সপ্তম অধ্যায়
প্রথম পর্ব
অসম অভিযানের মুখবন্ধ — কোচবিহার জয়
মীর জুমলা কোচবিহার দখল
বারিতলা সীমান্ত শিবিরে পৌঁছে মীর জুমলাকে কোচবিহারের দিকে যাওয়ার দুটি পরিচিত রাস্তা সম্বন্ধে বলা হল, একটা একদুয়ার হয়ে কোচবিহার গিয়েছে — রাস্তাটিতে রাজার সেনাবাহিনী সারাক্ষণ নজরদারি চালাচ্ছে, একটি সুসজ্জিত শিবিরও পেতেছে। আরেকটি রাস্তা কুঠিঘাট হয়ে রাঙ্গামাটি হয়ে দুপাশে জঙ্গলে ভরা ছোট রাস্তা ধরে, বেশ কিছু নালা পার করে কোচবিহারে পৌঁছনো যায়। এই রাস্তাটি বড় ব্যবহার হয় না। রাজাও এই রণনৈতিক দূরদৃষ্টিতে তিনি এই রাস্তাটি বাছলেন এবং এই রাস্তা ধরেই এগোলেন। দেখলেন এই রাস্তায় খুব বড় একটা নজরদারি নেই। আলগুলো স্বাভাবিকভাবে অন্যান্য রাস্তার থেকে নিচু। বাহিনী এই পথটা নজরদারি করা শুরু করল। ঘোড়াঘাট থেকে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত যত নালা বইত সব কটা নালাকে সুরক্ষিত করা হল।
সুজন সিংএর সঙ্গে মীর জুমলার কোচবিহারের আসার খবর পেয়ে যতটুকু প্রতিরোধ ছিল তাও থাকল না, অগ্রগামী সেনারা পালিয়ে গেল (১৩ ডিসেম্বর, ১৬৬১)। পরের দিন মীর জুমলা আল পথ ধরলেন। খচ্চরে চড়ে ঘণ জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা তৈরিতে সাধারণ সেনানীর সঙ্গে হাত লাগালেন। কোচবিহারে পৌঁছতে আর মাত্র তিন ধাপ বাকি তখন খবর এল মন্ত্রীকে নিয়ে রাজা ভূটান সীমান্তে কাঠাঁলবাড়ি হয়ে মৌরাঙ্গের পথে পালিয়ে গিয়েছেন। জঙ্গল পার হয়ে, নালা পায়ে হেঁটে পার হয়ে বাধাহীন মীর জুমলা ১৯ ডিসেম্বর কোচবিহারের রাজধানীতে পৌঁছলেন।
কোচবিহারে মীর জুমলার প্রশাসন
যুদ্ধ না করেই মীর জুমলা কোচবিহারকে মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করলেন। তার প্রশাসন ছিল তেজি কিন্তু নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ায় সমৃদ্ধ। তিনি সাধারণ মানুষকে তুষ্ট করার নীতি নিলেন। সদর মীর মহম্মদ সিদ্দিকিকে দিয়ে তিনি রাজপ্রাসাদ থেকেই নামাজ পড়ালেন। একডালা দুর্গ ধ্বংস করালেন। শহরের ১০০ গজের মধ্যের সব জঙ্গল ছিল কেটে ফেলে সমতল জমিতে রূপান্তর করলেন। ১০৬টা কামান, ১৪০টা জম্বুরক, ১১টা রামছঙ্গী, ১২৩টা মাস্কেট বন্দুক এবং অন্যান্য যুদ্ধ সামগ্রী দখল নিয়ে ঢাকা পাঠালেন। রাজার নানান জিনিস, সরকারি হিসেব পরীক্ষক আমলা – মহম্মদ আবিদকে দিয়ে পরীক্ষা এবং হিসেব করানো হল। কোচবিহারের নাম হল আলমগীরনগর। মীর জুমলার প্রস্তাবে এবং আওরঙ্গজেবের নির্দেশে আকসর খান স্থায়ী ফৌজদার হিসেবে যোগ না দেওয়া পর্যন্ত আল্লা ইয়ার খানের পুত্র ইসফান্দিয়ার বেগকে (খান) অন্তর্বর্তীকালীন ফৌজদার, কাজি সামুই সুজাইকে দেওয়ান, মীর বাহাদুর রজ্জাককে মনসবদার এবং খাজা কিশোর দাসকে আমিন পদে নিয়োগ করা হল।
দেশকে নিরাপদ রাখতে, দেশের শাসন ব্যবস্থায় তিনি কঠোরতা প্রদর্শন করলেন, কিন্তু তিনি প্রজ্ঞা দেখালেন রায়তদের লুঠেরা সেনানীর হাত থেকে বাঁচিয়ে। শহরে ঢোকার আগেই তিনি কড়া নির্দেশ দিয়ে সেনাদের উপস্থিত বা পালিয়ে যাওয়া রায়তদের ওপর অত্যাচার, বাড়ির আসবাব এবং সম্পত্তি লুঠ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তার নির্দেশ অমান্য করে যারা লুঠ চালিয়ে যাবে, তাদের চরম শাস্তি এবং জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। যে কয়েকজন হাতে গোনা সেনা পালিয়ে যাওয়া রায়তের উঠোন থেকে গরু বা ছাগল বা ফসল লুঠ করেছিল, তাদের নাক কেটে লুঠ করা দ্রব্য গলায় ঝুলিয়ে শহরজুড়ে ঘোরানো হল। প্রত্যেক রায়তকে শহরে ফিরে আসতে উৎসাহ দিয়ে বাড়ি ফিরে চাষাবাদ শুরু করতে বলা হল। আলমগিরনগরে একটা টাঁকশাল তৈরি করে সেখান থেকে সম্রাট আওরঙ্গজেবের নামে মুদ্রা ছাপানোর ব্যবস্থা করলেন মীর জুমলা। কোচবিহার দখল করে মীর জুমলা আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেন। তার প্রভাব সুদূর প্রসারী হয়। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন মীর জুমলার শাসনে কোচবিহার থেকে জারি করা ‘মুঘল জামানার একমাত্র মুদ্রা যেটিতে বাঙলা অক্ষর ব্যবহার করে পারসিক বা আরবি ভাষায় লেখা হয়’। স্থানীয় সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা এবং যতদূর সম্ভব পরিবর্তন না করার মুঘল নীতি মীর জুমলার অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করেছেন [এইভাবেই মুঘল সাম্রাজ্য যুগে যুগে জনগণের মধ্যে শাসন বৈধতা তৈরি করেছে — অনুবাদক]।
রাজার পুত্র মুঘলদের সঙ্গে যোগ দিলেন। ইসলাম গ্রহন করলেন। বাবাকে ধরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। কোচবিহারের উজির ভবনাথকে দুদিক দিয়ে আক্রমন করে ইফান্দিয়ার এবং ফারহাদ খান ধরে আনেন। রেজা কুলি বেগ আবাকীশ তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে নিক্ষেপ করে। কিন্তু রাজাকে ধরা সম্ভব হয় নি। তিনি ভূটান পাহাড়ের তলদেশ কাঁঠালবাড়ি থেকে পাহাড়ি শৃঙ্গের দিকে ঊঠে গিয়েছিলেন। দূতেরা রাজার ছেড়ে যাওয়া হাতি, দুটি ঘোড়া এবং সেগুলির ভূটিয়া মালিককে নিয়ে ফিরে এল। পশুগুলি নবাব দখলে নিলেন এবং ভূটিয়াকে গ্রেফতার না করে, তার মার্ফৎ ১২০ বছরের পূন্যাত্মা ভূটানরাজ ধর্মরাজাকে চিঠি লিখলেন রাজাকে ফিরিয়ে দিতে, না হয় অন্তত তার দেশ থেকে বহিষ্কার করতে। ভূটান রাজা অনাহুত আশ্রিতকে মীর জুমলার হাতে তুলে দিতে রাজি হলেন না। ভূটানের রাজাকে শাস্তি না দিয়ে মাত্র ১৬ দিন কোচ বিহারে থেকে, আর বেশি সময় নষ্ট না করে অসম (৪ জানুয়ারি, ১৬৬২) অভিযানে রওনা হয়ে গেলেন।
১৬৬২-র বর্ষায় রাজা পাহাড় থেকে নেমে এসে তার রাজ্য দখল নিলেন। প্রজারা তত দিনে মুঘলদের চাপিয়ে দেওয়া রাজস্ব ব্যবস্থায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তিনি মনসবদার মহম্মদ সালিহকে কাঁঠালবাড়িতে খুন করলেন, এবং ইসফানদিয়ার খানের কাছে রসদ আসার পথ কেটে দিলে সে গোলাঘাটে পালিয়ে যায়। আসকর খান পৌঁছলেও কোচবিহার উদ্ধার করতে পারলেন না।
টিকা
১। অনামা ডাচ সেনানীকে উদ্ধৃত করে গ্ল্যানিয়াস এবং বার্নিয়ে বলছেন, বংলা জয়ের পরে আওরঙ্গজেবের প্রধান সেনাপতি মীর জুমলা বৌবাচ্চা সহ শাহী আমলাতন্ত্র থেকে অবসর নিয়ে বাকি জীবন বাংলায় কাটিয়ে দেওয়ার মনস্থ করে, অবসর নেওয়ার জন্যে সম্রাটের অনুমতি চেয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য সম্রাটের ধারণা হয়েছিল, দিল্লি থেকে বহু দূরে, এই সব কথা বলে মীর জুমলা বাংলায় স্বাধীন রাজ্য তৈরি করার মতলব করছেন। তাই রক্ষাকবচ হিসেবে তিনি মীর জুমলার পুত্র মহম্মদ আমিনকে মীর বক্সি পদে নিয়োগ করেন — এবং সম্রাট মীর জুমলার পুত্রের পরিবারকে বাংলার পাঠানোর অনুমতি দিয়ে মীর জুমলার মত ক্ষমতাশালী মানুষকে তোয়াজও করলেন। উল্টো দৃষ্টিভঙ্গীতে তালিশ এবং আকিল খান বলছেন মীর জুমলা ক্ষমতায় বসতে না বসতেই তাঁর ঘনিষ্ঠদের কাছে পরের বছর এরকম আরেকটি সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করেরেখেছিলেন। ফলে আমরা অনামা ডাচ সেনানী আর বার্নিয়ের গুজব শুনে ইতিহাস লেখার দৃষ্টিভঙ্গীটি বাতিল করতে পারি। তাছাড়া মীর জুমলা প্রথম জীবন থেকেই তীব্র উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষ হিসেবে পরিচিত, তাঁর পক্ষে উচ্চতম রাজনৈতিক পদের মুঘল চাকরি থেকে অবসর নিয়ে সাধারণ অভিজাতর মত জীবন কাটিয়ে দেওয়ার ভাবনাটাই বিষ্ময়কর এবং চরিত্র বিরোধী। তাভারনিয়ে বলছেন মীর জুমলা নবাবি পদের মাধ্যমে তার ক্ষমতার আরও বেশি বিস্তার চাইতেন। থেভেনোর ভাবনা ছিল মীর জুমলা নিজেকে বাংলার সম্রাট ঘোষণা করার পরিকল্পনা করছিলেন। বাউরির বক্তব্য আসাম জয়ের পরে চিরস্থায়ী অমরত্বের ভাবনায় মীর জুমলা তারতারি বা তাতার দেশ বা পশ্চিম এশিয়া দখলের কথা মাথায় রেখেছিলেন।
দ্বিতীয় পর্ব
মুঘল কামরূপ উদ্ধার
অসমের দিকে যুদ্ধ জয়ের পথে
অহোমদের বিরুদ্ধে উদ্দীপ্ত অভিযানে মীর জুমলা
১৬৬১ সালে রশিদ খানের অভিযানের সংবাদে অহোমেরা হাতিশালা এবং ধুবড়ি ছেড়ে মোনাস নদী পার করে পশ্চাদপসরণ করে। রশিদ অহোমদ পশ্চিমি অসম থেকে রাঙ্গামাটি পর্যন্ত এলাকা দখলে নিলেন। রাস্তায় চোরাগোপ্তা আক্রমণের ফাঁদ পাতার অশংকায় তিনি মীর জুমলার আসার প্রতিক্ষা করতে রাঙ্গামাটিতে শিবির ফেললেন। অহোম সেনা পিছিয়ে আসার জন্য রাজা দুজন ফুকনকে (দিহিঙ্গিয়া এবং লাহুয়ি ফুকন) দায়ি করে গ্রেপ্তার করলেন এবং দক্ষিণ অসম রক্ষা এবং সেনাবাহিনীর দায়িত্ব দিলেন বরদলোই পরিবারের হিন্দু কায়স্থ ভাণ্ডারী (স্টোরকিপার) মানথির ভরালী বড়ুয়াকে। মোনাসের মুখে যোগীগুপার নিরাপত্তা জোরদার করা হল। অহোম সেনাপতি আহাতগুড়িয়া লাহন ফুকন এবং কান্ডু খামনের নেতৃত্বে ব্রহ্মপুত্রের উল্টো দিকের তীরে পঞ্চরতনে একটি দুর্গ তৈরি করা হল। সেনা অভিযানের কারণ জানতে চেয়ে কামরূপের অহোম প্রধানেরা রশিদ খানের উদ্দেশ্যে একজন দূত পাঠালেন। দুর্বিনীত দূতকে ঢাকায় মীর জুমলার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেওয়া হল। মীর জুমলা জানালেন, কামরূপের রাজা যদি দখল নেওয়া মুঘল কামরূপ অঞ্চল, নানান দখলি সম্পত্তি ফিরিয়ে দেন, তার মেয়ে এবং অন্যান্য সম্পদ উপঢৌকন পাঠান এবং ভবিষ্যতে আর মুঘল রাজত্ব আক্রমন না করার প্রতিশ্রুতি দেন, তাহলে তিনি অভিযান স্থগিত রাখবেন। কামরূপ দখলে না রাখতে পারা ঘিলা বিজয়পুরের জয়নারায়ন অহোম রাজার শাস্তি এড়াতে মীর জুমলার সঙ্গে যোগ দিলেন। মীর জুমলা বুঝলেন অসম দখলের সুবর্ণ সুযোগ উপস্থিত। পরিকল্পনা মাফিক আরাকান আক্রমন পরের বছরের জন্য আপাতত স্থগিত রেখে কোচবিহার এবং অসম আক্রমনে যাওয়ার প্রস্তাব পাঠালেন পাদশাহের কাছে। তিনি আওরঙ্গজেবকে লিখলেন অহোমেরা কামরূপ দখল করে এবং আমাদের আক্রমণের পরিকল্পনা করছে। আমার মনে হয় এত কম সময়ে মগ দেশ দখল করা যাবে না। আমার প্রস্তাব ইতোমধ্যে কোচবিহার এবং অসম আক্রমন করা হোক’। আওরঙ্গজেব তার সেনানায়কের পরিকল্পনা অনুমোদন করলেন। আহোম রাজা ফুকনদের নির্দেশ দিলেন মুঘলদের কাছে কামরূপ আত্মসমর্পন না করতে, যেহেতু এটি মুঘলদের থেকে নয়, কোচেদের থেকে দখল করা ভূমিখণ্ড। মীর জুমলা কোচবিহার দখল করার পরে যে প্রস্তাবটি অহোমদের পাঠান, তারা সেটি উপেক্ষা করলেন।
শুরুতেই মীর জুমলার সমস্যা
৪ জানুয়ারি ১৬৬২তে মীর জুমলা কোচবিহার থেকে অসমের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। রাঙ্গামাটিতে রশিদ খানের ছাউনিতে যোগ দেওয়ার জন্য খুন্তাঘাটের জঙ্গলের পথ ধরলেন। পদাতিক বাহিনীর সুরক্ষায় নাওয়ারা (নৌবাহিনী) ব্রহ্মপুত্র ধরে এগিয়ে চলল। স্থানীয় এলাকার ভূমিরূপ না জানা থাকায় মীর জুমলার বাহিনীর বেশ সমস্যা দেখা দেয়। মীর জুমলার নেতৃত্বগুণে এবং বাধা না মানার উদগ্রবাসনায় প্রকৃতি আর মানুষের সমস্ত বাধা তুচ্ছ করে স্থানীয় জমিদারদের থেকে খবর সংগ্রহ করতে শুরু করে সিদ্ধান্ত নিলেন ব্রহ্মপুত্রর পাড় ধরেই এগোবেন যাতে তার স্থল এবং নৌবহর, দুটি বাহিনীকে সমানতালে ব্যবহার করা যায়। অগ্রগামী বাহিনীর সেনাপতি দিলির খান এবং গোলাবারুদ ভাণ্ডারের দারোগা মীর মুর্তাজাকে নির্দেশ দিলেন জঙ্গলের কঠিন পথ ছেড়ে ব্রহ্মপুত্রের দিকে এগিয়ে যেতে। তালিশের ভাষায় ‘মানুষের নেতা’ বৃদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু হার না মানা সেনানায়ক সুর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত রাস্তা তৈরির কাজে বেলদারদের সঙ্গে নিজে হাত লাগালেন, একমাত্র ছুটি নিলেন নামাজের সময়টুকু। নানান বাধা অতিক্রম করে রাস্তা তৈরি হল। পদাতিক আর হাতি যথ দিয়ে খাড়া গাছগুলি মাড়ানো হল, হ্রদ আর জলাভূমিগুলি বোজানো হল ঘাস আর গাছের কাণ্ড দিয়ে, নালা পায়ে হেঁটে পেরোবার উপযুক্ত করা হল।
সাধারণ সেনার সঙ্গে সেনানায়কের অমানুষিক পরিশ্রমের চোখে দেখা বয়ান রয়েছে তালিশের লেখায়। বিপুল পরিশ্রমে জঙ্গল পরিষ্কার করে বিশ্রাম নেওয়ার সময় সেনারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত, ভুল যায়গায় পা ফেলে বহু সেনা মৃত্যুর মুখে পড়েছে, ছাঁটা খাগড়ার ছুঁচোল ডগা বহু সেনানীর পায়ে ঢুকেছে, বাঁশের আঘাতে রিসালা বাহিনীর সেনানীর মৃত্যু হয়েছে, বন্দুকধারী আর পা দিয়ে তীরছোঁড়া বাহিনী ভার বইতে বইতে ক্লান্ত অসুস্থ হয়ে পড়েছে। রাস্তার কাদা আর জলাভূমি সেনাবাহিনীর অগ্রগতি প্রায় থামিয়ে দিল। বিপুল সেনাবাহিনীর জন্য শুধুমাত্র একটাই ছোট রাস্তা বানানো গেল। পশু আর মানুষ পরস্পরের সঙ্গে গায়ে গা লাগিয়ে সরু রাস্তায় চলল অমানুষিক কষ্টে। পরিশ্রান্ত, উদ্ভ্রান্ত হাতির হকি লাঠির মত শুঁড়ের আতর্কিত আক্রমনে, ঘোড়ার নালের চাঁটে, উটের ধাক্কায়, ষাঁড়ের পা আর শিঙের চোট লেগে বহু সেনানী যুদ্ধের আগেই বেহেস্তে গেছে।
ঘন জঙ্গল, নালা, জলাভূমি প্রাকৃতিক বাধায় সেনাবাহিনী রোজ ৪-৫ মাইলের বেশি এগোতে পারল না।
গুয়াহাটিতে মীর জুমলা
১৭ জানুয়ারি মীর জুমলা মানস এবং ব্রহ্মপুত্রের মোহানায় যোগীগুপার ৫ মাইল পশ্চিমে পাহাড়ি উঁচু জমিতে ঘেরা কেল্লায় পোঁছলেন। কেল্লার গড়নে পশ্চিম দিক থেকে অতর্কিতে আক্রমন অসম্ভব। অহোমি রণ পরিকল্পনায় এই মাটির কেল্লায় বাদুলি ফুকনের নির্দেশে পশ্চিম প্রান্তে ছুঁচলো বাঁশের ডগা ফাঞ্জি পুঁতেছিল। প্রচুর লুকোনো গর্তও ছিল। উত্তরে লুকোনো গর্ত, জঙ্গল আর পাহাড়ি নিরাপত্তা দিয়ে ঘেরা। ডাঙ্গারি অহোমেরা দুর্গটি পাহারা দিত। দাস্তর (কলেরা) প্রাদুর্ভাবে ছেড়ে চলে যায়। ২০ জানুয়ারি প্রতিরোধ ছাড়াই কেল্লা দখল নিল মীর জুমলার বাহিনী।
দুরন্ত এবং গভীর মোনাস নদী পার করে মীর জুমলা তার বাহিনীকে দুটি ভাগে ভাগ করলেন। মূল টুকরি নিয়ে ব্রহ্মপুত্রের উত্তরপাড় দিয়ে এগোলেন। দক্ষিণ পাড় দিয়ে এগোলেন সৈয়দ নাসিরুদ্দিন খান। মাঝে ব্রহ্মপুত্রে নৌবহর ভূমি বাহিনীর গতির সঙ্গে তাল রেখে চলল।
মীর জুমলার ত্রিফলা আক্রমন সফল হল। যোগীগুপার পতনের খবর পেয়ে রাজা শ্রীঘাটএ (সরাইঘাট, রাজার শ্বশুর রাজসাউর) বাহিনী পাঠালেন যাতে শত্রুর ওপরে জোরদার আক্রমন চালানো যায়। যোগীগুপা থেকে শ্রীঘাট আরেকটু উঁচু টিলার মাথায় বলে রক্ষণ বেশ মজবুত। সারসার পাঞ্জি, লুকোনো গর্ত আর ছুঁচোল মাথা শালবল্লার পাঁচিলে ঘেরা। অহোম বাহিনী আসার আগেই মীর জুমলা শ্রীঘাটে পৌঁছে ‘খাট্টার চৌকি’ এবং দুটি কেল্লা দখল নেন। ৪ ফেব্রুয়ারি শ্রীঘাট পেরিয়ে গুয়াহাটি অবরোধ করলেন। রাতের বেলায় আতঙ্কিত অহোম বাহিনী নৌকো করে কাজলির দিকে পালিয়ে যায়। ৫ তারিখে হাজি মহম্মদ বাকর ইস্পাহানিকে দিয়ে শ্রীঘাটের শালবল্লার পাঁচিল হাতি দিয়ে ভেঙ্গে দেন। দুমাইল দূরে ব্রহ্মপুত্রের উত্তরপাড়ের মুঘল কামরূপের রাজধানী গুয়াহাটি নতুন করে দখল নিলেন মীর জুমলা।
দক্ষিণ পয়াড়ের বাহিনী ফুলবড়ুয়ার অধীনের বাহিনীকে পরাজিত করে পঞ্চরত্ন দুর্গ দখল করে। ফুলবড়ুয়া মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধ হেরে সমধারায় পালিয়ে যান। শ্রীঘাটের মতই সুরক্ষিত পাণ্ডু দুর্গ বিনা যুদ্ধে মুঘল দখলে এল। পালিয়ে যাওয়া বহু অহোমকে রাস্তায় ইয়াগধর খান উজবেগ হত্যা করলেন। পাণ্ডুর পূর্বদিকে বেলতলা দুর্গ রাতের আক্রমনে দখল নিয়ে প্রায় সব সেনাকেই কচুকাটা করা হয়। পাণ্ডুর ১৪ মাইল পূর্বদিকে কলং নদীর মুখে শ্রীঘাটের মত গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ কাজলিও দখলে আসে। অহোমেরা জাম্বুরক, বন্দুক, বারুদ ইত্যাদি ফেলে রেখে কাঁঠালবাড়ি পালিয়ে যায়। (চলবে)