কোনও অপরিচিত লোক যদি সকাল সাড়ে সাতটা থেকে আটটার মধ্যে এ পাড়ার বি/৩৬ নং বাড়ির সামনে দিয়ে যান, তিনি নির্দিষ্ট কিছু শব্দ শুনবেন। যেমন, ধাপ্পাবাজি নাকি, ধাপ্পার তো একটা সীমা থাকে, ধাপ্পা দিয়ে কি সব হয়, ধাপ্পাবাজে দেশটা ভরে গেল ইত্যাদি। অপরিচিত পথিক ভাবতেই পারেন বি/৩৬-এর ঘরের কর্তা শ্রী শ্রীল শ্রীযুক্ত প্রমোদরঞ্জন ভট্টাচার্য হয়তো চাকরকে বকছেন। কিন্তু পাড়ার লোকেরা জানে এখন তিনি খবরের কাগজ পড়ছেন।
অনেক মানুষ আছে, যারা কেউকেটা হয়েও ডাকসাইটে হয় না। অনেকে আছে, যারা কেউকেটা না হয়েও ডাকসাইটে হয়। তবে উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যাটা এই, যারা কেউকেটা তারা সব সময় ডাকসাইটে হতে চায়, আর যারা ডাকসাইটে, তারা সব সময় নিজেদের কেউকেটা ভাবে। যেমন আমাদের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডাকসাইটে প্রমোদবাবু। কিন্তু ধাপ্পাবাজ পাড়ার লোকেরা আড়ালে তাকে কেউকেটা না বলে বলে কালকেউটে, শুধু বিষ শুধু বিষ, কোথাও একটু মধু নেই! পাড়ার ক্লাবের ফুটবল ম্যাচ থেকে শুরু করে পাশের বাড়ির দাম্পত্য— সব বিষয়ই প্রমোদবাবুর বিষে নীল। সাধে কী তিনি বলেন, ধাপ্পাবাজ কি আর গাছে ফলে! পাড়ার ঘরে-ঘরে থরে-থরে সাজানো থাকে।
প্রমোদরঞ্জনবাবু মনে করেন সারা জীবনে তার ডাকসাইটে সুন্দরী সতী সাধ্বী পতিপরায়ণা স্ত্রী ছাড়া আর সকলেই তাকে ধাপ্পা দিয়েছে। এই কথাটা জোর দিয়ে বিশ্বাস করার একটা বড় কারণ হল, বিয়ের পর পর তিনি যখন বউকে নিয়ে বেড়াতে বেরোতেন, পাড়ার তৎকালীন ছেলে-ছোকরার দল মুগ্ধ/লোলুপ দৃষ্টিতে তাদের বউদির দিকে তাকিয়ে থাকত আর প্রকাশ্যেই টিটকারি দিত— বাঁদরের গলায় মুক্তোর হার। তখন স্কুল মাস্টার প্রমোদবাবুর রাগ হত না। ছেলেগুলোকে ধাপ্পাবাজ বলে গালও পাড়তেন না। উল্টে বুকের ছাতি গর্বে দশ হাত ছাপিয়ে যেত, আর মুখে ছড়িয়ে পড়ত ট্রাকের পিছনে সেঁটে থাকা আত্মতৃপ্তির কথাগুলো— দেখবি আর জ্বলবি, লুচির মতো ফুলবি ইত্যাদি। এ হেন ললিত লবঙ্গলতা স্ত্রীর শরীর স্বামীর সোহাগে ঠিকঠাক সাড়া দিয়েছে, পাতে সাত পদ রান্না পড়েছে, পাট করা ধুতি-পাঞ্জাবিটি ঠিক জায়গায় থেকেছে প্রতিদিন, ঠিক সময়ে একটা পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছে, সব কাজ করেছে স্বামীর মতে। পৃথিবীতে বিশ্বস্ততার এর থেকে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে! তবে একটা কাজ প্রমোদবাবুর স্ত্রী স্বামীর অমতেই করেছে। মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে কী কারণে যেন মারা গিয়েছে। এই মৃত্যুটাকে অবশ্য প্রমোদবাবু ‘বউ ধাপ্পা দিয়ে চলে গেল’ বলতে পারেন না, বলেন ‘ফাঁকি দিয়ে চলে গেল’। যদি বউ আত্মহত্যা করত, তিনি অবশ্যই বলতেন, না, না, মৃত্যু দুঃখের ঠিকই, কিন্তু এ ধাপ্পাটা মেনে নেওয়া গেল না, আমি তো তাকে সুখেই রেখেছিলাম। একটা অপ্রাসঙ্গিক তথ্য জেনে রাখতে হবে, প্রমোদবাবুর বউ এম এ পাশ করা মেয়ে ছিলেন, বিয়ের আগে একটা কলেজে পার্টটাইম পড়াতেন। অবশ্য এক জন হাউস-ওয়াইফের জীবনে এ সব তথ্য নিতান্ত অপ্রাসঙ্গিক।
প্রমোদবাবু প্রকাশ্যে এবং মনে মনে ধাপ্পাবাজদের যে তালিকা প্রস্তুত করে রেখেছেন, তার দুটো ক্যাটেগরি, একটা জেনারেল, আর একটা পার্সোনাল। জেনারেল ক্যাটেগরিতে থাকে শ্রেণি। যেমন, রাজনীতিক, ডাক্তার, দোকানদার, ট্যাক্সিওয়ালা, রিকশাওয়ালা ইত্যাদি। আর পার্সোনাল ক্যাটেগরির প্রথমেই যে ব্যক্তির নাম আছে, তিনি রাধিকারঞ্জন ভট্টাচার্য, বাবা। সন্তানদের সঙ্গে রাধিকাবাবুর সবচেয়ে বড় ধাপ্পা হল, যে ছেলেটিকে ভেবেছিলেন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবেই, সেই প্রমোদরঞ্জন হল কিনা প্রথমে স্কুলের পরে ঠেলেগুঁজে কলেজের মাস্টার। আর যে ছেলেকে ভেবেছিলেন বখে যাবে, সেই ছোট ছেলে হল কিনা ডাকসাইটে এবং কেউকেটা ডাক্তার! প্রথমে বিদেশ কাঁপিয়ে এখন দেশে ফিরে দেশসেবা করে চারটে বড় শহরে পেল্লায় চারটে বাড়ি হাঁকাচ্ছে। নিজের ছেলের সম্পর্কে এমন ভুল প্রেডিকশন বাবাদের ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কী! তালিকার দ্বিতীয় নাম অবশ্যই ভাইয়ের, যে ভাই চিরকাল দাদাকে দাদা জ্ঞান না করে পাশের বাড়ির পেয়ারা, ও-পাশের বাড়ির সুন্দরী মেয়ে, সে বাড়ির সেক্সি বউদি আর সেই সব বাড়ির পিয়ারীদের সুলুক সন্ধানে মত্ত থেকেও দেশ-বিদেশ মিলিয়ে পাঁচখানা বাড়ির মালিক হয়ে গেল। আর তিনি সারা যৌবন পড়া মুখস্থ করলেন, প্রাইভেট টিউটরের বাড়ি ছাড়া আর কোনও বাড়ির দিকে মুখটি তুলে তাকালেন না, অথচ একটা মাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই! ভাইয়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার একটাই অস্ত্র হাতে ছিল, সুন্দরী বউ, সেও তো হাত খালি করে গত হল! এর পর তালিকায় কলেজের কলিগরা। তারা তাকে যথাসাধ্য সম্মান দেয়নি। তার পর ছাত্ররা। টিউশনির টাকা গাপ করেছে। ধাপ্পাবাজদের তালিকার ফিরিস্তি দিতে গেলে মহাভারত হার মানবে। তবে লিস্টিতে এক জনের নাম না করলে নয়— রঞ্জন, ছেলে। বাবার সঙ্গে তার প্রথম ধাপ্পাবাজি হল মাধ্যমিকের অ্যাডমিটে নিজের নামের আগে ‘প্রসাদ’টা কেটে দিয়ে নিজেকে কেবল রঞ্জন বানিয়ে ফেলা। তবে মাধ্যমিকের অ্যাডমিটের চেয়ে বড় ধাপ্পা উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্ট!
— বাবা, পি ডিভিশন!
— এটা কি রেজাল্ট না ধাপ্পাবাজি?
— ধাপ্পাবাজি।
— তুমি আমাকে বলে বলে ধাপ্পা দিচ্ছ!
— আজ্ঞে সে সাহস কী আমার আছে! প্রশ্নগুলো আমাকে ধাপ্পা দিয়েছে, এলিই যখন আমাকে বলে আয়! একটাও বলে আসেনি। উত্তরগুলোও ধাপ্পা দিয়েছে, এত কষ্ট করে বানিয়ে বানিয়ে লেখা সত্ত্বেও ঠিক হয়নি। সব থেকে বড় ধাপ্পাটা দিয়েছে এগ্জামিনার, শালা দেখবি তো দেখ আমার খাতাটাই ঠিকমত দেখেছে।
— তুমি কী-ই-ই-ই?
— আজ্ঞে অকালকুষ্মাণ্ড।
— তুমি ফেরেব্বাজ!
— অকালকুষ্মাণ্ডরা সেটাই হয়ে থাকে।
এর পর কিছু দিন পাড়ার রকে উদাসীন আড্ডার পর আবার এক দিন সোনামুখ করে বাবার সামনে এসে রঞ্জন বলল— বাবা কিছু টাকা দরকার।
— আবার কী…
— একটা পোশাক ভাড়া করতে হবে।
— কেন?
— একটা চাকরির…
— ইন্টারভিউ!
— না, না, চাকরিটা হবে বলেই মনে হচ্ছে। ইন্টারভিউ যারা নিয়েছেতারা বলছে এ চাকরিতে আমাকে দিব্য মানায়।
প্রমোদবাবু উৎসাহিত হয়ে বললেন— ভাড়া কেন, আমি তোমাকে কিনে দিচ্ছি।
— না, মানে, পারমানেন্ট চাকরি নয় যে, যদি না টেকে! তাই এক মাসের ভাড়া নেব।
বিকেলবেলায় রঞ্জন পরনে একটা গরদের ধুতি, গলায় একটা সিল্কের গেরুয়া ও রুদ্রাক্ষ আর মাথায় তিলক কেটে বাবার সামনে দাঁড়াল। ধড়াচুড়ো দেখে প্রমোদবাবু আঁতকে উঠে বললেন— এটা কী!
— আজ্ঞে নির্ভেজাল ধাপ্পা।
— তুমি কি গৃহত্যাগ করছ?
— এ ফেভারটা আমি আপনাকে করতেই পারতাম, কিন্তু যাব কোথায়? এভারেস্টও টুরিস্টে ভরা।
— তা হলে এই ভেক কীসের?
— এই একটু অনুসন্ধান করব।
— অ, গোয়েন্দাগিরি?
— কাছাকাছি। তবে আমার হাতে অস্ত্র থাকে না, কেননা, হাতই আমার অস্ত্র।
— হেঁয়ালি না করে একটু খোলসা করে বলো তো!
— ওই একটু হাত দেখব, কপাল দেখব, কোষ্ঠি দেখব, এই আর কী!
— তুমি জানো আমি এ সব বিশ্বাস করি না।
— আমিও করি না।
— তা হলে?
— লোকে যে করে! জনগণের ভাবনার তো একটা মর্যাদা আছে!
— এ সব ধাপ্পা আমাকে চোখের সামনে দেখতে হবে!
— পিছন ঘুরে বসবেন। তাতে আপনারও সুবিধা, আমারও সুবিধা।
— উঃ! ঘরে ধাপ্পা, বাইরে ধাপ্পা। আর কত সহ্য করব!— বলে তিনি সত্যিই পিছন ঘুরে বসলেন।
এর মাস তিনেক পর রঞ্জনকে এক দিন সকালে শার্ট-প্যান্ট পরে একটা প্যাকেট হাতে বেরোতে দেখে প্রমোদবাবু জিজ্ঞেস করলেন— কী রে, আজ বসবি না? বেশ তো দু’পয়সা হচ্ছিল!
— বিকেলে একটা অন্য কাজ আছে।
— কী কাজ!
— সেটা বিকেলেই বলব।
বিকেলে রঞ্জন একটা মেয়ের হাত ধরে বাবার সামনে হাজির।
— ইনি কে?
— ইনি এক জন ভদ্রমহিলা।
— তা তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু উনি এখানে কেন?
— উনি আমার বউ। যা সব সক্ষম পুরুষ মানুষের থাকে, আপনারও ছিল।
— তুমি সক্ষম পুরুষ মানুষ?
— এই ভদ্রমহিলা আমাকে তেমনই বিবেচনা করেছেন।
— বোঝা গেল বিবাহ বিষয়ে ওঁর বিবেচনা শক্তি বড়ই দুর্বল।
— হতেই পারে না।
— কেন?
— উনি ম্যারেজ রেজিষ্ট্রেশন ডিপার্টমেন্টে চাকরি করেন।
— অ। চাকরি করে! তা বেশ।
— যাও, বাবাকে প্রণাম করো। তবে সাবধান…
— সাবধান মানে? — রঞ্জনের সপ্রতিভ বউ জিজ্ঞেস করল।
— পায়ে সুড়সুড়ি লেগে গেলে কিন্তু বাবা বেশ রেগে যায়।
ছেলের কথা শুনে প্রমোদবাবু রেগে গিয়ে ঝট করে চেয়ারে পা তুলে বসলেন। পুত্রবধূর শত অনুরোধেও প্রণাম গ্রহণ করলেন না। রঞ্জনের বউ মালবিকা বেশ সুন্দরী। প্রমোদবাবু মনে মনে বললেন, বাঁদরের গলায় মুক্তো হার!
২
এক দিন রাতে মালবিকা বলল— তোমার বাবা মানুষটা তো ভালই।
— যারা খারাপ হতে চায় না, তাদের ভাল না হয়ে উপায় কী!
— তুমি সব বিষয়েই একটু বেশি ক্রিটিকাল।
— দুভার্গ্যবশত!
— আচ্ছা শোনো, তোমাদের এই বুড়ি কাজের লোক দিয়ে আর চলছে না।
— বাবার কাছে পারমিশন নিয়ে একটা যুবতী কাজের মেয়ে লাগিয়ে নাও।
— বাবার কাছে পারমিশন কেন? বাবার পারমিশন ছাড়া এ বাড়িতে টিকটিকি আরশোলা ধরে না বুঝি?
— না না, তা নয়। সে সব দিকে বাবা একদম পলিটিক্যালি কারেক্ট। না হলে আমার মতো অপোগণ্ড ছেলেকে কখনও বাড়িতে রাখে! আসলে মায়ের মৃত্যুর পর থেকে এ বাড়িতে কোনও যুবতী কাজের মেয়ে ঢোকেনি।
— সে তো তোমার ভয়ে।
— তুমি শিয়োর, বাবাদের নিজেদের কোনও ভয় থাকে না?
— অন্তত আমার বাবার ছিল না।
— তা হলে হয় তুমি যথেষ্ট ক্রিটিকাল নও, অথবা তুমি লাকি। আর তোমার বাবার বউও
কম বয়সে কোট আন কোট ফাঁকি দিয়ে চলে যায়নি।
— তুমি কি বাবাকে ঘৃণা করো?
— না। আদর্শবাদ থেকে গৃহবিবাদ, সব বিষয়ে বাবার স্পষ্ট অবস্থানটাকে আমি অবজ্ঞা করি।
— সম্ভবত বাবাও তোমাকে অবজ্ঞা করেন।
— না, উনি আমাকে ঘৃণা করেন।
৩
মালবিকা এ বাড়ি আসার পর থেকে প্রমোদবাবু এক অদ্ভুত কাণ্ড জুড়ে দিলেন। প্রমোদবাবুর মনে শিশু-প্রীতি অন্তঃসলিলা ফল্গুধারা, এটা কেউ ভাবেনি কখনও। যদি তার কোনও অতি বড় বন্ধুও থাকত, সেও নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারত না। খেলনা বা চকোলেট তো দূরের কথা, পাড়ার কোনও শিশুকে তিনি কোনও দিন গাল টিপে আদর করেছেন, এমন অপার্থিব দৃশ্য কেউ দেখেছে বলে মনে পড়ে না। আর পাঁচটা অবসরপ্রাপ্ত বয়স্কদের মতো তাকে কেউ কোনও দিন পার্কের পাশে দাঁড়িয়ে শিশুদের খেলা দেখে মনে মনে অপত্য স্নেহ অনুভব করতে দেখেনি। পাড়ার ছেলে তো দূরের কথা, তার যে সব আত্মীয় এখনও তার সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে, তাদের বাড়ির শিশুদের প্রতিও কোনও দুর্বলতা কখনও প্রকাশ পায়নি প্রমোদবাবুর। এক দিন একটা সদ্যোজাত শিশুকে তার বাড়ির গেটের সামনে পড়ে থাকতে দেখা গেল। সারা পাড়া তোলপাড় হয়ে গেলেও তিনি কিন্তু ঘর থেকে বেরোননি, যতক্ষণ না পুলিশ এসে বাচ্চাটাকে সরিয়ে নিয়ে গেছে। সবাই চলে গেলে তিনি বারান্দায় বেরিয়ে শূন্য রাস্তার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বললেন, আর জায়গা পায় না, যত ধাপ্পাবাজি সব আমার দরজার সামনে! ভাল মানুষ পেয়েছে কিনা! ফাঁসাবার তাল!
সেই প্রমোদবাবু কিনা পাশের বাড়ির চার বছরের ছেলে মন্টুর প্রেমে পড়ে গেলেন! এতটাই আত্মহারা প্রেম যে, মন্টু ধোপা তো তিনি গাধা, মন্টু সেপাই তো তিনি ঘোড়া, তিনি চোর মন্টু পুলিশ, এমনকী তিনি ছাত্র মন্টু মাস্টার! যে খেলা তিনি কখনও নিজের ছেলের সঙ্গে খেলেননি, সেই খেলা পাশের বাড়ির ছেলের সঙ্গে, তাও আবার যখন তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে! পাড়ার লোকেদের যা স্বভাব, ফস্ করে বলে দিল— আদিখ্যেতা। কিন্তু যে যা-ই বলুক, ব্যবস্থাটা দুরন্ত মন্টুর বাবা-মায়ের পক্ষে বেশ সুবিধাজনক হল। মালবিকা কাজে বেরোয় দশটায়। ইদানীং রঞ্জন কী একটা ব্যবসা করছে, বেরোয় সাতটায়। মন্টু সাতটা থেকে দশটা এ বাড়িতে থাকে। ঠিক সাতটা থেকে দশটা। অবশ্য এই গোপন ডিসিপ্লিনটা কারও নজরে পড়ে না। এতে মন্টুর মায়ের সুবিধা, মন্টুর বাবাকে অফিসের ভাত দিতে অসুবিধা হয় না। মালবিকা ফেরে সাড়ে পাঁচটায়, রঞ্জন আটটায়। এই সময়টাও মন্টু কাটায় এ বাড়িতে। এতে মন্টুর বাবার কেনা কণ্ডোমগুলোর সুবিধা, উপযুক্ত ব্যবহারের মাধ্যমে তারা ফাংগাসের হাত থেকে বাঁচে। ব্যবস্থাটা যার কাছে যত সুবিধাজনকই হোক, এই অসম বন্ধুত্বটা সকলের কাছেই বেশ রহস্যজনক ঠেকে, তাই সকলেই নিজেদের মতো এর একটা মানে করতে চায়। কেউ মানতে চায় না মানুষ তার মানের চাইতে বড় অথবা ছোট। যেমন মালবিকার মনে হয়— মন্টুকে নিয়ে বাবার বাড়াবাড়িটা দেখেছ!
— শুনেছি। বলে রঞ্জন।
— কী মনে হয় তোমার?
— ভাবার সময় নেই। নতুন ব্যবসা।
— আমার কিন্তু একটা জিনিস মনে হচ্ছে।
— মাত্র একটা? বাবার কোনও কাজেরই কিন্তু একটা মানে থাকে না।
— আঃ! ফোড়ন না কেটে শোনোই না। আমার মনে হয় উনি আমাদের কাছে কিছু এক্সপেক্ট করছেন!
— কী? আমাদের ডিভোর্স?
— আঃ, তা কেন হবে?
— আমরা এ বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাই? বাবাকে বলে দিয়ো সম্ভব নয়।
— উঃ, যেমন বাপ তেমনি ব্যাটা!
— যাক, পিতৃপরিচয় নিয়ে সমস্যা নেই!
— উনি চাইছেন তুমিও পিতা হও।
— যেমন উনি হয়েছিলেন! তা উনি চাইছেন, না তুমি চাইছ?
— উনি চাইছেন।
— তুমি ডেফিনিট?
— হ্যাঁ।
— তা হলে আমিও ডেফিনিট উনি ঠিক এটাই চাইছেন না।
— কী করে বুঝলে?
— তুমি কী করে বুঝলে?
— একটি শিশুর প্রতি ভালবাসার কি কোনও মানে নেই?
— আছে। অন্য একটি শিশুর প্রতি ঘৃণা, যে শিশু জন্মের পর তার মায়ের সব রূপ রোগে শুষে নিয়েছিল।
— ওঃ! তোমরা বাপ-ব্যাটা…!
এক রবিবার রঞ্জন ব্যবসার কাজে বাইরে গেল। যাওয়ার সময় মালবিকাকে বলে গেল ফিরতে রাত ৯টা হবে। ওদের কথা প্রমোদবাবু সব সময় কান খাড়া করে শোনেন, যদিও তা জানান দেন না নিজের লিবারেল পরিচয়টা প্রতিষ্ঠিত করতে, বিশেষ করে বউমার কাছে। রঞ্জন যেতেই প্রমোদবাবু মন্টুদের বাড়ি গিয়ে বলল— আজ মন্টু আমাদের বাড়ি থাকবে, খাবে। মন্টুবাবুকে নিয়ে বাড়ি ফিরে বউমাকে বললেন, খাবারে ঝাল কম দেবে।
ঘরের ভিতর খেলা শেষ হওয়ার পর মন্টু বায়না ধরল বাগানে খেলবে। লুকোচুরি খেলা।
খেলাই যায়, কেননা কালটা শীত পেরিয়ে বসন্ত। বাগানে অনেক দেশি-বিদেশি ফুল ফুটেছে। গাঁদা, গোলাপ, গ্ল্যাডিউলাস, জারবেরা। আম গাছে মুকুল এসেছে। গন্ধে মৌতাত। খেলতে খেলতে এক সময় দাদুর পালা এল নাতিকে খোঁজার। ভরদুপুরে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ নজরে পড়ল মালবিকার বেডরুমের জানলা খোলা! পর্দাটা একটু সরানো। মালবিকা আয়নার সামনে। আঁচল লুটোচ্ছে মেঝেতে। দুধে আলতা গায়ে কালো স্লিভলেস ব্লাউজ। কাঁধ-বাহু-ঘাড় অনাবৃত। প্রমোদরঞ্জন ভট্টাচার্যের শরীর বেশি হয় শরীরের চেয়ে। আকাঙ্ক্ষা বেশি হয় আকাঙ্ক্ষার চেয়ে। প্রমোদরঞ্জন ভট্টাচার্য অপলক তাকিয়ে থাকেন মালবিকা মল্লিক-ভট্টাচার্যের শরীরের দিকে। কতক্ষণ কে জানে, হঠাৎ কোমরের কাছে একটা তীব্র আঘাত, সঙ্গে মন্টুর চিৎকার, অপরিশোধিত চিৎকার— দাদু ধাপ্পা! দাদু ধাপ্পা! তোমাকে আবার খুঁজতে হবে, আবার খুঁজতে হবে!
এক শিশুর সামান্য আঘাতে ভয়ে কুঁকড়ে গেলেন প্রমোদবাবু। দ্রুত নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে চেয়ারের উপর পা তুলে বসে হাতের তেলোর মোটা চামড়ার নীচে একটা অনায়ত্ত সুড়সুড়ি তৃপ্তিহীন চেষ্টায় চুলকোতে চুলকোতে ফিস্ফিস্ করে বলতে থাকলেন— উঃ, ঘরে ধাপ্পা, বাইরে ধাপ্পা!
প্রথম প্রকাশ : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৭ পৌষ ১৪১৭ রবিবার ২ জানুয়ারি ২০১১