সপ্তম অধ্যায়
দ্বিতীয় পর্ব
গুয়াহাটি থেকে গড়গাঁও
মীর জুমলা মূল আসামে ঢুকলেন
গুয়াহাটিতে বিজয়ী সেনানায়ক দুদিন কাটালেন। তখনও অহোমদের থেকে তার প্রস্তাবের কোন উত্তর না পেয়ে আসম অভিযানে মন দিলেন (৭ ফেব্রুয়ারি)। অহোমদের অতর্কিতে এবং রাতে হানার রণনীতিকে বেচাল করতে তিনি প্রত্যেক সেনানীকে সতর্ক করলেন, রাতে পাহারা দেওয়া সেনাদের অস্ত্র হাতে সারারাত জাগতে নির্দেশ দিলেন, ঘোড়ায় জিন চড়িয়ে রাখতে বললেন। রাস্তা জুড়ে বেশ কয়েকটা থানা তৈরি করে যোগাযোগ ব্যবস্থা পাকা করা হল। অহোম রাজধানী গড়গাঁও ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ পাড়ে ছিল। গুয়াহাটি আর সমধারার — মাঝের একটি জায়গায় মীর জুমলা সমস্ত বাহিনী নিয়ে নদী পেরোলেন (১৫-১৬ ফেব্রুয়ারি)। অহোমদের দায়সারা উত্তর উপেক্ষা করেই মীর জুমলা সিমলাগড়ের দিকে এগোলেন। কাজলি পতনের পরে নদীর উত্তরপাড়ের দরঙ্গের রাজা এবং দক্ষিণপাড়ের ডিমারুয়ার রাজা বশ্যতা স্বীকার করলেন, এবং ডিমারুয়ার রাজার ভাইপো মুঘল সেনার সঙ্গে যোগ দিলেন।
সিমলাগড় এবং সমধারা
মীর জুমলার রাস্তায় একটাই বিপক্ষের শক্তিশালী ঘাঁটি হল, তেজপুরের পূর্ব দিকে ভরালী নদীর তীরে ভ্রমরগুড়ি পাহাড়ে অহোম রাজধানী সমধাগড়। ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ পাড়ে, সমধাগড়ের উল্টো দিকে সিমলাগড়। এই দুটি এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করে মীর জুমলার অগ্রগতিকে রুখতে রাজা সেনাবাহিনীকে দুটুকরো করলেন, বয়স্ক সেনাদের চাকরি থেকে বাতিল করে নবীন যুবাদের সামনে আনলেন। ব্রহ্মপুত্রের দুই তীরের অহমিয়া বাহিনীর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হল অতন বুড়াগোঁহাইকে। সমধারা সুরক্ষায় উত্তরের সেনার নেতৃত্ব দেওয়া হল সেনাপতি ঘোরা কবরককে, সহকারী হলেন বাদুলি ফুকন, বারুকিল (বা লাঙ্গিছান) বরগোঁহাই, কেন্দতগুরিয়া বরপাত্র (গোহাঁই)। দক্ষিণে সিমলাগড়ের বাহিনীর নেতৃত্বে রইলেন বাহগড়িয়া বুড়াগোহাঁই, তার সাহায্যে রইলেন শিরিঙ্গিয়া রাজা, ভিটারুল গোঁহাই, বরচেতিয়া নামনিয়াল রাজশাহুর বরফুকন।
ব্রহ্মপুত্র এবং দক্ষিণের পাহাড়ের মধ্যে রণনৈতিকভাবে সুবিধাজনক উঁচুতে টিলায় সিমলাগড়ের দুর্গটি খাড়াই দেওয়াল আর সাজানো কামানের নিরাপত্তায় ঘেরা ছিল। ফাঞ্জি, লুকোনো গর্ত দিয়ে চারদিক ঘেরা দুর্গে বিপক্ষের ঢোকা সমস্যার। দুর্গের সুরক্ষা বাহিনী পিঁপড়ে, পঙ্গপালের মত অগণন হয়ে সুরক্ষার সরঞ্জাম ঠিকভাবে সাজিয়ে রেখেছিলেন। মানুষ আর প্রকৃতি নিরাপত্তায় যৌথভাবে দুর্গ অভেদ্য হল।
২০ ফেব্রুয়ারি দুর্গের দক্ষিণ থেকে পশ্চিমের দিকে বয়ে যাওয়া একটি নালার ধারে শিবির ফেললেন মীর জুমলা। দুর্গ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গোলা ধেয়ে এল। জাম্বুরক থেকে ছোঁড়া গোলা তাঁবুর ওপর দিয়ে উড়ে গেল। দুর্গ আক্রমনে বহু প্রাণহানির আশংকায় তিনি দুর্গ অবরোধ করলেন। সাম্রাজ্যের বক্সী মহম্মদ বেগের সুযোগ্য নেতৃত্বে অভিজাতরা শিবিরের রাতের সুরক্ষায় থাকলেন। পরিখা কেটে তার ওপরে কামান রেখে প্রচুর গোলা ছোঁড়া হল দিলির খান আর মীর মুর্তাজার নেতৃত্বে, কিন্তু দুর্গের মোটা দেওয়ালে আঁচড়টুকু লাগল না। শালবল্লার খুঁটির দেওয়াল তুলে দিলির খান সহযোগীদের নিয়ে দুর্গের দেওয়ালের কাছে গিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত গোলা ছুঁড়লেন, কিন্তু সে আক্রমনও ব্যর্থ হল।
দীর্ঘকাল ধরে অবরোধ চলল। মীর জুমলা রণনীতিতে পরিবর্তন আনলেন। দুর্গকে দু ধার থেকে ঘিরে একযোগে আক্রমন শুরু হল। এক অহোম অভিজাতর পুত্রের থেকে দুর্গের দেওয়ালের দুর্বল অংশ, লুকোনো অগভীর গর্ত আর খাদ, ফাঞ্জির সুরক্ষার দুর্বলতাগুলো ঘুরে দেখলেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে প্রস্তুতি নিয়ে দিলির খান ১,৫০০ রিসালা গোলন্দাজ নিয়ে ভোরবেলা অসতর্ক অহোমদের ওপর আক্রমন চালালেন। মীর মুর্তাজা আর মিয়ানা খানকে আগুন জ্বালিয়ে অন্য দিকে অহোম বাহিনীর মনোযোগ আকর্ষণের দায়িত্ব দিয়ে দিলির নিজে অন্য দিকের নেতৃত্ব দিলেন। পথনর্দেশক তাকে ভুল পথে চালিত করে দুর্গম পথে নিয়ে গেগে দুর্গ থেকে মুহূর্মুহু গোলার আঘাত আসতে থাকে। দিলিরের হাতি ২৫টি তীরে বিদ্ধ হয়েও প্রচণ্ড যুদ্ধ করে দুর্গ প্রাকার চড়ল। অহোমেরা দুর্গ ছেড়ে পালাল। কিছু অহোম সৈন্যকে মহম্মদ বেগ বক্সী নালার কাছে গ্রেফতার, কয়েকজনকে হত্যা করলেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি মীর জুমলা দুর্গে ঢুকে সুরক্ষার বহর দেখে আশ্চর্য হলেন। অসম সূত্রে বলা হচ্ছে যে, দুর্গ সুরক্ষা সামলাতে কত সেনা আর রসদ লাগবে সেই হিসেব করতে লাঙ্গিছাঙ্গ বড়ফুকনের ভুল হওয়ায় দুর্গর পতন ঘটল।
অভেদ্য সিমলাগড়ের পতনে হতোদ্যম হয়ে পড়লেন সমধারার রাজা, সেনা নায়ক। বুড়াগোঁহাই রাজার সঙ্গে পরামর্শ করতে রাজধানীতে গেলেন।
কালিয়াবরে মুঘল নৌসেনার বিজয়
আসামের ইতিহাসে এই প্রথম তেজপুরের পূর্ব দিকে মুঘল সেনা ঢুকল। রক্তপাত না করে কালিয়াবর দখল হল। মীর জুমলা কালিয়াবর ছাড়লেন ২ মার্চ। নদীর তীরটি পাহাড়ি চড়াই উৎরাই হওয়ায় পদাতিক বাহিনী নৌ বাহিনী থেকে ছয় মাইল দূরে সমতল পথ দিয়ে এগোতে শুরু করল। মুঘলদের পদাতিক আর নাওয়ার যৌথ লড়াইএর ভয়ালতা অনুমান করছিল অসমিয়ারা। এত দিনে তার দেখল নৌবাহিনীর সঙ্গে পদাতিকের যথেষ্ট দূরত্ব রয়েছে। অহোমেরা পদাতিক বাহিনীর রসদ আসার সূত্র কেটে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের কাছে আরেকটা গোপন খবর ছিল মুঘল সেনানায়ক ইবন হাসান সে দিন সেনার সঙ্গে ছিলেন না। এই সময়কেই তারা আক্রমনের সময় হিসেবে বেছে নিক। ৩ মার্চ সন্ধ্যায় আজানের পরেই বরগোঁহাইর নেতৃত্বে ৭০০-৮০০ নৌবহর ১০০ মুঘল নৌবহরকে চকিতে আক্রমন করে কুকুরাকাটার কাছে। সামরিকভাবে সব থেকে সুসজ্জিত ডাচ যুদ্ধ ঘুরাবগুলিও অসমিয়াদের চকিত আক্রমনে জবাব দিতে ভুলে যায় — যেন বিপক্ষের গুলির সামনে ঝাঁঝরা করে দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে খাবার থালায় সেনাবাহিনী সাজিয়ে উপহার দেওয়া হয়ে। নদীর টানে ভেসে গিয়ে পর্তুগিজ জাহাজগুলি বেঁচে যায়। অসম যুদ্ধে মুনাবর খান যতটা পারলেন চেষ্টা করলেন অহোমদের বিরুদ্ধে লড়ার। যুদ্ধের মধ্যেই তিনি অপেক্ষা করছিলেন কখন মুঘল বাহিনী তার সাহায্যে এসে পড়বে। রাত দু’প্রহরে বাহিনী এসে পড়ল। তিনি ডাচ আর পর্তুগিজদের বাঁচাতে তাদের পাঠালেন। তারা অহোমদের বিরুদ্ধে বাতাসের উল্টো দিকে যতটা দ্রুত পারা যায় যেতে চাইল কিন্তু ডাচেদের বাহিনীকে স্রোতের বিরুদ্ধে গুণটানার জন্য মুসলমান মাল্লাদের তীরে নামতে হল।
রাতভর কামানের গোলার আওয়াজ পেয়ে মীর জুমলা মহম্মদ মুনিম বেগ এক্কাতাজ খানকে আক্রান্ত ব্রিটিশ, ডাচ পর্তুগিজদের সাহায্যে পাঠালেন। রাস্তায় বাড়িঘরদোর ছিল না। জঙ্গল ভেদ করে, জলা জমি আর কাদার ঢিপি পেরিয়ে পরের দিন সকালে মাত্র ১০-১২ জন অশ্বারোহী নিয়ে তীরে পৌঁছে ভেরি বাজানোর নির্দেশ দিলেন।
এই ঘটনায় যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল। অহোমেরা হতোদ্যম হয়ে পড়ল আর মুঘলেরা তেড়েফুঁড়ে নতুন করে লড়াই শুরু করল। মুঘলেরা অহোমদের বড় কামানের ৩০০-৪০০ জাহাজ এবং অস্ত্রশস্ত্র দখল নিল। সব থেকে ছোট জাহাজে ৭০-৮০ জন সৈন্য ধরত। ২১,০০০ সেনা যুদ্ধ বন্দী করা হল। অনেকেকে হত্যা করা হল। ৫০ জন পালিয়ে এসা সেনাকে রাজা কঠিনতম সাজা দিলেন। ছদ্মবেশ সত্ত্বেও অহোম সেনাপতিকে গ্রেফতার করা হল। মীর জুমলার সেনানায়কদের সঙ্গে কথা বলার পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। মীর জুমলার শিবির থেকে মাইল খানেক দূরে থাকা আরও ৩০০ নৌবহরকে দূর থেকে কামান দেগে ডুবিয়ে দেয়া হল, কিছু পালাল, কিছু দখল নেওয়া হল। অসমিয়া নৌ-বহরের আক্রমণের ধার শেষ হয়ে গেল।
কালিয়াবরের ঠিক ওপরের যুদ্ধে কিন্তু অহোমদের নৌ বাহিনীর সংখ্যা অনেক অনেক বেশি ছিল। উজানে নদীর স্রোতও তাদের পক্ষে ছিল। চকিত আক্রমনে সাম্রাজ্যের বাহিনী হেরে যাওয়ার অবস্থাতেও জিতল। ৬০-৭০ সেনার অহোমিয়া বাছারি যুদ্ধ নৌকো মুঘল কষার তুলনায় ঢের ভারি ছিল বলে নড়াচড়া করতে সময় নিচ্ছিল। তাছাড়া মুঘল আর ইওরোপিয় সেনানায়কদের মধ্যে নিয়মিত কার্যকর যোগাযোগের জন্যে সব থেকে বড় দুর্যোগের মুহূর্তেও তারা বাহিনীকে হারের করাল গ্রাস থেকে বার করে নিয়ে আসতে পারল। তবে পোড়খাওয়া সেনানায়ক মীর জুমলা ঠিক সময়ে মহম্মদ মুনিম বেগকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোটাই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। জনৈক অনামা ডাচ সেনানীর যুক্তি – গুয়াহাটিতে হঠাই আক্রমণ করে মুঘল নৌবহর দুর্বল করে দেওয়া আর তার রসদ আসার পথ কেটে দেওয়ার রাজার নির্দেশ অহোম সেনানায়কেরা মানে নি। জনৈক প্রৌঢ আহত অহোম সেনানী তালিসের কাছে স্বীকারোক্তি করেছিল, মুঘল নাওয়ারার আহোম বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকাটাই আশ্চর্যের ঘটনা। ঐতিহাসিক তালিশেরও ধারনা হচ্ছিল যে মুঘলেরা গুয়াহাটির বেশি আর এগোতেই পারবে না।
অহোম গেরিলা রণনীতি
দুর্ভেদ্য সিমলাগড়ের পতন, সমধারা থেকে পিছু হঠা, বিপুল নৌবহর ধ্বংসের ত্রহোস্পর্শে অহোমদের মনোবলে চিড় ধরল। আত্মরক্ষার ভার পড়ল আতন বুড়াগোঁহাইয়ের কাঁধে। আজকের ভাষায় গেরিলা যুদ্ধ রণনীতি অনুসরণ করলেন। বর্ষায় ভেসে যাওয়া জমির অপেক্ষায় অহোমেরা পাহাড়ে গা ঢাকা দিল। মুঘলদের সঙ্গে সামনাসামনি লড়াইতে অর্থহীন শক্তি ক্ষয় বুঝে অহমিয়ারা চোরাগপ্তা লড়ায়ের রণনীতি বাছল। প্রথমত নির্দিষ্ট শিবির নির্ভর না হয়ে ছোট ছোট দলে অতর্কিতে হানা দিতে শুরু করে। অহমিয়া বাহিনী কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে মুঘলদের সামনের আর পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য রাস্তায় আক্রমন শানাত। গোটা শিবিরে আক্রমণ নয় — দল বেঁধে নির্দিষ্ট কাজে বেরোনো সেনাদের আক্রমন করা শুরু করে – যেমন আগুণ জ্বালাবার কাঠ কাটার দলকে হঠাত আঘাত করে খুন করত। এক জন দুজনকে ধরে নিয়ে গিয়ে তুর্কি তালার মত হাতিয়ার দিয়ে অত্যাচার করে ছেড়ে দিত, যাতে তারা যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে শিবিরে ফিরে বাহিনীর সামনে মারা যায়। দ্বিতীয়ত মুঘলদের বাহিনীর জন্য রসদ আসার রাস্তায় বাধা তৈরি করা, মুঘল বাহিনীর জন্যে পাঠানো রসদ রাস্তাতেই লুঠ করা শুরু হল। লাখু, গড়গাঁও, মথুরাপুরের মুঘল শিবিরে অনাহারের অবস্থা। খাবারের রসদএর রাস্তা কেটে দেওয়া, জমা খাবারে আগুণ লাগিয়ে দেওয়া এবং গ্রাম থেকে কোন খাবার যাতে শত্রুশিবিরে এমনকী শহরে বাজারে হাটে না যায়, রাজার সে নিষেধাজ্ঞা সারা দেশে ছড়ানো হল। তৃতীয়ত পোড়ামাটির নীতি। মুঘল সেনার আগামী দিনের সম্ভাব্য অভিযানের রাস্তায় যত রসদ লাগতে পারে যেমন খাদ্য, নৌকো, স্থলযান, সোরার গুদাম সব কিছু মাটিতে মিশিয়ে, আগুণ ধরিয়ে দেওয়া হল। উত্তর অসমে সমধরা ছেড়ে আসার আগে বারুদের গুদামে আগুণ ধরিয়ে আসা হল। পূর্ব দিকে আসার সময় তারা তিলান নদীর উত্তর পাড়ের সব মানুষকে গ্রাম ছাড়া করিয়ে রসদ দুর্ভিক্ষ তৈরি করল। জানমুনগের দুর্গের বসতি জ্বালিয়ে দেওয়া হল। চতুর্থত সেগুলিকে হয়ত যুদ্ধ বলা যাবে না – সামনা সামনি হঠাত উদয় হয়ে ছোটখাট লড়াই লাগিয়ে দিত। মীর জুমলা হয়ত যুদ্ধে জিতলেন, কিন্তু অসমিয়াদের হৃদয় জিততে পারলেন না, তিনি তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারলেন না। অহোমেরা মুঘলদের সামনাসামনি যুদ্ধে হয়ত হারাতে পারে নি, কিন্তু চোরাগোপ্তা লড়ায়ে মুঘলদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে দিল। এই সফল রণনীতির ফলে মুঘলদের খালি হাতে ফিরে আসতে হয়।
লাখাউতে মীর জুমলা
অহোমদের চোরাগোপ্তা আক্রমণ সহ্য করেই মীর জুমলা ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ পাড় ধরে এগিয়ে চলছিলেন অসমের অক্ষ হৃদয়ের দিকে। মুঘলদের আসমের আরও ভেতরে টেনে নিয়ে আসার রণনীতি নিয়ে অহোমদের ছেড়ে যাওয়া সোলাগড় দুর্গ মুঘলেরা দখল করার পরেই ফুকনেরা শান্তি বার্তা পাঠাল। কিন্তু আগের অভিজ্ঞতায় তিনি সেই বার্তা উপেক্ষা করলেন। এর আগের শান্তিবার্তায় তারা উত্তর দেয় নি। তার মনে হয়েছিল এই শান্তিবার্তা শুধুই সময় কেনার আছিলা আর মুঘলদের সতর্ক প্রহরা এড়ানোর বাহানা।
রাজা, বরগোহাঁই ভিটারুয়াল ফুকন, দুয়ারিয়া গোষ্ঠীর দিহিঙ্গিয়া ফুকনকে লাখাউ-এর নদীর দুপাড়ে মুঘলদের আক্রমনের নির্দেশ দিলেন যাতে তিনি ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা বাহিনীকে লাখাউতে একজোট করার সময় পান। ইতিমধ্যে ধরা পাড়া জনৈক অহোম অভিজাত আর অহোম বাগী সেনাদের একাংশের পথ দেখানোয় মীর জুমলা দিহিং এবং ব্রহ্মপুত্রের মোহানা লাখাউতে ঢুকলেন ৮ মার্চ। পেশকাশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার ব্রাহ্মণ গুরু আর তাম্বুলি ফুকনকে দিয়ে রাজা আবারও শান্তিবার্তা পাঠালেন। মীর জুমলা এই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করে বললেন তিনি শীঘ্রই গড়গাঁওতে পৌঁছে অবস্থা মত ব্যবস্থা নেবেন।
শ্বশুরের বিশ্বাসঘাতকতা এবং তার বাহিনীর বহু সেনানায়ক ছেড়ে চলে যাওয়ায় যতটা পারা যায় তার সম্পত্তি জড়ো করে রাজা জয়ধ্বজ পশ্চাদপসণের সিদ্ধান্ত নিলেন। সব সম্পদ নিতে অন্তত ১,০০০ নৌকো লাগত। অত নৌকো পেলেন না। যা পেলেন তাই নিয়ে চারাইদেও বা নাগা পাহাড়ের নিচের নামরূপের চারাই-খোরং এবং তার পরে তারাইসতএ গিয়ে ঘাঁটি গাড়লেন। মন্ত্রী অনুরাগীদের মন্ত্রণায় সিদ্ধান্ত হল বিশাল মুঘল বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই করে যুদ্ধে জেতা যাবে না। শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় কয়েকজন অভিজাত, মহিষীকে নিয়ে আরও ভিতরে টিপামে বসতি তৈরি করে ভবিষ্যতের জন্য ১ লক্ষ তীরান্দাজ সংগ্রহের পরিকল্পনা করলেন।
গড়গাঁও-এর পতন
বহু অহোম সেনা বাগী নিয়ে মীর জুমলা লাখাউ ছাড়লেন ১২ই মার্চ। বিপুল বাহিনীর অধিকাংশই পিছনে থাকল। ছোট দিহিং নালা দিয়ে তারা আসতেই পারল না। প্রয়োজনীয় রসদ ছোট ছোট নৌকো করে নদীপথে সেনাবাহিনীর জন্য নিয়ে আসা হল। পদাতিক বাহিনী নিয়ে মীর জুমলা গড়গাঁওএর দিকে দেওলগাঁও (১৩-১৪ মার্চ), গাজপুর (১৫ মার্চ) এবং ত্রিমোহনী (১৬ মার্চ) হয়ে নালার পর নালা পেরিয়ে এগোতে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি দিখু নালা পেরিয়ে গড়গাঁওতে ঢুকে রাজার প্রাসাদের পূর্ব পাশে শিবির গাড়লেন।
নাগা রাজা মুঘলদের কাছে বার্তা পাঠাল তারা মুঘলদের সাহায্য করতে চায়। মীর জুমলা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন, কিন্তু জানালেন তারা যদি অহোমদের সাহায্য না করে তাহলে তাদের মুঘলেরা সুরক্ষা দেবে।
নাগা পাহাড় পেরতে না পেরে, রাজাকে নামরূপের নাগা বন্দী শিবিরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দিন কাটাতে হচ্ছিল। রাজধানীর পূর্ব দিকে ১৪ দিনের দূরত্বে ‘ভাগানিয়া রাজা’কে ঘিরে থাকা ৪,৯৮০ জন সঙ্গী বর্ষার আগমনের জন্য দিনগুণতে লাগল। বরগোঁহাঁই তিরুতে আর ফুকনেরা মাজুলির চরে আশ্রয় নিলেন। ঐতিহাসিক মহম্মদ মুনিমের পুত্র মহম্মদ আমিন লিখলেন —
খানইখানান সর্বোচ্চ সেনাপতি,
তার ইচ্ছেতেই যুদ্ধ সমাপ্তির পথে,
তিনি দুটি রাজধানী দখল করলেন আমরা দেখলাম,
সময় কিছু গোপনীয়তায় ছিদ্র বানায়।
এক বছরে অনেক কিছুই ঘটল,
(যেমন) কোচবিহার আর অসমের জয়। (চলবে)