অশোককুমার ভাদুড়ী— এই নামটির সঙ্গে বাংলার নাট্যজগতের বহু মানুষই আগে থাকতে পরিচিত। কৃষ্ণনগরকে কেন্দ্র করে সমগ্র জেলা তথা বাংলায় তাঁর নাট্য প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটেছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলার নাট্যচর্চার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা হলে অশোককুমার ভাদুড়ীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতেই হবে। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ (শনিবার) ভোর চারটে নাগাদ কলকাতার একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব অশোককুমার ভাদুড়ী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
অবিভক্ত বাংলার পাবনা শহরে ১৯৩৯ সালের ৯ মার্চ অশোককুমার ভাদুড়ীর জন্ম। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলে তাঁর পরিবার এপার বাংলায় চলে আসে। তাঁর পিতার নাম নরেশচন্দ্র ভাদুড়ী, যিনি একজন শিক্ষক ছিলেন। এপার বাংলায় এসে ভাদুড়ী পরিবার কৃষ্ণনগরের শক্তিনগর এলাকায় বসবাস শুরু করে। শক্তিনগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অশোককুমার ভাদুড়ী পড়াশোনার পাঠ নেন। তারপর কৃষ্ণনগরের বিপ্রদাস পাল চৌধুরী ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন। তিনি বাংলার ঐতিহ্যমন্ডিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজেও শিক্ষালাভ করেন। অশোককুমার ভাদুড়ী কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজ প্রাক্তনী সংসদেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বভার সামলেছেন। বিভিন্ন সময়ে কলেজের মান-মর্যাদা রক্ষার একাধিক লড়াইয়ে তাঁকে সামনে থেকে লড়তে দেখা গেছে। অশোককুমার ভাদুড়ী ছিলেন কৃষ্ণনগরে সাংস্কৃতিক গণচেতনার অন্যতম মুখ। কয়েক দশক আগে রবীন্দ্রভবনকে বেসরকারিকরণের যে ঢেউ শহরের বুকে আছড়ে পড়েছিল, তাকে প্রতিহত করতে অশোককুমার ভাদুড়ী সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই আন্দোলন সফলতার মুখ দেখেছিল। এ ধরনের আরো অনেক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অশোককুমার ভাদুড়ী প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। অশোককুমার ভাদুড়ীর প্রয়াণ সংবাদ পেয়ে তাঁর বহু অনুরাগী সকাল থেকেই শক্তিনগর পাঁচমাথা মোড় সংলগ্ন তাঁর বাসভবনে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে জড়ো হন। তবে কলকাতা থেকে অশোককুমার ভাদুড়ীকে নগেন চৌধুরী রোডের এই বাড়িতে আনতে বেলা গড়িয়ে যায়। দুপুর ২:৪৫ নাগাদ তাঁকে কৃষ্ণনগরের শক্তিনগরে নিজ বাসভবনে আনা হয়। সেখানে এক ঘন্টা শায়িত থাকার পর তাঁকে কৃষ্ণনগরের চারটি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হয়। প্রথমে তাঁর নিজের স্কুল অর্থাৎ শক্তিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে যাওয়া হয় পার্শ্ববর্তী স্টুডেন্টস হেলথ হোমে (কৃষ্ণনগর আঞ্চলিক কেন্দ্র)। তারপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় বি.পি.সি. ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে। এই প্রতিষ্ঠানের সূচনায় প্রথম বছরের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন অশোককুমার ভাদুড়ী। কৃষ্ণনগরে তাঁর শেষ গন্তব্য ছিল রবীন্দ্রভবন। রবীন্দ্রভবনের মূল প্রবেশপথে সিড়ির সম্মুখে অশোককুমার ভাদুড়ীর মরদেহ কিছুক্ষণের জন্য শায়িত করা হয়, সেখানে কৃষ্ণনগরের নাট্যকর্মীদের পক্ষ থেকে অশোককুমার ভাদুড়ীকে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হয়। সেখান থেকে বৈকাল চারটে নাগাদ নবদ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া হয়।
অশোককুমার ভাদুড়ী ছিলেন কৃষ্ণনগরের শক্তিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার একেবারে প্রথম দিকের ছাত্র ছিলেন তিনি। নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরের প্রান্তে শক্তিনগর উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপিত হয় ১৯৪৯ সালে। অশোককুমার ভাদুড়ীর প্রাথমিক শিক্ষা ওপার বাংলায় হলেও দেশভাগের পর তাঁর পরিবার এপার বাংলায় চলে আসে এবং তাঁকে শক্তিনগরের এই বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। স্কুলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই সম্প্রতি শক্তিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন (২-৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩) অনুষ্ঠানে ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়েও তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন। বিদ্যালয়ের ৭৫তম বর্ষ উপযাপন উপলক্ষে চারদিনব্যাপী যে অনুষ্ঠান হয়, তার শেষ দিন অর্থাৎ ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র অশোককুমার ভাদুড়ী রচিত ‘খাঁচা’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। এটি নির্দেশনায় ছিলেন তপনকুমার ভট্টাচার্য এবং অভিনয়ে ছিলেন সুমন, তৃষিত, বিদ্যুৎ, তপন, প্রদীপ, সৌমেন, প্রীতি এবং মৌসুমী। এটি ছিল স্কুলের প্রাক্তনীদের প্রযোজনা। সেই অনুষ্ঠানের কুড়ি দিনের মাথায় অশোককুমার ভাদুড়ী প্রয়াত হন। তাঁর প্রয়াণে বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষিকারা শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন।

ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে তিনি রাজ্য সরকারের চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। চাকরি জীবনেও তিনি নৈতিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। দীর্ঘ চাকরি জীবনের পর বিশ শতকের নয়ের দশকের শেষ লগ্নে তিনি সসম্মানে অবসর গ্রহণ করেন। নাট্যচর্চা তো বটেই, সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা এবং সমাজবিজ্ঞানের প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছিল। বহু গুণী মানুষের সান্নিধ্য তিনি পেয়েছিলেন। নাট্যকার অরুণ মুখোপাধ্যায়, আশীষ সান্যাল, কবি বীরেন চট্টোপাধ্যায়, নীরদবরণ হাজরা, আচার্য ক্ষুদিরাম দাস, সুধীর চক্রবর্তী প্রমুখের সঙ্গে তাঁর বিশেষ সখ্যতা ছিল। ‘একান্ত সুধীর’ পুস্তকে সুধীর চক্রবর্তীর স্মরণে অশোককুমার ভাদুড়ী লিখেছিলেন— “আদ্যোপান্ত কৃষ্ণনাগরিক এই মানুষটি কৃষ্ণনগরের বাইরে সে অর্থে থাকেননি কোনদিন। কৃষ্ণনগরকে তিনি ভালোবাসতেন, কৃষ্ণনগরের মানুষজনও তাঁকে ভালোবাসত। যে পারিবারিক ‘মরুপথতাপ’ তাঁকে আজীবন সইতে হয়েছে নিঃশব্দে, সম্ভবত কৃষ্ণনগরের ভালোবাসা তার উপর স্নিগ্ধ বারি সিঞ্চন করত। কৃষ্ণনগর তাঁর জন্য গর্বিত ছিল। তাঁর জন্যই কৃষ্ণনগর অনেকদিন পর বাংলার মানচিত্রে পরিচিতি পেয়েছিল, তাঁর প্রয়াণে কৃষ্ণনগর সেই পরিচিতি হারিয়ে রিক্ত হয়ে গেছে।” এই বাক্যবন্ধ থেকেই বোঝা যায় যে, উভয়ের মধ্যে অকৃপণ ভালোবাসার সম্পর্ক বিরাজমান ছিল। আবার অশোককুমার ভাদুড়ীর নিজের মুখ থেকেই আমরা শুনেছি যে, আচার্য ক্ষুদিরাম দাসের প্রতিভার বিচ্ছুরণ তাঁকে কিভাবে প্রভাবিত করেছিল! অন্যদিকে ‘সীমান্তের প্রহরী’, ‘স্মৃতিসত্তা নিয়ে’, কালিদাসের মেঘদূতের বঙ্গানুবাদ প্রভৃতির লেখক প্রখ্যাত সাহিত্যিক পরেশনাথ সান্যালের সঙ্গেও অশোককুমার ভাদুড়ীর পারিবারিক যোগসূত্রতা স্থাপিত হয়েছিল। পরেশনাথ সান্যাল ছিলেন অশোককুমার ভাদুড়ীর সহধর্মিনী মীরা সান্যালের পিতা। সাহিত্যিক পরেশনাথ সান্যাল ছিলেন শক্তিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহ-প্রধান শিক্ষক। কন্যা মীরা সান্যাল ছিলেন সংগীতশিল্পী। তিনি পরবর্তীতে শক্তিনগর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে সহ-প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মভার সামলেছিলেন। অশোককুমার ভাদুড়ী ও মীরা সান্যাল উভয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। মীরা ভাদুড়ী (৮০) বর্তমানে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা। অশোককুমার ভাদুড়ীর প্রয়াণে তাঁর পরিবার, নিকট আত্মীয় থেকে শুরু করে পাড়ার প্রতিবেশী, অনুরাগীবৃন্দ— সকলেই গভীর শোকাহত। অশোককুমার ভাদুড়ীর অনুজ অরুণ ভাদুড়ী (৮২) বি.পি.সি. ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক।

অশোককুমার ভাদুড়ী রচিত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘জিরাফ’, ‘খাঁচা’, ‘শ্রীকান্ত’। নাট্যচর্চার পাশাপাশি রবীন্দ্র সাহিত্যের প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। তাঁর রচিত একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল ‘রবীন্দ্রসঙ্গ’। কালীনগর কো-অপারেটিভ সোসাইটি-র প্রকাশন বিভাগ থেকে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। তবে অতি সমৃদ্ধ একটি পুস্তক হওয়া সত্ত্বেও এটি রবীন্দ্র গবেষক বা সাধারণ পাঠকবর্গের কাছে খুব বেশি পৌঁছায়নি। এই গ্রন্থটিতে অশোককুমার ভাদুড়ী রবীন্দ্রসমকালীন এমন কিছু ব্যক্তি বা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন যা তুলনামূলকভাবে স্বল্প আলোচিত। যেমন জগদানন্দ রায়, প্রিয়নাথ সেন, ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, আশুতোষ চৌধুরী, বিবেকানন্দ প্রমুখরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনে বা সাহিত্যকর্মে কতটা প্রভাব ফেলেছিলেন, সেবিষয়ে বইটিতে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া অশোককুমার ভাদুড়ী বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রচনা করেছেন, যেগুলি ছোট বড় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বা গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। কলকাতার আনন্দ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত অশোককুমার ভাদুড়ীর নাট্য সংকলনের কথাও এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়।
নাট্যচর্চার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। নদিয়া জেলা তো বটেই, বাংলার একজন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। প্রথম দিকে ‘শিল্পী সাথী’ নামে তাঁর নিজস্ব একটি নাট্যদল ছিল। পরবর্তীকালে কৃষ্ণনগর সেতু নাট্যদলের সভাপতির পদ অলংকৃত করেছিলেন। এমন বহু নাট্যকর্মী রয়েছেন যারা আজও নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন— অশোককুমার ভাদুড়ী ছিলেন তাদের প্রথম নাট্য গুরু। অশোককুমার ভাদুড়ীর জন্যই হয়তো তাদের নাটকের হাতেখড়ি হয়েছিল— এমন বলার লোকও খুঁজে পাওয়া যায়। আসলে পরবর্তীতে নাট্য জগতে বিশেষ সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন, এমন অনেক নাট্য প্রতিভাকে প্রথম খুঁজে বার করেছিলেন অশোককুমার ভাদুড়ী। সেই সকল নাট্যকর্মীদের অনেকেই নিজেদের প্রথম নাট্য শিক্ষক হিসেবে অশোককুমার ভাদুড়ীকে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করেন। আসলে অশোককুমার ভাদুড়ী ছিলেন নাট্য অন্ত প্রাণ এক ব্যাক্তি। তিনি বহু নাটকে অভিনয় করেছেন। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নামজাদা একাধিক নাট্য দলের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। নাটক নির্দেশনাতেও তিনি ছিলেন বিশেষভাবে পারদর্শী।
বাল্যকাল থেকেই তিনি অসুস্থ ছিলেন। দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে একাধিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন করেছিল। কিন্তু আদ্যপ্রান্ত সংস্কৃতিমনা এই মানুষটিকে কোনো রোগ ব্যাধিই যেন দমাতে পারেনি। তাঁর অভিনয়, নির্দেশনায় অগুন্তি নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। তিনি একাধিক পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্মৃতিধন্য দ্বিজেন্দ্র পাঠাগার কর্তৃপক্ষ অশোককুমার ভাদুড়ীকে তাঁর সাংস্কৃতিক অবদানের জন্য ‘দিলীপকুমার রায় স্মারক সম্মান’ প্রদান করে। তাঁর দীর্ঘ নিরলস সাংস্কৃতিক জীবনচর্যা অবশ্যই অনুকরণীয়। সকল প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে কিভাবে জীবনযুদ্ধে নিষ্ঠাবান সৈনিকের মতো লড়তে হয়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ অশোককুমার ভাদুড়ী।

কৃষ্ণনগরের সাংস্কৃতিক সংস্থা ‘মুক্তধারা’-র প্রধান উপদেষ্টাও ছিলেন তিনি। কৃষ্ণনগরের ভূমিপুত্র বিশিষ্ট সাহিত্যিক সুধীর চক্রবর্তীর পাশাপাশি ‘মুক্তধারা’-র আত্মপ্রকাশে অশোককুমার ভাদুড়ীরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। শক্তিনগরে অশোককুমার ভাদুড়ীর বাসভবনে ঘরোয়া এক আড্ডায় মুক্তধারার জন্ম। উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রতি এক-দেড় মাস অন্তর নির্দিষ্ট বিষয়কেন্দ্রিক আলোচনাসত্রের আয়োজন করে থাকে। কৃষ্ণনগরের বুকে এই ধরনের আয়োজন এক প্রকার ব্যতিক্রমই বলা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশতবর্ষের সময় থেকে মুক্তধারার পথচলা শুরু হয়েছিল। আলোচনা সভা থেকে শুরু করে পত্রিকা প্রকাশ, সংগীতানুষ্ঠান, রবীন্দ্র মেলা— এই ধরনের বহুবিধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মুক্তধারা ক্রমান্বয়ে একীভূত হয়ে যায়। ২০১৫ সাল নাগাদ শুরু হয় মুক্তধারার নির্দিষ্ট বিষয়কেন্দ্রিক আলোচনাসত্র, যার পশ্চাতেও প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন সুধীর চক্রবর্তী, অশোককুমার ভাদুড়ীর মতো গুণীজন। ২০২০ সালের ১৫ ডিসেম্বর মুক্তধারার অন্যতম স্তম্ভ সুধীর চক্রবর্তী প্রয়াত হন। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ১৯ এপ্রিল ২০২১ মুক্তধারার অন্যতম আহ্বায়ক শংকর সান্যাল পরলোকগত হন। ৩ অক্টোবর ২০২১ (রবিবার) মুক্তধারার পক্ষ থেকে শংকর সান্যাল স্মরণ ও পত্রিকা প্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেদিন অশোককুমার ভাদুড়ীর হাত দিয়েই মুক্তধারা সাহিত্যপত্রের (দ্বিতীয় সংখ্যা) আবরণ উন্মোচন করা হয়েছিল। ২০২৩-এর ২৫ ফেব্রুয়ারি মুক্তধারার সেই স্তম্ভ অশোককুমার ভাদুড়ী আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।
অশোককুমার ভাদুড়ীর এহেন চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে এক সাংস্কৃতিক শূন্যতার সৃষ্টি করল। একাধিক সংগঠন হয়ে গেল অভিভাবকহীন। আমিও আজ খুব বিভ্রান্ত। হঠাৎ করে যেন তাঁকে হারিয়ে ফেললাম। দীর্ঘ কালপর্বের পরিচয় না হলেও, বা বয়সের সামঞ্জস্য না থাকলেও, আমাদের মধ্যে আত্মিক টান জন্মেছিল। এর পশ্চাতে ছিল তাঁর অফুরণ স্নেহ। যদিও তাঁকে আমি সর্বদা ‘স্যর’ বলেই সম্বোধন করে এসেছি। বিগত ৩-৪ বছরে তাঁর সান্নিধ্য এবং আশীর্বাদ পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য বলে মনে করছি। ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে তাঁর শারীরিক অসুস্থতা এমন পর্যায়ে পৌঁছালো যে, নিজ বাসভবনে পাঁচদিন কঠিন পরীক্ষা-শুশ্রুষার পরেও উৎকৃষ্ট চিকিৎসার প্রয়োজনে কলকাতায় নিয়ে যেতেই হলো। কিন্তু সেখান থেকে তিনি আর ফিরলেন না। ২৫ ফেব্রুয়ারির সকালে তাঁর অন্যতম স্নেহধন্য সম্পদনারায়ণ ধরের কাছ থেকে দুঃসংবাদটি পেয়ে আমি শোকস্তব্ধ হই। আমার জীবনে এক উল্কার মতো তাঁর আবির্ভাব। আর তাঁর চলে যাওয়াটাও যেন এক উল্কার হারিয়ে যাওয়ার ন্যায়। জানি— এ শূন্যতা পূরণ হবার নয়। আর আমি এও নিশ্চিত যে, অশোককুমার ভাদুড়ী সম্পর্কে এই অনুভূতি শুধু আমার একার নয়। ব্যক্তিজীবনেই শুধু নয়, অশোককুমার ভাদুড়ীর প্রয়াণ যে শূন্যতার সৃষ্টি করলো, তা বাংলার সার্বিক শিল্প অবয়বকে প্রভাবিত করবে। নাট্যপ্রাণ অশোককুমার ভাদুড়ীর প্রয়াণে জেলা তো বটেই, বাংলার নাট্যজগতে এক যুগের অবসান ঘটলো বলা যায়।
লেখক : আঞ্চলিক ইতিহাস লেখক, নদিয়া।
It is a small article with compact information that gives a clue for better understanding about the man with chequered life. I bow down head to the immortal soul of Ashoke Kumar Bhaduri whose name will be uttered by the Cultural Society of today and the future years.
Thanks to Shri Dipanjan for his presentation in a unique style.
সকলের পরম শ্রদ্ধেয় ছিলেন অশোক স্যর।
খুবই মূল্যবান লেখা। অশোকবাবু আমাদেরও অভিভাবক ছিলেন।
স্যরের চলে যাওয়ায় বহু মানুষ অভিভাবকহীন হলেন।
অশোক লাহিড়ী বাবুর প্রয়াণে শোকাহত।নাট্যপ্রাণ অশোককুমার ভাদুড়ীর প্রয়াণে জেলা তো বটেই, বাংলার নাট্যজগতে এক যুগের অবসান ঘটলো বলা যায়।দ্বীপাঞ্জনকে ধন্যবাদ এই রকম মূল্যবান লেখার জন্য
ধন্যবাদ স্যর। অশোক স্যরকে হারিয়ে আমরা খুবই শোকাহত।
সুন্দর স্মৃতিচারণ। রবীন্দ্রসঙ্গ বইটির কথা প্রথম শুনলাম। এ বইটি কি এখনো পাওয়া যায়?
বইটি পাওয়া যায়। কালীনগর কো-অপারেটিভ সোসাইটি থেকে প্রকাশিত।
খুব ভাল লেখা হয়েছে।
ধন্যবাদ।
Amar boromama uni. Abar baba Ashis Sanyal, (jnaar ullek lekhay royechhe), ebong amar boromama Ashok Bhadurir digho 55 bochhorer shomporko.
Babao aj oshustho…ashongkay din katchhilo…boromama niyomito khoj niten.
Bhabteo parini hothat ebhabe boromama chole jete paren.
মন্তব্যটি ভালো লাগলো।