সপ্তম অধ্যায়
দ্বিতীয় পর্ব
কামরূপ, অসমে মীর জুমলার প্রশাসনিক ব্যবস্থা
সেনা শাসন
বাঙলার সঙ্গে যোগাযোগের সুবন্দোবস্ত করতে, আসাম-কামরূপকে শাসনে রাখতে, অহোম বিদ্রোহীদের বশে রাখতে, স্থানীয় রায়তদের শান্ত রাখতে যত তিনি এগিয়েছেন, প্রত্যেক জায়গায় সেনা শিবির তৈরি করতে করতে চলেছেন। প্রত্যেকটিতে একজন সেনা আধিকারিক আর তার নেতৃত্বে একটি বাহিনী রাখা ছিল। গৌহাটির ফৌজদারির জন্য মহম্মদ বেগ আর কালিয়াবরের জন্য নাসিরুদ্দিন খানকে নিয়োগ করলেন। আতাউল্লা হুসেন বেগ, সৈয়দ আলি মির্জা, আলি রাজা বেগ, আনওয়ার বেগ, মীর নুরুল্লা এবং মহম্মদ মুকিমকে যথাক্রমে যোগীগুপা, কাজলি, সমধারা, দেওলগাঁও, গাজপুর, ত্রিমোহনী এবং রামডাঙ্গের থানাদার নিযুক্ত করা হল। ইবন হুসেনের নেতৃত্বে ৩২৩টা নৌবহর রাখা হল। তাকে সাহায্যের জন্য দেওয়া হল জামাল খান, আলি বেগ, অন্যান্য আধিকারিক এবং মুনাবর খান এবং অন্যান্য বাংলার জমিদারদের। অহোমদের মাজুলি ঘাঁটির জবাবে লাখাউ হল মুঘল নৌঘাঁটি। জনসাধারণ যাতে হঠাৎ হঠাৎ ঢুকে আসতে না পারে গড়গাঁওএর প্রাসাদে পাহারা বসানো হল। টাঁকশাল তৈরি হল সম্রাটের নামে টাকা আর খুচরো তৈরির উদ্দেশ্যে। কিন্তু স্থায়ী সরকারের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল না।
মীর জুমলার যথাযথ তথ্য পাওয়া খুব জরুরি ছিল এবং তিনি এর জন্যে কঠোরতার নীতি নিয়েছিলেন। কালিয়াবরে ভুল খবর দেওয়া মুসলমান চরের জিভ কেটে নেওয়া হল, চাকু চালাবার মত তার পিঠে চাবুক চালানো হল।
অহোম রাজধানী দখলের অর্থ কিন্তু অহোম বিদ্রোহ শেষ হওয়া নয়। বিভিন্ন এলাকায় থানা বা চৌকি তৈরি করা হলেও সেগুলোর ওপরে রাজার অনুগত অহোমি সেনা বাহিনীর গেরিলা আক্রমণের বিরাম ছিল না। মীর জুমলা যখন গড়গাঁওতে পৌঁছলেন, তার কিছু দিন পরে গড়গাঁওয়ের উদ্দেশ্যে আসা সোনারূপোয় ভর্তি ছটা নৌকো অহোমিরা দখল করে নাবিক-সেনাদের হত্যা করে। রাজার প্রাক্তন আমলা আর গুপ্তঘাতকদের দল মুঘল বাহিনীকে অতিষ্ঠ করে তুলছিল। তাদের চেষ্টা ছিল বর্ষা আসা পর্যন্ত তাদের শিবিরে রসদ আসা ঠেকানো যায়, তারা তাতে সফল হচ্ছিল।
আশ্চর্যের, সেই বছরেই সময়ের অনেক আগে বর্ষা এল। মীর জুমলার পরিকল্পনা ছিল রসদের আকাল কাটাতে বর্ষাকাল লাখাউতে কাটাবেন। কিন্তু রাস্তাঘাটের অসুবিধের জন্য দখল করা মালপত্র পাঠানো সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। গড়গাঁওয়ের ৭ মাইল দক্ষিণপূর্বে মুথুরাপুরে বাহিনীর মূল ছাউনি ফেললেন (৩১ মার্চ)। শিবির তৈরি হল উঁচু জমিতে। সুন্দর পরিবেশ। এলাকায় প্রচুর ফল গাছ ধানি জমি থাকা। বাহিনীর নিত্য খাবারের সমস্যা অনেকটা মিটল। অহমিয়াদের চোরাগোপ্তা আক্রমণের রুখতে সতর্ক থাকলেন।
গড়গাঁওতে গোলান্দাজ গুদাম, হাতিশাল, রসদ ভাণ্ডার, সেনাবাহিনী সম্পত্তির ভার দেওয়া ছিল মীর মুর্তাজা, রাজা অমর সিং এবং ৫০জন রিসালাদার আর কিছু বন্দুকবাজকে। প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র রেখে বাকি ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হল। দেওয়ানিতন মীর সৈয়দ মহম্মদকে স্থানীয় রায়তদের শান্ত করার ভার দেওয়া হল। বাজেয়াপ্ত মালের দাম ঠিক করার আমলা মহম্মদ আবিদ রাজার প্রাসাদের সম্পত্তির খতিয়ান নিলেন, সেনাবাহিনীর বেতন দিয়ে বাকি অর্থ ঢাকায় পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন। মহম্মদফ খলিল আমিনি পদে এবং সম্পত্তি দেখাশোনার কাজে মহম্মদ আশরফকে নিযুক্ত হলেন।
গড়গাঁও আর মথুরাপুরের চারপাশ পুলিশি চৌকি দিয়ে ঘেরা ছিল। অহোম সেনাবাহিনীর বাগীদের সাহায্যে সাহায্যে মীর জুমলা সাইরিং, শিলঘাট, টাউকাক, ছররা, রাওখাম, সিনাতোলির মত ১০০টা গ্রাম দখল করলেন। বরগোঁহাইদের আক্রমন আটকানোর জন্যে দক্ষিণের পাহাড়ের সালপানি মিয়ানা খানের প্রশাসনের অধীনে দেওয়া হল। গড়গাঁও আর সালপানির মধ্যে দেওপানির কর্তৃত্ব দেওয়া হল গাজি খানকে, গড়গাঁওয়ের উত্তরপূর্বের দিহিং তীরের দায়িত্ব দেওয়া হল জালাল খানকে। অহোমদের নিয়মিত আক্রমন সত্ত্বেও মুঘল অটুট ছাউনিগুলি দাঁড়িয়ে থাকল।
অসম যুদ্ধে অধিকৃত জিনিসপত্রের ব্যবস্থা
যুদ্ধে দখল করা মালামাল যেহেতু সাম্রাজ্যের সম্পত্তি, সেগুলির নিরাপদে রাখার দায়িত্ব মীর জুমলা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। সিমলাগড়েই হোক অথবা কালিয়াবরে যে সব হাতি, কামান, জাম্বুরক, বন্দুক, বারুদ অহমিয়ারা ছেড়ে গিয়েছিল, এক আধিকারিককে দিয়ে সেগুলি দখল নিয়ে তালিকাভুক্ত করাছিলেন। দেওলগাঁওতে কয়েকজন মুসলমান রায়তের থেকে শুনলেন হাতি সহ বেশ কিছু শনাক্ত না করা দ্রব্য রাজা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন নি, ফেলে রেখেছেন। দিওয়ানিতন মীর সৈয়দ মহম্মদ এবং ফরহাদ খানকে সেই দ্রব্যগুলি আনতে পাঠালেন। উতসাহী সেনাপতি ভাগানিয়া রাজা আর ফুকনদের পদ্ম পুকুরিতে ছুঁড়ে ফেলা প্রচুর এ ধরণের অস্ত্রশস্ত্র নিজে উদ্ধার করালেন। মথুরাপুরেও তিনি মীর মুরতাজাকে দিয়ে যুদ্ধাস্ত্র সংগ্রহ করেছেন।
অসমে যুদ্ধ অধিকৃত সংগ্রহর পরিমান বিশাল, ৮২টি হাতি, সব থেকে দামি হল ৩ লাখ নগদ টাকা, রাজার ফেলে যাওয়া নানান ধরণের মালপত্র। অভিযানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৩ মন গোলা ছোঁড়ার মত ৬৭৫টা কামান — একটা বড়, লোহার, ১৩৪৩টা উটের ঘোরানো কামান, ১২০০ রামছাঙ্গি, ৬৫৭০টা গাদা বন্দুক (ম্যাচলক), ৩৪০ মন বারুদ, ১৯৬০ সিন্দুক সোরা — এক একটার ওজন দুই থেকে আড়াই মন, ৭৮২৮টা লোহার ঢাল, ওজন করা হয় নি লোহা, সোরা আর গন্ধক, ১৭৩টা ধানের গোলা — প্রত্যেকটায় ১০ থেকে ১০০০ মন ধান, বহু বছরের রাজা আর ফুকনদের জন্য সঞ্চিত খাদ্য, যা তারা পোড়াতে ভুলে গিয়েছিল — যার অভাবে মীর জুমলার বাহিনীকে হয়ত অভুক্ত মরতে হত (৮)।
কালিয়াবরের উজানি এলাকায় অহোম নৌবাহিনী পর্যুদস্ত হলেও রাজার নৌশালে প্রচুর নৌকো ছিল। মীর জুমলা একটি নৌশাল লাখাউএর কাছে আর একটি ত্রিমোহনীর নৌশাল ঘুরে দেখেন। লাখাউতে ১০০টা বাছারি ছপ্পরপোয়ালা (ঘাসের ছাদওয়ালা) জাহাজ, ৭০, ৮০, ১০০, ১২০ হাত (কিউবিটস) লম্বা, পোক্ত এবং দারুণ সাজের। যদিও অসমিয়ারা গড়গাঁও নৌশালার বিড় ১২০টা সমুদ্রে যাওয়া সাজসজ্জার বাছারি জাহাজ ডুবিয়ে চলে গিয়েছিল, তবুও ৬০, ৭০, ৮০ নাবিক বহনক্ষম সমুদ্রগামী ১০০০ জাহাজ মীর জুমলা উদ্ধার করেন।
অসমিয়া বন্দুক এবং বারুদ তৈরির প্রযুক্তিবিদদেরকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। মাহুত পাওয়া গেল না।
কর্নাটকের মত অসমেও মীর জুমলা মন্দির লুঠ করলেন। কাজলি দখল করার পর কামাখ্যা, লুনা চামরি এবং ইসমাইল যোগী মন্দির মুঘল নিয়ন্ত্রণে নিলেন। উজানি অসমে জানতে পারলেন ময়দাম বা কবরে প্রচুর সোনাদান থাকে। একটা কবর থেকে ৮০ বছর আগের রাণীর ৯০০০০ টাকা মূল্যের পানবাটা লুঠ করে হাড় গোড় ছড়িয়ে ফেললেন। অহোম রাজা দুঃখে মন্তব্য করল, এন তিনি পূর্বজদের হাড়ও বাঁচাতে পারলেন না। অজানা ডাচ নাবিক লিখল, ধনীদের কবর (লুঠ করতে) পেলে তাদের আর কে চায়? ঢাকায় মানুচি দেখলেন গড়গাঁও ইত্যাদি এলাকা থেকে জাহাজ বোঝাই করে লুঠের মাল আসছে।
অসমিয়াদের প্রতি মীর জুমলার ব্যবহার
বিদ্রোহীদের চরম সাজা হয়েছে। তিনি সেনাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন অবাধ্য অসমিয়াদের খুন করতে। একজন ডাচ নাবিক বলছেন প্রত্যেক কাটা মাথা ‘উপহারের’ জন্য ৫০ টাকা জীবিত ধরে নিয়ে এলে ১০০টাকা পারিতোষিক দেওয়া হত। মুঘলদের হাতে যে সব অসমিয়া ধরা পড়েছে তাদের প্রচণ্ড অত্যাচার করে মাথা কেটা হয়েছে। অত্যাচারের কারণ ছিল অহমিয়ারা যাতে ভয় পেয়ে মুঘলদের বাহিনীতে যোগদান করে।
মুঘল সাহায়কদের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করা হয়েছে। যুদ্ধের সঙ্গে জুড়ে না থাকাদের উন্নতির জন্যে মীর জুমলা নানান ব্যবস্থা করেছেন। তিনি কৃষকদের মন জেতার চেষ্টা করেছেন। লুঠ, ধর্ষণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। নারীলোলুপ সেনারা হতাশ হয়েছিল। সেনাবাহিনী অসম থেকে না ফেরা পর্যন্ত নির্দেশ ছিল — ‘বাহিনীর কোন আমীর, সেনা, তাঁবেদার কোনও অসমিয়া মহিলা বা তার পারিবারিক সম্পত্তিতে লোভ করবে না। আদেশ অমান্য করা সেনাকে সারা শহর ঘোরানো হবে, কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।
একবার একটি গ্রাম অবরোধের ফলে পালিয়ে যাওয়া গ্রামবাসীদের মধ্যে একজন ফেরত এসে মুঘল সেনার কাজে বাধা দেয় এবং গ্রেফতার হয়। ফারহাদ খানএর মহম্মদ মুকিম বেগকে নির্দেশ দেন গ্রামে গিয়ে গ্রেফতার হওয়া মানুষটিকে খুন করে তার সম্পত্তি লুঠ করতে এবং স্ত্রী আর সন্তানদের ওপর অত্যাচার করতে। মীর জুমলা নির্দেশটি খারিজ করে গ্রেপ্তার হওয়া মানুষটিকে ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য গ্রামীনদের সুরক্ষা নিশ্চিত করেন। অহোমদের অত্যাচারে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তাদের বিভিন্ন শহরে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেন মীর জুমলা। সিমলাগড়ে বহু কামরূপী মুসলমান বন্দী ছিল তাদের মুক্তি দেন মীর জুমলা।
গড়গাঁওতে পৌঁছে তিনি ঘরছাড়া রায়তদের ফিরিয়ে এনে, পুনর্বাসনের নির্দেশ জারি করলেন। কামরূপের অধিবাসীদের বাড়ি তৈরির সাহায্য, একবছরের জন্য চাষের রাজস্ব ছাড় দেওয়ার নির্দেশ দেন। আর একটি নির্দেশে হিন্দু মসলমান নির্বিশেষে রাজা বা অহোম অভিজাতদের কাছে যারা দাসের মত থাকতেন, এবং যারা মুক্তির আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তাদের মুক্তির নির্দেশ দিয়ে খাসা নৌকো করে বাড়ি পৌঁছে দেন এবং তাদের যেসব জিনিসপত্র লুঠ হয়েছিল সেসবও ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
এতদ সত্ত্বেও প্রজাদের মন জয়ের বিষয়টি সহজ হয় নি। তালিশ দুঃখ করে লিখছেন, মীর জুমলার মহানুভবতা বা উল্টোদিকের রাজার অত্যাচারেও অসমিয়ারা ইসলামিদের অনুগত হল না। হয়ত মীর জুমলার মন্দির ধ্বংস-লুঠ বা কবর লুঠে মানুষের মনে এমন ঘৃণা জেগেছিল যে তারা মুঘল বাহিনীর প্রতি সদিয় হয় নি। তবে বিদ্রোহীদের প্রতি কঠোরতা আর জনগণকে সাহায্য করার নীতিতে অসমিয়ারা বুঝল মুঘল থানা আক্রমন করে লাভ নেই। দখিনকোল অঞ্চলের মানুষেরা বশ্যতা স্বীকার করল আর উত্তরকোল অঞ্চলের মানুষ আস্তে আস্তে বুঝতে পারল বর্ষার সময়ের দুর্যোগে তাদেরও মুঘলদের কাছে অবনত হতে হবে।
তৃতীয় পর্ব
অসমে মীর জুমলার দুর্দশা
মীর জুমলার দুর্দশা শুরু
এতদিনের বিজয় যাত্রায় মীর জুমলার বাহিনী যে কষ্ট ভোগ করেছে, সেই দুর্দশাকে তুচ্ছ মনে হল এর পরের সময়ে মুখোমুখি হওয়ার দুর্যোগের প্রাবল্যে। রাশিয়ার শীত যেমন ফরাসি, জার্মানদের মাটি ধরিয়ে দিয়েছিল, অসমের বর্ষাকালও মীর জুমলার সেনা দলের মাথা ব্যথার কারন হয়ে উঠল – নদীগুলো সমুদ্রের মত হয়ে উঠল, নালাগুলো হঠাতই রূপ পাল্টে টইটম্বুর নদী হয়ে গেল। অহমিয়াদের তীব্র আতঙ্ক মুঘল উড়তা ঘোড়সওয়ার বাহিনী বর্ষায়, কাদায়, জলাজমিতে দৌড়োরে না পেরে দাঁড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। মীর জুমলার কপালে ভাঁজ বাড়ল। শুকনো এলাকায় চতুরঙ্গ নিয়ে লড়াইতে অভ্যস্ত মুঘলদের বিরুদ্ধে আসামে বর্ষার এই অজানা অনভ্যস্ত পরিবেশেও অসমিয়া সেনা মুখোমুখি লড়াই না করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা জানে প্রতিকূল পরিবেশেও বিশাল পেশাদার মুঘল বাহিনীর বিরুদ্ধে সামনা সামনি লড়াই তাদের বিন্দুমাত্র জেতার সুযোগ করে দেবে না। অহমিয়ারা পূর্ব সিদ্ধান্ত মত মুঘলদের অচেনা গেরিলা রণনীতি নিয়ে শাহী বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলার সিদ্ধন্ত নিল। দিনে লুকিয়ে থেকে রাতে হঠাত হঠাতই মুঘল থানা আক্রমণ করতে থাকে তারা। মুঘলেরা এই রণনীতির প্রত্যুত্তর দিতে পারল না। এছাড়াও যে সব গ্রামীন মুঘলদের কাছে আত্মসমর্পন করেছিল, তাদের ওপর আক্রমন চালাতে লাগল অহমিয়ারা। মুঘগলদের স্থানীয় সমর্থন পাওয়ার, জরুরি সময়ে রসদ জোগাড়ের সুযোগ কমতে থাকে। এই অঞ্চলে আসা, বেরোনোর সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দিল, অহমিয়াদের চকিত, অতর্কিত আক্রমনের ফলে খবর দেওয়া নেওয়ার ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হল, মুঘলদের সবরকম সমস্যা চরমে পৌঁছল। লাখাউ আর গড়গাঁওএর মধ্যের নৌ বাহিনীর রসদ আসার রাস্তায় সক্রিয় বাধা তৈরি করল অহমিয়ারা। রক্তচোষা তীরের ভয়ে মুঘল সেনার প্রকাশ্যে বেরোনো প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। এমন কী মথুরাপুর আর গড়গাঁও ঘাঁটিতে মুঘলদের তীরান্দাজ সেনা নিয়ে বেরোতে হল। আত্মসমর্পনকরা গ্রাম দেবলগাঁওয়ের ওপরে আক্রমণ সজাগ থানাদার রুখে দিলেও, ভিটারুয়াল ফুকন অতর্কিতে হানা দিয়ে ১০ মে আনোয়ার বেগকে খুন করে গজপুর থানা দখল নেয়। ত্রিমোহনী থেকে গজপুর পর্যন্ত দিহিং নদীতে মুঘল সেনার রসদ আসায় বাধা তৈরি করল অহোম বাহিনী। তিয়কের উজানি এলাকায় সমস্ত মুঘল ব্যাপারীর জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেল অহমিয়াদের আক্রমনে। ফলে সব ধরণের পথে, সব দিক দিয়েই রসদ আসা বন্ধ হয়ে গেল। দিহিংএর বন্যা আর শালপানি পাহাড় থেকে নেমে আসা তীব্র বেগের জল মুঘল দারিয়াবাদী এবং মিয়ানা খানের পদাতিক বাহিনী আর রিসালাকে শিবিরে আটকে বসে থাকতে বাধ্য করল। বর্ষার মধ্যেই পাহাড় থেকে অহোমরা তীব্রবেগে নেমে এসে গড়োগাঁও ঘিরে ফেলে। এই আক্রমণের বিরুদ্ধে সতর্কভাবে মুর্তাজা বাধা দিতে থাকে। সে জানে এই বর্ষায় তাকে সাহায্যের শিবির থেকে উদ্ধার বাহিনী আসা সম্ভব নয়। বরগোঁহাইর ভাইপোর নেতৃত্বে ১০/১২,০০০ বিশাল সেনা দেওপানি থানা ঘিরে ধরল। খুবই কম সেনা নিয়ে পাল্টা আক্রমনে অহোম গেরিলা বাহিনীর নেতাকে মেরে ফেলে মুঘলেরা। বাধ্য হয়ে অহমিরা পিছিয়ে যায়। গড়গাঁও, মথুরাপর অভয়পুরের রায়তেরা গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেল।
মুঘল আর আহোমদের মধ্যে একের পর এক চোরাগোপ্তা লড়াই, খুন, জখম এত বেশি হতে শুরু হল যে মুনসি আর ঐতিহাসিকেরা সেগুলোর হিসেব রাখা বন্ধ করে দিল। কবর খুঁড়ে পূর্বজদের বার করে তাদের সম্পদ লুঠ করে, ইয়াদের মরদেহকে প্রকাশ্যে ছড়িয়ে ফেলার অপমানের ঘটনার প্রতিশোধে মুঘল সেনাদের যে কোনও মূল্যে শাস্তি দিতে, হত্যা করতে নির্দেশ দিলেন রাজা। বেশ কয়েক শত সেনা হত্যা করেও গেরিলা যুদ্ধে দক্ষ অহোমরা দেখল, মুঘল সেনার শক্তি খুব বেশি কমে নি।
বর্ষায় থানাগুলির বিচ্ছিন্নতা, পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব মীর জুমলার মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠল তীব্রভাবে। ১৬৬২র মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মুঘল বাহিনীকে শিবিরেই বসে থাকতে হল। সেনাপতিদের ওপর মীর জুমলার নিয়ন্ত্রণ এতই প্রবল ছিল যে শিবিরে বসে থাকা বাহিনী তাদের জীবনের বিনিময়ে নানান আঘাতের বিরুদ্ধে প্রত্যাঘাত করতে থাকে। তালিস লিখছেন, যুদ্ধের ধড়াচূড়া একেবারের জন্যও খোলার সময় পাচ্ছেনা মুঘল সেনা; যে সেনা ধুলো সহ্য করতে পারে না, তাকেই কাদা মেখে সারাদিন জলে ভিজে, সূর্যের রোদ্দুরে পুড়ে যুদ্ধ করতে হয়; ঘোড়ার জিন একদিনের জন্যেও খোলা হয় না; চাকরেরা তাদের প্রভুদের সেবা করতে পারে না; পালগাঘন্টি বাজলেই সময় খরচ না করে প্রত্যেককে হাতে খোলা তরোয়াল ধরতে হয়।
নৌবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করার ব্যার্থতা
মীর জুমলা ছাড়া অন্য কোন সেনা নায়কের পক্ষে বর্ষার অসমের মৃত্যুমুখী পরিবেশ থেকে মুঘল সেনা বাহিনীকে আসাম বের করে আনা সম্ভব ছিল না। তাঁর ঠাণ্ডা মাথা, প্রজ্ঞা, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, কয়েক দশক নানান সমস্যা সঙ্কুল যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা জন্য মুঘল বাহিনীর পক্ষে যতটা পারা যায় কম ক্ষতি সয়ে আমাদের মৃত্যু উপত্যকা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভবপর হয়েছিল। যেখানে যখন প্রয়োজন সেখানে তিনি প্রয়োজনীয় ত্রাণ পাঠালেন। তার প্রথম পরিকল্পনা ছিল নৌবাহিনীকে সফলভাবে ব্যবহার করা। নাওয়ারা তার অসম আক্রমণের প্রাথমিক জীবনী শক্তি। তাই এই দুর্যোগের মধ্যে তাঁর প্রথম চেষ্টা হল নৌবহরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা। দেবলগাঁওয়ে আক্রমণের সংবাদে থানাদার আলি রাজার সাহায্যের জন্য পাঠাললেন ইয়াদগার খান উজবেগকে, থানা আক্রমনকারীরা পালাল। কিন্তু গজপুরের থানাদার সারান্দাজ খান লাখাউয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হলেন তিনি। নালায় বন্যার জন্য তিনি তিয়ক থেকে বেশি দূর পর্যন্ত পৌঁছতে পারেন নি। মীর জুমলা মহম্মদ মুরাদকে নৌবাহিনী দিয়ে এবং পরে পদাতিক দিয়ে সারান্দাজ খানকে উদ্ধারের নির্দেশ দিলেন। কিছু আধিকারিকের অযোগ্যত্যার জন্য পরিকল্পনাটি মাঠে মারা গেল লড়াই না করেই সেই বাহিনীকে ধরতে সমর্থ হল আহোমরা। ২৩ মে মুরাদ ত্রিমোহনীর দিকে পালাল আর দিলির খানের নেতৃত্বে কিছু নৌকো সুরক্ষিত অবস্থায় দেবলগাঁওতে ফিরে আসতে পারল। মীর জুমলা হাসানকে দেওপানি ঘিরে বসে থাকা অহোমদের ধংস করতে পাঠিয়েছিলেন, তিনি সেই কাজ করে দেখালেন। গড়গাঁওএর নিরাপত্তার জন্য এবারে সৈয়দ সালার খানের নেতৃত্বে ৫০টি ঘোড়সওয়ার বাহিনী রইল।
ফারহাদ খানকে মীর জুমলা নির্দেশ দিলেন রাস্তার দুপাশে অহোমদের বাধা হঠিয়ে লাখাউ থেকে রসদ আনা, এবং গজপুরে থানা বসানো আর ত্রিমোহনি আর রান্ডাংএর সিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে। ফারহাদ খানকে সাহায্য করার জন্য মীর জুমলার নিজের বাহিনী থেকে সিপাহি সরদার হিসেবে দিলেন আবুল হাসানকে। কিন্তু এই বিশাল কাজটি ব্যর্থ হতে বসল নৌকোর অভাবের জন্য। গড়গাঁও থেকে ২৭ মে রাতে বেরিয়ে তারা তিয়কে (ত্রিমোহনী আর গজপুরের মাঝে) আটকে গেলেন বন্যার দুর্বিপাকে। জলে ভরা সমতল মাঠ যেন বর্ষার বিশালকায় হয়ে ওঠা দিহিং-এর থেকেও বিপুলাকায় নদীর মত দেখাল। রাস্তাই দেখা গেল না। আকাশ থেকে যত না জল ঝরছে, তার থেকে বেশি জল; উঠছে মাটির নিচ থেকে। তাঁবুগুলো যেন জলের বুদবুদের মত দেখতে লাগল। রিসালারা সারারাত তাদের ঘোড়ার ওপরে আর পদাতিকেরা তাদের পায়ের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হল। অসহায় ফারহাদ ত্রিমোহনী থেকে সারান্দাজকে সঙ্গে নিয়ে ফিরতে গেলেন। পিছন ফিরে দেখলেন রাস্তাজুড়ে গভীর খাত কাটা আর ছুঁচোল শালবল্লার খুঁটি দিয়ে ঘেরা। অসমিয়ারা খাতকে দিহিঙ্গের সঙ্গে জুড়ে তাদের যেন দ্বীপের মঝখানে আটকে দিয়েছে। এবারে ভিটারুটয়াল ফুকন তার নৌবহর নিয়ে মুঘলদের চারপাশে ঘুরতে লাগলেন। নৌবহর আর প্রয়োজনীয় রসদ ছাড়া সেনাপতির ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এই সময় ক্ষুধার্থ সেনাকে নিজেদের ঘোড়া আর বাহিনীর ষাঁড় কেটে খেতে হয়েছে। মহম্মদ মুনিম বেগ আর এক্কাতাজ খান মীর জুমলার নির্দেশে এলেও তারা ত্রিমোহনী থেকে বন্যার জন্য বেরোতে পারলেন না। হাতির পিঠে চাপিয়ে উদ্ধারকারী দল পাঠানোর অবাস্তব পরিকল্পনা বাতিল করতের হল। ফারহাদের ইঙ্গিতে সুজন সিং-এর বাহিনী অহোমদের নৌবাহিনীর একাংশের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিলে ফারহাদ ভোরে কয়েকটি ছিটিয়ে থাকা অহোম নৌবাহিনীর ওপর অতর্কিতে হানা দিয়ে ৪১টা আহমিয়া নৌকো দখল করেন, তার অধিকাংশ খাসা। ছিনিয়ে নেওয়া নৌকো বাহনে ৫ জুন মুঘল বাহিনী ত্রিমোহনী পৌঁছল। (চলবে)