| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা : জগদীশ নায়ারণ সরকার (৪১নং কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৪০০ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২২

সপ্তম অধ্যায়

তৃতীয় পর্ব

গড়গাঁও বিচ্ছিন্ন হল

ফারহাদ খানের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ রূপে ব্যর্থ হয়ে পড়ায় অহোমেরা পূর্ণদ্যোমে সব রাস্তা বন্ধ করে দিল। এমন অবস্থা তৈরি হল যে থানা থেকে কেউ বেরোতেও পারল না কেউ ঢুকতেও পারল না। মীর জুমলা সব থানা বন্ধ করে দিলেন। অভয়পুর থেকে মথুরাপুর খুব কষ্ট করে ফিরে এলেন আজম খান। অন্যেরা গড়গাঁওতে ফিরে এলেন। দিখুর পূর্ব দিকে পাহারা দিচ্ছিল সারান্দাজ খান আর মিয়ানা খান, পশ্চিমে মীর মুর্তাজার নেতৃত্বে জালাল খান দারিয়াবাদী, গাজি খান এবং মহম্মদ মুকিম। লাখাউএর পূর্ব দিকের সম্পূর্ণ দেশটি অহোমদের দখলে চলে যায়, শুধু মুঘলদের হাতে থাকে গড়গাঁও এবং মথুরাপুরটুকু। নিরাপত্তা বাহিনী ছাড়া বাইরে বেরোনো অসম্ভব হল। মীর জুমলার সামনে নিস্তারের আর কোন আশা নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্যে কোনও বাহিনী উদ্ধারে আসা বাস্তবিকভাবে সম্ভব হল না। খাদ্য, যুদ্ধ, কোনও রসদই মুঘল শিবিরে প্রবেশ করছে না। সক্কলে ফিরে যাবার আশা ছেড়ে দিল। তারা কোন খবরই বাইরে পাঠাতে পারছে না, হিন্দুস্তানের বাড়িতে বাড়িতে মুঘল সেনাবাহিনীতে যাওয়া মানুষদের অগ্রিম শেষ কৃত্য সম্পন্ন করে ফেলল। তালিস লিখছেন, ‘বাবা আদমের সময় থেকে এই প্রথম ১২ হাজার মুঘল পদাতিক, অসংখ্য সংখ্যক রিসালা, অগুনতি শিবির ছ-মাস কাজ ছাড়া ক্ষমতাহীন হয়ে বসে থাকল চুপচাপ। এ যেন স্রোতের বৃত্তের মধ্যে গণ্ডী কেটে অসহায় সময় কাটানো। বাইরে কেউ পা ফেলতে সাহস করছে না’।

মুঘলদের দির্গতির চূড়ান্তে ফেলে অহোমেরা দ্বিগুণ উৎসাহে পরিকল্পনা সাজাতে লাগল। অভিজাতদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে রাজা তাদের যুদ্ধে যাবার জন্য উৎসাহিত করতে লাগলেন। তিনি নামরূপ থেকে বেরিয়ে গড়গাঁও থেকে মাত্র চার দিনের পথ শোলাগুড়িতে শিবির ফেললেন। বাদুলি ফুকনকে তার নং ফুকনরূপে বা প্রধানমন্ত্রী এবং সেনানায়ক পদে বৃত করলেন এবং নির্দেশ দিলেন মুঘল সেনানীদের হত্যা করে মীর জুমলাকে ধরে আনার জন্য। আসামজুড়ে অহোমবাসীকে নির্দেশ দেওয়া হল বাদুলি ফুকনকে যে কোন প্রকারে সাহায্য করার জন্যে। ২-৩ দিনের মধ্যেই বাদুলি ফুকন ৬ মাইল দীর্ঘ, বিশাল চওড়া এবং বহু উঁচু, আর চরম শক্ত বিশাল বিশাল বুরুজুওয়ালা বাঁধ তৈরি করে মথুরাপুর পূর্বের দিল্লি নদীর তীর, দক্ষিণী পাহাড়ের সঙ্গে দিহিং নদীর সংযোগ ঘটিয়ে ফেলল। মথুরাপুরের ওপর তার রাতের আক্রমন দিলির খান বিফল করেছিলেন। বাদুয়লি ফুকন আর বরগোহাঁইএর যৌথ বাহিনীর আক্রমন শুরু হওয়ার আগেই শিলিঘাটের মুঘলেরা নামরূপের দক্ষিণে বুরহাটে চলে এসেছিল। সাইরিঙ্গএর রাজা আগামী দিনের চক্রধ্বজ সিংহ, বা চারিং রাজা গড়গাঁওএ আক্রমণ করলে সুজন সিং প্রতিহত করেন। এরকম প্রচুর ছোটখাট লড়াই চলতে থাকে।

গড়গাঁও ধরে রাখার লড়াই

বাদুলি ফুকন এবারে গড়গাঁও অবরোধ করলেন। শিবিরে মীর জুমলা উপস্থিত না থাকলেও, এখানে শাহী বাহিনীর বিপুল সম্পত্তি, রসদ, পশু, গোলাবারুদ এবং বেশ কিছু যুদ্ধ নৌকো ছিল। তাই এই শিবিরের নিরাপত্তা আঁটসাঁট করে রেখেছেন তিনি। ১৪ জুন তিনি ফারহাদ খানের নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠালেন মীর মুর্তাজার নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য। ১৬টি জলবা আর ১৮ খাসা তৈরি রাখা হল। বাগানের পশ্চিমে শত্রুর কাটা পরিখা বোজানো হল, শহরের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে দিখুর তীর পর্যন্ত বাঁশের কেল্লা তৈরি হল, বিভিন্ন দিকে প্রয়োজনীয় টহলদার মোতায়েন করা হল। অসমের চাচনি গ্রাম থেকে মুসলমান বন্দুকবাজ দিয়ে উত্তরের দিকে নিরাপত্তা বিধান করা হল।

রাজধানীতে পরপর কয়েকটি রাত জুড়ে আক্রমন চালিয়ে গেল অহোমেরা। ৮ জুলাই, উত্তরের বাঁশের বেড়ার পিছনে নিরাপত্তায় বাকসারিয়া বন্দুকবাজদের খতম করে দুর্গের অর্ধেকটা দখল করে নিল তারা। দুর্গের ভিতর থেকে প্রবল প্রতিরোধ তৈরি করে তীব্র এই আঘাত সামলে নিল মুঘলেরা। ভুল বুঝতে পেরে পরের দিন বাঁশের দেওয়ালের বদলে মাটির দেওয়ালের প্রতিরোধ গড়লেন সেনাপতি। এক হপ্তার মধ্যে কয়েকটি বুরুজ দিয়ে একটি বিশাল চওড়া দেওয়াল তৈরি হয়ে গেল। গড়গাঁও-এর নিরাপত্তা বিধানে মীর জুমলা এই দেওয়ালের প্রশংসা করেছিলেন। অহোমদের রাতের আক্রমন ক্রমাগত চলতেই থাকল, কিন্তু যুদ্ধে আহত, অসুস্থ হয়েও ফারহাদ সারা রাত পাহারায় থাকতেন। মীর জুমলা অহোম বন্দুকবাজদের থেকে ডাঙ্গা নালার মুখের সেতু পাহারা দেওয়ার জন্য প্রত্যেক রাতে ২০০ বাহিনী নিয়োগ করেছিলেন, তারা সুখ স্বাচ্ছন্দ্য না দেখে গোটা রাজধানীর নিরাপত্তায় নজর রাখত। সারা রাত জেগে থেকে ভোরে মথুরাপুরে ফিরে যেত।

মীর জুমলা ফরহাদের প্রতি যে অসীম আস্থা পেশ করেছিলেন, তার পরিপূর্ণ প্রতিদান দিলেন তিনি। ১২ তারিখ রাতে চারদিক থেকে চারটি বাহিনীর রাজধানী আক্রমণের ঝাঁঝ রুখে দিয়েছিলেন। ফারহাদের রণনীতিতেই সৈয়দ সালারের দারিয়াবাদী বাহিনী, অসমিয়া বাহিনীর গণহত্যার হাত থেকে বেঁচেছিল। তিনি শহরের মাঝে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় রদস মুহুর্মুহু চার দিকে পাঠাবার ব্যবস্থা করছিলেন। শিহাবুদ্দিন তালিশ লিখছেন, একমাত্র তার বাহিনীরই পরাক্রমে উত্তরপশ্চিমে আহোমদের আক্রমন থেকে শহরটি বেঁচেছিল।

গড়গাঁও-এর সুরক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন মীর জুমলা রাতদিন ‘দূরের গোলমালের দিকে কান খাড়া’ করে রাখতেন। বিশাল উঁচু কাঠের মিনারে দাঁড়িয়ে গড়গাঁওতে আগুণ দেখা যাচ্ছে কিনা, তার নিরাপত্তা কর্মীরা লক্ষ্য রাখতেন। শাহাবুদ্দিন তালিশকে তিনি বলেছিলেন, ‘সকালের নামাজের পরে সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে আমি পাতা কার্পেটের ওপরেই ঘুমোতাম। সেখানেই আমার সারা রাত দিন কাটত।’

১৫, ১৬, ১৮ জুলাই অহোমিয়ারা নতুন করে আক্রমন শানাল। কিন্তু গড়ের নিরাপত্তা ভাঙতে পারল না তারা। অসুস্থ, আহত ফারহাদের জায়গায় মীর জুমলা রশিদ খানকে দায়িত্বে দিলেন। গড়গাঁওএর চারপাশের কাটা পরিখা, বিশেষ করে কাকুজানের (২৩ জুলাই) রশিদ খান নিজে ঝটিকা আক্রমন করে অহোমদের তাঁর পরাক্রমের মাত্রা বুঝিয়ে দিলেন। দিল্লি নদীর পাশেই কাটা পরিখা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিল অহোমবাহিনী। তারা দাঙ্গা নদী পেরিয়ে চলেও গেল। বহুকাল পরে গড়গাঁওতে শান্তি ফিরে এল।

রণঅক্লান্ত ফুকন তার আক্রমণের ব্যর্থতার মাত্রা বুঝতে শুরু করলেন। রাতের আক্রমন, রসদ সরবরাহের ওপর আঘাত হানা অথবা মুঘল শিবিরের ওপর তীব্র আক্রমনেও মুঘল বাহিনীর সেনাপতির মনোবলে চিড় ধরল না। দিলির খানের মধ্যস্থতায় হয় নিজের উদ্যোগে অথবা রাজার নির্দেশে ফুকন শান্তি প্রস্তাব দিয়ে চললেন (জুন-জুলাই)। উত্তরে মীর জুমলা কিছু কঠিন শর্ত দিলেন, যাতে তাকে অহোমেরা দুর্বল না ভাবে – রাজাকে প্রথম দাঁত কাটা ৫০০ হাতি দিতে হবে, ৩০ লাখ তোলা সোনা রূপো দিতে হবে, রাজার মেয়েকে সম্রাটের জেনানায় পাঠাতে হবে, প্রথম দাঁত ওঠা ৫০টা মদ্দা যুদ্ধ হাতি বার্ষিক পেশকাশ হিসেবে দিতে হবে, রাজা শুধু নামরূপ আর তার আশেপাশের পাহাড় দখল রাখতে পারবেন। মীর জুমলার দূত খাজা ভুর মলকে ফুকন জানালেন যদি রাজা এই শান্তি প্রস্তাব না মানেন তিনি মুঘল বাহিনীতে যোগ দিতে ইচ্ছুক। মীর জুমলা ১৭ আগস্ট মহামারীর আশংকায় মথুরাপুর থেকে বড়গাঁওএর দিকে রওনা হলেন। অহোমেরা শান্তি শর্ত বাতিল করল।

মথুরাপুর আর গড়গাঁও-এর মুঘল শিবিরে মহামারী এবং মন্বন্তর

আগস্টে মথুরাপুরে বিপুল মহামারী আক্রমন করল মুঘল শিবিরে। মহামারীর ধাক্কা অহোমদেরও ছাড়ল না। মীর জুমলার ভাইপো সহ দুইতৃতীয়াংশ সেনা মারা গেল। প্রায় ২৩ লক্ষ অহোম মারা গেল। মৃতদের ঠিকভাবে পোড়ানো বা কবর দেওয়াও গেল না। ব্রহ্মপুত্রর জলে হাজারে হাজারে মৃতদেহ ভাসতে লাগল এবং জল অপেয় দূষিত হয়ে গেল, লাখাউএর মুঘল সেনাকে ফুটিয়ে নদীর জল শুদ্ধ করে খেতে হত।

মীর জুমলার পক্ষে শিবিরে মজুদ চাল বা অন্যান্য রসদ না নিয়ে মহামারীতে ভোগা শিবির ছেড়ে যেতে পারছিলেন না। গতায়াতের অসুবিধের জন্য রসদ সঙ্গে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। মহামারীর সঙ্গে শুরু হল খাবারের অপ্রতুলতা। ১৭৩টা ধানের গোলার মধ্যে মাত্র ১৬টা বন্যার জলে বা শত্রুর লুঠের থেকে বাঁচানো গিয়েছিল। এর মধ্যে ৬টা পশুদের জন্য আর ১০টা মানুষের জন্য বরাদ্দ করে দিলেন মীর জুমলা। লাল, মোটা চাল খেতে হল সক্কলকে। প্রথমের দিকে গরুর মাংস জলে ফুটিয়ে খাওয়া, তার পরে লুঠ করা ষাঁড়ের চর্বিতে গরুর মাংস ফুটিয়ে খাওয়া, তার পরে ঘোড়ার, উট এবং হাতির মাংস খাওয়া শুরু হল। দৈনন্দিনের চাল, লাল, তেল, ঘি, মিষ্টি, আফিম, তামাক বা নুনের অভাব বাড়তে থাকায় শিবিরের সেনা পাগলপারা হতে থাকে। ঘি বিক্রি হতে হল ১৪টাকা সের, ছোলার দাম উঠল ১টাকা সের। আফিমের তোলার দাম উঠল ১ সোনার মোহর, এক ছিলিম তামাকের দাম উঠল ৩টাকা, মুগডাল আর নুনের দাম হল ১০টাকা সের। মহম্মদ বেগ মীর বক্সী তামাক বিক্রি না করে যাদের তামাক অতি প্রয়োজন তাদের বিলিয়ে দিলেন, নিজের আফিম সেবনের মাত্রা কমিয়ে দিলেন।

সংক্ষেপে মথুরাপুরে মুঘলদের জীবন অসহনীয় হয়ে উঠল। ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় প্রাসাদে নামাজ সেরে বিপুল বর্ষার মধ্যে শিবির ছেড়ে পরের দিন ভোরে গড়গাঁও পোঁছলেন মীর জুমলা। কয়েকটি সাঁজোয়া গাড়ি রাস্তায় কাদায় আটকে থেকে গেল। দিলির খান সেগুলি উদ্ধার করে ১৮ তারিখ সন্ধ্যায় নিয়ে এলেন। নির্দেশ সত্ত্বেও গুদামের তিন চতুর্থাংশ ধান নিয়ে আসা গেল না। বহু অসুস্থ সেনাকেও শিবিরে ছেড়ে আসতে হল।

অহোমেরা এবার নতুন করে কিন্তু উদ্দেশ্যবহীনভাবে গড়গাঁওতে রাতের আক্রমন চলতে থাকে। মীর জুমলা তার সেনানায়কের সাহায্যে ঠিক সময় সৈন্য পাঠাতে পারলেন। ১৫ সেপ্টেম্বর চাঁদনি রাতের আক্রমনে আবুল হাসান এবং রাজা সুজন সিং আহোমদের এমনভাবে পর্যুদস্ত করে যে তারা আর এর পরে নতুন করে আক্রমন শানাবার কথা ভাবে নি।

মথুরাপরের উদ্বাস্তুরা মারী আক্রান্ত গড়গাঁও এসে পৌঁছলে রোগ ছড়াল। মন্বন্তর আর মহামারী একসঙ্গে আক্রমন করল মুঘল বাহিনীকে। বমি আর দাস্ত একসঙ্গে চলতে লাগল… শরীর জলশূন্য হয়ে গেল… মরণ যেন ধন্বন্তরী… সে কখন কাকে কোলে টেনে নেয় বোঝা যায় না… লাল মোটা চাল আর গাছের লাল পাকা লেবু ছাড়া সব ধরণের খাদ্যদ্রব্যের অভাব ঘটল… লালচালের ভাত খেলেই কম্প দিয়ে জ্বর আসল…। গরীবেরা গাছের পাতা মাঠের ঘাস বা নদীর ধারের শাকপাতা খেল। নিজের জন্য বরাদ্দ রসদ মীর জুমলা বিলিয়ে দিলেন সৈন্যদের মাঝে। ঐতিহাসিক মহম্মদ মুনিম তাব্রেজি, অসুস্থদের শুশ্রূষা করতে করতে মারা গেলেন।

অসমে মুঘল নৌবহর

দুর্দশার মাসগুলোয় মুঘল নৌবাহিনী নিজেদের বাঁচিয়ে রাখে এবং ক্রমশঃ সেনাদের সাহায্যও করতে থাকে। বর্ষায় মীর জুমলার থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও লাখাউতে নৌবাহিনী প্রধান ইবন হুসেন সৈন্যদের মানসিকতা উত্তেজকর বক্তৃতা দিয়ে উঁচু তারে ধরে রেখেছিলেন। আলি বেগের নেতৃত্বে একটি সুসজ্জিত নৌবহর গজপুরে পাঠানো হয়। কিন্তু জলের টানে বাঁশবাড়ি (দেওলগাঁও আর গজপুরের মাঝে) পর্য গিয়েন্ত ফিরে আসতে হয়। সেখানে আলি বেগের সঙ্গে যোগ দেন, ইবন হুসেনের পাঠানো নৌসেনানায়ক মুনাবার খান। তারা তামুলি দলাইএর থেকে দুটি মুঘল জাহাজ উদ্ধার করে লাখাউতে ফিরে আসে। আলি বেগ অন্য একটা অচেনা দুর্গম জলপথে গড়গাঁওতে মীর জুমলার সঙ্গে মিলতে যাবার কথা ভাবলেও সেই অবাস্তব পরিকল্পনা দেওলগাঁওএর থানেদার ইয়াদগার খান বাতিল করেন।

লাখাউএর সাফল্য ছিল মন ভেঙ্গে যাওয়া মুঘলদের শেষ ভরসাস্থল। মীর জুমলা নৌসেনার সঙ্গে যোগাযোগ চ্যানেল তৈরি করতে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। তার দিকে চলে আসা দুই অহোম ডাক হরকরা দিয়ে নৌসেনাপতিকে বার্তা পাঠিয়ে স্থল সেনাদের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হতে বারন করলেন কিন্তু রসদ পাঠানোর বিষয়ে আরও একটু গভীরে নজর দেওয়ার কথা বললেন, তাছাড়া কালিয়াবর, সমধারা এবং দেবলগাঁও থেকে সব বাহিনী নিয়ে লাখাউতে জড়ো করার নির্দেশ দিলেন।

৭ জুলাই-এর বার্তা ইবন হুসেন, আসাম অভিযানের সর্বাধিনায়ক মীর জুমলাকে নৌ বহরের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত না হওয়ার কথা বলেন। কিন্তু সমধারা আর কালিয়াবরের থানা তুলে নেওয়ার প্রস্তাবে একমত হলেন না। তাঁর যুক্তি এর ফলে বাংলার সঙ্গে সামে অভিযানে আসা বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তিনি দেবলগাঁওএর থানাটি তুলে দেন। এটি দখল করতে মাজুলি দ্বীপ থেকে ভিটারুল ফুকন এগোচ্ছিলেন। বাঁশের কেল্লা পরিখা তৈরি করে ফুকনের রাত আক্রমণের প্রতিষেধক প্রতিরক্ষা সাজালেন, এবং গুয়াহাটির সঙ্গে নদী পথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চললেন। কিছু সময়ের জন্যে লাখাউ পশ্চিম, দক্ষিণ এবং উত্তর অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু সেনাপতি ব্রহ্মপুত্রের উত্তর তীরের চাষীদের থেকে প্রচুর ধান জোগাড় করলেন এবং শোলাগড়ে (লাখাউ এবং কালিয়াবরের মধ্যে) বহু অহোম হত্যা করলেন। ভয় পেয়ে বহু চাষী তাদের বিদ্রোহী নেতাকে ধরিয়ে দিয়ে মুঘলদের কাছে আত্মসমর্পন করে (৫ আগস্ট)। পশ্চিম দিকের খবর পাঠানোর রাস্তাটা গ্রামবাসীরা সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কালিয়াবর হয়ে লাখাউ থেকে গুয়াহাটির মধ্যে বার্তা লেনদেনের রাস্তার সুরক্ষা নিশ্চিত হল। মৃত শ্বশুর সৈয়দ নাসিরুদ্দিনের স্থলে সৈয়দ হুসেন কালিয়াবরের থানাদার হলেন (১২ আগস্ট) আর সমাধায় মৃত সৈয়দ মির্জার স্থলাভিষিক্ত হলেন কিসান সিং। ইবন হুসেন বিজিত দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে রাখার চেষ্টা ত্রুটি করলেন না। তিনি জানেন নৌসেনার এক মুহূর্তের অসতর্কতায়স্থলবাহিনী চরম বিপদের মুখে পড়তে পারে এবং সামগ্রিকভাবে সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে যেতে পারে।

গড়গাঁওতে মুঘল সেনার হাতে পর্যুদস্ত হয়ে অহোমেরা মুঘল নৌ বাহিনীর ওপরে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। ভিটারুয়াল ফুকনের লাখাউ এবং অন্যন্য থানায় রাত আক্রমন ক্রমশ ব্যর্থ হতে থাকে। ইতিমধ্যে অসামরিক অসমিয়াদের ওপরে গণহারে হত্যালীলা চাপিয়ে দিলেন ইবন হুসেন। ভয়ে ভীত রায়তেরা চিঙ্গুলাং লুথুরি দায়াঙ্গিয়া রাজখোয়া এবং বুড়াগোহাঁইকে ধরিয়ে দিলেন মুঘল নৌ সেনাধ্যক্ষ্যের কাছে। লাখাউ আর গড়গাঁওএর মাঝে অহোম বিদ্রোহীদের হারানোর জন্য মুঘলদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসে সাধারণ প্রজারা। প্রজাদের অসন্তোষে ভিটারুল ফুকনকে দেবলগাঁও থেকে মাজুলি দ্বীপের রাঙ্গালি চাপরিতে পালিয়ে যেতে হয়। এবারে ইবন হুসেন দেবলগাঁওতে নতুন করে থানা তৈরি করে মীর জুমলার কাছে দু’দন অহোম ডাকহরকরা মার্ফত এই খুশির খবর পাঠালেন (৫ সেপ্টেম্বর)। তামুলিদলাই বাঁশবাড়িতে হারার পরে পালিয়ে যায়। গজপুর এবারে মুঘলদের দখলে এল।

চতুর্থ পর্ব

মীর জুমলার নতুন করে আক্রমন

যে দুর্যোগের ঘনঘটা ছেয়ে গিয়েছিল মীর জুমলার বাহিনীর ওপর ২০ সেপ্টেম্বর ১৬৬২ নাগাদ সেটা পুরপুরি কেটে গেল। দেখতে দেখতে বর্ষা চলে গেল, বন্যার জল নেমে গেল, রাস্তা নতুন করে সারাই করা হল, খবরাখবর আনা নেওয়া হতে লাগল। দেবলগাঁও থানা তৈরি হবার পর মীর জুমলা গড়গাঁওএর সঙ্গে লাখাউএর সংযোগ তৈরির কাজটি সম্পন্ন করতে উদ্যোগী হলেন। মীর মুর্তাজা গড়গাঁওএর কাছে দিখাউএর ওপর সেতু তৈরি করলেন। ২৫ সেপ্টেম্বর দিখুর তীরে গোলাকার পাড় হয়ে আবুল হাসান, সাইরাং এবং দেবলগাঁওএর দিকে এগোলেন। অহোম পথ প্রদর্শকদের সঙ্গে নিয়ে তিনি অহোম বিদ্রোহীদের দমন করলেন গাজি খানের নেতৃত্বে সাইরাং, গজপুরে সৈয়দ আহমেদ জামাতদারের নেতৃত্বে থানা তৈরি করলেন। দেবলগাঁওতে ঢুকে তিনি মূল বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ তোইরি করলেন। অসমের অবস্থা বর্ণনা করে সম্রাটের উদ্দেশ্যে এবং ঢাকার উদ্দেশ্যে লেখা মীর জুমলার চিঠি, দরঙ্গের রানী-ডোগারের উদ্দেশ্যে পরওয়ানা, গুয়াহাটির মুঘল ফৌজদারকে, এবং কালিয়াবরের থানাকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে চিঠিগুলি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হল। খুব তাড়াতাড়ি ইস্তিয়াখ খানকে অসমের সুবাদার, রশিদ খানকে কামরূপের ফৌজদার করার পাদশাহের ফরমানটি পৌঁছল। প্রত্যেকেই তাদের পদ নিতে অস্বীকার করল। যেহেতু নদী পথ তখনও সুরক্ষিত নয়, তাই নৌসেনাধ্যক্ষ্যের সুরক্ষায় দেবলগাঁও এবং তার পরে গড়গাঁও পর্যন্ত ভূমিপথে বাহকদের সাহায্যে ব্যাপারীদের রসদ এবং পশু পাঠানো হল। সেগুলি গড়গাঁওতে পৌঁছল ২৪ অক্টোবর। আবুল হাসানের নৌবহরে করে কিছু রসদ সেখানে পৌঁছল ৩১ তারিখ। ‘দীর্ঘ দিন পরে সাম্রাজ্যের বাহিনীর প্রত্যেকের প্রত্যেকটি চাহিদা পূর্ণ হল’। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev