ওঁম গাং গণপতে নমঃ নমঃ.. শ্রী সিদ্ধিবিনায়ক নমঃ নমঃ.. অষ্টবিনায়ক নমঃ নমঃ.. গণপতি বাপ্পা মোরিয়া.
বেদ পুরাণ তন্ত্র মহাকাব্য সকলই সিদ্ধিদাতা, বিঘ্নহারী গনেশের জয়গানে মুখরিত। তিনি ভক্তের ভগবান। শিবের মতো গণেশও অল্পেই সন্তুষ্ট। নারদ পুরাণে কথিত আছে,তিনি প্রসন্ন হলে কর্মে দক্ষতা আসে, সংকল্প সিদ্ধ হয়, সৌভাগ্য লাভ হয়, বিদ্যার্থী বিদ্যা লাভ করে, ধনার্থী ধন, পুত্রার্থী পুত্র, মোক্ষার্থী মোক্ষ লাভ করেন। তিনি সিদ্ধিদাতা, বিঘ্ননাশক অথচ তিনি রুষ্ট হলেই অনর্থ। তাঁর কৃপা পেতে ‘গণপতি বাপ্পা মোরয়া’র প্রবল আওয়াজে ভরে ওঠে চারিদিক।মোরয়া অর্থাৎ প্রণাম। মোরেশ্বর নামে গণপতির এক মহান ভক্ত ছিলেন, সেই ভক্তকেই সম্মান জানাতেই মোরয়া নাম গনপতি নামের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। গণপতি সর্বসাধারণের প্রভু।
ভাদ্র মাসের শুক্লা চতুর্থী মহাসিদ্ধি বিনায়কের নামে খ্যাত। স্কন্দপুরাণ মতে, ভাদ্র মাসের শুক্লা চতুর্থীর দিন গণেশের জন্ম। কিন্তু অন্য মতে গণেশের জন্ম হয় মাঘ মাসের শুক্লা চতুর্থীতে। বহুকাল ধরে বাংলার বাইরে ভাদ্র মাসে গণেশের জন্মোৎসব পালিত হয়। কিন্তু বাঙালি গণেশ পুজো করে মাঘ মাসের সরস্বতী পুজোর আগের দিন। অবশ্য সেকালে গণেশ চতুর্থী নিয়ে বাঙালির আগ্রহ সে রকম চোখে পড়তো না। বাঙালির কাছে তিনি ছিলেন ধনের দেবতা। তাই পয়লা বৈশাখ, অক্ষয় তৃতীয়ার নতুন খাতায় সিঁদুর দিয়ে গণেশ অর্চনা ছিলো বাঙালি ঘরের চিরন্তন প্রথা। যেকোনো শুভ কাজের শুরুতে তা সে পুজো হোক বা বিবাহ। যেকোনো শুভ কাজে শুরুতে যেমন ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন, গৃহপ্রবেশ বা লক্ষ্মীপূজোই হোক এমনকি কোন মন্দিরের মূর্তি প্রাণ প্রতিষ্ঠাতেও প্রথমে গণেশের পূজা হয়ে থাকে। গণেশের মূর্তি যদি না থাকে তাহলে সুপারিকে গণেশ মনে করে আগেই পূজো করা হয়।
গণেশ চতুর্থীর প্রাধান্য প্রধানত লক্ষ্য করা যায় মহারাষ্ট্রে। বালগঙ্গাধর তিলক জনগণের ঈশ্বর গণেশের মহিমাকে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে এক সুরে বাঁধতে চেয়েছিলেন। দেশপ্রেমের গন্ধ এই উৎসবের গায়ে লাগিয়ে গণেশ চতুর্থীকে ১০ দিন ব্যাপী মহোৎসব করেছিলেন। তাই আজও মহাসামারোহে মহারাষ্ট্রে গণেশ চতুর্থী ১০ দিন ধরে পালিত হয়।
তবে একবিংশ শতাব্দীর বাংলা ও বাঙালি কিন্তু গণেশ চতুর্থী বিমুখ নয়, বাঙালির বারোমাসের তেরো পার্বণে দিব্যি আসনটি পাকা হয়েছে ভাদ্রমাসের গণেশ চতুর্থীর। বাড়ি থেকে বারোয়ারি বাঙালি এখন মগ্ন গণেশের আবাহনে।
ভাদ্র শুক্লা চতুর্থী তিথি পড়ছে আগামী ২৬ অগস্ট দুপুর ১টা ৫৪ মিনিটে। চতুর্থী থাকবে ২৭ অগস্ট বেলা ৩টে ৪৪ মিনিট পর্যন্ত। উদয়া তিথি অনুসারে গণেশ চতুর্থী পালিত হবে ২৭ অগস্ট। সেই দিনেই করতে হবে গণেশ মূর্তি স্থাপন। গণেশ মূর্তি স্থাপন করার সবচেয়ে শুভ সময় হলো দুপুরবেলা। কারণ, মনে করা হয়, এই সময়েই জন্ম নিয়েছিলেন সিদ্ধিদাতা। এই বছর গণপতির আরাধনা করার শুভ সময় পড়েছে ২৭ অগস্ট সকাল ১১টা ৫ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত।
ভগবান গণেশ আটটি ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছেন, যা অষ্টগণেশ বা অষ্টবিনায়ক নামে পরিচিত। এই অবতারগুলির উল্লেখ হিন্দুধর্মের মুদ্গল পুরাণ-এ পাওয়া যায়, যা সম্পূর্ণভাবে ভগবান গণেশকে উৎসর্গীকৃত। অষ্টবিনায়ক হলেন গণেশের আটটি রূপ যা বিভিন্ন ধর্মীয় ও মহাজাগতিক ভূমিকা পালন করে।
অষ্টগণেশ বা অষ্টবিনায়কগণ হলেন — বক্রতুণ্ড, একদন্ত, মহোদর, গজানন, লম্বোদর, বিকট, বিঘ্নরাজ, ধূমরবর্ণ।
আসুন গণেশ চতুর্থী উপলক্ষে গণেশের আটটি অবতার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জেনে নেওয়া যাক।

বক্রতুণ্ড অবতার (vakratunda) : মুদ্গল পুরাণ অনুযায়ী গণেশের অষ্টঅবতারের প্রথম অবতার বক্রতুণ্ড। গণেশের বাঁকা শুঁড়ের কারণে তার আরেক নাম বক্রতুণ্ড। ‘বক্রান তুন্ডয়তি ইতি বক্রতুণ্ড ‘ অর্থাৎ অর্থাৎ ভুল পথে যিনি হাঁটেন তাকে যিনি শাস্তি দেন তিনি হলেন বক্রতুণ্ড। সেই অর্থে নেতা ও তত্ত্ববেত্তাগনের বক্রতুণ্ড হওয়া উচিত। এই বক্রতুণ্ড অবতারের সাথে জড়িয়ে আছে মৎসরাসুর নামক এক মহাশক্তিশালী অসুরের কাহিনী।
একদা দেবরাজ ইন্দ্রের অবহেলায় মৎসরাসুর নামে এক দুষ্ট অসুরের জন্ম হয়। দৈত্যদের গুরু শুক্রাচার্যকে তুষ্ট করে শিবের পঞ্চাক্ষরী ওম নমঃ শিবায় মন্ত্র পেয়ে ঘোর তপস্যায় মনোনিবেশ করেন মৎসরাসুর। কালক্রমে তিনি সেই মন্ত্রে সিদ্ধিলাভ করেন। দেবাদিদেব মহাদেব তার তপসায় তুষ্ট হয়ে তার সামনে আবির্ভূত হলেন এবং অপরাজেয় হওয়ার বর প্রদান করলেন। শিবের বরপ্রাপ্ত মৎসরাসুরকে দৈত্যরাজ পদে বরণ করলেন শুক্রাচার্য। মৎসরাসুর ক্ষমতায় আসার পর তার মন্ত্রীরা তাকে পরামর্শ দিলেন বিশ্বজয় করার। তিনি তার সুবিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে বিশ্বজয় করতে বেরোলেন। পৃথিবীর সিংহভাগ রাজারা তার সামনে নতজানু হলেন। কেউ তার হাতে প্রাণ দিলেন কেউবা পালিয়ে বাঁচলেন।
এরপর মৎসরাসুরের খেয়াল হলো তিনি যদি পৃথিবী জয় করতে পারেন তবে স্বর্গ বা পাতাল নয় কেন? অহংকারে মদমত্ত হয়ে মৎসরাসুর প্রথমে পাতাল আক্রমণ করলেন। সেই সময় পাতালের ক্ষমতায় ছিলেন শেষনাগ। কিন্তু সুবিশাল ও মহাশক্তিশালী শেষনাগও মৎসরাসুরের দাসত্ব স্বীকার করে তার করের আওতায় এলেন ।
এরপর মৎসরাসুর গেলেন স্বর্গে ।সেখানে ইন্দ্র বরুণ কুবের ইত্যাদি প্রমূখ দেবতাদের সাথে প্রবল যুদ্ধ হলো। সেই যুদ্ধে ইন্দ্র বরুণ কুবের পরাজিত হয়ে মৎসরাসুরের হাত থেকে স্বর্গ ছেড়ে পালিয়ে বাঁচলেন। পরাজিত হতোদ্যম দেবতারা শ্রীবিষ্ণুকে সঙ্গে নিয়ে কৈলাসে গেলেন। সেখানে শিবের কাছে গিয়ে বললেন, ‘হে প্রভু, আপনি মৎসরাসুরকে এমন বর প্রদান করেছেন যে আমাদের ঘরছাড়া করে দিল।’
শিব বুঝলেন মৎসরাসুরকে অপরাজেয় হওয়ার বর দিয়ে তিনি খাল কেটে কুমির এনেছেন। ততক্ষণে মৎসরাসুর কৈলাসে হানা দিয়েছেন। হুংকার করে মহাদেব মৎসরাসুরের সামনে দাঁড়ালেন। কিন্তু মহাদেবের দেওয়া বর মহাদেবের মতোই অমোঘ। মৎসরাসুরের কাছে হেরে গেলেন শিব।মৎসরাসুর কৈলাসের অধিপতি হয়ে বসলেন। শুরু হলো দৈত্যদের প্রবল অত্যাচার। চতুর্দিকে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠল। দেবতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা গেল, কি করে ঠেকানো যায় এই ভয়ঙ্কর বিপদকে।
এমন সময় আবিভূত হলেন ভগবান দত্তাত্রেয়। তিনি দেবতাদের বললেন, ‘বক্রতুন্ডদেবের ধ্যান করো। তার একাক্ষরী (গং) মন্ত্র জপ করো সফলতা আসবেই।’
এই মন্ত্র জপের ফলে দেবতাদের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন সিংহবাহন বক্রতুণ্ড অবতার। তার দেহ রক্তবর্ণ গজমুক চতুর্ভুজ এবং সিংহপৃষ্ঠে আলুরও তিনি দেবতাদের আশ্বাস দিলেন মৎসরাসুরকে বিনাশ করে তার গর্ব খর্ব করার।
ভগবান বক্রতুণ্ড তার অসংখ্য গণকে নিয়ে মৎসরাসুরের রাজ্য ঘিরে ফেললেন। পাঁচ দিন ধরে প্রবল যুদ্ধ চলল এই যুদ্ধে মৎসরাসুরের দুই পুত্র সুন্দরপ্রিয় এবং বিষপ্রিয় যুদ্ধে প্রাণ হারালেন। পুত্রশোকে ব্যাকুল হয়ে মেজাজ হারিয়ে যুদ্ধ ভূমিতে এলেন মৎসরাসুর। কিন্তু সিংহপৃষ্ঠে আরুড় রক্তবর্ণ বক্রতুণ্ডর ভয়াবহ মূর্তি দেখে সমস্ত শক্তি নিশ্চয় হয়ে গেল মৎসরাসুরের।তিনি প্রাণভয়ে বক্রতুণ্ডর স্তব করতে লাগলেন। তখন বক্রতুণ্ড তাকে অভয় দিয়ে বললেন, তুমি হিংসা করেছ এবার আমার শরণাপন্ন হয়ে পাতালে গিয়ে বাকি জীবন সুখে শান্তিতে কাটাও।’ মৎসরাসুর বক্রতুণ্ডর নির্দেশ অক্ষর অক্ষরে পালন করলেন।
আবার ত্রিলোকে শান্তি ফিরে এলো, জীবন ফিরলো স্বাভাবিক ছন্দে। বলা হয় মৎসরাসুর আসলে আমাদের মাৎসর্য তথা ঈর্ষার প্রতীক এবং আমাদের এই ঈর্ষাকে ধ্বংস করার জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন গণেশের এই বক্রতুণ্ড অবতার।

একদন্ত অবতার : শ্রীগনেশের একটি দাঁতভাঙ্গা হওয়ার কারণে তার আরেক নাম একদন্ত। মুদগল পুরান অনুসারে শ্রীগনেশ যে অবতারে মদাসুরকে পরাস্ত করেছে তার নাম একদন্ত অবতার। একদা অশ্বিনীকুমারদ্বয় ও দেবরাজ ইন্দ্রের মধ্যে দ্বন্দ্বের ফলে ঋষি চব্যণ যজ্ঞের মাধ্যমে সৃষ্টি করেন মদাসুর নামক এক বিশালদেহি মহাপরাক্রমী অসুরকে।জন্মের পর অসুরগুরু শুক্রাচার্যের পরামর্শে হিং মন্ত্রে সন্তুষ্ট করেছিলেন দেবী ভগবতীকে। দেবী তার তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তার প্রার্থনা অনুযায়ী বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে রাজ করার বর প্রদান করেন।
ব্যাস অপাত্রে দান করলে যা হয়। মদাসুর ধরণী জয় করে নিজেকে অপরাজের অধিপতি ঘোষণা করেন।স্বর্গলোক জয় করে প্রমাদাসুরের কন্যাকে বিবাহ করলেন।তাদের তিনটি পুত্র ছিলো।সর্বত্র চলছে কাটাকাটি মারামারি হানাহানি, ধর্মকর্ম শিকেয় উঠেছে। দেবতা ও মুনিগণ কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। এমন সময় তাদের মনে পড়ল ব্রহ্মার মানস পুত্র সনৎকুমারের কথা। সনৎকুমার তাদের পরামর্শ দিলেন, ‘একমাত্র শিবপুত্র গণেশ পারেন আপনাদের সমস্যার হাত থেকে রক্ষা করতে।অতএব আপনারা তারই উপাসনা করুন।’
গণপতি আরাধনায় মগ্ন হলেন। ১০০ বছর পর গণেশ তাঁদের সামনে আবির্ভূত হলেন। দেবতারা দেখলেন মূষিকের উপর উপবিষ্ট রক্তবর্ণ একদন্ত দেবকে। তাঁর চতুর্ভুজ মুখমন্ডলে একটি মাত্র তীক্ষ্ণদন্ত, তিন হাতে কুঠার পাশ কমল এবং একহাতে অভয় মুদ্রা, কোমরে শেষ না দেবতাদের প্রার্থনা। শ্রী গনেশ মদাসুরের সঙ্গে প্রবল যুদ্ধে লিপ্ত হলেন। মদাসুর যখন একদন্তের দিকে প্রথম তীর নিক্ষেপ করেন তখন তীরটি আঘাত করার পরিবর্তে তার চরণ তলে পতিত হলো। দ্বিতীয় তীর নিক্ষেপ করার আগে একদন্ত তার কুঠার নিক্ষেপ করে মদাসুরকে বিদ্ধ করেন। মদাসুর বুঝলেন তার পক্ষে সঙ্গে যুদ্ধ করা অসম্ভব। তাই তিনি একদন্তর কাছে আত্মসমর্পণ করে প্রাণভিক্ষা ও ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। একদন্ত তাকে ক্ষমা করলেন বটে কিন্তু তাকে আদেশ করলেন পাতাললোকে ফিরে যেতে। একদন্তর আদে শ শিরোধার্য করে রাজপাঠ ত্যাগ করে পাতালে ফিরে গেলেন মদাসুর।
বাস্তবে মদাসুর আমাদের অহংকার বোধের প্রতীক এবং অহংকারের সাথে লালসা বিলাস লোলুপতা এবং ধনলিপ্সা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর এগুলো ধ্বংস করতে আবির্ভূত হয়েছে শ্রীএকদন্ত।