ইওরোপিয়দের সঙ্গে মীর জুমলার সম্পর্ক (১৬৬০-৬৩)
ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় মীর জুমলা চতুরভাবে সুবিধাবাদ আর চাপে রাখার নীতির মিলমিশ ঘটয়েছিলেন। জাহাজ কাণ্ড ব্যবহার করে তিনি চাপ দিয়ে আরাকানে পালিয়ে যাওয়া সুজার বিরুদ্ধে চরম পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য করেন। মীর জুমলার জাহাজ সমস্যা সমাধান করতে মছলিপত্তনমের কুঠিয়ালদের সম্মেলনে যৌথ সিদ্ধান্ত সুরাটের কুঠিয়ালদেরও বিরক্তির কারন হয়েছিল, মীর জুমলাও এই সিদ্ধান্তে খুশি হন নি। মীর জুমলার ২৩,০০০ প্যাগোডা দাবি ব্রিটিশদের অত্যধিক মনে হয়েছিল, একই সঙ্গে তিনি যে বকেয়া ঋণের ৩২,০০০ প্যাগোডা চেয়েছিলেন সেটাও কোম্পানি মেনে নেয় নি। ১৬৬০-এর মাঝামাঝি সময়ে অসন্তুষ্ট সুবাদার ব্রিটিশদের কাশিমবাজার কুঠি এবং বঙ্গোপসাগর এলাকায় তাদের সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ করে ত্রেভিসাকে সমাধান খোঁজার জন্যে তার সঙ্গে ঢাকায় বৈঠক করতে নির্দেশ দেন। অগস্ট মাসে ছোট বজরা করে হুগলী থেকে ত্রেভিসা ঢাকার পথে রওনা হন। আগস্টের শেষের দিকে মাদ্রাজের কুঠিয়ালেরা হুগলী কুঠিয়ালদের মীর জুমলার চাহিদা পূরণ করার এবং সুজাকে কিভাবে ফেরত আনা যায় তারও ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেয়। ত্রেভিসার সফল দৌত্যে নবাবের গুদামে পড়ে থাকা পাটনার ১৫,০০০ মণ সোরা উদ্ধার হয়। সুজাকে আরাকান থেকে ধরে আনতে মীর জুমলা ব্রিটিশ আর ডাচদের থেকে সাহায্য চাইলেন।
আওরঙ্গজেবের উদ্বেগ বুঝে ২৭ অক্টোবর ১৬৬০-এ ডাচ প্রধান কুঠিয়াল ম্যাথায়াস ভ্যান ডেন ব্রোককে তিনি জানালেন আরাকান থেকে সুজাকে ধরে প্রথমে হুগলী বন্দরে আনবেন। ডাচ জাহাজ করে পারস্য বা মোকায় সুজা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা রুখতে হবে। এই কাজে ডাচেরা সাহায্য করলে ব্রিটিশদের থেকেও বেশি ব্যবসার সুযোগ সুবিধে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
সামরিক কারণে মীর জুমলা ব্রিটিশ, ডাচ এবং পর্তুগিজ জাহাজ ব্যবহার করেছেন। ব্রিটিশ এজেন্ট ত্রেভিসা যে বজরায় করে ঢাকায় এসেছিলেন, তার ইওরোপিয় নাবিকদের তিনি তার বাহিনীতে নিয়োগ করেন। যুদ্ধ জাহাজ তৈরিতে ব্রিটিশেরা ডাচেদের সাহায্য নেয়। ব্রিটিশদের থেকে পালিয়ে আসা জনৈক ক্যাপ্টেন জন ডুরসনের নেতৃত্বে এক নাবিক বাহিনী হুগলীতে তৈরি ডাচ গ্যালিওট জাহাজকে ঢাকায় নিয়ে যায় ১৬৬১-র মে মাসে। মীর জুমলা জনৈক ব্রিটিশ টমাস প্রাটকে যুদ্ধ জাহাজ এবং নদীতে লড়ায়ের উপযোগী গোলাগুলি বানানোর জন্য নিয়োগ করেন। কিছু রুশ [Muscovites] বন্দুকবাজ মীর জুমলার অসম আভিযানে অংশ নিয়েছিল।
মীর জুমলার জীবদ্দশায় জাহাজ কাণ্ডর সমাধান ঘটে নি। তাঁর মছলিপত্তনমের কর্মী টাপাটাপার কাছে জাহাজ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্রিটিশেরা দিয়েছিল। ১৬৬২-র কেড্ডা থেকে মালাক্কায় যাওয়ার সময় বিপুল ঝড়ের সামনে পড়ে সেটি প্রায় কর্মক্ষমতা হারিয়েছিল। সেটিকে মালাক্কাতেই রাখা ছিল। মীর জুমলার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে মাদ্রাজ কুঠিয়াল অন্য একটি জাহাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই সময়ে তারা মছলিপত্তনমের কুঠিয়ালদের, টাপাটাপার উত্তরসূরী আলি বেগকে এই অবস্থা এবং ব্রিটিশদের বাধ্যবাধকতা বুঝিয়ে বলার নির্দেশ দেয়। মীর জুমলার মৃত্যুর (ডিসেম্বর ১৬৬৩) পরে ব্রিটিশদের ধারণা হয়, পুত্র মহম্মদ আমিনের স্মৃতিতে এসব পুরোনো কথা উদয় হবে না। ১৬৬৫-তে মাদ্রাজের কুঠিয়ালেরা কোম্পানিকে জানায় তখনও পর্যন্ত কোনও দাবিদাওয়া আসে নি। মৃত নবাবের সব নথিপত্র আওরঙ্গজেবের দরবারে পাঠানো হয়েছে। তারা আশা করছে ত্রেভিসার সঙ্গে তার চুক্তিপত্রে তাকে সন্তুষ্ট করার যে শর্ত উল্লেখ করা ছিল সেটা আওরঙ্গজেবের কাছে পাঠানোটা একটু বাড়াবাড়িই হয়ে গিয়েছে। মীর জুমলার মৃত্যুর এত দিন পরে ব্রিটিশদের মনে হল, তাঁর সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে জাহাজ নিয়ে টানাপোড়েন পর্ব মোটামুটি ভালয় ভালয় মিটেগিয়েছে।
মীর জুমলার মৃত্যুর প্রভাব
বার্নিয়ে লিখছেন, ‘মীর জুমলার মৃত্যুর সংবাদে ভারত জুড়ে উত্তেজনার তরঙ্গ বয়ে গেল। বাওরিও (Bowery) লিখছেন, ‘রাজ্যের জ্ঞানী এবং অভিজাতদের দুঃখ সাগরে ডুবিয়ে, মীর জুমলা মারা গেলেন। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতি হল। রাষ্ট্র দক্ষতম নবাব হারাল’। ২৩ এপ্রিল মীর জুমলার মৃত্যু সংবাদ লাহোরে আওরঙ্গজেবের কাছে পৌঁছয়। মাঝের কিছু সময় ইহতিশাম খান খালিসা প্রশাসন এবং রায় ভগবতী দাস বাঙলা রাজস্ব প্রশাসন দেখাশোনা করতেন। বাঙলা আর দক্ষিণে মীর জুমলার যে সমস্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রের নামে নেওয়া হয়েছিল, তার পুত্রের দখলে ফিরিয়ে দিল মুঘল সাম্রাজ্য। নাতি মীর আবদুল্লাসহ, মীর জুমলার পরিবারবর্গ, তার সম্পত্তি, হাতি ইত্যাদি নিয়ে ইতিশাম খান সম্রাটের নির্দেশে দরবারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলেন। সম্রাট নির্দেশ দিলেন যতক্ষণনা বিহার থেকে দাউদ খাঁ এসে পৌঁছচ্ছেন, ততক্ষণ দিলির খাঁ সুবাদার হিসেবে কাজ চালাবেন, সুবাদার হিসেবে শায়েস্তা খাঁ যতক্ষণ না এসে পৌঁছচ্ছেন ততক্ষণ দাউদ খানই প্রশাসন চালাবেন।
বাঙলার প্রশাসন থেকে মীর জুমলার মত দক্ষ, কড়া প্রভাবশালী প্রশাসকের চলে যাওয়ার পরে সুবা জুড়ে চরম অরাজকতা এবং দুষ্কৃতি দমনে প্রশাসন কাঠামোয় চরম শিথিলতা নেমে আসে। খানইখানানএর কড়া চাবুকে যে সব স্বার্থবাহী নিরস্ত ছিল, তারা নিজেদের চরিত্র খুলে ধতে শুরু করে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী আমলা এবং ব্যক্তি প্রকাশ্যেই তাদের স্বার্থ পূরণে বাঁকা আঙ্গুলে ঘি তোলার ব্যবস্থা করলেন। ইইতিসাম খান চরম দুর্বিনীত হয়ে উঠলেন। পদমর্যাদায় এবং ব্যক্তিত্বে তার থেকে অনেক ধাপ ওপরে থাকা দিলির খান তাঁর এই পরিবর্তনে তীব্র অসন্তুষ্ট হলেও, মনোভাব গোপন রাখতে বাধ্য হলেন। প্রত্যেক আমলা, কর্মচারী স্বজনপোষণের চরম শিখরে উঠলেন। ক্ষমতাচ্যুত জমিদারেরা জমিদারির জমি দখল নিল। শিহাবুদ্দিন তালিশ এই সময়টিকে জঙ্গলের রাজত্ব নাম দিয়ে লিখছেন, মীর জুমলার মৃত্যুর পর বাংলায় অবিচার এবং বিদ্রোহ ছেয়ে গেল।
সামরিক বাহিনীতেও অবহেলার কৃষ্টি তৈরি হল। মীর জুমলার মৃত্যুর পর কোচবিহার দখলের পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হয়। মীর জুমলা আকসর খানকে কোচবিহার দখলের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর জেদে দাউদ খানের সমস্ত প্রস্তাব পরামর্শ বিফলে গেল। মীর জুমলার আসার আগে আকসর খান যে জমিদারির মালিক ছিলেন, সেই চাকলা ফতেপুর নতুন করে ফিরে পেতে সক্রিয় হয়ে উঠলেন।
মীর জুমলার দেওয়া যে পরওয়ানা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিহার বাংলাজুড়ে ব্যবসার শর্ত নিয়ন্ত্রণ করত এবং আবগারি দপ্তরের কর্মচারীদের থেকে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা দিত, মীর জুমলার মৃত্যুর পর এই সমস্ত শুল্ক ইত্যাদি দেওয়া থেকে ব্রিটিশদের ছাড় দেওয়ার পদক্ষেপের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠল; কেননা শাহজাহানের বন্দীত্বের পরে যদি শাহজাহানের পরওয়ানার শর্ত মানতে মুঘল কর্মচারীরাই অস্বীকার করে, তাহলে ক্ষমতায় না থাকা মৃত মীর জুমলার সময় সেই ঘটনার ব্যতিক্রম হতে যাবে কেন? বিহার আর বাংলার আবগারি আমলারা ব্রিটিশ ডাচেদের থেকে শুল্ক দাবি করে। মীর জুমলার সময়ের বাধ্যবাধকতা থেকে বেরিয়ে এসে সর্বস্তরের আমলা, সওদাগরেদের থেকে বহিঃশুল্ক দাবি করল। মীর জুমলা ব্রিটিশদের ফোর্ট জর্জের যে অধিকার ব্রিটিশদের দিয়েছিলেন, সেই পরওয়ানাটা তার উত্তরাধিকারীরা কিভাবে দেখবে তাই নিয়ে তারা ব্যাপক সংশয় ছিল। ইতিমধ্যে ডাচেরা সম্রাটের থেকে ফরমান জোগাড় করেছে যুক্তি দেখিয়ে বালেশ্বর, পাটনা এবং মাদ্রাজের কুঠিয়ালেরা সুরাটের ব্রিটিশ কর্তাদের আওরঙ্গজেবের থেকে নতুন ফরমান আদায়ের জন্য উদ্যোগী হতে অনুরোধ করলেন। সুরাটের কর্তাদের গড়িমসিতে ক্ষুব্ধ বাঙলার কুঠিয়ালেরা দেওয়ান রায় ভগবতী দাসের থেকে একটা নির্দেশ নামায় পরিষ্কার করে লিখিয়ে নিলেন মীর জুমলার পরওয়ানা তখনও কার্যকর রয়েছে। ফলে ইওরোপিয়রা, বিশেষ করে বাংলা বিহার ওডিসার ব্রিটিশ আমলারা মীর জুমলার মৃত্যুর জন্যে সত্যকারের দুঃখ পেলেন।
সপ্তম অধ্যায়
প্রথম পর্ব
অসম অভিযানের মুখবন্ধ – কোচবিহার জয়
মীর জুমলার পূর্বাঞ্চল অভিযানের প্রেক্ষিত
সুজার কবল থেকে বাংলার নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেওয়ার পরে পরেই ভীমবেগে মুঘল ভারতের উত্তরপূর্ব সীমান্তে অসম রাজ্য আক্রমণের পরিকল্পনা ছকে ফেললেন মীর জুমলা। ইওরোপিয় লেখকদের ধারণা ছিল মুঘল পাদশাহ ভেবেচিন্তেই তার রণকুশল বৃদ্ধ সেনানায়ককে সব থেকে কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলেন যাতে মীর জুমলা দিল্লি থেকে বহুকাল বহুদূরে থাকতে বাধ্য হন। এছাড়াও এই অঞ্চল আক্রমণ পরিকল্পনার পিছনে আরও একটা বিষয় কাজ করছিল, মীর জুমলা তার বাহিনীকে নিয়ে বার্মা হয়ে চিন অভিযান করে অমর বিশ্বজয়ী হবার বাসনা পোষণ করতেন। অসম বুরুঞ্জীর লেখকদের অভিযোগ মীর জুমলা তার স্বপ্ন সাকার করতে সম্রাটের বিধিবদ্ধ অনুমতিটুকুও নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন নি। তবে বাদশাহের যে ফারমানবলে (জুন ১৬৬০) মীর জুমলাকে বাঙলার সুবাদার নিয়োগ করা হয়েছিল, সেই নথিতেই তাকে বাঙলার ঘটনাবলী নিয়ন্ত্রণ করে অসম এবং আরাকানের রাজ্য অভিযানের অনুমতি দেওয়া হয়। সেই অনুমোদিত অভিযানের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল আরাকানে পালিয়ে থাকা সুজার মুঘল হিন্দুস্তানে প্রত্যার্পন। মীর জুমলা আওরঙ্গজেবের থেকে আরাকান আক্রমণ সাময়িক স্থগিত রেখে প্রথমে কোচবিহার তারপরে অসম অভিযানের অনুমতি নিয়েছিলেন।
আমাদের মনে হয় সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের সম্মান। মুঘল বাহিনীর কোচবিহার-অসম বিজয় শুধু যে সাম্রাজ্যের সম্মান বৃদ্ধি করত না, সেই যুদ্ধ সাম্রাজ্যকে নিরাপদ রাখারও অন্যতম হাতিয়ার ছিল। ১৬৩৯-এর অসম-মুঘল চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিম অসমের গুয়াহাটি থেকে মানস (মানাহা) নদী পর্যন্ত ভূভাগ ছিল মুঘল নিয়ন্ত্রণে। মুঘল ফৌজদার গুয়াহাটি থেকে কামরূপ সরকার শাসন করতেন। শাহজাহানের অসুস্থতার পরে ১৬৫৭ থেকে বাংলা সুবায় পর পর কয়েকটি ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক ঘটনা যেমন, বাংলার সুবার ওপর সুজার নিয়ন্ত্রণ ঢিলে হওয়া, বাংলার নৌবহর শক্তিহীন হয়ে যাওয়া, সিংহাসনের সম্ভাব্য লড়াইতে সুজার অযোগ্যতার ধারণা ইত্যাদি সময়ার বিষয় সংক্রান্ত গুজব দাবানলের মত ছড়িয়ে যেতে থাকে। কিছু দিনের মধ্যেই এর সঙ্গে যোগ হয় বাস্তব রাজনৈতিক শূন্যস্থান – সিংহাসনের লড়াইতে সুজা বাংলা সুবার সম্পূর্ণ মুঘল নৌবহর এবং সেনাবাহিনী নিয়ে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে সিংহাসনের লড়াইতে অংশগ্রহণ করলেন। প্রায় দেড় বছর বাংলাজুড়ে বিপুল শূন্যস্থান তৈরি হল। শূন্যস্থান পূরণ করতে মুঘল কামরূপ, ব্রহ্মপুত্রের উত্তর পাড়ে হাজো সহ মোনাস থেকে গুয়াহাটি পর্যন্ত এলাকা দুটো পরাশক্তির (মার্চ-এপ্রিল ১৬৫৮) আক্রমনের লক্ষ্য হয়। পশ্চিম থেকে মুঘল অধিকৃত কোচবিহার রাজ্যের রাজা প্রাণনারায়ণের মন্ত্রী ভবনাথ কার্জী স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং হাজোয় শিবির স্থাপন করে সাধারণ প্রজা এবং মুসলমান মহিলাদের ওপর অত্যাচার শুরু করে। পূর্ব থেকে আক্রমন করেন রাজা জয়ধ্বজ সিংহের সেনানায়ক বরগোঁহাই তাংচু সান্দিকুই করতোয়া পর্যন্ত জমি দখল করার মানসিকতা নিয়ে। সাম্রাজ্যের দুপাশ থেকে ধরণের বড় আক্রমণ হলে প্রতিরোধ খাড়া না করতে পারবেন না বুঝতে পেরে মুঘল ফৌজদার মীর লুফতুল্লা জাহাঙ্গীর নগর (ঢাকা) পালিয়ে আসেন। মুঘলদের সঙ্গে যৌথ লড়ায়ে কোচেদের দেরি করে আসা প্রস্তাব সান্দিকুই প্রত্যাখ্যান করে কোচেদের হাজোয় পরাজিত করে তাড়িয়ে দেন এবং বারিতলা পর্যন্ত কোনরকম বাধা ছাড়াই এগিয়ে এসে হাটশিলা বা হাতডোবায় (ঢাকা থেকে মাত্র কিছু দূরে কারিবাড়ি বা কারাইবাড়িতে) সেনা ছাউনি স্থাপন করে, মুঘলদের স্থানীয় বাজারে আসার নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং অত্যাচারের ঝাঁটাপেটায় আসামজুড়ে গ্রেফতার হওয়া বহু মুঘলকে সেখানেই বসবাস করতে বাধ্য করেন।
মীর জুমলার বাঙলা প্রবেশের ঠিক আগে মুঘলদের মাথা ব্যথা ঘটানোর এই সব কাণ্ডগুলির বহু আগে জাহাঙ্গীর আর শাহজাহানের সময় যথাক্রমে সৈয়দ আবু বকর এবং আবদুস সালামকে অহোমেরা গ্রেফতার করলেও অহোমদের বিরুদ্ধে মুঘলেরা প্রতিশোধ নিতে পারে নি। আওরঙ্গজেবের সময়ে মীর জুমলা বাঙলার নবাব হলে তাকে এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে বলা হয়। এটা শুধুই সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা ছিল না, মীর জুমলার ঘনিষ্ঠ ওয়াকিয়ানবিশ বলছেন, ‘তিনি বিধর্মী অহমিয়াদের ওপর ধর্মযুদ্ধ চালাতে চাইছিলেন, যাতে যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দেওয়া যায়, মূর্তিপুজকদের শিক্ষা দেওয়া যায়, ইসলামি ধর্মাচারণের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলিয়ে নিতে বাধ্য করা যায় এবং অবিশ্বাসীদের আচার আচরণ নিষিদ্ধ করা যায়’।
মীর জুমলার যুদ্ধ প্রস্তুতি
বাংলায় আওরঙ্গজেবের জয় এবং ঢাকায় কোচবিহার-অসম অভিযানের মুঘল যুদ্ধ প্রস্তুতির সংবাদে কোচ আর অহোম রাজারা মুঘলদের শান্তি চুক্তির প্রস্তাব দেয়। অহোম রাজা জয়রাজ শান্তির অনুরোধ জানিয়ে বললেন, তিনি কামরূপ জয় করেছেন কোচদের হাত থেকে অঞ্চল উদ্ধার করার জন্য, এখন সেটি মুঘলদের হাতে তুলে দিতে চান। বর্ষার পরেই আরাকানে সুজাকে গ্রেফতার করার আগেই মীর জুমলা অহোমদের হাত থেকে কামরূপ দখল নিতে রশিদ খানকে পাঠালেন। কিন্তু তিনি কোচ রাজ্যের মুঘল সামন্ত রাজা প্রাণনারায়ণের বিদ্রোহকে মাফ করতে রাজি হলেন না, রাজা সুজন সিংএর নেতৃত্বে বাহিনী পাঠালেন। তাকে শক্তিশালী করার জন্য তার পিছনে পাঠালেন মীর্জা বেগ সুজায়ীকে। গ্রেফতার হওয়ার রাজা প্রাণনারায়ণের পক্ষে ক্ষমা চাইতে আসা দূতকে গ্রেফতার করা হল। তারপরেও কোচবিহারের দরবারের জনৈক মুঘল অভিজাতর পাঠানো চিঠি পড়াই হল না।
মীর জুমলা জানতেন, অহোম আর কোচদের শান্তি প্রস্তাব, পাল্টা যুদ্ধের প্রস্তুতি জন্যে সময় নেওয়ার ছল। সুসজ্জিত অহোম বাহিনীর বিরুদ্ধে বেশি দূর এগোতে সাহস না পেয়ে রশিদ খান রাঙামাটিতে শিবির ফেললেন। ওদিকে সুজন সিংহ কোচেদের বিরুদ্ধে একদুয়ারের বেশি এগোতেই পারলেন না (মে-জুন ১৬৬১), উত্তরবঙ্গের ভয়াল বর্ষার আশংকায় সেখানেই ঘাঁটি গাড়লেন। ততদিনে মীর জুমলা সিদ্ধান্ত নিলেছেন কোচেদের বিরুদ্ধে তিনি নিজে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেবেন। সম্ভব হলে তারপরে অহোমদের বিরুদ্ধেও অভিযান করবেন। অভিযান শুরুর আগে বাংলা প্রশাসনে কিছু পরিবর্তন আনলেন।
১৬৬১-র ১ নভেম্বর রাতে মীর জুমলা এবং দিলির খান খিজিরপুর থেকে ১২,০০০ ঘোড়সওয়ার, ৩০,০০০ পদাতিক, অসংখ্য যুদ্ধ জাহাজ এবং ৩২৩টা নৌকোর নৌবহর নিয়ে এগোলেন। বাহিনীর মধ্যে সব থেকে ভয়াল ভয়ঙ্কর ছিল ডাচেদের ঘুরাব নৌকো, প্রত্যেকটি ঘুরাব নৌকোয় সার দিয়ে সাজানো ১৪টি কামানের পিছনে ৫০-৬০ জন নৌ সেনানী আর প্রতি ঘুরাবের সঙ্গে জোড়া চারটি কষা নৌকো থাকত। দো-আঁশলা ম্যাস্টকোস ছাড়াও পর্তুগিজদের সব থেকে দক্ষ নৌসেনানীর সঙ্গে ছিল কিছু ডাচ এবং ইংরেজ সেনানীও। ইওরোপিয় যোদ্ধাদের বিষয়ে মীর জুমলার সদর্থক মনোভাব ছিল। বিশেষ করে পর্তুগিজ, ডাচ গোলান্দাজ আর আর্মেনিয় রিসালার (ঘোড়সওয়ারদের) কাজে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন। প্রচুর অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত অসামান্য চেহারার বেশ কয়েকজন মস্কোভাইটও ছিল [মাথায় রাখতে হবে আরমেনিয়া আর রাশিয়ার মস্কো দূরত্ব খুব বেশি নয়]। ডাচেদের মাইনে দেওয়া হত, কিন্তু পর্তুগিজ আর ব্রিটিশেরা স্বেচ্ছাসেবা দিতে এসেছিল। (চলবে)