“দাদা, উস্তাদ রাশিদ খান কেমন গান গায়?”…..আমার এই প্রশ্নের উত্তরে অজয়দা অর্থাৎ পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী আমার মুখের দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকালেন। ভাবটা এইরকম ছবিওয়ালা গায়কের গুনেরও খবর রাখার চেষ্টা করে বুঝি!!
তারপর কি ভেবে বললেন — “জানো একবার সকালে আমি বাজার করতে যাচ্ছিলাম। তখন আমি এবং রাশিদ টালিগঞ্জের কাছে সংগীত রিসার্চ এ্যাকাডেমিতেই থাকতাম। যাওয়ার পথে সকালে কেউ রেওয়াজ করছে সা-রে-গা-মা আমার কানে আসে। বেশি করে “সা”-এর সুর ধরাটা আমার মনে লাগে। আমি দাঁড়িয়ে পরি….আওয়াজটার কাছাকাছি যেতেই যে বাড়িটার সামনে আমি দাঁড়ালাম, সেটা রাশিদের বাড়ি। ও রেওয়াজ করছে। কিন্তু যে ভাবে “সা” ধরছে আমি অবাক হয়ে গেলাম।
বাজারে না গিয়ে বাড়ি চলে এলাম। তোমার বৌদিকে বললাম, একটু হারমনিয়ামটা বার করো তো…তোমার বৌদি তো অবাক, আরে এই তো বাজারে গেলে আবার ফিরে এসে হারমোনিয়াম! আমি বললাম, আসলে রাশিদ গানের রেওয়াজে করছে। ও যেভাবে “সা”টা ধরেছে এটা আমি একবার নিজে চেষ্টা করে দেখতে চাই। চেষ্টা করলাম কিন্তু রাশিদের মতন কিছুতেই হলো না। অশোক, রাশিদ-এর ওই “সা” ধরাটা আমায় বুঝিয়ে দিয়েছিল ও কতবড়ো গায়ক।”
আসলে ভারতীয় রাগ-রাগিনী বা ধ্রুপদী সংগীতের আমি এক আনাড়ি শ্রোতা এবং দর্শক। কিছুই বুঝি না। কলকাতার মিউজিক সম্মেলনগুলোয় একসময় ভারতীয় ক্লাসিক্যাল ঘরানার বিখ্যাত শিল্পীদের চাঁদের হাট বসতো। বিশেষ করে ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স তো দেশের মধ্যে কুলীন বলাই যায়।
আনন্দবাজার পত্রিকা চিরকালই রাগ সঙ্গীতের উপর আলাদাই গুরুত্ব দিত। এবিপির হয়ে আশীষ চট্টোপাধ্যায় আসরগুলোয় যেত। আশীষদা রাগ সঙ্গীতের বোদ্ধা যাকে বলা যায়। ওনাকে চেনে না এমন সঙ্গীতজ্ঞ কেউ নেই। বিখ্যাত শিল্পীদের দেখেছি আশীষদার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে। আমিও ছবি তোলার জন্য মাঝে মাঝে সঙ্গীত সন্মেলনগুলোয় হাজির হতাম। বলতে গেলে আশিষদার সূত্র ধরেই সঙ্গীতের বিশ্ববিখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে আমার আলাপ ও পরিচয়।
আমি দেখেছি ক্লাসিক্যাল শিল্পী মানুষরা খুবই সহজ সরল হন, ফলে তাদের সাথে কিছুক্ষন কাটালে আপনার নিজেরই অবাক লাগবে যে এরা এত নামী হয়েও কি করে এমন সাধারণ!! এবং আজ গর্ব করে বলতে পারি এইসব মহান পন্ডিত, উস্তাদদের সাথে আমার সেই যোগাযোগ এখনও আছে।

অজয়দাও সেরকমই একজন কাছের মানুষ। সেই সময় রাশিদের সাথেও আমার সামান্য আলাপ হয়েছে। ছবিওয়ালার এরকম ঘরোয়া আড্ডা প্রায়ই জমতো ছবি তোলার ফাঁকে ফাঁকে। সেইরকম একদিন পন্ডিত অজয় চক্রবর্তীর কাছে উপরোক্ত কথাগুলো জানতে চেয়েছিলাম।
শুনেছি পৈতৃক ঐতিহ্যের ঘরানার উত্তরসূরি হিসেবে যখন ওনার ছোটবেলায় রেওয়াজ শুরু হলো, তখন নাকি সপ্তসুরের এক একটি সুরকে কয়েক মাস ধরে গাইতে হত। এই হচ্ছে উস্তাদ রাশিদ খান, যাঁর সঙ্গীতচর্চার শিকড় বটবৃক্ষের মত গভীর বলেই আজ মাত্র পঞ্চান্ন বছরের যাত্রাশেষে তিনি রেখে গেলেন আগামীর জন্য কয়েকশো বছরের পুঁজি।
গত ৯ তারিখ মুখ্যমন্ত্রীর সভা করে জয়নগর থেকে তাড়াতাড়ি কলকাতা ফিরছি কারণ বিকেলবেলা বাবুঘাটে সাগরমেলার উদ্বোধনে মুখ্যমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন। মাঝপথে রাশিদের খবরটা শুনলাম। বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠলো। এটা হতে পারে না। মোবাইলে কিছু বন্ধুদের কাছে জানতে চাইলাম। সবাই হ্যাঁ বলাতে নবান্ন থেকে শুনলাম মুখ্যমন্ত্রী পিয়ারলেস হাসপাতালে যাচ্ছেন।
ঠিক মাসখানেক আগে, বিশিষ্ট নাটক এবং সিনেমার পরিচালক আমার পিতৃতুল্য গৌতম হালদারকে হারিয়েছি। আজ আপনাদের কাছে রাশিদ সঙ্গীতের উস্তাদ পণ্ডিত হলেও আমার কাছে বন্ধুর মতো। বয়সে ও আমার থেকে অনেকটাই ছোটো। কিন্তু ও এতটাই বন্ধুবৎসল যে কাছের মানুষ হয়ে উঠতে সময় লাগে না। শুধু রাশিদ নয় ওর পুরো পরিবারের সাথেই আমার ওঠা-বসা, খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা সব হত। প্রসঙ্গত বলি, রাশিদের পরিবারের সঙ্গে গৌতমদা অর্থাৎ গৌতম হালদারের স্ত্রী ও মেয়ে চৈতী, রাইদের কিন্তু ভীষন আন্তরিক সম্পর্ক। রাশিদ অসুস্থ ছিলো ঠিকই কিন্তু সেটা যে রাশিদকে এভাবে নিয়ে চলে যাবে ভাবতে পারিনি।
কত টুকরো টুকরো স্মৃতি মনে পরছে। কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখব বুঝতে পারছি না। রাশিদের স্মৃতিচারনে ছবিওয়ালার গল্প লিখতে হবে ভাবিনি কখনও…
উফফফ কি নিষ্ঠুর আমাদের যমরাজ। সেদিন কোথাও না গিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। কাকে কি বলবো কিই বা সান্তনা দেবো!! সন্ধ্যেবেলায় টিভি খুলতেই শুধু রাশিদের মৃত্যুর খবর আর ওর গানের সুর ছেয়ে আছে….ইশ এদেরকে কেন এত তাড়াতাড়ি মৃত্যুর প্রয়োজন পরে?
রাশিদের সাথে আমার ওঠাবসা, ওর বাড়িতে যাওয়া সে বহুকাল আগের কথা। রাশিদের দুটো মেয়ে সুহা আর শাওনা তখন খুব ছোটো। যে ছেলেকে রাশিদের সাথে এখন গান করতে দেখেন সে তখনও হয়নি। একদিন রাশিদের স্ত্রী সোমা ঘরোয়া আড্ডায় হেসে বললো, “রাশিদকে এবার থামতে বলো।”
রাশিদ হেসে বললো, “অশোকদা আমরা পুরুষমানুষ…থামার কি আছে?”
তার কয়েকবছর পরেই ছেলে আরমান হয়। শুনেছি সেও নাকি খুব ভালো গায়। যদিও বংশপরম্পরায় এটাই স্বাভাবিক।
রাশিদ পান খেত খুব। ওর বাড়ি গিয়ে প্রায়ই জর্দাছাড়া একটা পান খেতে চাইতাম। ও যে চুনটা দিত সেটা সাদা নয় গোলাপী। আমি সেই রঙিন চুন ওর কাছে ছাড়া আর কোনোদিন কারো কাছে দেখিনি। ওকে জিজ্ঞাসা করতে বলেছিলো, “ইয়ে গুলাবী চুন হ্যায়।”
তখন কলকাতার পাতায় ছবি তুলি। রাশিদ গানপাগল আড্ডাবাজ মানুষ। লোকজনকে বাড়িতে ডেকে নিজে রান্না করে খাওয়াতে ভালোবাসতো। বিরিয়ানি বোধহয় ওর প্রিয় রান্না। একদিন ওর বাড়িতেই বিরিয়ানি খাওয়ার ফাঁকে রাশিদ বলেছিল, “অশোকদা আমার এমনই ভাগ্য যে কলকাতার কোনও বন্ধ দেখিনি। তখন বামফ্রন্টের সময়। বন্ধ তখন এক একটা রাজনৈতিক দলের ব্রহ্মাস্ত্র ছিল।

আমি বললাম, “সেকি! বাংলায় এত বন্ধ হয় কোনও বারই থাকোনি?”
রাশিদ বলল, “মাইরি বলছি, থাকি নি। হর বার ঠিক উস সময়ই আমার বিদেশে প্রোগ্রাম চলে।”
কিন্তু কথাটা আমার মনে গেঁথে গেছিল। এর ঠিক কয়েকমাসের মধ্যেই কোনো কারনে বাংলা বন্ধ হয়। কোন রাজনৈতিক দল মনে নেই। কলকাতার রাস্তাঘাট ফাঁকা। ভরদুপুরে নাকতলায় বান্টি সিনেমার পেছনে রাশিদের প্রাসাদপম বাড়িতে হাজির হই। গেটে ঢোকার মুখে দেখি দূরে একটা আইসক্রিম ওয়ালা ওই গলির ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাকে আটকাই, লোহার গেটের কাছে আসতে বলি। এবার গেট কিপারকে বলে দরজা খুলে আইসক্রিমের গাড়িটা গেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিই।
রাশিদের বাড়িতে দীর্ঘদিন যাতায়াতের ফলে আমাকে সকলে চিনতো। রাশিদ, সোমাকে নিচে আসার জন্য ডাকতে শুরু করি। দুপুরবেলা, তাই সাধারন পোশাকেই ওরা বেরিয়ে আসে। সঙ্গে দুই মেয়ে …।
আমি বললাম, “তোমরা আইসক্রিম খাও, আমি ছবি তুলবো।”
রাশিদ বললো, “আরে এ আবার কি ছবি!!”
সোমা একটু বুঝলেও হেসে গড়াগড়ি দেয়।
এদিকে দুই মেয়ের আবদারে ততক্ষণ রাশিদ আইসক্রীমের বাক্স খুলে ফেলেছে। আমাকেও ডাক দেয়। যাওয়ার আগে আমি বেশ কিছু ছবি তুলে ওদের সাথে আমি নিজেও আইসক্রীম খেতে যোগ দিই। সেই ছবি কলকাতার পাতায় ধর্মঘটের পরের দিন প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে সে ছবিটি দেওয়া থাকলো।
গত পরশু ১১ তারিখ আনন্দবাজার পত্রিকায় বিশিষ্ট গায়িকা হৈমন্তী শুক্লার রাশিদকে নিয়ে একটি লেখা রয়েছে। তার ভেতরে যে ছবিটায় হৈমন্তীদি রাশিদকে ভাইফোঁটা দিচ্ছে সেটা এই অধমেরই তোলা ছবি।

হৈমন্তীদির বাবার মৃত্যুদিন বাবুঘাটে গিয়ে হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে তর্পন করেন, ফুল ভাসিয়ে দেন। একথা হৈমন্তীদির মুখে শুনে, আমি সে ছবিও তুলেছি।
আমার একটা অভ্যাস ছিল কোনও সেলিব্রিটি মানুষের একবার ছবি তোলার ভেতরেই আরও একটা ছবির গল্প শুনে রাখতাম। তখনই জেনেছিলাম হৈমন্তীদির সঙ্গে রাশিদের ভাই-বোনের সম্পর্ক। এমনকি রাশিদকে ভাইফোঁটা দেওয়ার কথাও বলে ফেললেন।
হৈমন্তীদির সঙ্গে আমার সম্পর্কও কিন্তু দিদি-ভাই-এর মতো। আমাকেও তুই বলে। কথায় কথায় সেদিন বলেছিল, “অশোক এবার ভাইফোঁটায় তুই আয়, তোকেও ফোঁটা দেব।”
যথারীতি আমি ভাইফোঁটার দিন হৈমন্তীদির বাড়ি পৌঁছে যাই। আমার যাওয়ার কিছুক্ষন পরই রাশিদ আসে। আমাকে হৈমন্তীদি পীড়াপীড়ি করেন, “অশোক তুই রাশিদের পাশে বসে যা। তাহলে একেবারে আমার কাজ হয়ে যাবে। হাঁটুতে ব্যাথা। বার বার মেঝেতে ওঠাবসা করতে হবে না।”
আমি বললাম, “না না, আগে তোমার রাশিদের ছবি তুলবো, ওটাই আমার আজকের সাবজেক্ট।”
রাশিদকে ফোঁটা দেবার পর খুব যত্ন করে আমাকেও হৈমন্তীদি ফোঁটা দিলেন। তারসাথে পাঞ্জাবি, মিষ্টি দুপুরের খাবার। হৈমন্তীদি খুব আদোআদো করে আদূরে কথাবার্তা বলেন, ওনার বিখ্যাত সেইসব গানের মতো।
আমায় বলেছিল, “তুই কিন্তু প্রতিবার আসবি।”
আমি দু-বার গিয়েছিলাম। তারপর আর সময় হয়নি।
সংগীত জগতে রাশিদের সঙ্গে হৈমন্তীদির সম্পর্ক একেবারে আমাদের ঘরের ভাইবোনের মত। ভাবলে অবাক হই এখনকার সময়ের রাজনীতি যেটা আমাদের ভুলিয়ে রেখেছে। মানুষ এখন প্রকাশ্যেই হিন্দু মুসলমান নিয়ে বিদ্বেষী কথাবার্তা বলছে। এদের কাছে মানুষে মানুষে সম্পর্কটা পরিচয় নয়, জাতপাতটাই সবথেকে বড়ো পরিচয়।
যাক এসব কথা, যতদূর মনে পরছে… আমার ভুল হতে পারে, হৈমন্তীদি ওই বছর থেকেই রাশিদকে ফোঁটা দিয়ে আসছেন। ওটাই ছিল প্রথম। কলকাতায় থাকলে রাশিদ ভাইফোঁটার দিন হৈমন্তীদির বাড়িতে যাবেই।
ক্লাসিক্যাল মিউজিকের কিছু তেমন না বুঝলেও রাশিদের বহু স্টেজ পারফরমেন্স শুনেছি আমি। বন্ধুত্ব হয়েছে। ততদিনে ও জেনেও গেছে, আমি কলকাতার পাতার জন্য অনেক সেলিব্রিটি বিশিষ্ট মানুষদের এক্সক্লুসিভ ছবি তুলি।
একদিন সকালে রাশিদের ফোন, “অশোকদা আমার বাড়ি চলে এসো। বিখ্যাত পেইন্টার হুসেন (মকবুল ফিদা হুসেন) সাহেব আসছেন।”
আমি বললাম, “কেন?”
বললো, “জানিনা। তুমি সকাল সকাল চলে এসো।”
আমি তো সেই আনন্দে সাতসকালেই রাশিদের বাড়িতে হাজির। যথা সময়ে হুসেন বাড়িতে এলেন। গাড়ি থেকে নামলেন…. সেই খালি পায়ে!!
রাশিদ ও সোমার সাথে অনেক কথাবলার ফাঁকে আমি জানতে চেয়েছিলাম, “কেন রাশিদের বাড়িতে এলেন?”
হুসেন উত্তরে বলেছিল, “কলকাতায় বছরে বহুবার আসি। আমি দুবাইয়ে রাশিদ-এর গানও শুনেছি। এই রকম একটা মানুষের সঙ্গে আমার কথা বলার বহুদিনের ইচ্ছে ছিল, আজ সেই ইচ্ছে পুরন হলো।”
রাশিদের ছোট দুই কন্যাকে দেখে হুসেন খুব দ্রুত তপোবনে শকুন্তলার একটা ছবি এঁকে ওদেরকে উপহার দিলেন। হুসেনের ছবি বলে কথা। আমরা জানি, হুসেনের এক আঁচড়ের দাম লাখ নয় কোটি টাকা। পরে দেখেছিলাম ওটা রাশিদ বাড়িতে বাঁধিয়ে রেখেছে।
রাশিদের পরিবারের সাথে ছবি তুলতে তুলতে কখন যে আপন হয়ে গেছি নিজেই জানিনা। ওই বাড়িতে বহু অনুষ্ঠানে আমি যেতাম। জন্মদিন, ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি।

বাড়িতেই রাশিদ বন্ধুদের জন্য একটা অনুষ্ঠান করতো। সেটা কলকাতার সংগীতপ্রেমী এবং শিল্পীদের কাছে বিরাট পাওনা বলা যেতে পারে। গল্প করার ফাঁকে ফাঁকে কথা বলতে বলতে রাশিদ সুরের বিভিন্ন ভাঁজ মারতো যা শুনতে আমার মত মূর্খেরও অসাধারণ লাগতো। এককথায় ও সঙ্গীতেই ডুবে থাকতো।
একটা সময় ওস্তাদ রাশিদ এবং অজয়দার সাথে একটা চাপা অভিমান কাজ করছিল। সেই সময় একই স্টেজে একসাথে দু-জনকে দেখাই যেত না। আজকে এই কথা বলছি বলে, পাঠকরা অন্যভাবে নেবেন না। দু-জন শিল্পীর ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবদের কাছে সেটা খুব কষ্টের ছিল। আমি ছবিওয়ালা, তা সত্বেও সেই কষ্টটা আমারও হতো। এখানে সেই আলোচনা করার মানে নেই। কিন্তু বিশ্বাস করুন ওই সময়ে আমি অজয়দা এবং রাশিদ খানকে নিয়ে একটা ছবি করেছিলাম। আমি জানি সেই ছবি দেখে অনেক সংগীতপ্রেমীর মুখে হাসি ফুটেছিল।
গর্বের সাথে বলছি, এই দুইজন মহানশিল্পীর কাছে আমি ভাগ্যবান। কেননা এই দুজন শিল্পী আমায় মাথায় উঠিয়ে ছবি তোলার মাস্তানি শিখিয়েছিলেন। আসলে আমি যেটা বলতে চাইছি, এই দুজনেরই অসাধারণ সব মুহূর্তের ছবি আমি তুলেছি। যা ওনারা দুজনেই কোনো আপত্তি করেননি। বরং সাহায্য করেছেন। আমি কৃতজ্ঞ।
অজয়দার মেয়ে এইসময়ের বিখ্যাত গায়িকা কৌশিকী চক্রবর্তী দেশিকান যাকে এখনও ঘরোয়া ভাবে আমি পুতুল বলেই ডাকি। কৌশিকীর এটাই ডাকনাম। সেই পুতুলের একটা লেখা পড়ে খুব ভালো লাগলো। অজয়দা, রাশিদ, কৌশিকী, চন্দনাবৌদি, সোমা এরা সবাই কিন্তু একটাই পরিবারের মত। এহেন পারিবারিক সম্পর্কের বুনন কেটে রাশিদ চলে গেল। ওতো শুধু শিল্পী ছিল না….ওর গলার মতই জমাটি আড্ডাবাজ সারল্যে ভরপুর একজন মানুষকেও আমরা হারালাম।
একবার কলকাতায় বিশ্ববঙ্গ সম্মেলন হয়েছিল। সঠিক বছরটা মনে পরছে না তবে ১৯৯৯ সাল হতে পারে। ক্লাসিক্যাল-এর অনুষ্ঠানের প্রোগ্রামে ছিলেন রাশিদ খান, পারভীন সুলতানা, আমজাদ আলী খান, অজয় চক্রবর্তী, পন্ডিত যশরাজ, ভীমসেন যোশি। বেশ মনে আছে রাশিদই সেদিন প্রথম গান গাইতে উঠেছিল।
অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল সন্ধ্যে সাড়ে ৬টা পৌনে ৭টায়, শেষ হয়েছিল পরদিন সকাল ৭টায়। কিন্তু আমার যেটা অবাক লেগেছিল রাশিদ সবার প্রথম গান গাইলেও নিচে স্টেজের সামনে সোফায় বসে শেষ অবধি অনুষ্ঠান শুনেছিল। ওর গান গাওয়া হয়ে গেছে ও তো চলে যেতেই পারতো। কিন্তু না ও যায় নি। সবার গান শুনে সকালে বেরিয়েছিল। অন্যান্য সহশিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রাশিদের মধ্যে বরাবর ছিলো।
রাশিদের মত এত হাসিখুশি প্রানবন্ত অজাতশত্রু শিল্পী আমরা বোধহয় আর দুটো পাব না। আমাদের অনেক কিছু পাওয়ার ছিল এই মহান উস্তাদজির কাছে। পঞ্চান্ন কি একটা বয়স চলে যাওয়ার?
১০ তারিখ সকালে রবীন্দ্রসদনে সোমার কাছে দাঁড়াতেই আমার ঠোঁট কেঁপে চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। ও বুঝতে পারে। আমায় দু-হাতদিয়ে আলিঙ্গন করে পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। আমি ওকে কি বলবো কিছু ভেবে পাচ্ছিলাম না। পাশেই রাশিদের বড়ো মেয়ে সূহা মুখঢাকা অবস্থায় খুব কান্নাকাটি করছে। ছোটমেয়ে শাওনার কান্নায় চোখ লাল। ছেলে আরমান আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। কতটুকু বয়স থেকে ওদের দেখছি হাসতে খেলতে। কখনও ভাবিনি ওদের সামনে এভাবেই দাঁড়াতে হতে পারে!!

ছেলে-মেয়ের মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে পিছনে ঘুরতেই লম্বা টেবিলে রাশিদের পা দুটো লাল গোলাপে ঢাকা। একটু রোগা হয়ে গেছে। আমি বেশিক্ষণ তাকাতে পারিনি। গান স্যালুটের তোড়জোর চলছে। আমি বাইরে বেরিয়ে আসি।
মুখ্যমন্ত্রী ঢোকার পর রোবটের মতো সব কাজকর্ম করে গান স্যালুট শেষে রাশিদের দেহটা যখন গাড়িতে তোলা হচ্ছে….আমি একটু দূরে কাঁচের ফাঁক দিয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম, না রাশিদ তোমার এই মুখটা চোখ দেখছে না। আমার চোখ আর মন বাড়িতে লুঙ্গি পরে একটা হাফহাতা গেঞ্জি পরে পানশুদ্ধু তোমার সেই হাসি মুখটা মনে পরছে…
তুমি বলছো, “অশোকদা কি খবর বলো?”
আর আমি বলছি, “তুমিতো রেওয়াজ করছো খাটের ওপর।”
তুমি বললে, “এতো সারাদিনই চলবে। তুমি এসেছো একটু গল্প তো করি।”
সঙ্গীতের আকাশে নক্ষত্রসম রাশিদ তোমাকে হয়তো আর দেখতে পাবো না। তবে তুমি আমার কাছে জীবিতই থাকবে।
ছবিগুলো রাশিদের বিভিন্ন মুহূর্তের। শত ইচ্ছা থাকলেও কৌশিকী আর রাশিদের খুব সুন্দর একটি ছবি খুঁজে পেলাম না। অন্য একদিন পোস্ট করবো।
১৩/০১/২০২৪
অপূর্ব
অপূর্ব লেখা