প্রায় দেড় দশক আগে সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। সেই রিপোর্টে দেশজুড়ে মুসলিমদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের যে দূরবস্থার কথা তুলে ধরা হয়েছিল আজও তার খুব একটা পরিবর্তন হয় নি। সমাজের পিছিয়ে পড়া, অংশের মধ্যেও এই সম্প্রদায়ের মানুষ বহুক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে। তবু রাজনীতির কু যু্ক্তিতে, মিথ্যে পরিসংখ্যান দেখিয়ে এদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার যথেষ্ট গতিশীল। এর পাশাপাশি ভোট এলেই গোটা সম্প্রদায়টাই ভোট ব্যাঙ্কের তকমা প্রায়। রাজনীতি এবং সংসদীয় গণতন্ত্রে সুবিধাবাদী মেলবন্ধনের পরিনতি হলো গোটা একটি সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ভোটব্যাঙ্কের ফ্রেমে বন্দি হয়ে পরা। ভোট মুখী পশ্চিমবঙ্গেও এর ব্যতিক্রম নেই। সমাজমাধ্যম এবং সংবাদমাধ্যমে এই সম্প্রদায়ের ভোটিং প্যাটার্ণ নিয়ে নানা জল্পনা চলছে। কেউ বলছেন, এবারে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে ভোট যুদ্ধের যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে তাতে মুসলিম সম্প্রদায়ের সব ভোট তৃণমূল কংগ্রেস পাবে। এমনকি ক্ষয়িষ্ণু অবস্থাতেও কংগ্রেস ও বাম দলগুলিতে এই সম্প্রদায়ের যেটুকু ভোট রয়েছে তাও তৃণমূল কংগ্রেসে চলে যাবে। আবার অনেকে বলছেন, আসাদউদ্দিন ওয়েইসি-র মিম এবং ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের জোট তৃণমূলের বাড়া ভাতে ছাই দেবে।
তাই অনেকেই মনে করছেন ওয়েইসি এবং আব্বাস সিদ্দিকির জোট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষমতায় ফেরার পথে বড়ো কাঁটা। যারা এই কথা মনে করছেন তারা তিনটি কারণ দেখাচ্ছেন।
এক. পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের একটি বড়ো অংশ, তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর বিরক্ত। দুই. বিহারের সাম্প্রতিক নির্বাচন দেখিয়ে দিয়েছে যে সব বিধানসভা কেন্দ্রে মুসলিমরা সংখ্যা গরিষ্ঠ সেখানে তারা মুসলিমদের সংগঠনকেই ভোট দিতে চাইছেন। তিন. বাম-কংগ্রেস দুর্বল হয়ে পড়ায় মুসলিমদের মধ্যে তীব্র তৃণমূল বিরোধী অংশ সিদ্দিকি-ওয়েইসি সমীকরণকে বেছে নেবেন। এই যুক্তির গোড়ায় গলদ রয়েছে।
প্রথমত, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের সামজিক ও রাজনৈতির পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। দ্বিতীয়ত, এই সম্প্রদায়কে মনে করা হচ্ছে মুখ বন্ধ পাত্রে বন্দি জড় পদার্থ, যাদের নিজের ভালো মন্দ বিচারের শক্তি নেই। তাই মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মগুরুরা যা বলে দেবেন তাঁরা তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন। বাস্তব অভিজ্ঞতা এর বিপরীত কথাই বলে।
প্রাক নির্বাচনী পর্বে রাজ্যের সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মুসলিম মানস নিয়ে কাজ করছেন এক গবেষক। সম্প্রতি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে তিনি তথ্য জোগাড় করছেন। তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল— বিভিন্ন জেলায় ঘুরে কথা বলে তাঁর মনে হয়েছে এবারের মুসলিম সম্প্রদায়ের ভোটের বৃহৎ অংশই তৃণমূলের পক্ষে যাবে। তাঁর মতে মুসলিম অধ্যুষিত উত্তর দিনাজপুর, মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ জেলায় যেখানে গত লোকসভা নির্বাচনেও এই সম্প্রদায়ের মধ্যে কংগ্রেসের প্রভাব ছিল সেখানেও এবার তৃণমূলের পাল্লা ভারী হবে। বিহারের সম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে সীমাঞ্চলে মিম যথেষ্ট ভালো ফল করেছে। তবে মুসলিম অধ্যুষিত ওই অঞ্চলে মিম হঠাৎ করেই ভালো ফল করেছে ভাবলে ভুল হবে।
২০১৫ সাল থেকে আখতারুল ইমান-এর নেতৃত্বে সীমাঞ্চলে মিম-এর সংগঠন মজবুত হয়েছে। বিহার রাজনীতিতে অত্যন্ত দক্ষ নেতা ও সংগঠক বলে পরিচিত আখতারুল ইমান আরজেডিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। তিনি দু-বার বিধানসভা নির্বাচনে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন। ২০১৫ সালে তিনি আরজেডি ছেড়ে দিয়ে মিম-এ যোগ দেন। পশ্চিমবঙ্গে মিম-এর আখতারুল ইমান-এর মতো কোনও নেতা নেই। তাছাড়া নাগরিকত্ব বিলের প্রতিবাদ না করেই বিহারে জেডিইউ মুসলিমদের সমর্থন হারিয়েছে। তার ফলে বিহারে মুসলিমদের সামনে আরজেডি ছাড়া পছন্দের ক্ষেত্রে একটা শূন্যস্থান তৈরি হয়। এছাড়াও সীমাঞ্চলের গেরুয়া শিবিরে জেতার মতো শক্তি না থাকায় সেখানে বিজেপি ভিতি নেই। এই পরিস্থিতিতে ৫ বছর ধরে মিম-এর সংগঠন জোরদার হয়েছে।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক শক্তির মেরুকরন হয়েছে তাতে এই পরিস্থিতি নেই। অন্যদিকে বিহার নির্বাচনের ফল বেরোতেই বিজেপির জেতার কারণ খোঁজা শুরু হয়। মিম-এর জন্যই বিজেপি ক্ষমতায় ফিরেছে বলে অনেকেই মত দেন। যদিও ভোটের পরিসংখ্যান বলছে যে ২০টি আসনে মিম প্রার্থী দিয়েছিল তার একটাতেও তাদের ভোটকাটার জন্য বিজেপি যেতে নি। তবু মিম-এর জন্যই আরজেডি জোটের কপাল পুড়েছে বলে ধারনা ছড়িয়েছে। এই ধারনা পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে দানা বাঁধেনি বলে ভাবার কোনও কারণ নেই, ফলে মিমকে ভোট দিলে বিজেপির সুবিধে হবে এই ধারনাও তৃণমূল কংগ্রেসের লাভ হবে বলেই মনে হয়।
গত লোকসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গে ৮টি আসনের মধ্যে ৭টি লোকসভা আসনেই বিজেপি জিতেছিল। তবে ৭টি আসনে জিতলেও উত্তরবঙ্গে মুসলিমদের ভোট বিজেপি পায় নি। যার ফলে কোচবিহার উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর ও জলপাইগুড়ি ও মালদহের মুসলিম প্রধান এলাকায় বিরোধীদের থেকে পিছিয়ে ছিল বিজেপি। বিধানসভা নির্বাচনে, ভোটের এই অঙ্ক বিজেপিকে বিপাকে ফেলবে। উত্তর দিনাজপুরে ৯টি বিধানসভার মধ্যে ইসালমাপুর, গোয়ালপখর, চাকুলিয়া, করণদীঘি ও ইটাহার মুসলিমপ্রধান অঞ্চল। এই আসন গুলিতে জিততে হলে মুসলিম ভোট পেতে হবে। দক্ষিণবঙ্গে মতুয়া ভোট পেতে সিএএ নিয়ে প্রতিশ্রুতি দিলে এই সব বিধানসভা কেন্দ্রে মুসলিম ভোট সঙ্ঘবদ্ধ হবে। জলপাইগুড়ি জেলাতেও মুসলিম ভোট না পেলে, রায়গঞ্জ, ধূপগুড়ি, মালবাজার, নাগরাকাটা বিধানসভা আসনে জেতা কঠিন। বিহার নির্বাচনে যে ৫টি আসনে মিম জিতেছে, পশ্চিমবঙ্গে তার সংলগ্ন এলাকা হলো উত্তর দিনাজপুর এবং মালদহ। অনেকে তাই মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গের এই দুই জেলায় মুসলিমদের মধ্যে মিম-এর জেতার প্রভাব পরবে। রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে মুসলিমভোট এই সরল রেখায় এগোবে ভাবলে অতি সরলীকরণ হবে।