বাঙ্গালোর শহরটা দেখে মনে হয় না কলকাতার মতো অভিভাবকহীন। শহরটার অভিভাবক আছে যার কথা লোকে মানে, যার শাসনে শহরবাসীর আপত্তি তো নেই বরং সানন্দ সম্মতি আছে। এই রকম লেগেছিল তাঁর পুনে দেখে—এক বাড়ন্ত জীবন্ত শহর। যেটুকু আছে সেটুকুই টিমটিম করে ধরে রাখা নয়; শহরের সীমানা চারপাশে বাড়ানোর সমৃদ্ধি, মাঠের মাঝখানে মাঝখানে বাগানে ঘেরা চকচকে পথ-আঁটা ফ্যাক্টরি আগন্তুক মাত্রেরই চোখে পড়ে। ফ্যাক্টরি মানে পোস্টার ভরতি ছ্যাৎলাপড়া পাঁচিল তোলা গারদ নয়। ব্যাঙ্গালোর টুরিস্টকোচে সহকর্মী কমিটি মেম্বারদের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে ডক্টর বোসের মনে হয়েছিল সীমাকে সঙ্গে আনলে মন্দ হত না। কিন্তু সে ভাবনা পরদিন কাজের চাপে কোথায় মিলিয়ে গেল।
পরদিন ঝাড়া তিন ঘণ্টা সেমিনার কন্ডাক্ট করলেন ডক্টর বোস। তারপর প্রায় একঘণ্টা তাঁর নিজস্ব সাম-আপ। এই সাম-আপের জন্যেই তিনি আজ প্রায় সর্বভারতীয় ব্যক্তিত্ব। ধরা মাপা যান্ত্রিক নির্ভুলতায় তিনি বলে যান সংখ্যাতত্ত্বগুলো। একবারও থমকান না। কেউ কেউ বলেন, ‘অসাধারণ হোমওয়ার্ক। একবার চণ্ডীগড়ের সভ্যকে পিঠ চাপড়ান, পরমুহূর্তে অন্ধ্রের বক্তাকে সামান্য অনুযোগের সুড়সুড়ি দিয়ে তিনি মধ্যপ্রদেশের প্রতিনিধির বক্তব্যে দেশের মূল সমস্যার চিহ্ন আবিষ্কার করেন। তাঁর শ্রোতারা সম্মোহিতের মতো শুনে যায় সেই কণ্ঠস্বরের একটানা কলধ্বনি। সভার শেষে প্রবল করতালিতে সম্বর্ধনা আসে বারবার।
লিফটের মুখে বড় কাচের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরান ডক্টর বোস। দিল্লির ডক্টর সিং এসে বললেন, ‘হাউ ডু ইউ ম্যানেজ টু রিমেন সো আনরাফল্ড?’
কোনো কোনো তরুণ সভ্য প্রশ্লের ঝড় যে বইয়ে দেয় না এমন নয়। সেদিনও শেষের দিকে ঝড় উঠেছিল কিন্তু ডক্টর বোসের কলধ্বনিতে ঝড় শান্ত। তরুণ সভ্যদের কেউ কেউ জানতে চেয়েছিল তাঁর নিজস্ব বক্তব্য কিন্তু তিনি চমৎকার পাশ কাটাতে পারেন ফুরফুরে কথাবার্তায়। সবাই হেসে ওঠে, সবাই পুলকিত। প্রশ্নকর্তাও শেষ পর্যন্ত এই পুলকের স্রোতে ভেসে যায়।
গত দু-তিন দশকে সংগঠিত মনীষার আর এক নাম সেমিনার। আগে তা ছিল সভা কিংবা অধিবেশন, কিন্তু তাতে মনীষাকে হই চই-এর মধ্যে ফেলা যেত না। সারা বছরে কিংবা ষান্মাসিক পরিধিতে তা ছিল সীমাবদ্ধ। এখন প্রায় সারা দুনিয়ায় সারা বছর জুড়ে এই মনীষা চর্চা, যার অপর নাম সেমিনার। যে যত বলতে-কইতে পারে সে তত ইন্টেলেকচ্যুয়াল।
অবশ্য সেমিনারের অন্য মানেও আছে। সেমিনার মানে প্লেনের টিকিট, নিদেনপক্ষে ট্রনের প্রথম শ্রেণীর টিকিট, গেস্ট হাউসে কিংবা কখনো ফাইভ-স্টার হোটেলের স্বাচ্ছন্দ্য, ইওরোপ আমেরিকা যাত্রা, খবর কাগজ, রেডিও, টি ভি, সবচেয়ে বড় কথা যোগাযোগ! এক প্রকাণ্ড প্রবহমান আদান-প্রদান সিরিজে নিজেকে ফেলে দেওয়া।
ডক্টর সিং তাই বললেন, ‘সামনের আগস্টে কি চণ্ডীগড়?’
‘চণ্ডীগড় তো সেভেন্টি ফাইভে হয়ে গেছে।’
‘ও আপনার বোধহয় স্টেট ক্যাপিটালগুলো…’
‘তা আপনাদের আশীর্বাদে…’ ডক্টর বোস মৃদু হাসেন।
‘তাহলে এবার কি বন না জুরিখ?’
ডক্টর বোস আলগোছে বলেন, ‘সেটা আপনার মর্জি আর আমার নসিব।’
‘আচ্ছা, মাধব মুখার্জির কাজ কেমন?’ ডক্টর সিং তাঁর শাদা ধবধবে পাগড়ি ঝুঁকিয়ে বললেন।
‘মাধব মুখার্জি?’
‘বাঃ। আপনি চেনেন না। সে কী! আপনি ওয়েস্ট বেঙ্গলের কর্তা লোক।’
‘না না, এটা আপনি অনেক বাড়িয়ে বলছেন। আমি সামান্য লোক। মাধব মুখার্জি? ও মনে পড়েছে। চণ্ডীগড় সেমিনারে ছিল। মনে পড়েছে এবার।’
‘ওর তো কাজ খুব ভালো শুনছি’
‘কাজ? ঠিক জানি না।’
নীচু গলায় ডক্টর সিং বললেন, ‘আসলে ওর একটা লবি তৈরি হচ্ছে দিল্লিতে।’
‘এত ইমপর্ট্যান্ট কিছু নয়, আমি যদ্দূর জানি। আপনি আর কদিন আছেন?’
‘আমি কালই যাব। ভাবছি যাবার আগে শ্রবণবেলগোলাটা ম্যানেজ করা যায় কি না।’
‘দ্যাট লর্ড বহুবলী? ওটা আমারও দেখা হয় নি। চলুন একসঙ্গে যাওয়া যাবে।’
সিঁড়িতে নামতে নামতে ডক্টর বোস বললেন, ‘আপনাকে কে ব্রীফ করেছে জানি না। মাধবের কাজ এমন কিছু আহামরি না। আমি দেখেছি’
‘আপনি দেখেছেন, তাহলে আপনিই ভালো জানবেন।’
ডক্টর সিং আবার বললেন, ‘আমার আর কিছু করার নেই। ইউ আর দ্য বেস্ট জাজ।’
দুই
‘তুমি যেন আজকাল কেমন হয়ে যাচ্ছ মনীষ।’ সুভদ্রা বললো
‘একথা তুমি আগেও বলেছ ভদ্রা। আসলে বয়সটা বাড়ছে এটা আমি মেনে নিয়েছি। তুমি মান নি।’
স্ত্রী বললে, ‘বয়সের কথা কেন বলছ? যখন বয়স কম ছিল তখন নিজের মনে ডুবে থাকতে, এখনকার মতো এত ছোটাছুটি ছিল না। এত পয়সা কড়ি ছিল না, নামডাকও ছিল না। কিন্তু আমার সেই ছিল ভালো। এখন আর তোমাকে পাওয়া যায় না, সব সময় অন্যমনস্ক হয়ে থাকো।’
‘তোমার কথার মধ্যে তোমার আদর্শবাদী বাবার গলা ভেসে আসে। সারাজীবন ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই করে শেষ জীবনে কর্পোরেশনে নাম-কা-ওয়াস্তে একটা চাকরি করে কাটিয়ে দিলেন। এসব আজকাল চলে না। আজকাল ক্রমাগত উঠবার চেষ্টা করতে হয়, না উঠলে নীচে গড়িয়ে পড়বে।’
সুভদ্রা বললে, ‘এসব কথা আগেও বলেছ। বাবাকে টানছ কেন? বাবাদের জগৎ ছিল আলাদা।’
‘আমিও তো তাই বলছি।’
‘মাধব সেদিন এসেছিল।’
‘বাঃ! আমি না থাকলেই তোমার বয়ফ্রেন্ড চলে আসে।’
সুভদ্রা হেসে বলে, ‘কী সব যা-তা বলছ। মাধব সম্বন্ধে তোমার বরাবর রিজার্ভেশান আছে। তাই না?’
‘তা আছো’
‘কিন্তু তা কেন? সে কী এমন দোষ করেছে তোমার কাছে?’
‘সে তুমি বুঝবে না।’
‘মাধবের ধারণা তার বিরুদ্ধে একটা চক্র তৈরি হয়েছে। তারা তাকে উঠতে দেবে না। আর সেই চক্রের মধ্যে…’
‘আমিও আছি। মাধব ঠিকই বলেছে। সেই চক্রের মধ্যে আমিও আছি।’
ঝিমঝিম করে বষ্টি শুরু হয়। খোলা জানলা দিয়ে ছাট আসে। সুভদ্রা উঠে গিয়ে কাচের পাল্লা বন্ধ করে দিতে দিতে বলে, ‘কেন গো? মাধব কী দোষ করেছে?’
ডক্টর বোস গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘আমি শুনেছি মাধব দিল্লিতে লবি করেছে। সে যে আমার নিজের বাড়িতেই একটা লবি করে বসেছে আমি তা ভাবি নি।’
সুভদ্রা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, ‘আমি জানতাম তুমি আমার কথায় কান দেবে না।’
চাপা উত্তেজনায় ডক্টর বোস বললেন, ‘আচ্ছা, তুমি কী চাও বলো তো। তুমি কি চাও না আমি আরো বাড়ি। আরো এগিয়ে যাই? আমি আগে বলি নি, এখন তোমাকে স্পষ্ট বলছি, আমি যখনই ভাবছি আমি এগিয়ে চলেছি সেই মুহূর্তেই তুমি আমাকে পেছন থেকে টেনে ধরেছ। তুমি স্পষ্ট করে বলো তো ভদ্রা, কী চাও। তুমি কি চাও আমি এক জায়গায় পড়ে থাকি আর সবাই আমাকে মেরে বেরিয়ে যাক।’
স্বামীর দিকে প্রবল মমতায় চেয়ে থাকে সুভদ্রা। ধীরে ধীরে বলে, ‘আসলে তুমি আমার কাছ থেকে সরে যাচ্ছ মনীষ, এটা আমি চাই না। আমার তো আর কেউ নেই, একা পড়ে আছি। আর তুমি সারা বছর হিল্লি-দল্লি বেড়াচ্ছ। আজ বম্বে, কাল ব্যাঙ্গালোর, পরশু দিল্লি-চণ্ডীগড়। এর মাঝখানে আমি কোথায়?’
‘তুমি সব সময় আছ ভদ্রা। তুমি সব সময় আমার মনের মধ্যে আছ।’
নিঃসন্তান সুভদ্রা ব্যাথায় ছলছলিয়ে ওঠে, ‘তাও যদি একটা ছেলেমেয়ে থাকত।’
‘ও কথা ভেবে আর কী হবে?
‘আমরা যখন মানিকতলার ফ্ল্যাটে ছিলাম, তখন বরং ভালো ছিলাম। তখন আমার মনে অনেক ফূর্তি ছিল। আমি সেই ইস্কুল সামলে কোনো কোনো দিন সন্ধেবেলা বাজার করে ফিরতাম। তোমার বন্ধুবান্ধব আসত, মাধব আসত। সবাই মিলে হই-হল্লা করে কাটত। এখন এই যোধপুর পার্কের সাজানো বাড়ি, কেমন মরা-মরা। তুমি থেকেও নেই। সব সময় কাজ করেছ। চিঠি লিখছ। তোমার শত্রুরা কী বলে জানো?’
‘মানে মাধব?’
‘বলে সেই পুরোনো মনীষ বোস কোথায় হারিয়ে গেছে এখন সে একটা টকিং মেশিন।’
তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে চেয়ে মনীষ বোস বললেন, ‘তুমি কি মাধবকে ভালোবাসো?’
‘এইসব সেমিনার করে করে তোমার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে মনীষ। মাধব তোমার বন্ধু, তোমার ভক্ত। ওসব ভালোবাসা-টালোবাসার কোনো ব্যাপারই নেই। মাঝে মাঝে ভাবি, ওই রকমই যদি কিছু থাকত তাহলেও বরং ভালো ছিল। শুধু বাড়ি পরিষ্কার করো আর বাড়ি পরিষ্কার করো। আর তুমি না থাকলে তোমার ঘন ঘন ফোন ধরো।’
‘তোমাকে একটা সাইকঅ্যাট্রিস্ট দেখানো দরকার।’
‘আচ্ছা মনীষ, তুমি যে এই সারা দেশ চষে বেড়াচ্ছ এতে তোমার মন ভরে? তুমি মনে করছ তুমি খুব জরুরি কাজ করছ?’
স্ত্রীর কথায় অসোয়াস্তি হয় তাঁর। বললেন, ‘মন ভরে বলে তো ছুটে বেড়াই।’
‘আমার মনে হয় তুমি যদি চুপচাপ তোমার ঘরে বসে কাজ করতে, যেমন আগে করেছ বছরের পর বছর, তাহলে বোধহয় শান্তি পেতে।’
‘তুমি বড্ড ভাবের কথা বলছ ভদ্রা। সেমিনারে এত লোক আসছে সারাদেশ থেকে। খানিকটা হইচই হয়তো হয় আমি মানছি। কিন্তু মাধব যেমন ভাবে সবটাই ব্লাফ সেটা ভুল। তোমার কথা তো পৌছে দিতে হবে চারপাশের লোকের কাছে। তুমি যতই ভালো কাজ করো তোমার কাজের কী দাম যদি তা না ছড়ায়, যদি অন্য লোকে তা নিয়ে বলাবলি না করে।’
‘তুমি আগে কিন্তু অন্যরকম বলতে।’
‘তা হয়তো বলতাম। কিন্তু নিজের কাজে ডুবে থেকে তলিয়ে যেতে বসেছিলাম। মানুষের একটা সময় আসে জান, যখন নিজের মুখ নিজের আয়নায় সে দেখতে চায় না। তখন সে অন্যের আয়না খোঁজে।
খানিকক্ষণ চুপচাপ। তাদের দুই জগৎ যেন আলাদা হয়ে পড়েছে আর তারা দুজনেই তা জানে। সে জন্য কথা বাড়ালে বেড়ে যায়। তা কোনো সমাধানে আসতে সাহায্য করে না।
‘আসল কি জান ভদ্রা, ওরা সবাই আমাকে ঈর্ষা করে। এটা আমাদের বাঙালিদের স্বভাব। কেউ দাঁড়ালে তাকে কী করে বসানো যায় তারই সর্বক্ষণ চেষ্টা। মাধবও আমাকে ঈর্ষা করে।’
‘অত্যন্ত ভুল মনীষ, অতান্ত ভুল! মাধব তোমার ভক্ত, তোমায় সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করে।’
‘আসলে ও আমাকে টপকাতে চায়। ওকে বোলো অত অস্থির না হতে। সকলেরই সময় আসে। আমার থেকে তো বয়স অনেক কম। আরো কয়েক বছর যাক। ও যা চাচ্ছে ও তা পাবে। ওর কাজ ভালো আমি জানি। ও হয়তো যা করেছে তার মর্যাদা পায় নি।’
‘অমি তো তাই বলছি মনীষ।’
অসহিষ্ণুভাবে ডক্টর বোস বললেন, ‘কিন্তু তার জন্যে আমার স্ত্রীর মারফত তার সুপারিশের প্রয়োজন নেই যখন সময় আসবে তখন আসবে। তার জন্যে অপেক্ষা করতে হবে।’
তিন
সেমিনারের তিন বৃত্ত। প্রথম প্রাদেশিক, দ্বিতীয় জাতীয়, তৃতীয় আন্তর্জাতিক। ষাট সালে ডক্টর বোস প্রথম বৃত্তে ছিলেন, সত্তর সালে দ্বিতীয় বৃত্তে। কিন্তু তৃতীয় বৃত্ত হব-হব করেও নাগালের বাইরে। আর এই দুই থেকে তিনে যাওয়া কঠিন পরীক্ষা, ভারতীয় স্থল-আর্মিতে কর্নেলের পরের ধাপে উপনীত হওয়ার দুরূহ রাস্তার মতো। প্রথম বৃত্তে লোক অনেক, মাধব যেমন এখানেই পড়ে আছে। পরের ধাপে তাকে তুলে ধরার সুপারিশ প্রধানত ডক্টর বোসের হাতে। কিন্তু কম বয়স হলেও মাধবকে তিনি তাঁর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন। মাধবের সাম্প্রতিক কাজের সুনাম হয়েছে, বিদেশী জার্নালে তারিফ বেরিয়েছে। সে লাফিয়ে প্রথম বৃত্ত থেকে তৃতীয়ে যাবার চেষ্টায় সচেষ্ট। তাকে আটকানো দরকার। তার বদলে ডক্টর বোস পরেশ গুহকে সুপারিশ করেছেন। পরেশ গুহ অত ব্রিলিয়ান্ট নয়। কিন্তু পরেশ বিনয়ী, সে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খায় না। এই লাইনে থাকতে গেলে বিনয়ের প্রয়োজন। বিনয় মোটেই বৃদ্ধের বিদ্যা নয়।
কয়েক দিন ধরে প্রবল বৃষ্টি। রাস্তায় জল কাদা, তাঁদের ইনস্টিটিউটের ভ্যান মাঝপথে এসে ফিরে গেছে এত জল। টেলিফোন বিগড়ে আছে। অফিসে কী খবর এল তা জানতে ডক্টর বোস উশখুশ করেন।
‘বেশ তো ছুটি পেয়েছ, একটু জিরোও না।’ সুভদ্রা বললে। ডক্টর বোস গুম হয়ে বসে থাকেন।
রুগ্ণ শিল্পের ওপর মনোগ্রাফ লিখছেন ডক্টর বোস। খানিক দূর এগিয়েছেন। আসলে রুগ্ণ শিল্প তাঁর বিষয়বস্তু হলেও তার পরিধি তিনি বিস্তৃত করে তুলেছেন। প্রাইভেট এবং পাবলিক এনটারপ্রাইজের আলোচনা তিনি এ প্রসঙ্গে খুটিয়ে করতে চান যাতে তার একটা ব্যাপক ভারতীয় রূপ নেয়। শিল্পে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য কেমন করে সম্ভব তার নির্দিষ্ট রূপও তিনি তুলে ধরতে চান গত দশ বছরে সারা দেশের শিল্পের উত্থান-পতনের আলোচনা প্রসঙ্গে। এ নিয়ে গত কয়েক বছর তিনি খাটছেন, কিছু পরিমাণ নিজেকে অভিনিবিষ্টও করেছেন। এবং লক্ষ্য তাঁর তৃতীয় বৃত্ত। আগস্টে জিনিভায় তৃতীয় বিশ্বের শিল্পের প্রধান সমসা নিয়ে যে সেমিনার হতে চলেছে ডক্টর বোসের পেপারের লক্ষ্য সেই সেমিনার।
এক প্লেট কাটা আম আর ঠাণ্ডা লেবুর সরবত ছোট টিপয়তে রেখে সুভদ্রা বললে, ‘যাক, অনেক দিন পর মনে হচ্ছে নিজের কাজ করছ, ইনস্টিটিউটের ফাইল ক্লিয়ার করছ না।’
কলম রেখে মনীষ বোস বললেন, ‘বোসো ভদ্রা, ঠিকই বলেছ। অনেকদিন পর নিজের কাজ করছি। কিন্তু কী জানো, মনটা বসাতে পারছি না।’
‘আগে তো এরকম ছিলে না।’
‘তা হয়তো ঠিক। আগে খুব একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল না। যেটা আমার কাছে খুব প্রয়োজনীয় তাতেই নিজেকে ঢেলে দিতাম। তারপর সেটা নিয়ে কে কী বলল না-বলল ভাবতাম না।’
‘তাহলে তুমি আমার কথা মানছ?’
‘আমি পালটে গেছি তা বলতে পারো। এখন আমার এই পেপারের লক্ষ্যটা কী জানো? জিনিভা। গত একটা সপ্তাহ আমি সন্ধের পর দিল্লির ট্রাঙ্ককলের জন্যে কান খাড়া করে বসে আছি। ডক্টর সিং-এর কাছ থেকে ফোন আশা করছি। এদিকে ফোন ডেড দুদিন হল।’
‘আর সেই ফোন না পেলে তোমার লেখা আর এগোচ্ছে না। কী আশ্চর্য!’
মনীষ বোস ধীরভাবে বললেন, ‘আমি আশ্চর্য হই না ভদ্রা। আশ্চর্য হবার কী আছে! জিনিভাটা হলে সামনের সামারে এই সেমিনারের কণ্টিনিউয়েশান প্যারিস। সবই নির্ভর করছে একটা সুতোর ওপর। আর এই সুতোর প্রান্ত ধরে আছে ডক্টর সিং।’
সুভদ্রা তার বড় বড় চোখ তুলে বললে, ‘জিনিভা প্যারিস, তাতে কী?’
‘তাতে কী বলছ! তুমি অ্যাবসার্ড সুভদ্রা! অন্য কারুর স্ত্রী হলে সেও আমার মতো উশখুশ করত, অস্থির হয়ে পড়ত। আর তুমি ব্যাপারটাকে পাত্তাই দিচ্ছ না।’
তারপর মনীষ বোস বললেন, ‘দাঁড়াও দেখি, টেলিফোন সেরেছে কি না।’
বলবার সঙ্গে সঙ্গেই টেলিফোনের রিসিভার তুলে আনন্দে চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘ঠিক হয়ে গেছে! ঠিক হয়ে গেছে!’ সঙ্গে সঙ্গে ইনস্টিটিউটে ফোন করেন।
‘নিমাই, আমার কোনো টেলিগ্রাম এসেছে?’
‘হ্যাঁ স্যার, কাল থেকে একটা টেলিগ্রাম পড়ে আছে। কাল আপনাকে ফোনে পাই নি। ফোন খারাপ নাকি?’
‘তুমি টেলিগ্রামটা খোল। আচ্ছা দাঁড়াও, রাখো, আমি যাচ্ছি।’
‘বলা হয়েছে। খেয়ে যাও।’ সুভদ্রা বললে।
কিছু ভেবো না। আমি অফিস ক্যান্টিন থেকে খাবার আনিয়ে নেব।’
উত্তেজনায় টগবগ করেন ডক্টর বোস। মুখ ধুয়ে হাওয়াই শার্ট চাপিয়ে স্ত্রীকে বললেন, ‘ভদ্রা, উইশ মি গুড লাক।’
‘গুড লাক।’ যান্ত্রিক গলায় সুভদ্রা বলে।
রাস্তায় হাঁটু পর্যন্ত জল। রিকশায় চাপলেন ডক্টর বোস। মোড় থেকে মিনি বাস। ঘণ্টাখানেক হল মিনি চলতে শুরু করেছে।
বাথরুম থেকে টেলিফোনের আওয়াজ পায় সুভদ্রা। মাথার জল মুছতে মুছতে টেলিফোন ধরে।
‘সিং-এর টেলিগ্রাম পেয়েছি’ উত্তেজিত গলা মনীষ বোসের। ‘সামনের আগস্টে জিনিভা, সামারে প্যারিস।’
‘কবে রওনা হতে হবে?’
‘সামনের মাসে সাত তারিখে। এখানে দিল্লিতে কয়েকদিন, যেমন হয়। তারপর সব ক্লিয়ারেন্স আছে তো…ভিসার ব্যাপার…ভাবছি লন্ডনেও… একি… ছেড়ে দিলে!’
সুভদ্রা ফোন নামিয়ে রেখেছে।