শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, আসামে দেখা গেল ভয়ংকর দৃশ্য। উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছিল সে রাজ্যের পুলিশ। তাদের গুলিতে, লাঠির বাড়িতে নিহত হয় দু’জন প্রতিবাদকারী নাগরিক। ভিডিও, ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মরা মানুষের উপর লাঠি মারছে পুলিশ। কেবল তা-ই নয়, মৃত অথবা তখনও হয়তো জীবিত, কিন্তু সাংঘাতিক আহত মানুষটার উপরে লাফিয়ে নাচানাচি করছে একজন লোক। জানা গেছে, ভয়ংকর এই লাফালাফি করেছেন সরকারি এক চিত্রগ্রাহক। সারা দেশে ধিক্কার ধ্বনিত হবার পরে সে রাজ্যের প্রশাসন একটা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু ভিডিওতে দেখা গেছে, মৃতপ্রায় মানুষের দেহের উপর নাচার পরে সেই আলোকচিত্রিকে আলিঙ্গন করছেন একজন পুলিশ কর্মী। অমানবিকতার এমন ভয়াবহ ছবি খুব কমই দেখা যায়।

আসামে চলছে বিজেপি পরিচালিত সরকার। সেখানে এনআরসি করে ১৯ লক্ষ মানুষকে তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। এই ১৯ লক্ষ মানুষের মধ্যে ১২ লক্ষই হিন্দু। সেখানে ডিটেনশন ক্যাম্পে বিদেশি সন্দেহে বন্দি করে রাখা হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে। অমানবিক এসব বন্দি শিবিরে বাঁচার ন্যূনতম ব্যবস্থাও নেই, এমনই অভিযোগ করছেন অনেকে। সেখানে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে চলছে লাগাতার ঘৃণার অভিযান। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে পুঁজি করে আসাম চালাচ্ছেন সাম্প্রদায়িক মানুষজন। তাঁদের ঘৃণার গাছে এবার ফল ধরছে। এই আসামে সাম্প্রদায়িক হানাহানির বহু ইতিহাস আছে। আমাদের মনে পড়বে, ১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি গৌহাটির অদূরে নেলি নামক স্থানে সাম্প্রদায়িক হিংসায় প্রাণ হারিয়েছিলেন বহু মানুষ। এ দেশের জঘন্যতম সাম্প্রদায়িক হানাহানির ঘটনাগুলির মধ্যে আসামের নেলি এলাকার ঘটনা একটি। তারপর কেটে গিয়েছে প্রায় চার দশক। ‘বিদেশি’ নামে একদল মানুষকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে লাগাতার বিষাক্ত প্রচার চলেছে। অহমিয়া উগ্র জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে সে রাজ্যে অতীতে গড়ে উঠেছিল রাজ্য সরকারও। ১৯৮৫ সালে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন প্রফুল্ল কুমার মহন্ত। এর পরে বারকয়েক কংগ্রেস ও অসোম গণ পরিষদ পরপর সরকারে বসে। এই শতাব্দীর শুরু খেকে কংগ্রেস একটানা দেড় দশক সরকারি ক্ষমতায় থাকে। সেই সময়ে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি মোটের উপর ভালো ছিল বলেই ভাষ্যকাররা মনে করেন। কিন্তু ২০১৬ সালে সে রাজ্যে সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে ক্ষমতা দখল করে বিজেপি, মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন সর্বানন্দ সোনওয়াল। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আবার বিজেপি জেতে, এবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। বিজেপির নিজস্ব ঘরানার রাজনীতি ক্রমেই সে রাজ্যের সম্প্রীতির পরিবেশ ধ্বংস করছে। তারই একটা নগ্ন রূপ দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গের প্রতিবেশি এই রাজ্যে।

এই দিনই দিল্লিতে ঘটে গেল আরেকটি নজিরবিহীন ভয়ংকর ঘটনা। সব থেকে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, ঘটনা ঘটেছে একটি আদালত, রোহিণী আদালত চত্বরে। ঘটনার বিবরণে জানা যাচ্ছে, এক গ্যাংস্টার জিতেন্দর গোগিকে আদালতে আনা হচ্ছিল একটি মামলার সূত্রে। সেই সময় আইনজীবীর বেশ ধরে আরেকটি পাল্টা গ্যাং-এর লোকেরা আদালতের এজলাসেই, ২০৬ নম্বর কোর্ট রুমে গুলি চালাতে শুরু করে। ঘটনাস্থলেই খুন হয় গোগি। পুলিশের পাল্টা গুলিতে সম্ভবত আততায়ী দু’জন নিহত হয়েছে। জানা যাচ্ছে, গুলি, পাল্টা গুলি চালনার সময় একজন মহিলা আইনজীবী আহত হয়েছেন। আদালতের এজলাসে ৩৫ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি চলেছে। এমন ভয়াবহ ঘটনা অতীতে কবে ঘটেছে, সেটা বলতে পারছেন না স্মৃতিধর ব্যক্তিরাও।
আদালতে একজন গ্যাংস্টারকে হাজির করানোর পুলিশি প্রোটোকল আছে। একাধিক স্তরীয় নিরাপত্তা বলয়ে ঘিরে রাখার কথা। দিল্লি পুলিশ যে সে বিষয়ে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, সেটা জলের মতোই পরিষ্কার। মনে রাখতে হবে, দিল্লি পুলিশ কিন্তু দিল্লির সরকার চালায় না। এখন সেখানে আম আদমি পার্টির সরকার চলছে, মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কিন্তু সে সরকারের হাতে নেই দিল্লি পুলিশ। রাজধানীর পুলিশ পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। আজ অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক আসামির কাঠগড়ায় উঠতে বাধ্য। যদি খোদ আদালতের এজলাসেই এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তবে কী নিরাপত্তা রয়েছে সাধারণ মানুষের, উঠছে প্রশ্ন।

এ রাজ্যে ভোট পরবর্তী হিংসার ঘটনা নিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে নানা প্রান্তে ঘুরতে দেখা গেছে। নির্বাচনের অব্যবহিত পরেই কিছু হিংসার ঘটনা ঘটেছিল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার বলেছেন, প্রথম তিন দিনেই হিংসার ঘটনা মূলত ঘটেছে, যে সময় রাজ্যের পুলিশ চালাচ্ছিল নির্বাচন কমিশন। কিন্তু সেসব কথা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধিরা মানেননি। তাঁরা তাঁদের মতো রিপোর্ট জমা করেছে আদালতে, যার ভিত্তিতে কলকাতা উচ্চ আদালত খুন ও ধর্ষণের ঘটনায় সিবিআই তদন্ত এবং অন্যান্য ঘটনায় স্পেশাল ইনভেস্টিগেটিং টিম বা সিট গঠন করেছে। সিবিআই ইতিমধ্যেই ৪০টিরও বেশি মামলা দায়ের করেছে। কিন্তু আসামের ঘটনায় মানবাধিকার কমিশনের কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না কেন? দিল্লির ঘটনায়, যেখানে আদালতের এজলাসে ৪০ রাউন্ড গুলি চলে, তা নিয়ে কেন চুপ মানবাধিকার কমিশন? এ রাজ্যে কেবলমাত্র এক পক্ষের লোকেদেরই বিরুদ্ধে মূলত অভিযান চালাচ্ছে সিবিআই। সারা দেশে যখন ভয়ংকর হিংসার ঘটনা ঘটে চলেছে, নিস্ক্রিয় কেন সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগশন? জবাব একটাই, বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলিতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ এক কথা, আর সারা দেশে সুশাসনের চেষ্টা করা অন্য কথা।
ঠিক এই সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে। এরোপ্লেনে ওঠার ছবি দিয়ে চিত্রমালা সিরিজ শুরু। তারপর মুহূর্তে মুহূর্তে ভেসে আসছে কেবল ছবি। ভালো ভালো জামাকাপড়ের যেন প্রদর্শনী চলছে মোদিজির শরীরে। দাড়ি কতটা ছোটো করা হয়েছে, তা নিয়ে চলছে চর্চা। সবই ঠিক, কিন্তু মার্কিন দেশের জনতা যখন আসামে মৃতপ্রায় মানুষের উপর সরকারি আলোকচিত্রির ডিস্কো ড্যান্স দেখবেন, মোদিজির ধবধবে জামায় কাদার ছিটে লাগবে না তো?