পাতলা হিলহিলে সাপ যেন। সেই রকমই ঠাণ্ডা ছোঁয়া। আরশোলা দেখাল বাড়িতে যেমন তুড়িলাফ, সেই ভাবেই বুবাইয়ের চেঁচিয়ে ওঠা,
—ও মা, আমর পায়ের তলায় জল।
কাচবন্ধ গাড়িটার ভিতরে বুবাইয়ের একার চিৎকার কলের লাটিমের মতো এক পাক ঘুরতে না ঘুরতেই মিমিরও প্রায়—আর্তনাদ।
—ও মা, সত্যিই জল ঢুকছে যে।
আরো একটা চিৎকার ওঠার কথা। কিন্তু খেয়েদেয়ে আইঢাই শরীর বলে সংঘমিত্রা বসেছিল পা দুটো তুলে না—বসা না—শোয়া এক বিশেষ ভঙ্গিতে। গাড়িতে জল ঢুকতে পারে এটা আগাম আন্দাজ করে নয়, মোটা—সোটা শরীরের আরামের জন্যেই।
—পা তোল, পা তোল, পা তুলে বোস।
ছেলেমেয়েকে পরামর্শ দিয়ে, নিজের দু-পায়ের মাঝখানে ঝুলে-পড়া শাড়িটা অনেকখানি উপরে উনে সংঘমিত্রা স্বামী বা সুশান্তকে।
—গাড়িতে জল ঢুকছে যে গো।
সুশান্তর গলা এমনই শান্ত। এখন অতিশয় নরম। যেন বৃষ্টিতে ভিজে নেতানো।
—পা তুলে বোসো সবাই। জল আরো বাড়বে।
—জুতো ভিজে যাচ্ছে যে। কী করব? বুবাইয়ের নাকি কান্নায় মিমির ধমক।
—এ রকম করে বোস না। আমি তো বসে আছি। বসে জুতো মোজা খুলে নে।
মিমির পায়ে স্যান্ডেল। সে জলের ছোঁয়া পেয়েই খুলে পিছনে মাথার দিকে। মিমির জুতো রাখা দেখে সংঘমিত্রা হঠাৎ তেলে-বেগুনে।
—নিজেরটা রাখলি, আমারটা পড়ে রইল?
মিমি নিচু হতে যাছিল শালোয়ারের তলাটা গোটাত। শরীরটাকে বাঁকার ভঙ্গিতে রেখেই মায়ের মুখের দিকে ঘুরিয়ে দেয় ঘাড়টা।
—বলবে তো। আমি কি করে জানব জুতোটা তোমার পায়ে না নীচে?
মায়ের স্যান্ডেলটাও তুলে নিয়ে নিজের পাশে। বুবাইয়ের জুতো খোলা হয়ে গেছে। শূন্যে পা রেখে মোজা খুলছিল। খোলা হয়ে গেলে মিমির মতো সামনের সিটে পা দুটো ভাঁজ করে টান টান আটকে রাখার চেষ্টা।
—কী করে রাখব? পা নেমে যাচ্ছে তো। মা দেখো, কতটা বেড়েছে জল।
জল বাড়ছিল, কারণ তখনো বৃষ্টি থামে নি। আর পা-পা করে এগিয়ে চলেছিল গাড়িটা। আর হাত কুড়ি যেতে পারলেই যখন আমীর আলি অ্যাভিনিউ, তখনই চূড়ান্তভাবে আটকে গেল সুশান্তর হালকা নীল অ্যামবাসাডার।
—য্যা-ক।
স্টিয়ারিং জড়িয়ে থাকা হাত দুটোকে স্টিয়ারিং থেকে খুলে নিয়ে নার ভঙ্গিতে খানিকটা উপরে তুলে তারপর নিজের দুই হাঁটুতে চাপড়ে সুশান্তর গলার ওই শব্দটা যেন উঠে এল তার কণ্ঠনালী থেকে নয়, এমনকী তার নিজেরও উচ্চারণ নয় ওটা, যেন সুশান্তর হয়ে প্রক্সি দিলে তার হৃৎপিণ্ডের ভিতরে জমে-ওঠা অস্থিরতার একটা প্রবল চাপ।
এ রকম ভয়াবহ কোনো সঙ্কটে যে জড়িয়ে যেতে হতে পারে, সেটা অনেক আগেই আন্দাজ করে নিয়েছিল সে। অনেক আগে মানে, এয়ারপোর্ট হোটেল থেকে বেরোনোর মুহূর্তেই। যতক্ষণ হোটেলের ভিতরে ছিল, বজ্রপাতের শব্দ শুনেছে, বিদুৎ ঝলক চোখে এসেছে, কিন্তু বর্ষণের ধরণটা বুঝতে পারে নি। খাওয়া-দাওয়া সেরে, হোটেল থেকে গাড়ি বের করার সময় এক পলকে জামাপ্যান্টসহ গোটা শরীরটার যখন শাওয়ারে-স্নান, তখনই আতঙ্কটা ব্যাঙের লাফে একদম বুকে।
—মাই গড! বাড়ি পোঁছতে পারব তো?
সুশান্তর তুলনায় অন্যদের ভেজা প্রায় কিছুই নয়। নিজে পুরাদস্তুর ভিজে গাড়িটাকে সে ব্যাক গিয়ারে নিয়ে এসেছিল হোটেলের গেটে। শরীরটাকে শুইয়ে খুলে দিয়েছিল পিছনের দরজাটা।
সংঘমিত্রা তখনো দেখতে পায় নি সুশান্তর ভিজে যাওয়াটা।
—আমিও কি পিছনে বসব নাকি?
বৃষ্টির ঝমঝমে শব্দে ভিজে গিয়ে সংঘমিত্রা কী বলল কানে আসে নি। সুশান্ত গাড়ির ভিতর থেকে গলা চড়িয়ে—
—দাঁড়িয়ে থেকো না। উঠে পড়ো। সামনে আসতে গেলে ভিজ যাবে।
টাওয়েল নেই। তাই প্রথমে রুমালে। পরে ড্যাশ বোর্ড-এর চৌখুপি থেকে আধময়লা একটা হাত-টাওয়েল দিয়ে সুশান্তর মাথা মোছা দেখে, সেই সঙ্গে গায়ে লেপটে থাকা জামাটাও, সংঘমিত্রার ডুকরে ওঠা
—ওমা, একী? এই রকম ভিজে গেছ? মিমিও আঁতকে উঠেছিল তখুনি।
—এ কী বাবা? এই রকম ভিজে জামা পরে থাকবে নাকি? তোমার তো শরীর খারাপ হয়ে যাবে। নিজের গায়ের দোপাট্টাটাকে, যেন গা থেকে ছিড়ে নিচ্ছে, এইভাবে ঝটকা টানে সুশান্তর দিকে এগিয়ে দেয় সে।
—এটা দিয়ে মোছো
—আরে না, এসব লাগবে না। প্রথম বর্ষা। একটু ভিজলুম। আমার তো ভালোই লাগছে।
ভি আই পি রোড পর্যন্ত সন্তর্পণে। যেই না ইস্টার্ন বাইপাস, আর আশাতীত রকমের ফাঁকা রাস্তা, সুশান্ত হয়ে উঠেছিল জেট প্লেনের পাইলট। ঝড়ের বেগে গাড়ি উড়িয়েও ভয় ঘোচে নি হৃৎপিণ্ডের, টানটান টেনশন। একটা সিগারেটের জন্যে জিভের মধ্যে চাতকের ডাক। বুক পকেটেই সিগারেট আর লাইঢার। তবু ধরায় নি। সময়টাকে বাঁচানো দরকারা অনেকগুলো পকেট আছে, যেখানে জমে যেতে পারে থৈ-থে সমুদ্র। যত দ্রুত পারা যায় পার হতে হবে।
গাড়ির হেডলাইটের এলাকার ভিতরে ঝমঝমে বৃষ্টির ঝকঝকে রেখাগুলোকে একটানা দেখে যেতে-যেতে সুশান্তর মনে হছিল সে যেন জড়িয়ে পড়েছে বিরতিহীন এক আক্রমণের ভিতরে। ছুঁচের মতো বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ক্রমশই তার চোখে হয়ে উঠছিল কোনো জবরদস্ত কব্জির মোচড়ে ছোঁড়া, ছুঁড়ে ছুঁড়ে যাওয়া, বর্শাফলক। কোনো-এক সময়ে পৃথিবীর আবিষ্কারের ইতিহাস পড়তে গিয়ে তার চোখে পড়েছিল হাওয়াই দ্বীপে ক্যাপটেন কুকের মৃত্যুদৃশ্য। তাঁকে ঘিরে উন্মত্ত আদিবাসীদের হাতে-হাতে উদ্যত বর্শাফলক। ছবিটা ভেসে উঠল মনে। সুশান্তর গাড়ি চালানোর উন্মাদ বেগে ভয় পেয়ে যায় সকলেই। সুশান্ত স্বাভাবিক তো? নাকি হুইস্কির নেশায় এই রকম?
—কী করছ তুমি? একটা অ্যাকসিডেন্ট ঘটাবে নাকি?
মিমিরও বুক ধুকপুক।
—বাবা, কী করছ? আর একটু আস্তে চালাও না।
ভালো লাগছিল শুধু বুবাইয়ের। বাইরে বেরোবার আগেই সে যে ক্যাসটটা দেখেছে ভি সি আরে, সেখানে যে চেজিং-এর দৃশ্য আর দৌড় এর চারগুণ। বলে ফেলে কথাটা
—এ আর কি স্পড! ‘ফ্রেঞ্চ কানেকশন’ তো দেখলে না। কাকে বলে স্পিড দেখতে। মিমির হাসিতে ফ্যু ফ্যু শব্দ।
—ফিলমের স্পিড কি সত্যিকারের স্পিড নাকি? স্লো স্পিডে তুলে হাই করে দেওয়া যায়। বুবাইয়ের স্বভাবে হার মানা নেই
—তুই সব জানিস? ওটা মোটেই স্লো স্পিডে তোলা নয়! মোটর রেস দেখায় যখন সেগুলোও কি স্লো স্পিডে তোলে নাকি?
—ঝেকার মতো কথা বলিস না তো?
—তুই তো বলছিস বোকার মতো।
আজ ছিল বুবাইয়ের জন্মদিন। আজকাল অবস্থাপন্ন বাড়িতে, অন্তত অবস্থার হেরফের ঘটিয়ে যারা হঠাৎ-হঠাৎ নিচুতলা থেকে লিফটে চেপে উঠে যাচ্ছে আভিজাত্যের উপর তলায়, যেভাবে পালিত হয় পুত্রকন্যাদের বার্থডে অনুষ্ঠান, সেভাবেই ষোলো আনা আড়ম্বরে কেটেছে সন্ধে পর্যন্ত। তারপরই বাড়ি থেকে বোরয়েছে ওরা। আগে থেকেই ঠিক করা, বাইরে খাবে।
—কোথায় খাবে?
ভোট নিয়ে জানতে চেয়েছিল সুশান্ত।
বুবাই—ট্রিংকা।
মিমি—প্রথমে মন্তব্য করতে রাজি না হয়ে, পরে ব্লু ফক্স।
সংঘমিত্রা—আমার বাবা বেশ লাগে ওয়ালড্রফ—ই অনেকটা চেনা হয়ে গেছে।
দুপর থেকে অসহ্য গুমোট। নিজের কোম্পানিতে নিজের এয়ারকন্ডিশন্ড কামরা থেকে বাড়ি ফিরে সুশান্তর মনে হছিল যেন ফ্রিজ থেকে আভেন-এ। সুশান্তকে অঝোরে ঘামতে দেখে রেগে গিয়েছিল সংঘমিত্রা, ফিফটি পার্সেন্ট দরদ মিশিয়ে।
—তোমার কাণ্ডকারখানা বলিহারি। এতজনের জন্যে এত করছ, নিজের জন্যে খরচ করার বেলায় তোমার হাত নড়ে না কেন বলো তো? হুটপাট করে ভি সি আর না কিনে, তোমার কি উচিত ছিল না নিজের শোবার ঘরটায় একটা এয়ারকুলার লাগানো?
—ও রকম যদি পারতাম, নিশ্চয়ই করতাম। পারি না বলেই করি নি। যদি এয়ারকন্ডিশন্ড চালাতে হয়, গোটা বাড়িতেই চলবে। শুধু আমার ঘরে কেন? ধাপে-ধাপে হবে। একটু ধৈর্য ধরো। কোথায় ছিলাম আর কোথায় এসেছি, তুমি তো আর কম জানো না?
—জানি গো জানি। তুমি মানুষটা যে অন্য রকম সে কি আর জানি না? তবু যে বলি, তোমার শরীরের কথা ভেবে বলি। আগে কেরানিগিরি করতে; সে ছিল একরকম। এখন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে নিজের ব্যবসা, এখন তো বাড়ি ফিরে একটু সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-স্বস্তি দরকার।
তখনকার আলোচনায় সুশান্তই টেনে দিয়েছিল পূর্ণচ্ছেদ।
—হবে, হবে, সব হবে। গাড়ির জন্যে ব্যাঙ্ক লোনটা শোধ হয়ে যাবে সামনের বছরের মার্চে। তারপর পড়ব এয়ারকন্ডিশনিং নিয়ে।
ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনস-এর গলি থেকে বেরিয়ে গড়িয়াহাট রোড পার হয়ে আমীর আলি আভিনিউ-এ পড়ে পার্কসার্কাসে পৌঁছবার মুখে সুশান্তর চোখে পড়ে পুবদিকের আকাশে ঘন কালো মেঘ। আরো কিছুদিন কলকাতাকে আগুনের সেঁক-তাপে সিদ্ধ করার মতলবে, আকাশ যেন কলকাতা ছাড়িয়ে দূরের আকাশেই আয়োজন করে চলেছে প্রাণ-জুড়োবার ঘন বর্ষণের। যে দিকে মেঘ সেদিকেই বুঝি এয়ারকন্ডিশন্ড পৃথিবী। এই রকম এক আকস্মিক বোধের হলকানিতে বাঁদিকে অর্থাৎ পার্ক স্ট্রিটে যাওয়ার দিকে না বেঁকে সুশান্ত ডান দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল স্টিয়ারিং।
—এদিকে কোথায় যাচ্ছ?
সংঘমিত্রার প্রশ্নে মিমিও সচেতন তখুনি।
—চায়না টাউনে যাচ্ছ নাকি বাপি?
সুশান্তর বদলে বুবাইয়ের মুখেই লাফানো উত্তর।
—চায়না টাউনে মোটেই না। বাপি যাচ্ছে ক্যালকাটা বোটিং রিসর্টের ওপেন এয়ারে। তাই না বাপি?
—যাঃ, ওখানে কেউ ডিনার খেতে যায় নাকি?
—কেন যাবে না, খুব যায়।
—সবেতেই তোর আগ বাড়িয়ে পাকামি। বলো না বাপি, কোথায় যাচ্ছ।
—আজ যেখানে নিয়ে যাচ্ছি, সেখানে কখনো যাই নি আগে।
—কোথায় বলো না তবু।
—এয়ারপোর্ঢ হোটেলে।
—টসাম্, টসাম্।
ডান হাতটাকে সামনে ছড়িয়ে, যেন হাতে বন্দুক, এইভাবে মুখে গুলি ছোঁড়ার শব্দ করে বুবাই। মনের উপছে-পড়া উল্লাস জানানোর এটাই ওর শ্রেষ্ঠ কায়দা। গোটা সাতেক, নানা ধরণের বন্দুক আছে তার। আসল নয় অবশ্যই, খেলনার। ফলে বন্দুকের শব্দ দিয়েই সে বলতে শিখে গেছে জীবনের উলটো-সোজা সব রকমের অনুভূতি-আলোড়ন।
—আঃ, দারুণ হবে। এরোপ্লেন টেক অফ করছে দেখা হয়ে যাবে। টসাম্, টসাম্।
গাড়িটা ইস্টার্ন বইপাসে পড়তেই অন্য পৃথিবী। ময়ুরের মতো বহুবর্ণ নয় যদিও, কিন্তু ঠিক নাচের আগের ময়ূরের মতোই নীল মেশানো কালো পেখম ছড়িয়ে ডানদিকের প্রকাণ্ড আকাশটা যেন নাচের জন্য তৈরি। ভয়াবহ, অথচ সুন্দর। ডান দিকে শাক-সবজির খেতের পর খেত পার হয়ে দূরের যে দিগন্ত, সেখান থেকে এই ইস্টার্ন বাইপাসের সড়ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে মেঘের ছায়া যেতে-যেতে রেলগাড়ি হঠাৎ টানেলে ঢুকে পড়লে যেমন, অনেকটা সেই রকমই প্রতিক্রিয়া হু-হু হাওয়ায় ঝড়ের বেগ। নিমেষে গায়ের ঘাম জুড়িয়ে যায় সকলের। ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার মতো অগাধ শান্তি চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকছে শরীরে। মিমির মুখটা থেকে থেকেই ঢেকে যাচ্ছিল উড়ন্ত চুলের অবাধ্যতায়। চুল সরাতে সরাতে বিরক্ত মিমি জানলার ডান দিক থেকে চোখ সরায় নি তবু। মেঘের তোলপাড় দৃশ্যটা যতক্ষণ পারে দেখে যাবে সে। গানের বুদবদ উঠে আসতে চাইছে তার গলায়। মেঘের পরে মেঘ জমেছে, আঁধার করে আসে। সৌরভের প্রিয় গানগুলোর একটা। হঠাৎ ময়ূরের মতো নেচে-ওঠা হৃদয়টা নিয়ে সে কী করবে ভেবে না পেয়ে সুশান্তর পিঠের দিকে ঝুঁকে, মনের উল্লাসকে টেনে আনে গলায়।
—থ্যাঙ্কিউ বাপি, এমন দৃশ্য দেখি নি কখনো।
সুশান্তর গলা খাদে বাঁধা।
—দেখেছিস। তোর মনে পড়ছে না।
কবে গো?
—মথুরা থেকে আগ্রা যাওয়ার পথো নাইনটিন এইটটি থ্রি।
সংঘমিত্রা সুশান্তকে—
—ওর কী করে মনে থাকবে? ওর তো তখন জ্বর।
—আমার মনে আছে।
পিঞ্চাং বলের লাফ বুবাইয়ের গলায়।
—তোর তো সবই মনে থাকে বেশি পাকা তো!
—এ্যাই, আজ আমার বার্থডে। বকবি না আমাকে।
—তাহলে চুপ করে বসে থাক। সব কথায় ফোড়ন কাটিস কেন?
—মোটেই ফোড়ন কাটছি না। যা দেখেছি, তাই বলছি।
—তোর তো তখন মোটে ছ-সাত বছর। কী মনে থাকবে রে?
সংঘমিত্রা শুধরে দিয়েছিল মিমির ভুল।
—ছ-সাত বলছিস কেনা ওর তো নয়।
—নয় হোক আর যাই হোক, ওর একেবারে সব মনে আছে?
—খুব মনে আছে। বলব? এই রকম মেঘ। তারপর ঝড়-বৃষ্টি হেডলাইট জ্বালিয়েও তুমি রাস্তা দেখতে পাচ্ছিলে না। তাই সাইড করে দাঁড়িয়ে পড়েছিলে।
বলিস কী রে? এত মনে আছে তোর।
—থানডারিং শব্দে ভয় পেয়ে মা আমাকে বুক জড়িয়ে ধরেছিল। মা ভয় পাচ্ছিল থানডারিং হবে বুঝি আমাদের গাড়ির মাথায়। তুমি আর বাবা ঝগড়া করছিলে।
—বেশ তো, তোর যদি এত স্মৃতিশক্তি, বল তো যেবারে রাজগীরে বেড়াতে যাই, নালন্দায় যাওয়ার পথে কী ঘটেছিল?
—যদি বলতে পারি কী দিবি?
—আগে বল না।
—আমি বলব, তারপর যদি তুই কলা দেখাস?
—দেখেছ মা! ছেলের ভাষা শোনো।
—ওকেই-বা তুই ঘাঁটাচ্ছিস কেন?
—আমি ওকে ঘাঁটাচ্ছি? কী সে বুঝলে যে ঘাঁটাচ্ছি। আদর দিয়ে দিয়ে যা পাকাচ্ছ এটিকে!
বুবাই দমে না। তার পড়ার ঘরের দেয়ালে সুপারম্যানদের পোস্টার। আর জাপানি যুযৎসু খেলোয়াড়দের। আদর্শ ও আরাধ্য পুরুষ ওইসব শক্তিমানেরাই।
—তুই বুঝি পাকিস নি? কচি ঢ্যাঁড়স হয়ে আছিস এখনো? তোর পাকামির খবর বুঝি জানিনা আমি।
—দ্যাখ বুবাই, বেশি পাকামি করিস না বাবা দেখছ?
গাড়ি তখন ভি আই পি রোডে বাগুইহাটির কাছে। হঠাৎ বাতাস বন্ধ। তারপরই মেঘের গলায় বাঘের ডাকা একটু পরে টুপটাপ বৃষ্টি।
—হোক বাবা, একটু বৃষ্টি হোক।
সংঘমিত্রার চোখে মুখে মানত করার ভঙ্গি।
দুই
স্টিয়ারিং থেকে উপড়ে আনা হাতির শুঁড়ের মতো হাত দুটো হঠাৎ এতখানি নিস্তেজ আর অকেজো হয়ে আছে দেখেই যেন সুশান্ত ডান হাতের আঙুলে ভিজে জামার আরো কয়েকটা বোতাম খুলতে খুলতে বাঁহাতে ড্যাশ বোর্ড থেকে আধ-ময়লা হাত টাওয়েলটা নিয়ে পিছনে ছুঁড়ে দেয়।
—বুবাই পিছনের কাচটা মোছ তো।
না দেখে ছোঁড়া। টাওয়েলটা সরাসরি সংঘমিত্রার মুখে। ঘেন্নায় বিরক্তিতে খেঁচিয়ে ওঠে সংঘমিত্রা।
—আমার মুখেই ছুঁড়ে মারলে ওটা?
—তোমার মুখে? স্যরি ম্যাডাম। কি রে বুবাই ক্যাচ ধরতে পারলি না?
—আগে বলবে তো।
—একটু থামছো তাই না রে?
বোতাম খুলতে-খুলতেই সুশান্তর মনে পড়ে যায়, সিগারেট। এক ধরণের টেনশনে জিভের মধ্যে সিগারেটের জন্যে হ্যাংলামি। আবার আরেক রকমের টেনশনে কী রকম বেমালুম ভুলে যাওয়া। ভিজে যায় নি তো প্যাকেটা? ইস্, আগেই পকেট থেকে বের করে নেওয়া উচিত ছিল।
—হ্যাঁ, একটু যেন কমার দিকে।
সিগারেটের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে—
—ভুল হয়ে গেল?
কী ভুল।
—আমাদের বেরোনো উচিত হয় নি। হোটেলে আরো কিছুক্ষণ থাকলেই ভালো ছিল। বুঝতেই পারি নি তো যে, এই রকম বৃষ্টি হচ্ছে। এখন যা অবস্থা, সারারাত না বসে থাকতে হয় গাড়িতে।
এইটুকু সময়েই হাঁপিয়ে উঠেছে সংঘমিত্রা। খেয়ে-দেয়ে ভরা পেট। গাড়ির ভিতরে হাওয়া নেই। শুধু সামনের সিটের ডানদিকে জানলার পাল্লাটা ইঞ্চিখানেক ফাঁকা। বাইরে এত বৃষ্টি, তবু ভিতরটা শ্বাসরোধকারী। তার উপরে এইভাবে পা তুলে বসে থাকা। সামনের সিটে হাত-পা ছড়িয়ে খুশিমতো বসবার নড়বার চড়বার স্বাধীনতা থাকলে তবু স্বস্তি মিলত খানিকটা। এইভাবে সারারাত? আর ঘন্টাখানেক কাটাতে হলেই তো হাঁপিয়ে মারা যাবে, এই রকম একটা উদগত আতঙ্ক তার স্নায়ুর ভিতরে গর্ত খুঁড়তে থাকে তখন।
—বলো কী, সারারাত পড়ে থাকতে হবে এখানে?
কথাগুলা বৃষ্টির মতোই খসে খসে পড়ে তার গলায়।
—ব্যাক করে অন্য কোনো রাস্তা দিয়ে যেতে পার না?
উত্তরটা যাতে সংঘমিত্রা নিজেই খুজে নিতে পারে, তাকে অনেকখানি সময় ছেড়ে দিয়ে সুশান্ত সিগারেটের প্যাকেট খোলে। খোলার সঙ্গে সঙ্গে মেজাজে গরম তেলের ছিটে। সিগারেট মাত্র একটাই। হাঁদামি। পিওর অ্যান্ড সিম্পল হাঁদামি আমারা। হোটেলেই খেয়াল করা উচিত ছিল। পাওয়া যেত তখুনি। এমন কিছ ড্রিঙ্ক করি নি যে বিবেচনাবোধ ঘণ্ট পাকিয়ে যাবে। তাহলে ভুলটা করলাম কী করে?
—ব্যাক করে?
সুশান্তর গলায় তার হঠাৎ তেতো-হয়ে-যাওয়া মনের বিরাক্তি।
—পিছনে তাকিয়ে দেখেছ?
সুশান্ত সিগারেটের দিকে তাকিয়ে। ইচ্ছা-আবেগের ভিতরে হ্যামলেটের দ্বিধা। এখুনি এটা খাবে কি খাবে না।
—কেন, পিছনে কী?
সংঘমিত্রার পিছনে তাকানোর ক্ষমতা এবং ইচ্ছা দুটোই ভোঁতা।
—নিজের চোখে দেখ তো অসুবিধেটা কোথায়?
বুবাই জানলার কাচে জমে-ওঠা জল-স্বেদের উপর আঙুল দিয়ে লিখছিল নিজের নাম। মিমি তাকিয়েছিল বাইরে। বন্ধ কাচ আর বৃষ্টির পরদায় ঢাকা বাইরের দৃশ্যটা তখন তার কাছে অনেকটা পেনটিং-এর মতো। ঠিক কার পেনটিং-এর সঙ্গে মিল, সেটাই মনে মনে হাতড়াচ্ছিল সে। বাবার শেষ কথাটায় ঘুরে মায়ের দিকে।
—পিছনে গাড়ির পর গাড়ি মা।
—তাহলে কি সত্যি সত্যি সারারাত এই গাড়ির মধ্যে পাড় থাকব নাকি?
—তুমি না অল্পেই বড্ড অস্থির হয়ে ওঠো বৃষ্টিটা তো ধরে আসছে একটু-একটু করে। বৃষ্টি থামলে তবে তো জল নামবে। একটু তো থাকতেই হবে।
—কখন বৃষ্টি থামবে তার ঠিক আছে নাকি?
—থামবে, থামবে, এখুনি থামবে। আমরা তো আর একা আটকে নেই। শয়ে শয়ে গাড়ি আটকে আছে।
—কী দরকার ছিল?
—কীসের?
—ওখানে, অতদূরে খেতে যাওয়ার?
—এয়ারপর্ট হোটেলের কথা বলছ?
—ঘরের কাছে পার্ক ষ্টিট ছেড়ে?
—তোমর ভালো লাগে নি এয়ারপোর্ট হোটেল? পার্ক স্ট্রিটের চেয়ে ভালো লাগল না তোমার? কত স্পেশাল। কত পরিচ্ছন্ন। পার্ক স্ট্রিটে ঢুকলে তো মনে হয় খাঁচায় ঢুকলুম।
—আগে তো তোরাই লাফাতিস পার্ক স্ট্রিটের জন্যে।
এখনো লাফাব। আমি কি বলেছি নাকি যে পার্ক স্ট্রিটে খাব না কখনো? কমপারেটিভলি কোনটা বেটার সেটাই বলছিলুম।
—তোমরা একেবারে সব বুঝে গেছ এই বয়সে।
—তুমি এভাবে কথা বলছ কেন?
—কীভাবে বলব আবার?
—এতে রাগের কী আছে। কার উপর রাগ করছ তুমি। এটা তো একটা অ্যাকসিডেন্ট।
—আমাকে আর বকাস না তো মাথার যন্ত্রণা হাচ্ছে।
বৃষ্টি ধরার মুখে। সিটের উপর লম্বা হয়ে শুয়ে বাঁ দিকের জানলার কাচটা অনেকখানি নামিয়ে দেয় সুশান্ত। সঙ্গে সঙ্গে ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝলক, সামনেই ফুটপাত। ঘাড় ঘুরিয়ে দুদিকে যতটা দূর দেখা যেতে পারে, দেখে নেয়। না, সিগারেটের দোকান নেই একটাও। তাহলে এখন থাক। গাড়ি চলতে শুরু করলেই ধরব। সুশান্ত শোয়ানো শরীর গুটিয়ে আবার নিজের জায়গায়। জানলাটা খোলাই রাখে। একটু বাতাস ঢুকুক।
একটু পরেই জলের উপর সাঁতার কাটার শব্দ। দূরে বেশ কয়েকটা গাড়ির হর্ন। সুশান্ত শব্দ শুনেই বুঝতে পারে, ছেলে-ছোকরারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে জলে। গাড়ি ঠেলবে। ওরা জানে কী রকম বৃষ্টি হলে, কতগুলো গাড়ি আটকাবে। জলের পরিমাণ দেখে ওদের টাকার অঙ্কের ওঠানামা।
সুশান্তর বাঁদিকের জানলার কাছ দিয়ে যারা বকের ভঙ্গিতে জল ঠেলে ঠেলে এগিয়ে চলেছে দূরে, অর্থাৎ সামনের দিকে, আবার সিটের ওপরে শুয়ে জানলার কাছাকাছি মুখ এনে তাদেরই একজনকে ডাকে সে।
—এই যে ভাই, কোনো-ও-ও।
এক পলকের জন্যে জানলার ফ্রেমে আটকে যায় ভিজে আর ছেঁড়া গেঞ্জি পরা একটি রোগা কিশোরের অবয়ব।
—সিগারেট এনে দেবে ভাই এক প্যাকেট? তোমাকে আলাদা পয়সা দেব।
—এখন উসব হবে নি।
ঝটকা বেগে ছেলেটি জানলার ফ্রেম থেকে সরে যায়া সিগারেটহীনতার বিস্বাদ জিভ থেকে মাথায় চড়ে বসে যেন তখুনি। নিজেকে অন্যমনস্ক রাখার জন্যে সুশান্ত কথার ছল খোঁজে।
—তিতির, মিমি, সব তৈরি হও।
কথাটার মানে বুঝতে পারে নি কেউ। সবাই চমকে সুশান্তর দিকে। সুশান্ত কী দেখতে পেয়েছে একটা দুটো গাড়ি চলতে শুরু করেছে দূরের? সংঘমিত্রা কাত করে রাখা শরীরটাকে ইষৎ সোজা করে।
—ছেড়েছে?
—ছেড়েছে? ছাড়তে এখনো দু-ঘন্টা।
—তাহলে তৈরি হতে বললে কীসের জন্যে?
—গাড়ি ঠেলার জন্যে।
—কারা গাড়ি ঠেলবে? বুবাই আর মিমি? এই পচা জলে নেমে?
—তাতে কী হয়েছে? নিজেদের গাড়ি নিজেরা ঠেলবে, অসুবিধেটা কী?
—বুবাইয়ের সকাল হলে ইস্কুল। যদি জ্বর-জালা বাধিয়ে বসে, সামলাবে কে?
—কিছু হবে না। বেশি আতুপুতু করে রাখলেই বরং ব্যামো বাড়ে।
বুবাই প্রস্তুত। আঃ জলে নামতে পারলে দারুণ অ্যাডভেঞ্চার। —এখনই নামব বাবা?
—না, বুবাই, তুমি একদম পা ঠেকাবে না পচা জলে।
—পচাজল, পচাজল, করছ কেন। জলটা পচল কখন? এই তো পড়ল আকাশ থেকে।
—বুবাই বয়স্কের ভঙ্গিতে হাসে। মিমির চোখে ঝাঁঝালো বিরক্তি, মায়ের কথা বলার অনর্থকতায়। এক আঙুলের পালিশ করা নখ দিয়ে আরেক আঙুলের নখের কী যেন লেগে থাকা তুলতে তুলতে।
—গাড়ি বুঝি আমরা আগে ঠেলি নি কখনো? গতবারে পুজোয় দীঘা যাওয়ার সময়?
—সে আলাদা। সেটা ছিল ভাঙা এটা পচা জল। সাত রাজ্যের নোংরা ভাসছে সাপ খোপ উঠে আসতে পারে।
—তাহলে লেকটাউনের বাড়িতে ছিলে কী করো সেই ৭৮-এ?
সুকান্ত-র গলায় বেশ ভরাট জিজ্ঞাসা। কারণ অন্যমনস্কতার ঘোরে হিশেবে-কষে-রাখা সময়েই আগেই ধরিয়ে ফেলেছে সিগারেটটা।
—তখন তো তেইশ দিন কেটেছে পচা জলে। এক গলা পচা জল ডিঙিয়ে ওরা গেছে স্কুলে, আমি গেছি চাকরিতে।
—সে বাদ দাও। তখন তো আর উপায় ছিল না।
সুকান্ত বেশি কথা বলে সিগারেটের মৌতাতটাকে মাটি করে দিতে চায় না বলেই চুপ। তখন বাবার বদলে মেয়ে।
—তোমার না মা, সব কিছুকে বেশি বেশি করে ভাবা একটা বদভ্যেস।
—তুই থাম তো। তোকে আর অত ব্যাখ্যা করতে হবে না।
আর একটা বদভ্যেস হল, বাবা যা বলছে, তার উলটোটা বলা।
—চুপ কর মিমি, অত জ্ঞান দিতে হবে না তোমায়।
—জ্ঞান দিচ্ছি নাকি, যা দেখি তাই বলছি।
ব্লাডপ্রেসারের রুগী। হার্ট। হঠাৎ তাই মাথায় আগুন। মাথার আগুন দপদপিয়ে উঠতেই সংঘমিত্রার গলার স্বর সপ্তমে।
—কী দেখিস তুই? তুই-ই শুধু দেখিস আমাকে? আমি আর তোর কিছু দেখি না? বাপি বাপি করে বাবার মন ভিজিয়ে তুমি গোপনে কী করে চলেছ তা জানতে আমার বাকি নেই। আমাকে ঘাঁটাস না সকলের সব কথা বলি যদি, বুঝবি তোদের এই মা-র সইবার ক্ষমতা কতখানি। বুঝলি?
কথা শেষ করেই হাঁপানি বুকের আইটাই তোলপাড়। মিমি সে তোলপাড়কে থামতে দেয় না।
—কী দেখেছ বলেই ফেলো না বাপিও শুনুক।
—তুই তোর প্রাইভেট টিউটরের সঙ্গে কী করিস?
—আনকমন কিছুই করি না। অন্যায়ও করি না কিছু?
—তাহলে দরজা ভেজিয়ে রাখিস কেন?
—অমন করে চেঁচিয়ে কথা বলো না মা। চেঁচিয়ে কথা বললেই সব সত্যি হয়ে যায় না। দরজা ভেজাই একদিকে টিভি আরেক দিকে বুবাইয়ের পড়ার ঘরের চিৎকারের জন্যে।
—আর কিছু বুঝি চোখে পড়ে নি আমার?
—পড়লেও সেটা দোষের নয়। তুমি যা ভাবছ তার চেয়ে অনেক বেশি ইনটিমেট সম্পর্ক সৌরভদার সঙ্গে আমার।
—লজ্জা করে না তোর অমন গা ঢলাঢলি করতে?
—না। করে না। কারণ ওকেই তো বিয়ে করব।
বেশ কিছুক্ষণ মুখের হাঁ-টা বোজাতে পারে না সংঘমিত্রা। মাথার আগুন চোখে। চোখের কটকটে আগুনেও ঘাড়-বাঁকানো মিমির চামড়ায় ছ্যাঁকা পড়ছে না দেখে সুশান্তর দিকে ঘুরে—
—শুনছ? মেয়ের কথা শুনছ?
—হুঁ।
—কাকে বিয়ে করবেন সেটা উনি নিজেই স্থির করে ফেলেছেন।
—হ্যাঁ।
—হ্যাঁ মানে কী? বাবা-মা-র মতামত না নিয়েই নিজের গার্জেন হয়ে উঠবেন নিজে?
সংঘমিত্রা যেন শক্তিশেলের ঘা খাওয়া লক্ষ্মণ। মেয়ের কাছে তর্কে হেরে-যাওয়াটা সহ্য করতে না পেরে গোটা শরীরে অস্থির মোচড়। এতক্ষণ বসেছিলেন মেয়ের গা ছুঁয়ে। অমন অশুচি মেয়েকে ছুঁয়ে থাকা পাপ, অবিকল এইরকম মনোভাবে নিজের হৃষ্টপুষ্ট শরীরটা গুটিয়ে নেন একপাশে। মেয়েকে ছেড়ে তাঁর আক্রোশ এখন সুশান্তর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়।
—তুমি চুপ করে শুনে যাচ্ছ সব?
আর মাত্র একটা টান দিলেই শেষ হয়ে যাবে সিগারেট। সুশান্তর সমস্ত মনোযোগ তখন ওই শেষ টানের দিকে। যেন আজকের এই সমন্ত রকম বিশৃঙ্খলা বিপত্তির বিপরীতে এই শেষটানের সুখ-স্বাদ। হয়তো-বা এতসব ঝামেলা-ঝঞ্ঝাটের রণাঙ্গনে প্রতিরোধ-প্রতিরক্ষার শক্তি-সাহস-শৌর্যে নিজেকে অবিচলিতরূপে প্রস্তুত করার জন্যেই শেষটানটুকুক জীবনদায়ী কোনো মহৌষধের মতোই তার একান্ত প্রয়োজন। একেবারে। ফিলটারে পৌঁছে গেছে দেখে জানলার কাচের সরু ফাঁক দিয়ে সিগারেট গলিয়ে দেয় সে।
—কী গো, তোমার কানে ঢুকছে না বুঝি কিছু?
—সমস্যাটা কী? গাড়ির মধ্যে এখন এইসব বিষয় তোমাদের আলোচনার?
—আমি তো তুলি নি এত কথা।
—তাহলে কে তুলল?
—কে তুলল শোন নি?
—শুনেছি।
—তাহলে চুপ করে আছ কেন?
—বাড়ি তো আছে। সেখানে গিয়ে বলা যায় না এসব?
—তা বলে গাড়িতে বসে কেউ যদি আমাকে অপমান করে, গাড়িতে তা নিয়ে কথা বলা যাবে না?
—বড্ড বাজে তর্ক হয়ে যাচ্ছে। চুপ করো তো। তুমি যা বলবে, সব জানি আমি।
—জানো? তোমার মেয়ে তার প্রাইভেট টিউটরকে বিয়ে করবে ঠিক করে ফেলেছে, সেটা জানো?
—প্রাইভেট টিউটার কি বামুন-কায়েত চাঁড়ালের মতো আলাদা কোনো জাত নাকি? তুমি যা বোঝ না তা নিয়ে কথা বোলো না।
—না আমি কিছু বুঝি না। না বুঝে ঘাসে মুখ দিয়ে চলি। ঘাসে মুখ দিয়ে তোমাদের সংসারটাকে ধরে আছি।
—তুমি কি একা ধরে আছ নাকি? তোমাকে সাহায্য করার ঝি-চাকর-রাঁধুনি-টাদুনি কেউ কোথাও নেই বুঝি?
—তা থাকবে না কেন? সে না হয় দু-বছর হয়েছে। নতুন ফ্ল্যাটে উঠে আসার পর। তার আগে লেকটাউনের দেড়খানা ঘরে ছিলে যখন, কটা ঝি-চাকর রেখেছিলে তখন?
—সামর্থ্য ছিল না রাখতে পারি নি। তখন চাকরি করতাম। তোমাকে সুখে রাখতে পারি নি। এখন বাবসা করছি। পারছি। এই তো সোজা কথা। মিটে গেল।
—না মেটে নি। চাকরির সব টাকা যদি সংসারে ঢালতে, তাহাল আর অকালে উনোনে-ধোঁয়ায় চুল পাকত না আমার।
—তাহলে কোথায় ঢেলেছি? রেসের মাঠে?
—আর একটা মেয়েমানুষের পিছনে। তোমার ছেলেমেয়েরা জানে না সেসব। আজ জানুক।
—তুমি কি ভাবছ, ছেলেমেয়েদের সামনে এসব বললে লজ্জায় কুঁচড়ে কেঁচো হয়ে যাব আমি?
আমার নিজেরই ক্ষমতা আছে ওদের কাছে সমস্তটা বলার। বলতে গিয়েও বলি নি, কারণ ওরা সবটা বুঝতে পারবে না। আজকের কমিউনিস্ট পার্টি দেখে এরা বুঝতেই পারবে না, আমাদের ছাত্রজীবনের কমিউনিস্ট আন্দোলনের যোগ দেওয়ার পিছনে ছিল ঠিক কী ধরণের অগ্নিপরীক্ষা। যখন প্রেসিডেন্সি জেলে, বাবা মারা গেলেন দেশের বাড়িত, মেদনীপুরে। জেল থেকে বেরোবার পর জানতাম লেখাপড়ার এইখানে ইতি। বাড়ি থেকে টাকা না এলে মেসে থাকা যাবে না। জেলে আমাদের দীক্ষাদাতা ছিলেন হীরেনদা। জেল থেকে বেরোবার পর সেই হীরেনদাই জুটিয়ে দিলেন একটা টিউশনি। শুধু টিউশনি নয়, যে বাড়িতে টিউশনি, সেখানেই এক চিলতে ঘরে থাকা-খাওয়ার বাবস্থা। একটা কমিউনিস্ট পরিবার। নিম্ন মধ্যবিত্ত। নিজেরাই এক হাঁটু র্দুদশায়। তবু আমাকে এম এ পর্যন্ত পড়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিলেন ওঁরা। এম এ পাশ করেই ওখান থেকে চলে আসি। তার কিছুদিন পরেই শুনলাম, রজনীবাবু মারা গেছেন। গোটা সংসারের দায়িত্ব বড়মেয়ে রমলাদির উপর। আমি যে সামান্যতম সাহায্য করব সে ক্ষমতা নেই। টিউশনির টাকায় নিজের খরচটা চলে কোনোমতে। চাকরি পেলাম যখন, তখন থেকেই প্রতিজ্ঞা ওদের কাছে ঋণের বোঝা শোধ করব যতটা পারি। সোজাসুজি টাকা দিতে গোল রমলাদি খেপে যেতেন। তাই কিনে নিয়ে যেতাম এটা সেটা। তারপর তোমার সঙ্গে বিয়ে। আমাদের বিয়ের ছ-মাসও পেরোয় নি রমলাদি বাস থেকে পড়ে গিয়ে হাঁটু ভেঙে বেডরিড্ন। বেডরিড্ন বলেই রমলাদি টের পান নি, যখন যা ওষুধ লাগত তার অনেকখানি খরচ জুগিয়ে গেছি গোপনে। তোমার কাছে গোপন করি নি কিছুই। এমনকী যাতে তুমি সত্যিকারের বাস্তব চেহারাটা বুঝতে পার, বিছানায় পড়ে থাকা রমলাদিকে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম একদিন। তা সত্ত্বেও তোমার মাথায় গেঁথে বসে গেছে ভিন্ন এক ধারণা। মেয়েমানুষের পিছনে টাকা ঢালা। তোমার দোষ নেই। এখনকার জল-হাওয়া অন্যরকম। এমনই অন্যরকম যে স্বাধীনতা পাওয়ার আগের রশিদ আলি দিবসের কথা বাদ দাও, এই তো সেদিনের ট্রাম আন্দোলন, তখনকার ত্যাগ কিংবা সংগ্রামের আন্তরিক কাহিনী এখনকার জেনারেশনের কাছে মহাভারতের যুগের মতো বাসি, পচা টকচা দইয়ের মতো জিভে ছোঁয়ানোর অযোগ্য। রমলাদি মেয়েমানুষ ঠিকই, কিন্তু ওইরকম কিছু মেয়েমানুষ সেই দীনেশের বউদির আমল থেকে বাংলার ঘরে ঘরে ছিল বলেই স্বাধীনতা আন্দোলনের আগুন জ্বালাতে পেরেছিল আমাদের দেশ।
একটা সিগারেট থাকলে ভালো হত। সুশান্তর মধ্যে কথা বলার আবেগ বর্ষার মেঘের মতো পাকিয়ে উঠছে। এই ভালো হয়েছে। বাড়িতে, বাড়ির উজ্জ্বল আলোর প্রখরতার নীচে এভাবে কথা বলতে পারত না সে। বেশ বলা যেতে পারছে এই দুর্যোগের মধ্যে গেঁথে গিয়ে। একটা সিগারেট থাকলে হয়তো আরো গুছিয়, অন্তঃশীল অনুভূতির তলদেশ থেকে তুলে এনে, নিজাক উন্মুক্ত করে দিত পারত আরো।
—মিমি?
—বাপি?
—দীনেশের নাম শুনেছ কখনো? জান, দীনেশ বলতে কাকে বোঝালাম?
—মনে পড়ছে না।
—বুবাই, তুমি বিবাদী বাগের নাম শোনো নি?
—হ্যাঁ, ওই তো ডালহৌসি স্কোয়ারে।
—কী মানে কথাটার?
—একটা জায়গার নাম।
—তোমাদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল শেখায় নি বুঝি এসব?
—কোনটা?
—বিবাদী এই তিনটে অক্ষরে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা যুদ্ধের কোন তিনজন সৈনিকের বা শহিদের নাম গাঁথা?
—কাদের বাপি?
—তোমরা কোনোদিনই এদের জীবনী পড়বে না জানি। তবু নামটা শুনে রাখ। বিনয় বাদল দীনেশ। বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত, দীনেশ গুপ্ত।
—ও, তুমি ওই দীনেশের কথা বলছিলে?
—মিমির মিয়োনো গলা এতক্ষণে তাজা।
—প্রথমে বুঝতে পারি নি। আমি জানি। সৌরভদার মুখে শুনেছি। রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণ তো?
—সৌরভ বলেছে তোমাকে? সৌরভের বয়সী ছেলেরা এসব নিয়ে আলোচনা করে এখনো? সৌরভ অবশ্য করবেই। রমলাদির ছোট ভাই বলে নয়, ওর বাবা এদেশের গোড়ার যুগের কমিউনিস্ট কর্মী। ট্রেড ইউনিয়নিস্ট। রমলাদি মারা গেছেন। সৌরভকে তোর প্রাইভেট টিউঢর করে দিয়ে আমি প্রায়শ্চিত্ত করছি। দু-ধরণের প্রায়শ্চিত্ত। এক, রমলাদিদের পরিবারের কাছে আমার অপরিশোধ্য ঋণের দিক থেকে, দুই, আমার ব্যবসা আমাকে যে অলমোস্ট আনঅ্যান্টিসিপেটেড আফ্লুয়েন্সের দিকে টেনে চলেছে, তারও।
তিন
কাছেদূরে হঠাৎ অজস্র হর্ন। ভূমিকম্পের সময়ের শঙ্খধ্বনির মতোই যেন। সুশান্ত জানে, তার গাড়ি স্টার্ট নেবে না। সামনের গাড়িটা মারুতি। মারুতির ডিসট্রিবিউটার অনেক উপরে। সেখানে জল ঢোকে নি। তারটায় অবধারিত ঢুকেছে। তবু, যদি দৈবক্রমে না ঢুকে থাকে, ব্যস্ত হয়ে চাবি ঘোরায়। না। স্টার্ট নেয় না। গাড়ির হর্ন। দূরের দূরের গাড়িতেই বেশি। তার মানে জল নেমেছে। অথবা কোনো রাস্তা-আটকানো খোঁড়া গাড়িকে সরানো গেছে এতক্ষণে।
এক ঝটকায় ডান দিকের দরজা খুলে জলে নেমে পড়ে সুশান্ত। নামবার পরে খেয়াল হয়, জুতো মোজা খুলে, প্যান্ট গুটিয়ে নামা উচিত ছিল তার। নেমে দেখল, প্যান্ট গুটিয়ে তার মতোই নেমে পড়েছে অনেকে।
—এই যে, এ্যাই যে, ও ভাই, এদিকে, এখানে, শুনছ ও ভাই—
যারা গাড়ি ঠেলার জন্যে এদিকে-ওদিকে ব্যস্ত, তাদের উপলক্ষ করে শূন্যে নিজের ডাকাডাকিটা ছুঁড়ে দেয় সুশান্ত। ডাকতে ডাকতে অনেকটা দূরে চলে যায় সে। বুবাই জানলার ধারে। জানলাটা পুরো খুলে দিয়ে গলা বাড়িয়ে বাবাকে দেখছিল। কিছুক্ষণ পরে আর দেখতে পায় না।
সুশান্তর নেমে যাওয়ার পর সংঘমিত্রার মাথায় আগুন নিভতে থাকে। মিনিট পাচেক পরেও তার গলার সাড়া বা তার ফিরে-না-আসায় সংঘমিত্রার ভিতরে উদ্বেগের কামড়। যে মানুষ নিজেকে নিয়ে এত কথা বলে নি আগে কখনো, বলতে বলতে বুকের খানা-খন্দ ঝাঁপিয়ে ওঠা কোনো অভিমানের জলস্রোত তাকে অন্য কোথাও ভাসিয়ে নিয়ে যায় নি তো?
সংঘমিত্রা তিতিরের দিকে ঘুরে
—অ তিতির—
—একটা গাড়িতে আবার কুকুর।
—অ তিতির—
—বাবার মতোই জুতোসুদ্ধ নেমে পড়েছে আরেকজন।
—অ তিতির—
—ক্যিই?
—তোর বাবা কোথায় গেল? একবার দেখবি নাকি?
—বাঃ, একটু আগে তো তুমিই বলছিলে পচা জল? নামাল জ্বর-জ্বালা হবে।
—সে তখন বলেছি বলেছি, মাথা দপদপ করছিল।
—বাবা কি ছেলেমানুষ নাকি, যে হারিয়ে যাবে? লোক ডাকতে গেছে।
—তো ফিরছে না কেন। ওই দ্যাখ। সামনের গাড়ি এগোচ্ছে একটু একটু।
—লোক নিয়ে ফিরাবে। ঠেলতে হবে তো।
—কেন, এমনি চলবে না?
দেখলে না, বাবা চাবি ঘোরাল। ভোঁভা।
—তাহাল ঠেলে ঠেলে কি ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনে নিয়ে যাবে নাকি?
—ওঃ মা কী যে আনাড়ি তুমি। ঠেলে জল থেকে তুলে দেবে। তারপর এঞ্জিন গরম করতে হবে জল বের করে। তারপর চলবে।
—সে তো অনেক সময়…
—এঞ্জিনে জল ঢুকে গেলে…
তিতিরের কথার মাঝখানেই বাঁদিকের জানলার কাছে সুশান্ত। পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে। একটু পরে একটা সাইকেল রিকশা নিয়ে আধবুড়ো একজন।
—তোমরা এই রিকশায় বাড়ি চাল যাও।
—সে কী? আমরা যাব। তুমি?
—আমি গাড়ি সাইড করে তারপর যা করার করে ফিরছি।
রিলাওয়লার চেহারা দেখে ভয় পায় সংঘমিত্রা। নিজের শরীরের ওজন তার জানা। সে ছাড়াও বুবাই আর মিমি। এই রকম সিড়িঙ্গে চেহারার বুড়ো বইতে পারবে নাকি জল ঠেলে ঠেলে। কোনো গর্তে পড়ে ভেঙে যায় যদি রিকশাটা? এগুলো যথেষ্ট বড় কারণ তার ভয় পাওয়ার। কিন্তু রিকশায় ওঠার অনিচ্ছা ঘোষণার সবচেয়ে বড় কারণ অন্য। মিমির সাঙ্গ গায়ে গা লাগিয়ে সে যোত পারবে না আজ। পরে হয়তো পারবে। নিজের মেয়ের গর্বিত ভঙ্গির বোলচাল হজম করে নিজের ভিতরে অপমানবোধ আর হেরে-যাওয়ার গ্নানি ধুয়ে-মুছে সাফ করতে একটা দুটো রাত লাগবেই তার।
—তুমি একা পড়ে থাকবে, আমি কী করে যাব?
—আমার সময় লাগবে। রাস্তায় গাড়ি ফেলে রেখে তো আর ফিরতে পারব না।
—সবাই একসঙ্গেই ফিরব।
—তা কখনো হয় নাকি? আমার অনেক সময় লাগবে। ভিজে এঞ্জিন গরম হবে, তারপর। ঘন্টাদুয়েক তো লাগবেই।
—দুঘন্টা পরেই ফিরব তাহলে।
—দুঘন্টাতেই যে স্টার্ট নেবে তার কি মানে আছে নাকি?
—তুমি কি তাহলে সারারাত জলে পড়ে থাকবে নাকি?
—থাকতে হলে, থাকতে হবে। তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের একদিন ভুগতে হলে, না ভুগে উপায় কী? শুধু তো আমি ভুগব না। বাইরে বেরোলেই দেখতে পাবে। জখম হয়েছে কতগুলো গাড়ি। আর এরাও এই তালে দর হাঁকাতে শুরু করেছে আকাশ ছোঁয়া। এখান থেকে ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনস যাবে, চাইছে কত জান?
—কত?
—আশি টাকা।
—ওমা, আশি টাকা? এইটকুনি যেতে?
তাও হাতে-পায়ে ধরে এনেছি।
তিতির গলা বাড়িয়ে দেয় কথার মাঝখানে।
দেখছ তো, মারুতিগুলো চলছে। আমি তো মারুতিই কিনতে বলেছিলাম তোমাকে। তুমি ইচ্ছে করে কিনলে না।
ইচ্ছে করে কিনলাম না মানে?
—আমি বলেছি বলে কিনলে না। দিদি বললে, কিনতে।
একা একা ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় পড়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল সুশান্তর। রমলাদির কথা বলতে গিয়ে তার জীবনের অতীতকালটা সিনেমা হয়ে উঠছিল স্মৃতির মধ্যে। আরেক বার সে ফিরে যেতে চায় সেই পুরোনো মানচিত্রে। কারখানা, ব্যবসা, একস্পোর্ট যে সুনিশ্চিত সার্থকতার ধাপ ধাপ সিঁড়িগুলোকে নির্মাণ করে চলেছে একের পর এক। কবেকার ফিকে-হয়ে যাওয়া অতীতকাল সেই সব নক্ষত্রগামিতাকে তুচ্ছ করে দিয়ে হঠাৎ গণনাট্যের কোরাস গানের মতো, ইউনিভার্সিটির গেটের পিকেটিং-এর সমুদ্রে মাতাল নৌকো হয়ে ভেসে চলার মতো উজ্জ্বল-উজ্জ্বলতর হয়ে উঠতে চেয়ে তার অস্তিত্বের কাছে প্রার্থনা করে চলেছে গভীর একাকিত্বের। বুবাইয়ের কথাবার্তার এঁচড়ে-পাকামি চরিত্রটা তার কাছে নতুন কোনো আবিষ্কার নয়। হয়তো সে, তার ইচ্ছে-আকাঙ্ক্ষার আগোচরেই, কোনো না কোনোভাবে, ডিমে তা দেওয়ার মতো, প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে ওদের এইভাবেই নষ্ট হয়ে যেতে। নষ্ট কিনা তাই-বা কে জানে। এমনও তো হতে পারে যে, আগামী কালের পৃথিবীর জন্যে বুবাইয়ের মতো শিকড়হীন শ্যাওলারাই সবচেয়ে বেশি উপযোগী? হতে পারে, হতে পারেও যদি-বা, তবুও সুশান্তর মনে হল তার অতীতমুখী স্মৃতি-অভিযানের তীব্রতর অভিপ্রায়কে বুবাইয়ের বাচালতাই যেন নোঙরে টেনে রাখতে চাইছে সাম্প্রতিকতার ডাঙায়।
সুশান্ত সচরাচর রাগে না। ছাত্রজীবনে রেগে যেত। অতি অল্পেই বারুদে আগুন। এখন কষ্ট করে শিখতে হয়েছে না-রাগার সুস্মিত শিষ্টাচার। কারণ সে একটা কারখানার মালিক। কারখানায় ইউনিয়ন। ছোট কারখানা বলে ছোট ইউনিয়ন। কিন্তু ছোট ইউনিয়ন বলে দাবি-দাওয়ার বহর ছোট মাপের নয়।
সচরাচর না-রাগা সুশান্ত এই মুহর্তে হঠাৎ ফেটে পড়ল রাগে। প্রায় স্থান কাল ভুলে গিয়ে তার গলায় এক আদিম চিৎকার।
—য়ু আর বিকামিং এ স্টুপিড, ডে বাই ডে।
সুশান্তর চিৎকারের ধাক্কা বুড়ো রিকশাওয়ালার গায়েও আছড়ে পড়ে যেন খানিকটা। সুশান্ত থামতেই।
—আপনারা যাবেন তো চলুন। না হলে ছেড়ে দিন আমাকে। অনেক খদ্দের দাঁড়িয়ে আছে।
সুশান্তের ভিতরে রাগের ইঞ্জিনটা গরগরিয়ে স্টার্ট নিয়েএ। থামানো অসম্ভব। তাই রিকশাওয়ালাকেও—
—না, কেউ যাবে না, তুমি যাও।
রিকশাওয়ালা উলটো দিকে ঘোরার জন্যে বেঁকেছে মাত্র, তখনই আবার আগের মতোই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি।
সুশান্ত লাফিয়ে গাড়িতে। খোলা জানলাগুলো বন্ধ হতে থাকে ঝটপট।
অসামান্য