়েছিল ২টো করে আসন। পরে অবশ্য কংগ্রেসের ৩জন কাউন্সিলরও যোগ দেন তৃণমূলে। ২০১৬ তে বালি পুরসভা হাওড়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় ১৬টা আসনে নির্বাচন হয় নতুন করে।এবং সবকটাই আসে তৃণমূলের দখলে। ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনেও হাওড়া শহর রায় দেয় ঘাসফুলের পক্ষেই। তবে কিছুটা ছন্দপতন ঘটে গত লোকসভা নির্বাচনে। তৃণমূল লক্ষাধিক ভোটে জিতলেও বিরোধী গেরুয়া শিবিরও পেয়ে যায় প্রায় ৪ লক্ষ ভোট। বিশেষ করে উত্তর হাওড়া এবং বালিতে ভোটের প্রবণতা বিস্মিত করেছিল তাবড় রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদেরও। এর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করে এবং অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েই এবারে দলের জেলা(সদর) সভাপতি অরূপ রায় কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন ভোটযুদ্ধে। বিশেষ নজর দিচ্ছেন গেরুয়া অধ্যুষিত ১৩ এবং ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে। যদিও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ ভাজপা হাওড়া শহরে ইতিমধ্যেই ব্যাকফুটে। লোকসভা নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীও সম্ভবত বিরক্ত হয়েই আর আগ্রহ দেখাচ্ছেন না ভোটযুদ্ধে। কার্যত বসে গেছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ অনুগামীরাও।
অরূপবাবু স্পষ্ট জানিয়েছেন, দলের প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে এবারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এলাকার সাধারণ মানুষের মনোভাব এবং দলের তৃণমূল স্তরের কর্মী-সমর্থকদের মতামতকে। সততা,যোগ্যতা,কর্মতৎপরতা,শৃঙ্খলাপরায়ণতা,মানুষের সঙ্গে ব্যবহার এবং জনসংযোগে সাফল্য – প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এই কয়েকটা বিষয় বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গতবারের বিজয়ী কোনও প্রার্থীরও যদি এই বিষয়গুলোতে ঘাটতি থাকে কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে যুক্তিসঙ্গত অভিযোগ থাকে মানুষের,তবে তাঁকেও ব্ল্যাক-লিস্টেড করা হচ্ছে। মনে রাখতে হবে,দলের লক্ষ্য কিন্তু ৬৬টা আসনেই জয়লাভ। কিন্তু সংরক্ষণ বা অন্য কারণে গতবারের বিজয়ী কোনও প্রার্থী মনোনয়ন না পেলে তাঁর স্ত্রী বা অন্য কোনও নিকটাত্মীয়াকে কি প্রার্থী করার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে? অরূপ রায়ের সাফ কথা, দলে এমন কোনও নির্দেশিকা নেই। শহরের প্রবীণতম বিধায়ক শিবপুরের জনপ্রতিনিধি জটু লাহিড়ির বক্তব্য,এক্ষেত্রে যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি। প্রার্থীর ভাবমূর্তিটাও বিশেষভাবে বিবেচ্য। এব্যাপারে কোনও আপোস নয়। সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম সুপারিশের পরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্য নেবে শীর্ষ নেতৃত্বই। সব মিলিয়ে উন্নয়ন এবং সংগঠনের নিরিখে প্রথম রাউন্ডেই নিশ্চিতভাবে এগিয়ে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দ্রুত ঘর গুছিয়ে নিচ্ছে আত্মবিশ্বাসী ঘাসফুল শিবির।