গাদাগুচ্ছের ভুলভাল ধারণা নিয়ে আমরা চরাচরে চড়ে বেড়াই। এরমধ্যে কিছু নির্দোষ, কিছু ক্ষতিকর। যেমন, ছোটবেলায় একমুখ দাড়িগোঁফওয়ালা ময়লা জামাকাপড় পরা লোকজন দেখলেই ভাবতাম সিআইডি। সবকিছু ছদ্মবেশে নজর রাখছে। সেসব ছিল গোয়েন্দা গল্প পড়ার বদহজম। তারপর এল, কারণে অকারণে ইংরেজি বলা লোক দেখলেই তাকে খুব শিক্ষিত লোক বলে ধরে নেওয়া। আমাদের পাড়ার বিশে দা ছিল এইরকম। লোকে ফিসফিস করে বলতো, খুব বেশি পড়াশোনা করতে করতে অমন দশা হয়েছে। পরে জেনেছি তেমন কিছু নয়, বিশে দা আদতে অপ্রকৃতিস্থ বা কিঞ্চিৎ ছিটগ্রস্থ মানুষ। ইংরেজির মাহাত্ম্য লোকজনের অমন ধারণা তৈরি করে দিয়েছিল। লিখতে লিখতেই মনে পড়লো, অফিস, আদালত, থানা, পুলিশ সর্বত্র বিরাজমান ‘বড়বাবু’দের কথা। সেই যে ছোটবেলায় পড়া ‘হেডঅফিসের বড়বাবু’র’ কথা। তারা বড়ও নন, তেমন একটা বাবুও নন। আদতে তারা ছিলেন নিরীহ হেড ক্লার্ক। পান থেকে চুন খসলে উঁচুতলার লোকেদের কাছে ধমক খেতেন। সবই নির্দোষ ভুল ধারণা। এতে জগৎসংসারের কিস্যু যায় আসেনা। শুধু যারা এমন বলে বা শোনে তাদের নিয়ে চালাকরা একচোট হেসে নেয়।

বিশ্ব গন্ডার দিবসেই ২৪৭৯ গন্ডারের শিং পুড়িয়ে দিলো আসাম সরকার।
কিন্তু অনেক ভুল ধারণা বা বিশ্বাস ক্ষতিকর, যাকে বলে প্রাণঘাতী। বহু মানুষ বা প্রাণীর প্রাণ যায় এতে। এমনকি তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। অথচ যে কারণে প্রাণ গেল তাতে বিশ্বব্রহ্মান্ডের কারও লাভ হল না। ক’দিন আগে আসামে সরকারি উদ্যোগে প্রায় আড়াই হাজার গণ্ডারের শিং পোড়ানোর খবর শুনে এমনটাই মনে হল। পৌরুষ বাড়ানো বা আরও বীর্যবান হওয়ার বাসনায় অনেকে গণ্ডারের শিং এর তাবিজ-কবচ-মাদুলি শরীরে ধারণ করেন। আবার অনেকে এতেও ভরসা করতে না পেরে শিং এর গুঁড়ো জল সহযোগে সেবন করেন। এতে কেউ বীর্যবান হয়েছেন বলে জানা যায়নি। শোনা যায়নি, এতে কারও পৌরুষত্ব পুনরুদ্ধার হয়েছে! অথচ দেখুন বিপ্লবী চিন থেকে শুরু করে আমেরিকাকে তাড়ানো ভিয়েতনামে এইরকম ঘটনা ঘটছে। বোঝাই যাচ্ছে দেশে বিপ্লব বা প্রতিবিপ্লব যাই ঘটুক না কেন, মানুষের মনের নাগাল পাওয়া বড়ই কঠিন!
মানুষের ভ্রান্তধারণা নির্ভর এই বন্যপ্রাণ বানিজ্য জুড়ে সারাদুনিয়া জুড়ে একটা কোটি কোটি টাকার ব্যবসা। মেধা থেকে পৌরুষত্ব বাড়ানো, রোগ সারানো থেকে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বাঘের অণ্ডকোষ থেকে তক্ষকের ল্যাজ সবকিছু খেতে রাজি একশ্রেণীর মানুষ। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, সাংস্কৃতিক বিপ্লব, প্রযুক্তির অগ্রগতি সবকিছুর পরও এই ঘটনা বাড়ছে। বিশাল বাজার, সরকারি বেসরকারি মদতে চলা এই কেনাবেচা বন্ধ করা সত্যিই খুব মুশকিল। পৃথিবীর ৭০ শতাংশ একশৃঙ্গ গন্ডার পাওয়া যায় আসামের কাজিরাঙায়। আইইউসিএন তালিকাভুক্ত এই প্রাণীগুলি আজ চোরাশিকারীদের উৎপাতে বিপন্ন। শুধু গণ্ডারই নয়, নিজেদের দেহে বহন করা বিশেষ কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বা দেহরস হয়ে উঠছে বহু প্রাণীর মৃত্যুর কারণ। অথচ তারা তা নিজেরাই জানে না! এরা সবাই মানুষের চিত্তবাসনার বলি।

নিজেদের তৎপরতার প্রমাণ দিতে এবং চোরাশিকারীদের সবক শেখাতে আসাম সরকার এই শৃঙ্গ পোড়ানোর কর্মসূচি নিয়েছে। প্রশ্ন আসে, এরা মারা গেল কীভাবে? সরকারের উত্তর – প্রাকৃতিক কারণেই মারা গেছে। কি সেই প্রাকৃতিক কারণ আমরা তা জানিনা! একশৃঙ্গ গণ্ডারদের সুরক্ষার জন্যই তা জানা জরুরি। প্রশ্ন উঠেছে শৃঙ্গগুলি এভাবে সংরক্ষিত রাখা হল কেন? এতে তো চোরাশিকারীরাই উৎসাহ পাবে! কারণ এগুলিকে সরকার একটা বাণিজ্যিক সম্পদ হিসেবে ভেবেছিল! সেজন্যই তা সংরক্ষিত করা হয়েছিল! আমাদের ভাবনাচিন্তার গোড়াতেই অনেক গলদ রয়েছে। আমার সম্পদ, আমার সৌন্দর্য, আমার স্বাস্থ্য – এই আকাঙ্ক্ষাকে উস্কে দিয়েই বাড়ছে বন্যপ্রাণ বাণিজ্য। এই জায়গাটাকে ধরে সরকারের কোন প্রচার নেই। ভুল ধারণাগুলি শুধরে দেওয়ার উদ্যোগও চোখে পড়ে না। মানুষের চিত্তবাসনা না বদলালে বন্যপ্রাণদের বিপদ কিন্তু থেকেই যাবে।