আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন আমাদের স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক ক্লাসে একটি কথা বলেছিলেন যা আমার মনে দাগ কেটে গিয়েছিল। কথাটা এইরকম, ‘মিথোলজি এবং ইতিহাসের মধ্যে প্রধান পার্থক্য এটাই যে ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়কাল আছে এবং মিথোলজির কোনো নির্দিষ্ট সময়কাল নেই। অর্থাত অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা ঠিক কোন সময়ে ঘটেছিল, সেই সময়টা যদি নির্ণয় করা যায় তবে সেটা ইতিহাস…যদি নির্ণয় করা না যায় তবে সেটা মিথোলজি। দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করেছিলেন ৩২৬ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে। ৩২৬ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ সময়টা যেহেতু আমরা জানি, সেইজন্য আলেকজান্ডার ইতিহাস…মিথোলজি নন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হয়তো হয়েছিল, কিন্তু কবে হয়েছিল আমরা জানি না। সেইজন্য মহাভারত মিথোলজি…ইতিহাস নয়’।
কিছুদিন আগে ইন্টারনেটে একজন পণ্ডিত ব্যক্তির বক্তব্য মন দিয়ে শুনছিলাম। লেকচারে সেই ভদ্রলোক বললেন, ‘দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডারের ঐতিহাসিকতা প্রধানত দাঁড়িয়ে রয়েছে তাঁর প্রায় সমসাময়িক পাঁচ জন ঐতিহাসিকের বর্ণনার উপর ভিত্তি করে। এই ঐতিহাসিকগণের বর্ণনা আমরা সত্য বলে মেনে নিই। সেইজন্য বলা যায়, এটা আমাদের বিশ্বাস যে আলেকজান্ডার মিথোলজি নন…আলেকজান্ডার ইতিহাস’।
‘চার এর সাথে একশো যোগ করে, সেই যোগফলকে আট দিয়ে গুণ করে, সেই গুণফলের সঙ্গে বাষট্টি হাজার যোগ করলে যে সংখ্যাটি আসে, সেই সংখ্যাটি হল কুড়ি হাজার একক ব্যাস বিশিষ্ট বৃত্তের পরিধি’। অর্থাত {(১০০ + ৪) × ৮} + ৬২০০০ = ৬২৮৩২…এই ৬২৮৩২ কে ২০০০০ দিয়ে ভাগ করলে ভাগফল দাঁড়ায় ৩.১৪১৬…’পাই’ (π)!
উপরোক্ত উক্তিটি প্রাচীন ভারতের শ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞ আর্যভট্টের (আর্যভট)। কেবলমাত্র দশমিকের পরে চার ঘর অবধি পাই এর মান নির্ণয় নয়…বীজগণিত, ত্রিকোণমিতি, সাইন টেবল, পরিমিতি, পৃথিবীর পরিধি নির্ণয় (যা আজকের পরিমাপের তুলনায় ৯৯.৮% সঠিক), পৃথিবীর আহ্নিক গতির বিবরণ, অন্যান্য গ্রহদের উপবৃত্তাকার কক্ষপথের বিবরণ, সূর্য্য এবং চন্দ্রগ্রহণের প্রকৃত কারণের বর্ণনা এবং তাদের হিসাব…ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে আর্যভট্টের অবদান বিশাল।
গণিত এবং মহাকাশবিদ্যা…এই দুইয়ের বাইরে আর্যভট্ট নিজের লেখা গ্রন্থে একটি অদ্ভুত কথা লিখে গেছেন যা অনেকের কাছে আগ্রহের বিষয়বস্তু। লেখাটা এইরকম, ‘কলিযূগ শুরু হওয়ার পর ৩৬০০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার সময় আমার তেইশ বছর বয়স ছিল’! আর্যভট্টের জন্ম ৪৭৬ খ্রীষ্টাব্দে, মহাভারত অনুসারে কলিযূগ শুরু হয়েছিল শ্রীকৃষ্ণের দেহত্যাগের দিন…বাকি হিসাবটা আমি আপনাদের জন্য রেখে দিলাম।
প্রশ্ন হলো, যেমন ভাবে পাঁচ জন ঐতিহাসিকের বিবরণ আলেকজান্ডারের ঐতিহাসিকতার ভিত তৈরী করেছে, মহাভারতকে মিথোলজির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত করবার জন্য আর্যভট্টের এই একটি উক্তিই কি যথেষ্ঠ? না…আমার মতে যথেষ্ঠ নয়।
সন্দেহ…মাঝে মাঝে প্রয়োজন। কারণ সন্দেহ মানুষকে আরও নিখুঁত করে। মহাভারত বিশেষজ্ঞ এ ডি পুসালকরের মতে, ‘প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ একটা সেন্ট্রাল ল্যান্ডমার্ক। যদি কখনও এই যুদ্ধের সময় নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা যায়, তবে ভারতের বাকি সমস্ত ইতিহাসের সময় নির্ণয় করবার জন্য একটাই ক্যালেন্ডার ব্যবহৃত হবে…’বিফোর ওয়ার’ কিংবা ‘আফটার ওয়ার’।’
সেইজন্য দরকার আরও প্রমাণ…আরও গবেষণা। কিন্তু কিভাবে? বলা হয়, মহাভারতের সঠিক সময় নির্ধারণ করবার জন্য প্রত্নতাত্ত্বিকদের খনন করবার দরকার নেই, বৈজ্ঞানিকদের কার্বন ডেটিং করবার দরকার নেই…তার কারণ মহাভারতের প্রকৃত সময়ের বিবরণ মহাভারতের শ্লোকের মধ্যেই দেওয়া আছে…রূপক আকারে। সমগ্র মহাভারতের মধ্যে প্রায় দেড়শো বার এক একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার সময় আকাশে গ্রহ নক্ষত্রের সন্নিবেশের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। আমরা জানি আকাশে প্রতিটি গ্রহের গতি, গতির তারতম্য এবং কোনো নির্দিষ্ট সময়ে আকাশে তাদের অবস্থান পূর্ব নির্ধারিত…আকাশের গ্রহ নক্ষত্রের সন্নিবেশ হয়তো সর্বাপেক্ষা প্রাচীন এবং সঠিক ক্যালেন্ডার। এই দেড়শো শ্লোকের মধ্যে ‘উদ্যোগ পর্ব এবং ‘ভীষ্ম পর্ব’ তে উল্লেখ করা কিছু গ্রহ সন্নিবেশের বিবরণের উপর ভিত্তি করে শুরু হয় গবেষণা।
যতদূর আমি জানি, এই সংক্রান্ত গবেষণা ভারতে শুরু হয় ১৯৪৭ সালে। কিন্তু মহাভারতে উল্লেখ করা জটিল শ্লোক ডিকোড করে সেখান থেকে ব্যাক ক্যালকুলেশন করে সঠিক তারিখ নির্ণয় করবার কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। কারণ এক্ষেত্রে কয়েক হাজার বছরের ব্যাক ক্যালকুলেশনের প্রশ্ন চলে আসছে। গবেষণার ফলাফল একাধিক আসতে থাকে এবং মহাভারতের কোনো নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা সম্ভবপর হয় না।
গবেষণার গতি আসে ২০০০ সালের পরে কারণ ততদিনে বাজারে ইন্টারনেট এবং সফটওয়্যর চলে এসেছে এবং গবেষকদের কাজ সহজ, দ্রুত এবং নিখুঁত হয়ে উঠেছে। ২০০১ সালে মন্ট্রিয়লে, ২০০২ সালে ‘ওয়েভস’ কনফারেন্সে, ২০০৩ সালে বেঙ্গালুরু কনফারেন্সে এবং ২০০৪ সালে ‘অক্সফোর্ড ৭’ কনফারেন্সে বিভিন্ন গবেষক নিজেদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। দেখা যায় বেশিরভাগ গবেষকের মতেই মহাভারতের সময়কাল ৩০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের আশেপাশে। কিছু গবেষকের মতে মহাভারতের সময়কাল ১০০০ থেকে ২০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে এবং অত্যন্ত কম সংখ্যক গবেষকের মতে মহাভারতের সময়কাল ৫০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দেরও আগে!
কেন এই বৈষম্য? সফটওয়্যরের ভুল? ভুল শ্লোক? বারংবার একই ধরণের গ্রহ সন্নিবেশ? উত্তর নেই। কিন্তু দেখা গেল ১৯৬৯ সালে ডঃ রাঘবন মহাভারতের সময়কাল সম্বন্ধে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছে ছিলেন ২০০৪ সালে মেমফিস বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাকাশবিজ্ঞানী ডঃ আচারও সেই সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছেন এবং এই দু’জন গবেষকের সিদ্ধান্ত আর্যভট্ট বর্ণিত মহাভারতের সময়কালের সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে যায়!
কোন কোন শ্লোকের উপর নির্ভর করে তৈরী হয়েছে এইসব গবেষণাপত্র? কি ধরণের গ্রহ সন্নিবেশের বিবরণ দেওয়া আছে সেখানে? কোন সফটওয়্যর ব্যবহার করা হয়েছে? কেন দু’জন গবেষক সঠিক এবং বাকি সমস্ত গবেষকের সিদ্ধান্ত ভুল? গবেষণার ফলের এতো বৈষম্য কেন? এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে কি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগের এবং পরের ঘটনাবলীর সময়কাল মিলে যায়? আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি এইসব প্রশ্নের উত্তর লেখার জন্য আমার ফেসবুক দেওয়ালটা ভীষণ ছোট। ঠিক করেছি, নিজের বইতেই পুরোটা লিখব। আমার হিসাবে এই বিষয়টা নিয়ে লিখতেই প্রায় পঞ্চাশ পাতা খরচ হবে এবং পুরো ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে প্রায় দশ থেকে বারোটা ছবি লেখার মধ্যে মধ্যে দিতে হবে। এ ডি পুসালকরের কথা মাথায় রেখেই বলছি, ‘যুক্তি বলিষ্ঠ এবং নির্ভুল হতে হবে এবং কোনো ফাঁক রাখলে চলবে না’।