| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা : জগদীশ নায়ারণ সরকার (৪২নং কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৪৬৫ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২২

সপ্তম অধ্যায়

চতুর্থ পর্ব

টিপামে মীর জুমলার অভিযান

মাঠঘাট শুকনো হয়ে যাওয়ায় মুঘল চতুরঙ্গ নির্ভর সেনাবাহিনী পুরোন আমলের মত অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠল। অহোম রাজা আগের মত নামরূপের পাহাড়ে চলে গিয়েছিলেন। বাদুলি ফুকন দু-দিক রেখে তার ঘুটি সাজাতে লাগল। একদিকে তিনি এবং গড়গাঁওনি ফুকন মুঘল বাহিনীর অগ্রগমন প্রতিরোধ করতে দিল্লি নদীর তীরে বাঁধ চওড়া আর জোরদার করছেন, অন্যদিকে মীর মুর্তাজা মার্ফত মীর জুমলার কাছে নিয়মিত শান্তিবার্তাও পাঠিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মীর জুমলা অহোমদের শর্তহীন আত্মসমর্পন চান। যতক্ষণ না ফুকনেরা তার জন্য অপেক্ষা করবে ততক্ষণ তিনি কোন শান্তিচুক্তি গ্রাহ্য করবেন না। গড়গাঁও-এর ২০ মাইল উত্তরপূর্বে দু-দিক থেকে বাদুলি ফুকনের শিবির আক্রমন করার পরিকল্পনা নিলেন। আবুল হুসেইন ১০ নভেম্বর দিল্লির দিকে নদী বাহিত হয়ে পিছন দিক থেকে গেল আর মীর জুমলা নিজে ১৬ নভেম্বর দান্দগা এবং দিল্লি নদী হেঁটে পেরোলেন। মুঘল বাহিনীর ভয়ে বাদুলি ফুকন বিশাল সুরক্ষিত গড় ছেড়ে পালিয়ে গেলেন।

২০ নভেম্বর মীর জুমলা দিহিঙ্গে পোঁছে দেখলেন বুড়াগোহাঁই নদীর অন্যপাড়ে তাদের সুরক্ষিত ঘাঁটি আর সুরক্ষিত দুর্গ ছেড়ে বরকটে পালিয়ে গিয়েছেন। দক্ষিণে টাওকাক, উত্তরে দিহিং পশ্চিমে শোলাগুড়ি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা সেনানায়ক মীর জুমলার নাম শুনে ভয়েইই পালিয়ে গেলেন।

বহুকাল ধরে অসমজুড়ে অভিযান, মন্বন্তর-মহামারী এবং বিপ্রতীপ পরিবেশ মীর জুমলার শরীরের ওপর কামড় বসাতে শুরু করল। যে রোগে তিনি মারা যাবেন সেই রোগটি তাকে আক্রমন করল। শত্রুর পরিখা দেখার সময় ঘোড়া থেকে তিনি অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। যতক্ষণনা তার বিছানা তৈরি হল ততক্ষণ তিনি অজ্ঞান ছিলেন। দিলির খান কোলে তার মাথা নিয়ে বসে রইলেন। শিহাবুদ্দিন তালিশ দশ দিন পরে দেখতে এলেন।

৩০ নভেম্বর রাজার দ্বিচারিতা অনুভব করে বাদুলি ফুকন শিল্লিখাটোলে মীর জুমলার সঙ্গে তিন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করতে এসে রাজাকে ধরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েগেলেন। মীর জুমলা তাকে ডেকা রাজা (ছোট রাজা) উপাধি দিলেন। পূর্ব অসমের মুঘল প্রশাসনিক প্রধান হওয়ায় গড়গাঁও থেকে নামরূপ পর্যন্ত গ্রাম এবং শহরের এবং ত্রিমোহনী পর্যন্ত পথ এবং জলসীমায় দায়িত্ব পেলেন ফুকন।

তীব্র অসুস্থতা সত্ত্বেও মীর জুমলা, বাগী ফুকনের দেখানো পথ ধরে এগিয়ে চললেন। ২ ডিসেম্বর দরবেশ বেগকে দায়িত্ব দিলেন অহোমদের তাড়িয়ে নিয়ে এসে শোয়ালগুড়ির হাতি দখল করতে। ৬ তারিখে তিনি নামরূপের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে পরের দিন শোয়ালগুড়ি পৌঁছলেন। ৮ তারিখে শোয়ালগুড়ি নদী পেরিয়ে দরবেশ বাগ এবং বাদুলি ফুকনকে সামনে নিয়ে এগিয়ে চললেন।

১০ ডিসেম্বর অসুস্থ হওয়ার এই প্রথম তিনি ধারাস্নান করলেন এবং পরিপূর্ণ খাওয়ার খেলেন। পাকস্থলীতে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হল। রাতে ধুম জ্বর আর বুকে ব্যথা। গিলানের ডাক্তার কারিমা তার চিকিতসা করাতে অস্বস্তি কিছুটা লাঘব হল। কিন্তু রক্ত পরীক্ষা করতে দিতে আস্বীকার করলেন। দুই বা তিন দিন পরে প্লুরিসি (ফুসফুসের রোগ) দেখা দিল।

তবুও মীর জুমলা বাদুলি ফুকনের সাহায্যে রাজাকে ধরতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু নেতার অসুস্থতায় মনভেঙ্গে যাওয়া মুঘল বাহিনী নামরূপ ঢুকতে অস্বীকার করল। এলাকা দেখে তাদের ধারণা হল সেখানে বাহিনীর সব কিছু হারিয়ে যাবে – এই এলাকার বাতাসে মৃত্যু আছে, এখানে জলস্থল বাহিত হয়ে কোন রসদ এসে পৌঁছবে না, যখন শুনল এখানে জানুয়ারির শুরুতেই বর্ষা আসে, অনদূর অতীতে মন্বন্তর-মহামারী থেকে ভুগে ওঠার, খালি পেট থাকার স্মৃতি, সাথী হারানোর স্মৃতি তখনও জ্বলজ্বল করে উঠল প্রত্যেক সেনার মনে। নামরূপের পাহাড়ি এলাকার উঁচু পথ দেখে তাদের মনে হল, রাজাকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টার জেদে যদি তারা এই রাস্তায় ঢোকে, তাহলে হয়ত তাদের বেরিয়ে যাবার কোন পথ থাকবে না, রাজার বাহিনী তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে কচুকাটা করবে। দিহিং পেরোনোর সময়েই সাধারণ এবং সেনাপতিরা তাদের নেতাকে ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল। দিলির খান তাদের শান্ত রেখে মহম্মদ বেগকে দিয়ে মীর জুমলাকে অবস্থা জানাতে খবর পাঠান।

সেনার দোদুল্যমান মনোভাবে মীর জুমলা আশ্চর্য হয়ে গেলেন। শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকল। ১৫ ডিসেম্বর যখন একটা পালকিতে তোলা হল তাঁকে তার চেহারা খুবই ভেঙ্গে পড়েছে এবং চোখে মুখে আশংকার অন্ধকার। ১৮ তারিখে মানরূপের গিরিপথের মুখের গ্রাম টিপামে শিবির ফেললেন দিহিঙ্গের অন্যান্য এলাকার সুরক্ষা মিয়ানা খানের দায়িত্বে দিলেন।

শান্তির পথে

টিপাম মীর জুমলার অসম অভিযানের যেমন শেষ বিন্দু, তেমনি এখান থেকে তিনি পিছিয়ে আসারও সূচনা করলেন। শান্তিচুক্তি নিয়ে দরকষাকষি শুরু হল। দুপক্ষই শান্তি চায়। অহোমদের দিক থেকে বলা হল তাদের এলাকা বিদেশিদের কবলে গিয়েছে এবং তাদের রাজা — স্বর্গদেওকে সেই বাহিনী রাজধানী চ্যুত করেছে। ছোটখাট লড়াই দিয়ে তাদের জাতীয় অবমাননার বিচার করা যাবে না। শত্রুর হাত থেকে দেশকে উদ্ধারের ক্ষেত্রে অহোমদের কাছে কোন মূল্যই যথেষ্ট নয়। আপাতত পেশকাশ বা রাজস্ব দেওয়ার শর্তে একটা কার্যকরী শান্তিচুক্তিতে উপনীত হতে তারা তীব্রভাবে আগ্রহী। আভ্যন্তরীণ সমস্যা বা বহিঃপ্রভাবে পরিবেশ/রাজনীতি পরিবর্তনের বাহানায় আগামী দিনে চুক্তির ধারাগুলো উল্লঙ্ঘন করা যেতে পারে। অহোমেরা নিশ্চিত ছিল মুঘলদের সঙ্গে আরও কিছু দিন লড়াই চললে আসমের দুর্গতি আরও বাড়তে থাকবে। দুশ্চিন্তার বার্তা নিয়ে প্রধান সেনাপতি আতন বুড়াগোঁহাই রাজার প্রবাস প্রাসাদে দেখা করে তাকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করলেন, বর্তমান অবস্থার অনুকূল প্রতিকূলতা বোঝালেন, এবং শেষ পর্যন্ত শান্তিচুক্তিতে রাজাকে রাজি করলেন। বাদুলি ফুকন এবং অন্য অভিজাত অহোমের শিবির ত্যাগ রাজাকে চিন্তায় রেখেছিল। শিবির পালটানো এবং তার বর্তমান অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে দৃঢপ্রতিজ্ঞ সেনাপতিকে দিয়ে বেশিদিন মুঘল বিরোধী লড়াই চালানো যাবে না বুঝেই রাজা আর তার ফুকনেরা দেশকে বাঁচাতে শান্তিকেই একমাত্র হাতিয়ার রূপে বেছে নিলেন এবং মীর জুমলার উদ্দেশ্যে দূত এবং উপহারের ডালি পাঠানো শুরু করেন।

কিন্তু অহোমদের শান্তি চেষ্টা মীর জুমলা বাতিল করে দিলেন (৩০ নভেম্বর)। দিন পনেরো পরে এক গুরুত্বপূর্ণ অহোম দূত টিপামের কাছে দিলির খানের শিবিরে গিয়ে মীর জুমলাকে বোঝানোর দায় নিতে তাঁকে রাজি করিয়ে ফেললেন। বাস্তব হল প্রধান সেনাপতি ততদিনে বুঝেগিয়েছেন মুঘল বাহিনী অসমে শাঁখের করাতের অবস্থায় পড়ে রয়েছে। মুঘল সেনাবাহিনীর পক্ষে অসম বিজয়ের পরেও শান্তিপূর্ণ সরকার গঠন প্রায় অসম্ভব। যতই মুঘলেরা প্রজাদের স্বার্থে কাজ করুক জনগনের সাহায্যে বিদ্রোহীরা সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেই। সেনা শাসিত সরকার তৈরি করা একান্তই অবাস্তব পরিকল্পনা। সেই বিষয়টা তার মনের কোণে একবারের জন্যেও ঠাঁই পায় নি। অথচ এই বিদেশে তার একমাত্র সম্বল সেনাবাহিনীই। দুর্দশার চরমে পৌঁছে সেনারা দেশে, জয়ের সংবাদ নিয়ে ফিরতে চায়। এই ইচ্ছাপূরণে তারা বিদ্রোহের মুখে দাঁড়িয়ে। নিজের রোগ, নিজের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়া, শান্তিচুক্তি বাতিলে নিজের বাহিনীতে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া এবং মুসলমান যুদ্ধ বন্দীদের অবস্থা আন্দাজ করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মীর জুমলা শান্তিচুক্তিতে রাজি হতে বাধ্য হন। বাস্তবিক অবস্থা তাকে বাধ্য করল শান্তিচুক্তিতে উপনীত হতে এবং এটাই এই সময়ের সক্কলের জন্য সব থেকে চাহিদাপূর্ণ এবং শ্রেষ্ঠ সমাধান বলেই তার মনে হল। রোগ শয্যায় শুয়ে থেকেও তিনি হারের মুখ নয়, কঠোরতাপূর্ণ মনোভাব দেখিয়ে নির্দেশ দিলেন মুঘল বাহিনী আরও এগোতে চায় কিন্তু তার আগে টিপামে শান্তিচুক্তির দরকষাকষি শুরু হোক। তার দূত রাজা ভোর মল রাজার দূত ফুকনদের মীর জুমলার মনোভাব জানিয়ে দিলেন। দিলির খানের মধ্যস্থতায় ঘিলাঝরি ঘাট, টিপামের চুক্তি সম্পন্ন হল ৯ মাঘ ১৫৮৫ শক, ২৩ জানুয়ারি, ১৬৬৩-তে।

মীর জুমলা এই চুক্তির মাধ্যমে সম্মানের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি করলেন। সম্রাটের সম্মান উঁচুতে থাকল এবং অহোম রাজাকেই মাথা নোয়াতে হল। সম্রাটের সামন্তরাজা হিসেবে, জয়ধ্বজ রাজ্যপাট চালাবার অনুমতি পেলেন। এর জন্য গুয়াহাটির মুঘল দরবারে একজন দূত এবং পাইক বাহিনী পাঠানোর শর্তে দেওয়া হল। উপযুক্ত উপঢৌকন সহ তার এক কন্যা এবং টিপামের রাজার পুত্রকে দরবারে পাঠাবার শর্ততেও রাজি হলেন।

দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের বিপুল ক্ষতিপূরণ রাজার থেকে চাওয়া হল — তাকে সেই মুহূর্তে দিতে হবে ২০ হাজার তোলা সোনা, ১,২০,০০০ তোলার রূপো (রূপিয়া), ২০টি সুসজ্জিত হাতি। পরের বছর থেকে বছরে ৩ লাখ রৌপ্য (রূপিয়া), বছরে তিনবার ৯০টা হাতি। তৃতীয়ত অসম রাজ্যের চারটি বড় স্তম্ভ বুড়াগোঁহাই, বরগোঁহাই, গড়গাঁওনিয়া ফুকন (রাজসুয়ার রাজমন্ত্রী) এবং বড়পাত্র ফুকনদের একজন করে পুত্র দিল্লিতে জামিন হিসেবে রাখা হবে যতক্ষণনা এই ক্ষতিপূরণটির কিস্তিগুলি মুঘলদের হাতে এসে না পোঁছাচ্ছে। চতুর্থত রাজা গুয়াহাটিতে বছরে ২০টা করে হাতি উপঢৌকন হিসেবে পাঠাবেন। পঞ্চমত মুঘলদের অসমের আধিকার পূর্ব দিকে বাড়বে, রাজাকে তার রাজ্যের প্রায় অর্ধেক অংশ মুঘলদের দিতে হল — উত্তরাকোলে দরং — হাতি সমৃদ্ধ, নাকটি রানী, গারো পাহাড়, বেলতলা এবং ডিমারুয়া (বা দক্ষণকোলের ডুমারিয়া পরগণা) এলাকা। পূর্ব দিকে মুঘলদের সীমান্ত মানস থেকে বেড়ে ভরালী পর্যন্ত গেল, এবং উত্তরে কলং নদী দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্রের দক্ষিণ পাড়। কামরূপের মুঘল এলাকার যুদ্ধ বন্দীসহ, গ্রেপ্তার হওয়া বাদুলি ফুকনের পরিবারকে মুক্তি দিতে সম্মত হল।

আওরঙ্গজেবকে জয়ধ্বজের আত্মসমর্পনের চিঠিটি মীর জুমলা পাঠালেন দরবারে। চুক্তি অনুমোদন এবং স্বাক্ষর করে পাদশাহ মীর জুমলাকে যথাবিহিত উপহার দিলেন।

তবে চুক্তিতে যে সব ধারার বা শর্তের কথা বলা হয়েছিল সেগুলির সব কটি রূপায়ণ হওয়া সম্ভবপর হবে না অল্প কালের মধ্যেই বোঝা গেল। মীর জুমলা অসমে থাকালীনই জামিনদার, কিস্তির পরিমান সহ হাতির সংখ্যা, সীমান্ত নিরূপন, মীর জুমলার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া যুদ্ধবন্দী আহোমদের ছেড়ে দেওয়া ইত্যাদি নিয়ে বিরোধ বাধল। ১৬৬৩-র ৫ জানুয়ারি রাজা, রাজকন্যা, চাহিদামত ৩০,০০০ তোলা সোনা, ৪০,০০০ তোলা রূপো, ১০টা হাতি মুঘল শিবিরে পৌঁছে দিলেন। তখনও মীর জুমলা লাখাউতে পৌঁছন নি। কিন্তু মীর জুমলা জামিনদারদের হাতে নিতে ইচ্ছুক। অহোমেরা বুড়াগোঁহাইয়ের ছেলের যায়গায় ভাইপোকে পাঠাল। মীর জুমলার কঠোর দাবিতে একজন গুটিবসন্তে ভোগা ছেলে পাঠানো হল, মীর জুমলা বুড়াগোঁহাইএর অন্য সন্তান (রাজার বোনের পুত্র) দাবি করলেন। কিন্তু সে কিছুদিন আগেই মারা গিয়েছে। মীর জুমলা তখন বরফুকনের (রাজার আর এক বোনের) দুই সন্তান দাবি করলেন। কিন্তু দিলির খান এবং রাজা ভুর মলের চাপ সত্ত্বেও ফুকনেরা এই দাবি মানতে রাজি নয়, চুক্তিতে নেই যুক্তিতে। মীর জুমলার মনে হল দিলির খান যদি আরও বেশি চাপ দিতেন তা হলে হয়ত হাতবদলটা হয়েই যেত। দিলির খান নিজে সেনাপতির ঘরে এসে তার মনের বিরুদ্ধতা দূর করার চেষ্টা করলেন।

পঞ্চম পর্ব

মীর জুমলার অসম থেকে প্রত্যাগমন এবং মৃত্যু

রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি, মৃত্যু

প্রত্যকের মনের উতফুল্লতা বাড়িয়ে মীর জুমলা অসম থেকে ফেরার নির্দেশ জারি করলেন ১০ জানুয়ারি। গড়গাঁওতে না নেমে পালকিতে চড়ে সেনানায়ক সোজাসুজি টিপান থেকে ত্রিমোহনীতে এলেন। ২২ জানুয়ারি লাখাউতে পৌঁছে কিছুটা সুস্থতা অনুভব করলেন। ২ ফেব্রুয়ারি কাজলি দুর্গে পৌঁছে শ্বাসের সমস্যা এবং প্লুরিসি জনিত বাঁদিকের বুক ফুলে থাকার সমস্যা অনুভব করলেন। প্রথম দিকে তাকে ডাচ শল্যচিকিতসক গেলমার ভোরবার্গ দেখছিলেন। তিনি তাকে দৈনিক ৩-৪ মাষা (দেড় তোলা) পরিস্রুত গন্ধক নিতে নিদান দিয়েছিলেন। পরে একজন ব্রিটিশ চিকিতসকের পরামর্শে তিনি মৌরির তেলের সঙ্গে ৪ মাষা গুড় মিশিয়ে খান। তিনি নিজে পরের দিকে জিউইশ বিটুমেন (মানে কি? আফিম?) খেতে শুরু করেন। ডাক্তার কারিমার বিরোধ সত্ত্বেও কড়া অষুধ খেয়ে মীর জুমলার অসুস্থ হয়ে পড়লেন, শ্বাসের অসুবিধে, বুকের ধড়ফড়ানি ড়া, হাত ডান পা এবং পাকস্থলী ফুলে যেতে শুরু করল এবং জল খাওয়ার প্রবণতা বাড়ল। কাশলে শ্লেষ্মায় রক্ত পড়ল। ফুসফুসে এবং টিম্প্যানিতে (?) ক্ষত হয়ে যাওয়ায় ডাক্তারের দক্ষতা ওদৃশ্য হতে শুরু করল।

২৮ ফেব্রুয়ারি বাড়িতলায় মীর জুমলার অবস্থা আরও খারাপ হল। প্রচণ্ড জ্বর এবং দমকে দমকে কাশির সঙ্গে কালো রক্ত উঠতে শুরু করে। এত অশক্ত হয়ে পড়লেন যে, তিনি নিজের চেষ্টায় দাঁড়াতে পারছিলেন না। হুগলী থেকে হেকিম জাহির আরদিস্তানি, পাশের রাজমহল থেকে হেকিম মির্জা মহম্মদ এবং ঢাকা থেকে হাকিম শাফিয়া রোগ সারাতে এসে পৌঁছলেন। রোগ নির্ণয়ে একমত হলেও নিদান নিয়ে একমত হতে পারলেন না। তারা ইঙ্গিতে বোঝালেন নবাব শক্তি ক্ষয় করে ফেলেছেন। যদিনা সর্বশক্তিমান তাকে ভালর দিকে ঠেলে দেন তাকে ভাল করে দেওয়ার ক্ষমতা চিকিতসা শাস্ত্রের হাতে আর নেই। খাওয়ার ইচ্ছেটাই যেন চলে গিয়েছে। চিকিতসকেরা কাঁকড়ার কাথ্ব খেতে বললেন। কয়েক দিনের পরে সেটাও খেতে অস্বীকার করলেন। হেকিম জাহির তাকে ছাগলের দুধ খাওয়াতে বললেন। যদি তিনি সেটি হজম করতে পারেন তাহলে তার সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ আছে।

মীর বক্সী, মহম্মদ বেগকে মীর জুমলা তার শেষ ইচ্ছে জানালেন – দাসদের মুক্ত করে দেওয়া, দেহ পরিষ্কার করে চাদরে জড়িয়ে দেওয়া আর তার হাড়গুলি মহান নজফে পাঠাবার ব্যবস্থা করা এবং পারস্যে তার যত কিছু সম্পত্তি আছে সেগুলি ভাল কাজের জন্য দান করার নির্দেশ দিলেন।

বারিতলা থেকে খিজিরপুরে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন হেকিমরা। হতাশ নবাব বললেন আমার দেহ এখন তোমাদের হাতে, যা ভাল মনে হয় তাই কর। ২৭ মার্চ তাকে একটি চারপাইতে করে ব্রহ্মপুত্রে নৌকোয় নিয়ে যাওয়ার পথে খিজিরপুর থেকে ৪ মাইল দূরে বুধবার সন্ধ্যের দেড় ঘন্টার আগে ২ রমজান ১০৭৩, ৩১ মার্চ ১৬৬৩ সালে আমীর আজম, সিপাহশালার মুয়াজ্জম, মহান অভিজাত, অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেনানী মৃত্যু বরণ করেন। সেই রাতেই তার দেহ খিজিরপুরে নিয়ে যাওয়া হল। দিলির খান এবং ইহতিসাম খান অসম যাওয়ার আগে তার দেহ বয়ে আনার জন্য যে কফিনটি তৈরি করা হয়েছিল মীর জুমলার নির্দেশে, সেটিতে দেহ ভরা হল। সম্রাটের নির্দেশে দেহ নিয়ে দরবারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল ইতিশাম খান। ইচ্ছে পূরণ করতে, তাঁর দেহকে নজফে নিয়ে গিয়েছিল কী না সে বিষয়ে ইতিহাস নীরব। মীর জুমলার এখনও কোনও সমাধি পাওয়া যায় নি (কিন্তু মেঘালয় সরকারের ওয়েবসাইট লিখছে — The tomb of Mir Jumla, the great Mughal General of Emperor Aurangzeb is located at Thakuranbari village on the Assam-Meghalaya border about 8 kms from Ampati. History has it that Mir Jumla, who was appointed the Governor of Bengal in 1659 by Mughal emperor Aurangzeb, invaded Assam heading a vast army. But the difficult terrain and the malaria prone climate of the area took a heavy toll on the Mughal Army. This forced Mir Jumla to retreat during 1663 without having fully accomplished the subjugation of Assam. Before he could return to Bengal, the general himself was stricken with malaria and succumbed to the disease on the 30th of March 1663 and his mortal remains were buried on a hillock near Thakuranbari in Garo Hills which is being maintained by the local Mazar Sarif committee. The tomb reflects a remarkably long grave and bears testimony to the tall height of Mir Jumla. সূত্র http://southwestgarohills.gov.in/Mir_Jumla.html) (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev