‘রন্ধন রান্ধিয়া সোনাই করিল ভাগ ভাগ/হিঙ্গ মরিচে রাঁধিলে শ্বেত সরিষার শাগ’—মনসামঙ্গল।
আদ্দিকাল থেকে রান্নায় ব্যবহৃত হিংয়ের সুগন্ধি মাতিয়ে রেখেছে বাঙালির হেঁসেল। হিংয়ের কচুড়ি কিংম্বা হিং ফোড়ন দেওয়া নিরামিষ তরকারির স্বাদ আর গন্ধ মাতোয়ারা করে দেয় ভোজনবিলাসি বাঙালিকে।
নিরামিষ রান্নায় আমিষের স্বাদ আনতে হিং-এর জুড়ি মেলাভার। দক্ষিণভারত, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান কিম্বা আমাদের রাজ্যের বহু জায়গায় যেখানে পেঁয়াজ ও রসুন উভয়ই নিষিদ্ধ সেখানে অনায়াসে বিচরণ হিংয়ের। প্রাচীন হিন্দুদের মন্দিরগুলোতে ভোগ তৈরিতে হিংয়ের ব্যবহার একটি পরম্পরা।

হিং (Asafoetida) সালফারের গন্ধযুক্ত গাম-রজন।
প্রায় ৪,০০০ বছর পূর্বে ভগবৎ পুরানে হিংয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকদের মতে, হিংয়ের আদিবাড়ী হিন্দুকুশ পর্বতমালার পাদদেশে, আফগানিস্তান। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের অভিযান থেকে এটি ইউরোপে প্রবেশ করে, যিনি উত্তর-পূর্ব প্রাচীন পারস্য ভ্রমণ থেকে ফিরে আসার পর ভেবেছিলেন যে তারা উত্তর আফ্রিকার বিখ্যাত সিলফিয়ামের সাদৃশ্যপূর্ণ একটি উদ্ভিদ পেয়েছে — যদিও কম সুস্বাদু। সে সময়ে সিলিফিয়াম না মাখিয়ে মাংস খাওয়া ছিল আত্মহত্যার সামিল। মাংসের বোঁটাকা গন্ধে ও হজমের গন্ডগোল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এটির ব্যবহার। সিলিফিয়ামের প্রক্সি দেওয়ার সুবাদে হিং প্রবেশ করে ইউরোপের মঞ্চে।
শুধু স্বাদবর্ধক নয়, হিংয়ের ব্যবহার হয় ওষুধ হিসেবে। খাবার হজম, কাশি নিরাময়, যৌনউত্তেজনা বৃদ্ধিতে, তড়কা বা খিঁচুনির সমস্যায়, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হিংয়ের প্রয়োগ করা হয়। হিংয়ের অ্যান্টি-কার্সিনোজেনিক উপাদান ক্যান্সার প্রতিরোধে সক্ষম।

ছোটবেলায় মা যখন পেঁয়াজ, রসুন, আদা দিয়ে মাংস রান্না করার সময় যে গন্ধে পেটের ইঁদুরগুলো ডন বৈঠক দিতো, তেমনি গন্ধ পাওয়া যায় হিং দেওয়া আলুর চপের মধ্যে। বৃষ্টি ভেজা বিকেলে আম তেল দেওয়া মুড়ি, শশার কুচি আর গরম গরম হিংয়ের পরশমাখা আলুর চপ…..আহা! এ স্বাদের যেন ভাগ হয়না।
আলুর চপে মাংসের ফ্লেবার পেয়ে জানতাম এর মধ্যে মাংসের কুচো আছে। কিন্তু ধারণা ভাঙলো তেলেভাজার বিক্রেতার কথায়। ‘আদার রসের সঙ্গে হিং মিশিয়ে ছেঁকে রান্নায় দিলে ওই মাংস মাংস ফ্লেবারটা আসবে।’

একটি নামী রেস্তোরাঁ-চেনের কর্ণধার শেফ সুশান্ত সেনগুপ্তের জানালেন, ‘হিং একটি বিশেষ ধরনের মশলা, যা রান্নায় টেস্ট এনহ্যান্সার বা স্বাদবর্ধকের পাশাপাশি বাইন্ডিং এজেন্ট হিসেবেও কাজ করে। হিং নিজের স্বাদ-গন্ধ বজায় রেখে নোনতা-মিষ্টি-ঝাল সব ধরনের স্বাদকে একত্রে এনে সেগুলোর স্বাদ বাড়িয়ে দেয়। এখানেই হিংয়ের ম্যাজিক।’
তিনি আরো জানান, ‘একটা সময়ে লেক মার্কেটে বিশেষ ধরনের মশলা বড়ি পাওয়া যেতো। ছোট ঘুঁটের মতো দেখতে। আমরা বলতাম, সিন্ধিদের মশলা বড়ি। তাতে প্রাধান্য থাকতো হিংয়ের, তার সঙ্গে থাকতো গোটা জিরে-ধনে-শুকনো লঙ্কা। ওই বড়ি অল্প তেলে সাঁতলে নিয়ে ভেঙে আলু দেওয়া রুই মাছের ঝোলে ফেললে গোটা ব্যাপারটাই পৌঁছবে অন্য উচ্চতায়।’

সাধারণ রান্নাকে অসাধারণ স্তরে উন্নীত করে হিং। সেই খাঁটি, ডেলা হিং এখন পাওয়া দুষ্কর। কাবুলিওয়ালার লম্বা ঝোলার সুগন্ধি এখন সহজে পাওয়া যায়না । বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হিংয়ে মেশানো হচ্ছে অন্য মশলা কিম্বা কৃত্রিম উপকরণ। ফলস্বরূপ ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে স্বাদ।
হিংয়ের চাহিদা এতটাই বেশি যে দেশে প্রতি বছর আফগানিস্তান, ইরান এবং উজবেকিস্তান থেকে প্রায় ১,৫৪০ টন কাঁচা হিং আমদানি করে এবং প্রতি বছর প্রায় ৯৪২ কোটি টাকা খরচ করা হয়। বর্তমানে হিমাচল প্রদেশের লাহৌল স্পিতি ও কিন্নৌর এ হিংয়ের চাষ করা হয়।
বাঙালির রান্না তার ঐতিহ্যের জন্য শুধু নয়, তার স্বাদের জন্য বিখ্যাত। এক চুটকি হিংয়ের পরশ রান্নার স্বাদকে করে তুলবে অতুলনীয়। চলতে থাকুক হিংয়ের ম্যাজিক এক চুটকির মধ্যে দিয়ে।
খুব সুন্দর একটা লেখা। খুব ভালো লাগলো। অনেক কিছু জানতে পারলাম।????