প্রথম জীবনে এক বোন ছাড়া পারিবারিক স্নেহ থেকে তিনি প্রায় বঞ্চিতই থেকেছেন। স্নেহান্ধ পিতা অযোগ্য বড় ছেলে দাদাকে সিংহাসনে বসাবার উদ্যমে ছোটবেলা থেকেই আওরঙ্গজেবকে দিল্লি/আগরার রাজনীতি, সম্পদ থেকে দূরে রেখেছেন, বারবার তাঁকে চরম পরীক্ষায় ফেলেছেন — নানান ঘটনায় তার নাম ছড়িয়েছে, তিনি তাঁর সময়ের বিখ্যাত হয়েছেন দক্ষিণ এশিয়ার বাইরের অঞ্চলেও।
উত্তীর্ণ তিনি সিংহাসনের লড়াইতে জিতে সম্রাট হয়ে ১৬৮১-র পর জীবিত বা মৃত উত্তরভারত ফেরেন নি, ২৫ বছর ধরে তিনি দক্ষিণ ভারতে তাঁবু শহরেই জীবন কাটিয়েছেন। অসুস্থ অবস্থায়ও যুদ্ধ করেছেন। আওরঙ্গজেব তারমত করে খুবই কঠিন বিনোদনহীন জীবন যাপন করেছেন, আলস্যকে প্রশ্রয় দেন নি। তাঁর জীবনে গান ছিল কিনা এটা নিয়ে বর্তমানে আর খুব বেশি বিতর্ক নেই। মানুচি আর তাঁকে নির্ভর করা কাফি খান আওরঙ্গজেবের রাজত্বে সঙ্গীত বর্জন তত্ত্বের মূল প্রবক্তা। মানুচি এবং আওরঙ্গজেবের রাজত্বের নানান উদাহরণে এই ধারণাটি উড়িয়ে দিচ্ছেন ক্যাথারিন বাটলার। তাঁকে উৎসর্গ করে বহু গান লিখেছেন বহু সঙ্গীতজ্ঞ, তার উদাহরণ দিচ্ছেন ক্যাথারিন বাটলার।
বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত, ইতিহাসের প্রায় সব ক’টা আঙ্গিকে নিন্দিত এই মানুষটার দৈনন্দিন জীবন কেমন ছিল, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের কৌতুহল থাকাই স্বাভাবিক। এই বিষয়টা আমি আলোচনা করেছি যদুনাথ সরকারের লেখা এনেকডোটস অন আওরঙ্গজেব এন্ড আদার এসেজ অনুবাদ আওরঙ্গজেবের উপাখ্যানে।

আওরঙ্গজেবের সারা দিন
৫ ঘুম থেকে ওঠা; ভোরের উপাসনা; ধার্মিক পড়াশোনা
৭.৩০ দেওয়ানি খাসে বিচারসভা
৮.৩০ ঝরোখা দর্শন; প্রার্থীদের অভাব অভিযোগের বিচার এবং হাতির যুদ্ধ দেখা
৯.১৫ দেওয়ানি খাসে প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠক
১১ দেওয়ানি আমে প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠক
১১.৫০ জেনানা মহলে প্রবেশ এবং দুপুরের বিশ্রাম
২ উপাসনা
২.৩০ দেওয়ানি খাসে প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠক; পড়াশোনা; রাষ্ট্রের নানা কাজ; উপাসনা; আবার রাষ্ট্রের কাজ
৫.৩০ দেওয়ানি খাসে আলাপচারিতা; উপাসনা
৬.৩০ দেওয়ানি খাসে বিনোদন
৭.৪০ দরবার বন্ধ; উপাসনা
৮ জেনানা; নানান ধর্মীয় আলাপ আলোচনা; পড়াশোনা; নিদ্রা।
সকালের উপাসনা
ভোরের আগে বিছানা ছেড়ে প্রাতঃকৃত্য সেরে সম্রাট জেনানায় দেওয়ানিখাসের মসজিদে উপাসনা করতেন। বেশ কিছুক্ষণ কোরান পাঠ করে ৭.৩০ নাগাদ প্রাতঃরাশ সারা।
পূর্ব দেশিয় রাজারা মনে করতেন তাঁদের প্রাথমিক কর্তব্য ছিল প্রজাদের বিচার দেওয়া, এই প্রথা আওরঙ্গজেব আজীবন মেনে চলেছেন; বিচার দেওয়া তার জীবনের অন্যতম ব্রত ছিল। সকালেই ব্যক্তিগত গৃহের কাছে খাইলিয়তগাহের সিঙ্ঘাসনে বিশ্বাসী আমলাদের নিয়ে বিচারসভা বসাতেন। কাজি দপ্তরের দারোগা বিভিন্ন সুবা, প্রদেশ থেকে আসা বিচারপ্রার্থী মানুষকে তাঁর সামনে উপস্থিত করতেন। তাদের আবেদনগুলো সম্রাটের সামনে তুলে ধরা হত। সম্রাট বিচারপ্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে সত্য খুঁজতেন এবং শরিয়ত আইন অনুযায়ী রায় দিতেন। সাধারণ গরীব বিচারপ্রার্থীকে খাজাঞ্চি থেকে রাহা খরচ দেওয়া হত।

দর্শন
বিচার দেওয়ার কাজ শেষ হলে নিজের ঘরের সঙ্গে লাগোয়া জানলার কাছে পৌঁছে যমুনার তীরে অপেক্ষারত প্রজাদের দর্শন দিতেন। এই পর্বের নাম ‘ঝরোখা দর্শন’। মাঝেমধ্যে এই কাজের সঙ্গে জুড়ে থাকত বিভিন্ন আমীরের সেনাবাহিনীকে সম্রাটের সামনে কুচ করানো। তাছাড়াও যখন তিনি শুক্রবারের যমুনা মসজিদে জন উপাসনার জন্যে যেতেন, সেখানেও সেনাবাহিনীকে প্যারেড করানো হত। শাহজাহান যেমন হাতির লড়াই দেখতে ভালবাসতেন, নতুন হাতির প্রশিক্ষণও দেখতে ভাল বাসতেন, আওরঙ্গজেব বাবার বিনোদনের সব অভ্যেস ত্যাগ করেন নি।
আমদরবার
৯-১৫ নাগাদ তিনি দেওয়ানিআমে প্রবেশ করতেন। শাহজাহানের আমদরবার চালানোর রুটিন অনুসরণ করতেন আওরঙ্গজেব। দরবার প্রায় দুঘন্টা চলত।
খাসদরবার
দুপুরের কিছু আগেই হাতেগোনা কয়েকজন বিশ্বস্তকে নিয়ে বসত দেওয়ানিখাস দরবার। এখানে প্রবেশাধিকার ছিল মাত্র কয়েকজন উচ্চপদস্থ আমলা, করণিক, ভৃত্য, নিশানবাহক, নজরদার বাহিনী (খাসচৌকি), কিছু দাস আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় মানুষজনের। শাহজাহান যে ধরণের প্রথা তৈরি করে গিয়েছিলেন খাস দরবার আয়োজনের, আওরঙ্গজেব সে প্রথা ভেঙে বেরোন নি। প্রধান উজিরএর প্রস্তাব অনুযায়ী বিভিন্ন সুবা অথবা প্রদেশের সুবাদার ইত্যাদির পাঠানো নানান প্রস্তাব, আবেদন ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হত, কেন্দ্রিয় সরকারের নির্দেশও বিভিন্ন এলাকার প্রশাসনে পাঠানো হত। সম্রাটের নির্দেশ আলাদা করে মুন্সিরা লিখে নিতেন, পরে সেটি ফরমানের আকার দিয়ে সম্রাটের সামনে নতুন করে পেশ করা হত স্বাক্ষর আর সিলমোহরের জন্যে। কখনো সম্রাট চিঠির শুরুরটা নিজের হাতে লিখতেন হয় প্রাপককে বিষয়ের গুরুত্ব বোঝাতে, নয়ত সম্মান জানাতে অথবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার দ্রুততার ভাবনা জানাতে অথবা যে কোনও রকম দ্বিধা ঝেড়ে ফেলার বার্তা দিতে।
এবারে দ্বিপ্রহরের খাওয়া আর বিশ্রাম।
উপাসনা
দুপুরে ২টোর দিকের উপাসনার আগে তিনি প্রাসাদের মসজিদে জপমালা নিয়ে সর্বশক্তিমানের নাম জপ করতেন। এটা যৌথ উপাসনা ছিল। ভাগ্যবান কিছু কিছু মানুষ উলেমা, সৈয়দ, শেখ, ফকির, সম্রাটের কাছেরজন আর খাওয়াসরা তাঁর সঙ্গে নামকীর্তনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন।
উপাসনা শেষে তিনি আবার খাস দরবারে যেতেন। এটা জেনানা মহল এবং দেওয়ানিখাসের মধ্যের এলাকা। এর নাম ব্যক্তিগত আলাপচারিতার ঘর বা গোসলখানা। এখানে ধর্মকর্ম বিষয়ে আলোচনা, কোরান পড়া, নকল করা, আইনি ব্যবস্থা সংকলনের কাজ দেখাশোনা করা ইত্যাদি চলত। উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে তিনি নানান সন্তের জীবন ও বানী পড়ে শোনাতেন। দরবারের শেষের দিকে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক কাজকর্মও সারা হত। এবারে জেনানায় যেতেন মহিলামহলের নানা দানধ্যানের কাজকর্ম দেখাশোনা করতে।
৪টের দিকে উপাসনা আয়জিত হত দেওয়ানি খাসের কাছের মসজিদে। বাকি কিছুটা সময় তিনি প্রশাসনিক কাজে ব্যয় করতেন।
সন্ধ্যের অভিবাদন গ্রহণ এবং উপাসনা
সূর্যডোবার আধঘন্টাটাক আগে আবার তিনি দেওয়ানি খাসে যেতেন বৈঠকের জন্যে। কিছু সময় সিংহাসনে বসতেন। টুকটাক কাজ সারতেন। দরবার শেষ হয়ে আসত। উপস্থিত মানুষেরা তাকে সমবেত অভিবাদন জানাতেন। যেসব অভিজাতর রাতে পাহারার কাজ পড়ত তারা রক্ষী বাহিনী নিয়ে দল বেঁধে উপস্থিত হতেন এবং দিনের পাহারাদারেরা চলে যাওয়ার উপক্রম করতেন। এই মুহূর্তে দুদল সিংহাসনের দুপাশে দাঁড়িয়ে সম্রাটকে সাম্রাজ্যের নিশান গরুর লেজ আর গোলক হাতে নিয়ে অভিবাদন জানাত। বক্সী সামনে দাঁড়িয়ে প্রথম অভিবাদন করতেন, তারপরে পিছনে দাঁড়ানোরা। সূর্য ডুবছে আর মদজিদ থেকে মুয়াজ্জিনদের আজানের তীব্রস্বরে ভেসে আসছে আল্লা হু আকবর! সমগ্র প্রাসাদ ছেড়ে যমুনার তীর পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে আজানের ধ্বনি।

দেওয়ানিখাসে বিনোদন
আজান শেষ হলে সিংহাসন থেকে উঠে সম্রাট দেওয়ানি খাসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। প্রাসাদ জুড়ে জ্বলে উঠছে হাজারো মোমবাতি প্রদীপ। সম্রাট দেওয়ানিখাসে সিংহাসনে উপবিষ্ট হচ্ছেন, প্রধান উজির আসছেন, রাজস্ব সমীক্ষা জানাচ্ছেন, নির্দেশ নিচ্ছেন। একই সঙ্গে অন্যান্য সরকারি কাজকর্মও চলছে। আওরঙ্গজেব ১১তম বছর থেকে দরবারে গান বাজনা বন্ধ করেছিলেন। গানবাজনার বদলে প্রশাসনিক কাজকর্ম চলতে থাকে। ৮টার দিকে উপাসনার সময় হলে সম্রাট পর্দা ফেলেদিলে, দরবার সেদিনের মত বন্ধ হল।
পাশের মসজিদে সম্রাট খাওয়াসি আর খুবই কাছের মানুষ নিয়ে উপাসনায় বসতেন। শেষ হলে জেনানায় চলে যেতেন। সেখানে আবার নানান ধর্মীয় কাজকর্ম সমাধা করতেন। শেষের রাতের খাবার আর ঘুম।
সপ্তাহে তিনদন দিনপঞ্জিকা কিছুটা পাল্টাত। শুক্রবার ছুটির দিন। বিচার সভার ছুটি।বুধবার শাহজাহানের মত দরবার বন্ধ করে বিচারসভা বসত ঝরোখা দর্শনের পর থেকে। দরবারে কাজি, মুফতি, আইনদপ্তরের আমলা, ধর্মতাত্ত্বিক উলেমা, কোতোয়ালির শান্তিরক্ষক (পুলিশ) ইত্যাদি উপস্থিত থাকতেন। তিনি বিচারসভায় পিতার দেখানো প্রথা, পথ অনুসরণ করতেন। বৃহস্পতিবার দরিবারের অর্ধদিবস ছুটি। দুপুর অবদি একই পঞ্জিকা অনুসৃত হত। দুপুরের পরের ঘটনাগুলো যেমন রাতে দেওয়ানিখাসের বৈঠকে যে সব কাজকর্ম হত সেগুলো আর ঘটত না।
দরবারি ঐতিহাসিকদের (আওরঙ্গজেবনামা) বক্তব্য তিনি রাতে তিন ঘন্টা ঘুমোতেন। আওরঙ্গজেব খুবই শ্রমসাধ্য জীবনযাপন করতেন। অনেকেই বলেন তার জীবনে কোনও সাংগীতিক বৈচিত্রের স্থান ছিল না — যদিও তার সময়ের নানান নথি উলত কথা বলে। যদুনাথ সরকার আওরঙ্গজেবকে গোঁড়া ইসলামপন্থী হিসেবে দেখিয়েছেন, কিন্তু সাম্প্রতিককালের ইতিহাস তার দৃষ্টিভঙ্গী সমর্থন করে না।
সূত্র : যদুনাথ সরকার, এনেকডোটস অন আওরঙ্গজেব এন্ড আদার এসেজ, অনুবাদ, আওরঙ্গজেবের উপাখ্যান বিশ্বেন্দু নন্দ ক্যাথরিন বাটলার, ডিড আওরঙ্গজেন ব্যান মিউজিক?