| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আশু আমি হারিনি, তুমি জিতে গেছো! : স্বপনকুমার মণ্ডল

Reporter
স্বপনকুমার মণ্ডল / ৯৯৬ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১

তখন প্রকাশমুখর জীবন। আত্মপ্রকাশে উজ্জীবনী হাতছানি। তারুণ্যের সহজাত স্পর্ধায় পথচলা। পড়াই সূর্য সেন কলেজে, থাকি শিলিগুড়ি আর স্বপ্ন দেখি সারা বাংলা জুড়ে। দৃষ্টি তখন অন্তর্দৃষ্টিতে, কল্পনা তখন স্বপ্নের সওয়ারি। ২০০৩-এর ২৩ এপ্রিল উত্তরবঙ্গ সংবাদে দৈনিক পত্রিকায় লেখালেখির সূচনা থেকে তার যাত্রা ক্রমশ গতি লাভ করে অভিযানে সামিল হয়। বছরখানেকের মধ্যে অধ্যাপনার পরিসরকে অতিক্রম করে আমার লেখক-পরিচিতি ডানা মেলে। সেই পরিমণ্ডলে শিলিগুড়িতে আশুতোষের সঙ্গে দেখা। প্রশংসা তবলার সঙ্গত হয়ে উঠলে আপনাতেই তা গানের প্রাণে উচ্ছ্বাস নামিয়ে আনে। আশু তার বন্ধুর গরিমায় যখন আমার লেখার প্রচারক হয়ে প্রশংসা কুড়িয়ে এনে দিত, আমি তখন লেখকের আলোয়ানে নিজেকে জড়িয়ে নিতাম। অন্যদিকে ভাবতাম কীভাবে পত্রিকার পাতা থেকে বইয়ের মলাটে নিজেকে হাজির করা যায়। আর বই প্রকাশ মানেই সুদূর কলকাতা। প্রকাশের তীব্রতাও এই দুস্তর ব্যবধানে কমে আসে। কলকাতাকেন্দ্রিক প্রকাশনার কারণে প্রকাশের সদিচ্ছা নানা ভাবেই ব্যাহত হয়ে পড়ে। সেখানে আশুতোষের প্রচারক ছেড়ে আমার বইয়ের প্রকাশক হয়ে ওঠাটা ছিল নিতান্তই বন্ধুকৃত্য উদারতা। সেদিক থেকে তাঁর ‘সংবেদন’-এর প্রকাশক হয়ে ওঠার স্বপ্ন তো দূরে থাক, কল্পনাও ছিল অলীক।

আসলে প্রকাশের অভিমুখে ছিলাম আমি। আমার লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশই তার মূলাধার। সেখানে আশুর প্রকাশক হয়ে ওঠাটায় নীরবে আত্মত্যাগ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। পুরো স্বার্থ ছিল আমার। কিছুদিন পূর্বে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে কলেজে আয়োজিত সেমিনারের আলোচনাগুলো একত্রিত করে পত্রিকার মতো করে প্রকাশ করেছিলাম। তার সমালোচনায় মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্সের ‘কথাসাহিত্য’ পত্রিকা থেকে সেটিকে বই করার পরামর্শ দিয়েছিল। সেক্ষেত্রে পূর্ব থেকে তার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েই ছিল। সেখানে আশুর প্রকাশ করার সদিচ্ছা আপনাতেই আমার আত্মপ্রকাশকে পূর্ণিমার আলোতে সক্রিয় করে তুললেও আশুর ভবিষ্যত সেখানে অমাবস্যার চাঁদ। কেননা আমার মধ্যে তাঁর প্রকাশও প্রকট নয়। সেই আমার সম্পাদিত ‘বঙ্গভঙ্গ ও বাঙালিসমাজ’ (২০০৬) বইটি ‘পত্রলেখা’ থেকে প্রকাশিত হয়। তাতে আশুর নাম না-থাকাই স্বাভাবিক। তবে তার মধ্যে তাঁর গন্ধ ছিল আপন সৌরভে। আশুর অসাধারণ বন্ধুত্বকে আমি’সম্পাদকের পাথেয়’তে অকপটে প্রকাশ করি। তাতে জানাই :’এ বইটি যাঁর জন্য প্রকাশের আলো খুঁজে পেল, সে আমার হিতাকাঙ্ক্ষী বন্ধু শ্রী আশুতোষ বর্মণ। তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে ছোটো করার অধিকার আমার নেই।’

মহানন্দ নদীর ধারে আড্ডা।

অন্যদিকে আশুর ভূমিকায় আমি বইটি দুই বন্ধুর যৌথ ফসল হিসাবে উৎসর্গপত্রে আমার মায়ের সঙ্গে তাঁর মাকেও শ্রদ্ধা জানাই। এতে অবশ্য আশুর যোগ নিবিড় হলেও তাঁর নাম জনমানসে সংগুপ্ত থেকে যায়। তা নিয়ে তাঁর কোনো অস্থিরতা ছিল না, বরং বইটির সঙ্গে নিজেকে জড়ানোতেই তাঁর আনন্দ। সে যে সত্যিকারের আশুতোষ। অল্পতেই তাঁর তুষ্টি। তাঁর এই আশুতোষ প্রকৃতিই আমাদের বন্ধুত্বকে সবুজ করে তুলেছিল। আত্মত্যাগের সোপানে সম্পর্কের বুনিয়াদি চেতনা প্রত্যয় লাভ করে। সেখানে বিশ্বাস ও ভালোবাসার বন্ধুত্বে আমি তাঁর সঙ্গে ক্রমশ দায়বদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। সেজন্য তাঁর আমাকে নিয়ে গর্ব অনুভব থেকে আমাতে জীবন জড়িয়ে নেওয়া সবেতেই তাঁর উদার প্রকৃতির সবুজ হাতছানিতে আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধে দুর্বল হয়ে পড়ি। আমার বন্ধুত্বই ছিল তাঁর আরাধ্য। তাঁর সেই গর্বের গর্ভ থেকেই জন্ম নিয়েছিল ‘সংবেদন’। এজন্য তার আত্মপ্রকাশ ছিল সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

‘বঙ্গভঙ্গ ও বাঙালিসমাজ’ বইটি প্রকাশিত হল এবং বিপুল সমাদরও পেল। এজন্য আমাদের প্রকাশমাত্র কৃতিত্ব। বাকিটা সময় ও সম্পাদনার সুবিধে। সেই সময় বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে বইয়ের চাহিদা তৈরি হয়েছিল। প্রকাশকও বইটির সরকারি বরাত পেয়েছিলেন। এজন্য আমাদের কাছে থেকেই সব বই ৪০% ছাড়ে কিনে নিতে চেয়েছিলেন। আমরা ইতিমধ্যে অনেক বই বিক্রি করে ফেলি। সম্পাদিত বই হওয়ায় অন্য লেখক-লেখিকাও এগিয়ে আসেন। একা আনন্দগোপাল ঘোষই হাতে ধরে জলপাইগুড়ির রবীন্দ্রভবনে ত্রিশ কপি বই বিক্রি করে দেন। অন্যদিকে শিলিগুড়ি মহকুমার তৎকালীন তথ্য আধিকারিক জগদীশ চন্দ্র রায় আঠাশ কপি বই পুরস্কার বিতরণের জন্যে নিয়েছিলেন। এভাবে বইটির সাফল্যে আমরা উজ্জীবিত হয়ে পড়ি। প্রকাশের তীব্র অভিমুখে হিসাবের খতিয়ান মেলানোর চেয়ে সাফল্যের আয়নায় মুখ দেখার সদিচ্ছা আপনাতেই গতি লাভ করে। এজন্য প্রথম বইটির সাফল্যে আমাদের মূলধন না হলেও তা মনধনে আভিজাত্য বয়ে আনে। এবার সরাসরি আমার নিজের বই প্রকাশে আশু আরও সক্রিয় হয়ে উঠল। দুজনে কলকাতায় গেলাম। সেখানে বইয়ের লেখক হিসেবে আমার স্বপ্নের কাজল যতই স্পষ্ট হোক, আশুর কল্পনা তাকে স্পর্শ করতে পারে না। তখন তাঁর লক্ষ্যহীন জীবন। অভ্যাসে বেঁচে থাকা। নিজেকে খুঁজেফেরার তাগিদও তাঁর ছিল না। অন্যদিকে বইপ্রকাশে অর্থপ্রাপ্তি ও আত্মপ্রতিষ্ঠার হাতছানিও তাঁকে আমন্ত্রণ জানায়নি। সে শুধুমাত্র আমার সহযাত্রীর সাফল্যে অগ্রসর হয়েছিল। অন্যদিকে আমার তখন বেড়ে ওঠা জীবন, গড়ে তোলা ভবিষ্যত। ইতিমধ্যে দার্জিলিং গভর্নমেন্ট কলেজে জয়েন করার তোড়জোড় চলছিল। পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখে চলেছি। অসংখ্য প্রবন্ধও জমা হয়ে গিয়েছে। উত্তরবঙ্গের সাহিত্যজগতে পরিচিত মুখ হয়ে উঠছি। সেখানে স্বাভাবিক ভাবেই বইয়ের লেখক হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠার হাতছানি সবাকমূর্তি লাভ করে। আশু সেই মূর্তিটিকে প্রতিমায় রূপান্তরিত করতে চাইলে আমি স্বভাবতই তার নৈবেদ্য সাজাতে উঠেপড়ে লাগি। ত্রিশটি প্রবন্ধের সংকলন ‘বাংলা ও বাঙালি’র মুদ্রিত পাণ্ডুলিপি নিয়ে স্বপ্নপুরী কলকাতায় গিয়েছিলাম আমরা। সেখানে নতুন বই পেলাম না, পেলাম বই প্রকাশনার নতুন ঠিকানা, ‘সংবেদন’, বি এস রোড, মালদা। ‘বাংলা ও বাঙালি’ সেখান থেকে মে ২০০৭-এ প্রকাশিত হল। শুধু বইটি প্রকাশিত হল না, ‘সংবেদন’কেও সর্বসমক্ষে প্রকাশ করে দিল।

বই প্রকাশ নিয়ে আমাদের কোনো ধারণা ছিল না। এজন্য যাতে কোনো ভাবে প্রতারিত না হই, সে বিষয়ে সতর্ক হয়েই একটি নামী প্রকাশনার দ্বারস্থ হয়েছিলাম আমরা। সেই চলতি কথায় হাতে মুরগি পেয়ে বেশ করে বানিয়ে নেওয়ার ফন্দি এঁটে যেই তিনি তার খরচনামা বিশদ করে আমাদের কাছে বিশ্বস্ত হওয়ায় সক্রিয় হয়ে উঠেছেন, ওমনি তার মধ্যে আমাদের কাছে বইছাপার ধারণাটি স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, সেই ধূর্ত প্রকাশকের প্রদেয় খরচার হিসেবে বাড়িয়ে বলার প্রবণতা আপনাতেই আমাদের সন্দিগ্ধ করে তোলে। অনেক সময় আমরা অভ্যাসবশে মহার্ঘতা বোঝাতে স্বল্পমূল্যের বস্তুকে দুর্মূল্য করে তুলি। এতে মহার্ঘ বোঝানো সহজ হওয়ার পাশাপাশি তার ফাঁকিও মহার্ঘ হয়ে ওঠে। এজন্য কালবিলম্ব না করে দুজনে শলাপরামর্শের অজুহাতে আমরাও সেখানে উঠে পড়ি। আশুকে আমি একটু যাচাই করে দেখার জন্য বৈঠকখানা রোডে পাঠাই। সে ফিরে আসে হাতে গরম প্রমাণ নিয়ে। সেই হাতের গরম মুখে চলে আসে। কেননা মনের উষ্ণতায় দ্রুত গতিতে নতুন আলোর পরশ ছড়িয়ে পড়ে। আশুকে বলে ফেলি, ‘তাহলে তুমি নিজেই একটা প্রকাশনা খুলে ফেলো।’ জানি না সেদিন এই ঝুঁকি নিতে কেন স্বতঃস্ফূর্ত হয়েছিলাম। বলছি ঠিকই আশুকে, কিন্তু দায়িত্ব তো আমাকেই নিতে হবে। এভাবে বই প্রকাশ করতে গিয়ে প্রকাশনার দায়িত্ব নেওয়া আমার পক্ষে স্বাস্থ্যকর ছিল না। আর তা নিতে হয়েছিল একান্তভাবে আশুর জন্যই। তাঁর আমার প্রতি আত্মিক বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধই আমাকে তাঁর প্রতি দায়বদ্ধ করে তুলেছিল।

আসলে আশুর লক্ষ্যহীন জীবন ক্রমশ তাঁর ব্যাক্তিত্ব গড়নের অন্তরায় হয়ে ওঠে। পারিবারিক ভাবেও সে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার সোপানে তাঁর অসফলতা তাঁকে আরও নিজের প্রতি অনাস্হাশীল করে তোলে। তার উপরে পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতার অভাব তাঁকে আরও দিশাহীন করেছিল। সাধারণ্যে আর্থিক সংকটও আত্মিক বিশ্বাসে অন্তরায় সৃষ্টি করে। আশুর সেই ব্যক্তিগত জীবনে আত্মপ্রতিষ্ঠার দুর্গমতাই তাঁকে সাংগঠনিক জীবনের সুগম পথে সক্রিয় করে তুলেছিল। সেখানে তাঁকে সংগঠনের মধ্যে না থেকে নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে নতুন জীবনের হাতছানি দিয়েছিলাম আমি। তখন অবশ্য চোখের ছানিতে হাতটা অদৃশ্য ছিল। এমনিতে তাঁর না ছিল মূলধন, না ছিল মনধন। ছিল শুধু অন্যকে আপন করে নেওয়ার হৃদয়রত্ন। অথচ যেখানে ধনের অভাব, সেখানে হৃদয়ের স্বভাব প্রান্তিক হয়ে পড়ে। আন্তরিকতাও সেখানে সন্দিহান। স্বাভাবিক ভাবেই তৃতীয় নেত্র খুব বেশি দূর অগ্রসর হতে না পারলেও বুঝেছিলাম সে পথ শুধু তাঁর পক্ষেই দুর্গম নয়, আমার পক্ষেও অগম্যপ্রায়। শুধু তাই নয়, তার সাফল্য তাঁকে প্রতিষ্ঠা দেবে, কিন্তু তার ব্যর্থতার দায় সবটাই আমার উপরে এসে পড়বে। তারপরও তাঁকে প্রতিষ্ঠার ব্রতে ‘সংবেদন’-এর পরিসর যেন আমার জন্য অপেক্ষা করেছিল। আশুর নিঃশর্ত আনুগত্যে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। শুরু হয়ে যায় নতুন করে পথচলা, অভিনব জীবনের অভিযান। সদিচ্ছার পথ বেয়ে ‘সংবেদন’-এর নবারুণ উদিত হতে থাকে আমাদের মনে।

প্রকাশনার কথা ভাবতেই তার নামকরণের বিষয়টি আপনাতেই ভেসে ওঠে। সেক্ষেত্রে ‘সংবেদন’-এর জয় হয়। নামের পরে ‘পাবলিশার্স’ বা ‘প্রকাশনী’ জাতীয় শব্দ দিয়ে তার পরিচয় দিতে চাইনি। বরং ‘সংবেদন’ শব্দেই যেদিন প্রকাশনার অস্তিত্বটি স্বপ্রকাশিত হবে, সেদিনের আভিজাত্যে আমাদের প্রতীক্ষা করাই শ্রেয় মনে করেছিলাম। সেখানে ‘সংবেদন’-এর লোগোতে তার চেতনা প্রকাশের ক্ষেত্রে দিনের সূচনায় গাঢ় লালরঙের কিয়দংশ অপূর্ণ নবারুণকে প্রতীক করে তার মধ্যে ‘সংবেদন’ শব্দটিকে রিভার্স করে ফুটিয়ে তোলার কথা ভাবতে থাকি। অন্যদিকে শিলিগুড়ির বাঘাযতীন পার্ক সংলগ্ন অ্যাপার্টমেন্টের এক অধ্যাপকের ফ্লাটে দ্রুত গতিতে কম্পোজের কাজ শুরু হয়ে যায়। বাকি থাকে প্রচ্ছদ। উত্তরবঙ্গ সংবাদের কার্টুনিস্ট অভির কাছে চলে যাই দুজনে। তাঁর ভাবনাতেই বইয়ের মলাট রঙিন হয়ে ওঠে। তখন প্রতিটি ক্ষেত্রে যেমন কপালের বলিরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তেমনই নতুন কিছু গড়ে তোলার উত্তেজনাতেও আমাদের আবিষ্ট করে তোলে। দুজনেই তখন শিলিগুড়িতে। প্রকাশনার কাজও শুরু হয় সেখানে। অবশ্য আশুকে ঘরে ফেরানোর লক্ষ্যে ‘সংবেদন’-এর ঠিকানা হল মালদা। এবার ছাপা-বাঁধার পালা। কলকাতায় রওনা দিলাম। কোনো অসুবিধা হল না। আশুর সংগঠনের পরিচিত প্রকাশক সে দায়িত্ব নেওয়ায় আমরা ফিরে আসি। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে তখন বর্তমানটাই চোখে ভাসছে। রঙিন মলাটে জড়ানো নতুন বই আর সালঙ্কারা নববধূর মুখদর্শনের উত্তেজনা যেন একাকার হয়ে যায়। সংবেদী লেখকের কাছে নতুন বইয়ের মধ্যে তাঁর সুসজ্জিত মানসসন্তানকে দেখার তীব্রতা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তার উপরে তার প্রকাশেও যখন লেখকের সক্রিয় ভূমিকা থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। বাসে করে যখন বইয়ের পেটি নিয়ে কলকাতা থেকে ফিরছিলাম, তখন আপনাতেই মনের চাপা উত্তেজনা চুইয়ে পরিতৃপ্তি বোধে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল আমায়। সেই বোধ বাস্তবের দুয়ারে হোঁচট খেয়ে সম্বিত ফিরে পেল। প্রথম মৌলিক বই প্রকাশই সেক্ষেত্রে মূল সমস্যা হয়ে উঠল। এখন একার বই, একার দায় একাকার। তার উপরে আশুর নিজস্ব দোকান নেই, এই লাইনে পরিচিতি একেবারেই আনকোরা। অন্যদিকে পুসিং সেলের পরিসরও সঙ্কীর্ণ। বই বেরিয়েছে তার বিজ্ঞাপন দেওয়ার সামর্থ্যও ভাবনায় আসেনি। আর বিজ্ঞাপন দিলেও কেনে কে। আবার বিক্রি না হলে পরের বই বেরুবে না। একটি বই প্রসব করেই ‘সংবেদন’-এর গঙ্গাপ্রাপ্তি আমি চোখ না বুজেই বুঝতে পারি। অবশ্য এসব আমি আগেভাগেই ভেবেছিলাম। অগত্যা আমাকেই আসরে নামতে হয়। তখন আমি দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করায় আমার লেখক-পরিচিত ক্রমশ বর্ধমান। বই বিক্রির ক্ষেত্রে তা অবশ্য দিকশূন্যপুর। কোনো দিক থেকেই তার নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে বইগোছানোর জন্য তো বান্ধব চাই। এব্যাপারে আমি একটু এগিয়ে ছিলাম। বইয়ের ভূমিকাতেই অনেকের অবদান উল্লেখ করেছিলাম যাতে বইপ্রকাশের পরে তাঁরা অবদমিত না হয়ে আরও বেশি করে আবেদনে সাড়া দেন। দিয়েওছিলেন। সেই পরিসরে যাঁর কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি, তিনি অজিতেশ ভট্টাচার্য। আশুর কাছে তিনি নগদ টাকা দিয়ে একাই দশকপি বই নিয়েছিলেন। ‘সংবেদন’ প্রতিষ্ঠায় তাঁর এই ভূমিকা বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য। অন্যদিকে অনেকেই সেদিন নানাভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। যে-কারণে অনতিবিলম্বে আমরা দ্বিতীয় বই প্রকাশ করার জন্য এগিয়ে গিয়েছিলাম। আর এই দ্বিতীয় বইয়ের পর থেকে আশুতোষ পূর্ণ প্রকাশক হয়ে পড়ে। ব্যর্থতার সোপান বেয়ে সাফল্যে উপনীত হওয়ার ইতিহাস রচিত হতে থাকে।

মহানন্দ নদীর ধারে যেখানে মালদা গেলে সকালে আড্ডা হতো।

আসলে প্রথম বই ‘বাংলা ও বাঙালি’র মাধ্যমে আশুর ‘সংবেদন’ জনমানসে আত্মপ্রকাশ করলেও তাতে ছাপা-বাঁধার কাজে তাঁর সরাসরি যোগ ছিল না। বকলমে অন্য প্রকাশক টাকার বিনিময়ে তা করে দেন। দ্বিতীয় বই ‘বিভূতিভূষণের জীবনবিভূতি’র (আগস্ট ২০০৭) কাজও সেখানে করা হয়। এবার সেই প্রকাশকের অপ্রকাশিত ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির নিষ্ঠুরতায় আমরা সরে পড়ি। আশুই এবার পুরোদস্তুর প্রকাশক হয়ে ওঠে। কিন্তু শুধুমাত্র আমার বই করে তো তাঁর প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে না। সেখানে উত্তরবঙ্গের প্রকাশনার অভাববোধই তাঁর ‘সংবেদন’-এর বিস্তারে সহায়ক হয়ে ওঠে। এজন্য তাঁর পরিচয় বৃদ্ধিতে আমি অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করি। বিশ্বাসের বুনিয়াদে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠা। সেখানে আশুর পরিচয় বলতে আমি ও আমার বই। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রচারিত হওয়াও তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। সেক্ষেত্রে পত্রপত্রিকায় আমার বইয়ের সমালোচনাই ছিল ‘সংবেদন’-এর সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। ‘রূপান্তরের পথে’ ছাড়া বারো বছর (২০০৭-২০১৯) ধরে চলা ‘সংবেদন’-এর বইয়ের অর্থের বিনিময়ে কোথাও কোনো বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়নি। তারপরেও ‘সংবেদন’ ছড়িয়েছে তার স্বকীয় বিশেষত্ব। আসলে কাজই মানুষের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। সেখানে মানুষের মতো বিজ্ঞাপক আর কে হতে পারে! ‘সংবেদন’-এর মোটো করেছিলাম ‘প্রকাশনা জগতের বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান’। আশু আজীবন তা রক্ষা করেছিল। অন্যদিকে সময়ে সময়ে বহু উদ্দেশ্যসাধক পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলাম আমরা। আমার সম্পাদিত ‘বিনিময়’ পত্রিকাটি ২০০৮-এ ‘সংবেদন’ থেকে প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি রাজ্যের নামীদামি লেখকদের দৌলতে নানাভাবে আবেদনক্ষম হয়ে ওঠে। এতে প্রকাশনারও পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে।

এছাড়া ২০১০-এর জানুয়ারি থেকে মাসিক ‘উত্তরবঙ্গ সাহিত্য-সংস্কৃতি’ ও ২০১৫-এর জানুয়ারি থেকে মাসিক ‘মননবিশ্ব’ পত্রিকাও বেশকিছু দিন চলেছিল। এসব পত্রিকার মাধ্যমে ‘সংবেদন’ যেমন ছড়িয়ে পড়ে,তেমনই তার ভিত সুদৃঢ় হতে থাকে। আমি সবসময় আশুকে লেখক-পাঠকের সঙ্গেই শুধু নয়, শিক্ষিত সমাজের সঙ্গে নিবিড় ভাবে জনসংযোগের কথা বলতাম। সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতি দৃষ্টিনিবদ্ধ না করলে তাঁর আবেদন কখনোই উচ্চকিত হবে না। আশুকে বলেছিলাম, ‘জীবনে আত্মপ্রতিষ্ঠাই বড় কথা নয়। রোলমডেল না হতে পারলে তার আবেদন জনমানসে নিবিড় হয়ে ওঠে না। এজন্য প্রথাগত উচ্চশিক্ষা আবশ্যিক নয়। সে-শিক্ষায় অসফল হয়েও তুমি সার্থক রোলমডেল হবে, তুমিকাজ করে যাও।’ এজন্য উত্তরবঙ্গের সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে নানা উদ্যোগে আশুকে সক্রিয় করে তুলি। সেক্ষেত্রে ‘সংবেদন’কে আমি প্রকাশনার ক্ষেত্রেই আবদ্ধ করতে চাইনি, নানাভাবে উত্তরবঙ্গের সাহিত্য-সংস্কৃতিকেও প্রাণিত করায় সচেষ্ট হতে বলি। এভাবে সময়ের সদ্ব্যবহারের মধ্যে আমরা এগিয়ে চলি।

২০০৯-এ আশুর শেষ অবলম্বন তাঁর মা স্বর্গত হন। তাঁর বাবা পাঁচ বছর আগেই চলে গেছেন। সেক্ষেত্রে সে আরও পরিবাররিক্ত হয়ে পড়ে। এজন্য ক্রমে অতুল মার্কেটস্থিত ‘সংবেদন’ই তাঁর ঘরসংসার হয়ে ওঠে। আর আমি হয়ে যাই তাঁর ঘরামি। অন্যদিকে তাঁর বাবা-মা’র স্মৃতিকে ছড়িয়ে দিতে তাঁদের নামে দুটি সাহিত্য পুরস্কার চালু করার পরামর্শ দিই। সঙ্গে একটি গুণীজন সংবর্ধনা। সেই পুরস্কার ও গুণীজন সংবর্ধনা ২০১০ থেকে চালু হয়ে যায়। অধীরচন্দ্র বর্মণ স্মৃতি স্মারক পুরস্কার ও বিমলা বর্মণ স্মৃতি স্মারক পুরস্কার প্রভৃতি শুধুমাত্র আশুতোষ বর্মণের বাবা-মাকে স্মরণীয় করেনি, উত্তরের সাহিত্যে পুরস্কারের পরিসরকেও ভিন্ন মাত্রা প্রদান করেছে। যাঁরা নীরবে নিভৃতে সাহিত্যচর্চা করে উপেক্ষিত রয়েছেন বা প্রতিশ্রুতির বিপুল সম্ভাবনার অধিকারী, তাঁদের খুঁজে নিয়ে পুরস্কার প্রদান করার লক্ষ্যে অগ্রসর হই। অন্যদিকে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেবক ও সাধক প্রকৃতির গুণী মানুষকে সংবর্ধনার আলোতে আনার প্রয়াসে মনস্থির করেছিলাম। শুধু তাই নয়, পুরস্কার ও সংবর্ধনার অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সাহিত্যবাসর, বই প্রকাশ, আলোচনা সভা, কবিসম্মেলন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আয়োজিত হয়েছে। আর এসব কর্মকাণ্ডই মানুষের মুখে মুখে চলমান বিজ্ঞাপনে ‘সংবেদন’ সম্প্রসারিত হতে থাকে। সংবাদপত্রের দৌলতে তার খবরাখবরই ‘সংবেদন’-এর বিজ্ঞাপন হয়ে ওঠে। তার প্রভাব পড়ে প্রকাশনাতেও।

২০১০ থেকে ‘সংবেদন’-এর বই প্রকাশে গতি লাভ করে যা ক্রমশ তীব্রতর হয়ে ওঠে। ২০১৭-তে মাত্র দশবছরে বিভিন্ন বিষয়ে ১২১টির মতো বই প্রকাশিত হয়। ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে সক্রিয় হতে না পারায় বই বিক্রির চেয়ে বই প্রকাশই আশুর আয়ের মূল উৎস হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে সে বেশি রকমের সফল। উত্তরের বই প্রকাশে ‘সংবেদন’ যে অবিকল্প প্রতিষ্ঠান ! অবশ্য আমরা সেখানেই শুধু পৌঁছাতে চাইনি। বই প্রকাশ অনুষ্ঠানকেও দিতে চেয়েছিলাম বনেদি আভিজাত্য। ২০১২ থেকে ‘সংবেদন’ আয়োজিত একক বই প্রকাশের অনুষ্ঠানেও অসংখ্য গুণী মানুষের সমাবেশে সারস্বত পরিসরের অবকাশ তৈরি হয়েছে। এছাড়া যখনই কোনো সুযোগ এসেছে, তখনই তার ভার তুলে নিতেও দ্বিধা করিনি। ২০১৪-তে মালদা জেলার দুশো বছর পূর্তি উৎসবও আমরা ঘটা করে পালন করি। এভাবে চলতে চলতেই ‘সংবেদন’-এর দশবছর পূর্তির শোভাযাত্রা বেরয়, অসংখ্য গুণীজনের সমাবেশে মঞ্চ আলোকিত হয়ে পড়ে, দশজন গুণী মানুষ ‘সংবেদন-সম্মাননা’য় সম্মানিত হন। প্রকাশিত হয় দশবছর পূর্তির স্মারক সংকলন ‘সংবেদন-এর স্মৃতিমঞ্জুষায় প্রথম দশক’ আমারই সম্পাদনায়। এরূপ স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রকাশনার ইতিহাস তৈরির নজির উত্তরবঙ্গে ছিল না। অন্যদিকে আশুও তাঁর প্রকাশনার জন্য এবছর (২০১৯) দিনহাটায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন মঞ্চে হিতেন নাগ স্মৃতি পুরস্কার ২০১৮ লাভ করে। এ যেন তাঁর সাফল্যের স্বীকৃতি। বহু শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে ‘সংবেদন’ ক্রমশ বটগাছের আশ্রয় হয়ে উঠেছে।

আমরা যখন হাঁটতে শুরু করেছিলাম, তখন ‘সংবেদন’ ছিল আমাদের ছাতা। তাতে ভালো করে দাঁড়াতে পারতাম না, হাঁটা তো দূরস্থান। একটু এদিক সেদিক হলেই বৃষ্টিতে ভিজতে হত, রোদে পুড়ে যেতাম। তবু সেদিন পথ হেঁটেছি ছাতাটাকে গাছ বানাবো বলে। সেখানে ছত্রপতি আশুর ‘সংবেদন’ গাছের নীচে সকলের শীতল আশ্রয়, নিরাপদ হাতছানিই ছিল আমার লক্ষ্য। অতি সামান্য প্রকাশনা দিয়ে এসব ভাবনা ছিল নিতান্তই বামনের চাঁদ স্পর্শের মতো কল্পনাবিলাস। তার উপরে আমার অধ্যাপনার অস্থির জীবন। দার্জিলিং গভর্নমেন্ট কলেজে জয়েনের পর আবার হুগলি মহসিন কলেজে চলে যাই। সেখানে বছর দেড়েক থাকার পর ২০১২তে পুরুলিয়ার সিধো-কানহো- বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি। অথচ আমাদের স্থানিক দূরত্ব মানসিক দূরত্বের আধার হয়ে ওঠেনি। সাফল্যের সিড়িতে পা দিয়েও সে আমাকে বিচ্ছিন্ন হতে দেয়নি। এজন্য আমিও তাঁর প্রতি দায়বদ্ধতায় শিথিল হতে পারিনি। ছুটে ছুটে গিয়েছি তাঁর কাজে, দূর থেকে সে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলত। এজন্য বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর অগ্রগতি থেমে না থাকায় কল্পনাও বাস্তবে নেমে এসেছে। সদিচ্ছায় নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে আন্তরিকতা থাকলে তা যে সম্ভব, ‘সংবেদন’-এর গাছ হয়ে ওঠার মধ্যেই তা প্রতীয়মান।

সময়ের রাহুগ্রাসে ঐতিহাসিক সৌধও ধ্বংস হয়ে যায়, ক্ষয় হয়ে লয়প্রাপ্তি ঘটে ধ্বংসাবশেষের। তারপরেও ইতিহাস নিঃস্ব হয়ে পড়ে না। মানুষের মাঝে সেই ইতিহাস কথা বলে। শুধু তাই নয়, চলমান ইতিহাসে গৌরী সেন, নন্দ ঘোষের মতো মানুষের কথাও জায়গা করে নেয়। ব্যক্তি যখন তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানের সমার্থক হয়ে ওঠে, তখন সেই ব্যক্তিত্বের রোলমডেল আপনাতেই সামনে এসে পড়ে। আশু তাঁর ‘সংবেদন’-এর সাফল্যের পরিসরেই মৃত্যুর কাছে হার মানে। অথচ সে জীবনযুদ্ধে জয়ী। সে তাঁর ‘সংবেদন’কে বারো বছরের মধ্যেই গাছের আশ্রয় করে তুলেছে। আজ ‘সংবেদন’ মানেই আশু, আশু মানেই ‘সংবেদন’। আর তাঁর অবর্তমানে সংবেদন-স্বজনদের তীব্র হাহাকারে সে কত তীব্র আত্মীয়তাবোধে আন্তরিক হয়ে ওঠে, তা তাঁদের অভিব্যক্তিতেই প্রকাশমুখর। এজন্য ওঁর কানে কানে বলতে ইচ্ছে হয়, ‘আশু আমি হারিনি, তুমি জিতে গেছো।’ জোরে বলার অভ্যাস যে নেই আমাদের। আমি যে ওঁর বন্ধু ছিলাম, নীরবে- নিভৃতে-নিরালায়।

কভার ছবি : প্রথম দিকে যখন আশুতোষ বর্মণের সঙ্গে আলাপ থেকে বন্ধুত্ব হয়। ছবিটি ঐ স্টুডিওতে তুলেছিল ।

লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো- বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

আপনার মতামত লিখুন :

2 responses to “আশু আমি হারিনি, তুমি জিতে গেছো! : স্বপনকুমার মণ্ডল”

  1. মনোশান্ত says:

    ভীষণ মনোগ্রাহী লেখা। এক নিমিষেই শেষ করলাম। আপনার অন্যান্য কথা কাহিনী পড়ার অপেক্ষায় রইলাম। সুস্থ থাকুন ভালো থাকুন। মনোশান্ত

  2. রূপা কুণ্ডু says:

    অসাধারণ এক বন্ধুত্বের পরিচয় পেলাম,,,,, অপূর্ব কৃতিত্ব স্যার। এমন বন্ধু মেলা ভার ???????????? মন ভালো হয়ে গেলো এমন লেখা পড়ে।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev