| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আশাপূর্ণা দেবীর ট্রিলজি : সমাজ বিবর্তনের দলিল (দ্বিতীয় পর্ব) : মোজাম্মেল হক নিয়োগী

Reporter
মোজাম্মেল হক নিয়োগী / ৪৮৩ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১৭ মে, ২০২৪

প্রথম প্রতিশ্রুতি

আশাপূর্ণা দেবীর অন্তর্দৃষ্টি কতটা প্রখর তা এই ট্রিলজি পড়ার পর উপলব্ধি করা যায়। ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’র ভূমিকায় প্রকাশের কথা অনুযায়ী তিনি রেলস্টেশনে বইয়ের নাম ঠিক করে দেন পত্রিকায় লেখার জন্য। পরে তিনি উপন্যাসটি লেখা শুরু করেন। এখানেই শেষ কথা নয়, লেখাটির শুরুতেই তিনি যে ট্রিলজি লিখবেন এরই একটি চারাও রোপণ করে রেখেছেন শুরুতেই। এই দীর্ঘ উপন্যাসের এত চরিত্র নিয়ে ভাবনার দুয়ার তিনি যেভাবে খুলেছেন সেটি ট্রিলজি না পড়া পর্যন্ত বোঝার উপায় নেই যে, তিনি কত বড় মাপের, পরিশ্রমী ও ধৈর্যশীল লেখিক। উপন্যাসের শুরুটাই নাটকীয় এবং একটি আকর্ষণ তৈরি করেছেন এভাবে—‘সত্যবতীর গল্প আমার লেখা নয়। এ গল্প বকুলের খাতা থেকে নেওয়া। বকুল বলেছিল, একে গল্প বলতে চাও গল্প, সত্যি বলতে চাও সত্যি।’

কে এই বকুল? এ প্রশ্নের চূড়ান্ত সুরাহার জন্য পাঠ করতে হবে তৃতীয় খণ্ডটি যেটি বকুলকথা শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। সুদীর্ঘ সময়ের ক্যানভাসে তিন প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে প্রথমেই এই বাক্যটি নির্মাণ করা মানে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। দ্বিতীয় খণ্ডে সত্যবতীর মেয়ে সুবর্ণলতা। সুবর্ণলতার মেয়ে বকুলের জন্ম হয় তারুণ্যে পা রাখে এবং বকুলের তরুণ বয়সে দ্বিতীয় খণ্ডটি শেষ হলেও বকুল কোনো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে চিত্রিত হয়নি। পরবর্তী খণ্ডে দেশ কাঁপানো যশস্বী লেখিকার হিসেবে প্রধান চরিত্র হতে পারে এমন উত্তাপও পাওয়া যায়নি। তৃতীয় খণ্ডে বকুল অনামিকা ছদ্মনামে প্রথিতযশা লেখিকা হয়ে স্বচ্ছ দর্পণে বিবর্তিত ও আধুনিক সমাজের প্রতিফলন ঘটান নিখুঁত ও পরিপূর্ণরূপে। এই যে খাতা বা ডায়েরি প্রথম খণ্ডে সামান্য আভাস পাওয়া গেলেও তৃতীয় খণ্ডেও ডায়েরির উল্লেখ পাওয়া যায়। দ্বিতীয় খণ্ডেও সুবর্ণলতা ডায়েরি লিখতেন এমন আভাস পাওয়া গেলেও তা খুব পরিষ্কার হয়ে পাঠকের কাছে ধরা দেয়নি। দীর্ঘ উপন্যাসের নাটকীয় শুরুটা সত্যি চমৎকার।

‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ প্রকাশিত হয় বাংলা ১৩৭১ (ইংরেজি ১৯৬৪) সালে ফাল্গুন মাসে এবং ১৪২৪ (ইংরেজি ২০১৭) সালের বাহাত্তরতম মুদ্রণটি পাঠ করে এই ট্রিলজির আলোচনার প্রয়াস চালাচ্ছি। এই উপন্যাসের জন্য আশাপূর্ণা দেবি ১৩৭২ সালে রবীন্দ্র পুরস্কারে এবং ১৩৮৪ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার অর্জন করেন। অনেক বড় ক্যানভাসে ত্রিশের দশক থেকে উপন্যাসটির বয়ান শুরু হয় যখন এই উপমহাদেশে মেয়েদের লেখাপড়া করাকে পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পশ্চিমা বিশ্ব ছাড়া ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মেয়েদের লেখাপড়াকে পাপ মনে করা হতো এবং তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানি শিক্ষার কোনো সুযোগ দেওয়া হতো না। নারীদের নিগ্রহ, অবহেলা, শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখার এই সমাজের আচার-অনাচারকে ভেঙে দেওয়ার জন্য প্রথম প্রতিশ্রুতি একটি শক্তিশালী শাবল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। একটি আলোচনা থেকে জানা যায় যে, এই ট্রিলজিটি লেখিকার আত্মজীবনী তাঁর জীবনের কথা বিধৃত হয়েছে। হয়তো পুরোপুরি সত্য না হলেও লেখিকার পারিবারিক জীবনের শৈশবের বর্ণনা থেকে যৌথ পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায় এবং ঠাকুরমার কারণে তাঁদের লেখাপড়া হয়নি এবং বাল্যবিবাহের রেকর্ড অনুযায়ী তৎকালীন সমাজের চিত্র প্রথম প্রতিশ্রুতিতে প্রতিফলিত হয়েছে। খুব বেশি সময় আগে নয়; মাত্র এক শতাব্দী আগে পশ্চিমা দেশগুলো ছাড়া বাকি সব দেশের মেয়েদের লেখাপড়া ছিল নিষিদ্ধ। পাক-ভারত উপমহাদেশেও মেয়েদের লেখাপড়া কিংবা ঘর থেকে বাইরে যাওয়ার বিধিবিধান ছিল সত্যি ভয়াবহ। এই মূঢ়তার শৃঙ্খল ভেঙে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার জন্য এই উপমহাদেশে প্রথম হিন্দুরা এগিয়ে আসে এবং তারা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হতে থাকে কিন্তু মুসলমানরা ইংরেজি ইহুদি-নাছারাদের ভাষা বলে ইংরেজি তথা স্কুল-কলেজের শিক্ষা গ্রহণ না করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করে এবং পশ্চাৎপদের ধ্যান-ধারণা ভাঙতেও প্রায় একশ বছর চলে যায়। হিন্দু সম্প্রদায়ের মেয়েরা স্কুল কলেজে যাওয়া শুরু করলেও মুসলমান মেয়েরা আরো পরে আড়মোড় ভাঙে বেগম রোকেয়ার মাধ্যমে। তখনকার মানুষের বিশ্বাস ছিল ধর্মীয় গ্রন্থ ছাড়া অন্য বই পড়া মেয়েদের জন্য পাপ। ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ উপন্যাসে একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে উপন্যাসটি রচিত হলেও কলকাতাকেন্দ্রিক তখনকার মেয়েদের বন্দিদশার একটি জীবন্ত দলিল হয়ে উঠেছে। এটি শুধু উপন্যাসই নয় বরং বলা যায় এটি একটি সমাজচিত্র ও সমাজ বিবর্তনের সমাজবিজ্ঞান।

‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’তে পঞ্চাশটি চরিত্রের মিথস্ক্রিয়া ঘটে এবং অধিকাংশ চরিত্রের সঙ্গেই পাঠক এক হয়ে যায়। চরিত্রগুলোর সঙ্গে পাঠকও ইনভলভড হয়ে তৎকালীন জীবনব্যবস্থার সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। লেখক এমনই সুকৌশলে চরিত্র নির্মাণ করেছেন যে, ৪৮টি অধ্যায়ে ৫১০ পৃষ্ঠার উপন্যাসটি পাঠের সময়ে মনে হবে চরিত্রগুলোর মিথস্ক্রিয়া চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ভাসছে।

সত্যবতী এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় ও প্রধান চরিত্র হলেও রামকালী একটি নাটকীয় অভিজাত প্রবল প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিত্বও পাঠকের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। এই চরিত্রটি সৃষ্টি করতে গিয়ে লেখিকা ধর্মীয় গোঁড়ামিতে সূক্ষ্ম কিন্তু তীব্রভাবে আঘাত করেছেন যা হয়তো অসচেতন পাঠকের মনোযোগ এড়িয়ে গেলেও সচেতন পাঠকের মনোযোগ এড়াতে পারবে না। রামকালী অর্থাৎ সত্যবতীর বাবা যিনি তাঁর বাবা জয়কালীর খরমের ঘা খেয়ে অভিমান করে গৃহত্যাগ করেন। অভিযোগও ছিল গুরুতর। একদিন কি যেন অসুবিধায় পড়ে জয়কালী একদিনের জন্য সদ্য উপবীতধারী পুত্র রামকালীর উপর ভার দিয়েছিলেন গৃহদেবতা জনার্দনের পূজা-আরতির। মহোৎসাহে সে ভার রামকালী নিলেও ভ্রমবশত ফল-বাতাসা দিলেও জল না দেওয়ার অপরাধে রামকালীর পিসির নালিশে মহাভ্রমের জন্য বাবা জয়কালী খড়মপেটা করার জন্য উদ্যত হলে রামকালী কি না বলল জল দেবতা খেয়ে ফেলেছে। জল দেয়নি আবার দেবতা জল খেয়ে ফেলেছে—এই মিথ্যেও গুরুতর অপরাধে তাকে খরমপেটা করার পরই রামকালী বাড়ি থেকে উধাও। দূরান্তে মুকশুদাবাদে নবাব-বাড়ির কবরেজ নিঃসন্তান গোবিন্দ গুপ্তর বাড়িতে থেকে কবিরাজি বিদ্যার্জন করে এবং শেষে গোবিন্দ গুপ্তর দয়ায় বস্তা ভরে টাকা এবং গুপ্তর পালকি দিয়ে বাড়ি এলেও বাবার মুখ দেখতে পারেননি। একবার বাবা যদিও রামকালীর খোঁজ পেয়েছিলেন কিন্তু জাতের দোহাইয়ে নিজ সন্তানকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। এই রামকালীই সত্যবতীর বাবা যিনি এই উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ, দায়িত্বশীল, অভিজাত, ধনাঢ্য, চৌকস, পরোপকারী ও ধর্মাচারী মহান চরিত্রে আবির্ভূত হন।

শৈশব থেকেই সত্যবতীর মধ্যে নেতৃত্বসুলভ ও বুদ্ধিমতীর গুণাবলি প্রকাশ পায়। সত্যবতীর বন্ধুদের নিয়ে চলাফেরা কিংবা গোসল করার সময় কিংবা দেবতুল পিতা রামকালীর সামনে কথা বলা বা বাড়ি ছেড়ে একা পাড়ায় যাওয়ার মতো সাহস তৎকালীন মেয়ে শিশুদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। রামকালীর ভাগ্নে জটা যখন তার স্ত্রীকে মারধর করল তখন স্ত্রী মরে গেছে এমন কথাই চাউর হয়ে গেলো গ্রামে। সত্যবতীই বাবাকে চিকিৎসার জন্য জটার বৌয়ের কাছে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। যদিও জটার স্ত্রী মারা যায়নি তবু সে এমন অবস্থায় ভান ধরেছিল যে, তাকে তুলসিতলায় শুইয়ে মড়াকান্না শুরু করেছিল সত্যবতীর পিসি। যদিও রামকালী সাধারণ ভেষজ দিয়ে কবিরাজি করে তবু এলাকার মানুষের ধারণা ছিল রামকালী মৃত-মানুষকেও ভালো করতে পারে। এই বিশ্বাস মেয়ে সত্যবতীর মনেও জন্মেছিল।

রামকালীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো প্রমাণ না পাওয়া গেলেও তাঁর মননে কিছুটা আধুনিকতার আঁচ ছিল বলে ধারণা করা যেতে পারে। কিন্তু কর্মে আধুনিকতার কোনো প্রভাব পড়েনি। তিনি সামাজিক প্রথা-ঐতিহ্য-সংস্কার-কুসংস্কার ভাঙার কোরাসে যোগ দেননি বরং নিরেট সংস্কারের মধ্যেই ছিলেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় রাসুর বিয়ে এবং শেষ বয়সে সত্যবতীর বাড়িতে বেড়াতে আসার ঘটনায়। যৌথ পরিবার হলে তার নেতৃত্বসুলভ গুণাবলি এবং বেশি উপার্জনশীল ব্যক্তি হিসেবে পরিবারের একমাত্র ও প্রতাপশালী সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ব্যক্তি হিসেবে তাকে দেখা যায়। তাঁর দাদা সংসারের সকল দায় রামকালীর উপর ছেড়ে দিয়েই নিষ্কর্মার মতো জীবনযাপন করেন। রামকালীর চরিত্রটি কোথাও কোথাও রহস্যময় করে তোলা হয়েছে। একবার পথে এক বরযাত্রীর সঙ্গে দেখা হয় পথে, তিনি ধারণা করেন যে বর খুব অল্প সময়ের মধ্যে মারা যাবে এবং বরকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেন। যে মেয়েটির লগ্ন ঠিক করা আছে সেই লগ্ন যদি ভেঙে যায় তাহলে মেয়েটির জীবনে আর বিয়ে হবে না এটি সমাজের বিধান। তাই তিনি আপন ভ্রাতুষ্পুত্র বিবাহিত রাসুকে উঠোন থেকে তুলে নিয়ে সেই মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেন। এখানেও সনাতন ধর্মের ছোটখাটো অনেক নিয়ম মানা হয়নি মেয়েটিকে বাঁচানোর স্বার্থে। একটি মেয়েকে রক্ষা করা হলো বিবাহিত রাসুর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে, কিন্তু রাসুর প্রথম স্ত্রীর কী হবে, সেটি ভাবা হয়নি? এই বিয়েও তখনকার পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থার এটি একটি দলিল। কারণ, বহুবিবাহ পুরুষের জন্য সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে বৈধ ছিল এবং বাল্যবিবাহ ছিল অবশ্য কর্তব্য বিষয়। ঔরসজাত কন্যাসন্তানের বুদ্ধি দেখে রামকালী অবাক হন এবং তাঁর আক্ষেপ হয় ও তুচ্ছজ্ঞান করে বলেন, ‘এত তলিয়ে ভাবে কী করে? আহা মেয়েমানুষ, তাই সবই বৃথা।…এই বুদ্ধিটা যদি নেড়ুর হতো।’ প্রসঙ্গত নেড়ু তার বড় ভাইয়ের শেষ কুড়ান্তি ছেলে।

কোনো উপন্যাসের চরিত্র নির্মাণের জন্য শুরুতে ছোট ছোট বিষয়ের গাঁথুনি দিয়ে পড়ে তা চূড়ায় তুলতে হয়। আশাপূর্ণা দেবীও অত্যন্ত কৌশলী ও উঁচুমানের লেখক বলে এই উপন্যাসের শুরুতেই সত্যবতীর শাণিত বুদ্ধির বীজ বপন করেছেন। জটার স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতনের প্রতিবাদ হিসেবে সত্যর পদ্য রচনা একাধারে তার প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যধারে প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে পিসতুতো ভাইয়ের বিরুদ্ধে সমাজের মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলার অস্ত্র হাতে দিয়ে দিয়েছে। পদ্য ও বইপত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে সত্যকে পরবর্তী সময় জ্ঞান বিকাশের ধারাকে অব্যাহত রাখতে পরিণত বয়সে স্কুলে পর্যন্ত নিয়েছেন। নিজে শিক্ষিকা হিসেবেও কাজ করেছেন।

তরুণ বয়সী নবকুমারের সঙ্গে শৈশবেই বিয়ে হয় সত্যবতীর যখন সে বিয়ের কিছুই বুঝে না। নবকুমারও বিয়ে বা সংসার বলতে কিছু বুঝে না। শ্বশুরকে দেখে লজ্জায় পালিয়ে যায় এমন ঘটনাও এখানে বিধৃত হয়েছে। এই উপন্যাসের সত্যবতী যেমন উল্লেখযোগ্য চরিত্র ঠিক তেমনি এলোকেশী সত্যবতীর শাশুড়িও উল্লেখযোগ্য চরিত্র। রামকালী যেমন ঋজু অভিজাত ও প্রবল প্রতাপশালী ব্যক্তিত্বের চরিত্রের মানুষ ঠিক তেমনি তাঁর বেয়াই সত্যবতীর শ্বশুর ঠিক বিপরীত মেনিমুখো দুশ্চরিত্রের স্ত্রৈণ প্রকৃতির মানুষ। সত্যর শাশুড়ি এলোকেশী যেমন প্রতাপশালী পরিবারের সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী আধিপত্য বিস্তারকারী চরিত্র ঠিক বিপরীত চরিত্র সত্যর মা শালীন টিপিক্যাল বাঙালি অভিজাত গৃহিনীর চরিত্র রূপে দেখা যায়। সত্যর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার হৃদয়ের লালন করা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্বর শাশুড়ির সঙ্গে টোকাটুকি লাগে। নবকুমার লেখাপড়া শিখেছে পাড়ার এক শিক্ষকের কাছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা সত্ত্বেও সে ইংরেজদের অফিসে চাকরি করার সুযোগ পায়—সেই যুগ তো এমনই ছিল।

উপন্যাসে অনেক নাটকীয়তা আছে যেখানে লেখিকার মেধার স্বাক্ষর। সত্যবতীর যেদিন দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয় সেদিন তার মায়ের মৃত্যু হয়। আঁতুড়ঘরে খবর পেয়েও এলোকেশী সাবধান করে দিয়েছে যেন কান্নাকাটি না করে। কান্নাকাটি করলে নবজাতকের অমঙ্গল হতে পারে। মায়ের লাশ দেখা তো দূরের কথা প্রিয় মায়ের মৃত্যু-শোক নবজাতকের মুখের দিকে তাকিয়েই ভুলতে হয়।

পৃষ্ঠাজুড়ে চলে পারিবারিক টোকাটুকি যেখানে ক্যারামবোর্ডের খেলার স্ট্রাইকার একবার থাকে এলোকেশীর হাতে আরেক বার থাকে সত্যর কাছে। দীর্ঘ সংসার জীবনে একবার সত্যর কাছে এলোকেশী হেরে যান।

এলোকেশীর প্রচণ্ড বিরোধিতার পরও সন্তানাদি নিয়ে নবকুমারের সঙ্গে কলকাতায় পাড়ি জমায় সত্যর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। এলেকোশী মেয়েদের শহরে থাকার ব্যাপারে ঘোর আপত্তি তুললেও সে আপত্তি ধোপে ঠেকেনি। সত্যবতী ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে নবকুমারের সঙ্গে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। সাংসারিক কাজ করেও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য শিক্ষার প্রতি অত্যুগ্র বাসনায় তাড়িত হয়ে নবকুমারের শিক্ষক ভবতোষের সঙ্গে যোগসাজসে লেখাপড়া শিখেন। শুধু লেখাপড়া শিখেন না, মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর জন্যও কাজ করেন।

সত্যবতীর তিন ছেলে এক মেয়ের মা হয় এবং তাদের নিজের মতো করেই শিক্ষা-দীক্ষা ও মানুষ করার জন্য ব্যাপৃত হন। ছেলেদের মধ্যে যদিও ডমিন্যান্ট মনোভাব গড়ে উঠে কিন্তু সেগুলোকে উপন্যাসে বিস্তারিত আনা হয়নি। সত্যবতীর মনোযোগ পড়ে কন্যা সুবর্ণলতার দিকে। সুবর্ণকে নিজের আদর্শে যখন শিক্ষা-দীক্ষা, চিন্তা- চেতনায় বড় করার জন্য প্রয়াসী হন ঠিক তখনই তার চূড়ান্ত হেরে যাওয়ার পালা। সুবর্ণকে নিয়ে একদিন নবকুমার গ্রামের বাড়িতে যান বেড়াতে। সেখানেই আলাপ-আলোচনা করে নয় বছরের শিশু সুবর্ণকে বিয়ে দেয় এলোকেশীর প্ররোচনায়। এলেকোশী সত্যর কাছে বারবার হেরে গেলেও শেষবার সুবর্ণকে শিশু বয়সে সত্যকে না জানিয়েই বিয়ে দিয়ে প্রতিশোধ নেন। জয়ী হয় শাশুড়ি এলোকেশী হলেও বিজিত সত্যবতী সুবর্ণের বিয়ে মেনে নিতে পারেননি। এলোকেশীর সই মুক্তকেশীর ছেলের সঙ্গে পুতুল খেলার মতো সুবর্ণকে বিয়ে দেওয়া হয়। সংসার জীবনের প্রতি চরম বীতশ্রদ্ধ হয়ে সংসারে ফিরে না গিয়ে জনমের জন্য চলে যান কাশীতে। এভাবেই নবকুমারের প্রতি প্রতিশোধের আগুন ঢেলে সত্যবতী গৃহত্যাগী হন এবং ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ অর্থাৎ প্রথম খণ্ডের এখানে সমাপ্ত হয়। [ক্রমশ]

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev