সপ্তম অধ্যায়
পঞ্চম পর্ব
মীর জুমলার পশ্চাদপসরণের পর প্রশাসনিক এবং সামরিক সমস্যা
মীর জুমলার পশ্চাদপসরণ সুপরিকল্পিত, দক্ষহাতে এবং সুচারুভাবে ঘটানো হয়েছিল। পশ্চাদপসরণ শুরুর সময় অতটা অসুস্থ হন নি সেনানায়ক। তাই কিছুটা বাঁচোয়া হয়েছে। পিছিয়ে আসার পরিকল্পনা ভালভাবে করতে পেরেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর বাড়তে থাকা অসুস্থতার মধ্যে যদি তাঁকে ফেরার পরিকল্পনা করতে হত, তাহলে সেটা তার বাহিনীর পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারত। অহমিয়ারা তার বাহিনীর ওপর বিশ্বাসঘাতকদের মত ঝাঁপিয়ে পড়ে নি। যে কোন বিপদ মোকাবিলা করার জন্য তিনি সবরকম সুরক্ষা ব্যবস্থা করেছিলেন। কাশিম বেগ বারিতিকে তিনি সেনাবাহিনীর পিছনের দিকটা সুরক্ষা দেওয়ার জন্য নিয়োগ করলেন। তাছাড়া পথ নির্দেশকও নিয়োগ করা হয়েছিল। ফেরত রাস্তায় সেনাদের অহোম রায়তের সম্পত্তি লুঠের বিরুদ্ধে কঠোর নির্দেশ জারি করা হয়।
তার সব থেকে বড় মাথাব্যথা ছিল গড়গাঁও থেকে সাম্রাজ্যের সম্পত্তি সুরক্ষিতভাবে সরিয়ে আনা। গড়গাঁও থেকে চলে যাওয়ার আগে তিনি মীর মুর্তাজাকে বলে যান যত শীঘ্র সম্ভব ইবন হুসেনের সঙ্গে মিলে শিবিরের সম্পদ স্থানান্তরণের কাজ সমাধা করতে। এ কাজ সমাধা করার জন্যে মীর জুমলা পর্যাপ্ত নৌকো পাঠাতে পারেন নি, তাই মীর মুর্তাজাকে আরও বেশি নৌকোর ব্যবস্থা করতে হয়। ফলে প্রতিশ্রুতি মত ত্রিমোহনীতে তিনি নবাবের সঙ্গে দেখা করতে পারেন নি। মহম্মমদ বেগ, মীর মুর্তাজাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাটাও কাজে দেয় নি। মীর মুর্তাজার জন্য ত্রিমোহনীতে অপেক্ষা না করে মীর জুমলা নির্দেশ দেন সাইরিং, গজপুর এবং দেবলগাঁওএর থানেদারেরা লাখাউ পর্যন্ত মীর মুর্তাজাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাক।
সেখানে মীর মুর্তাজা ২২-১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। সেই বছরে প্রতিশ্রুত বকেয়া ২৫টা হাতি অহোমেরা দিল না। লাখাউতে আরও ১০ দিন দিলির খান আর সমগ্র নৌবহরকে সেই হাতিগুলির জন্য অপেক্ষা করতে হল। রাজা সেই শর্ত অমান্য করলে ঠিক হল দিলির খান এবং মীর জুমলা পরের বছর বা কোন উপযুক্ত সময় নির্বাচন করে বাহিনীকে তৈরি করে নতুন করে যুদ্ধ আয়োজন করবেন।
মীর জুমলা বেশি দিন লাখাউতে অপেক্ষা করতে পারলেন না। বর্ষা আবার চলে আসার মুখে অথচ বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে হবে – যেমন দরং, ডিমারুয়া এবং অন্যান্য নতুন জেলাগুলির প্রশাসন নিয়ে সিদ্ধান্ত, গুয়াহাটির প্রশাসন ঠিক করা, কোচবিহারের রাজাকে শাস্তি দেওয়া এবং কোচবিহার শাহী সাম্রাজ্যে যুক্ত করার মত বহু কাজ বাকি পড়েছিল। ঠিক হল, দখিনকোলের ভূমিপথ দিয়ে মূল বাহিনী বারিতলার উল্টোদিকের কোন একটি জায়গা পর্যন্ত গিয়ে ব্রহ্মপুত্র পেরোবে। ৩০ জানুয়ারি জামিনদারদের নিয়ে নৌকো করে তিনি কালিয়াবরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলেন, সেখানে তিনি সৈয়দ নাসিরুদ্দিন খানের জামাই সৈয়দ হুসেন আর সেখ মহম্মদ সাদিককে বাজিয়ে দেখবেন এবং সাক্ষাৎ দেবেন। আগে পরে সব হাতি নিয়ে তাদের দিলির খানের সঙ্গে আসার নির্দেশ দেওয়া হল। ১২ ফেব্রুয়ারি বাকি সেনাকে বাকি হাতি নিয়ে আসার জন্য লাখাউতে রেখে পাণ্ডুতে দিলির ৮টি হাতি নিয়ে উপস্থিত হলেন।
আরও একটা সমস্যা ছিল অহোমদের একটা বড় অংশ বাহিনীর সঙ্গে বাংলার চলে আসছিল। এই ইস্যুতে মীর জুমলার সঙ্গে অহোমদের বিবাদ শুরু হল। রাজা ক্ষোভে জানালেন অহমিয়াদের তার বাহিনীর পিছনে পছনে যাওয়া বন্ধ করতে। মীর জুমলা জানালেন এটা তার হাতের বাইরে। কারণ তিনি এই মানুষদের জোর করে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন না ফলে তিনি তাদের বারণও করতে পারেন না। কারা মুঘল সেনার সঙ্গে যাবে সেটা তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত। ত্রিমোহনীতে তিনি দেখলেন বহু খাসায় প্রচুর মুসলমান আর অহমিয়া ভর্তি হয়ে গড়গাঁও থেকে এসেছেন। সেখানে কামরূপের কিছু রায়ত, নামরূপের ছাড়া পাওয়া সেনা এবং বাদুলি ফুকনের মুক্তি পাওয়া পরিবার তার সঙ্গে যোগ দিল। বহু অসমিয়া পরিবার স্বেচ্ছায় গড়গাঁও থেকে মীর মুর্তাজার সঙ্গে লাখাউতে চলে এসেছেন।
আরেকটা বিতর্ক তৈরি হল সীমান্ত চিহ্নিত করা নিয়ে। অহোমেরা ১৬৩৮-র চুক্তি অনুযায়ী দক্ষিণে আসুরার আলি নদী এবং উত্তরে বড়নাদীর ক্ষেত্রটা চাইছে। কিন্তু মীর জুমলার দাবি ১৬৬৩-র চুক্তি মান্য করা — দক্ষিণে কাজলি আর উত্তরে ভরালি। ৩০ জানুয়ারি একটা পালকি করে তিনি চুক্তি অনুযায়ী নতুন যুক্ত হওয়া ডিমারুয়ার সীমান্ত নির্দেশ করলেন, কাজলি পেরোলেন যা এর আগে কোন মুঘল সেনাপতি করতে পারে নি। সেখানে স্থানীয়দের সাহায্যে জঙ্গল পরিষ্কার করে যাতে ৫-৫টা ঘোড়সওয়ার যেতে পারে এমন পথ তৈরি করালেন। ৪ দিনে শুধু জল আর ঘাসপাতা খেয়ে তিনি ৩৪ ক্রোশ দূরত্ব পার করে কলং পার হয়ে নৌকো করে কালজি দুর্গের নিচে পৌঁছলেন।
মীর জুমলা আসামের কয়েকন সামন্ত প্রভুর সঙ্গে দেখা করেন। কাজলিতে অবস্থান কালে (২-১১ ফেব্রুয়ারি) অহোমদের হাত থেকে রাস্তাটির সুরক্ষার জন্য দরঙ্গের রাজা মকরধ্বজের (অসমে মারা যান) মায়ের সঙ্গে দেখা করে তাকে গুয়াহাটির ফৌজদার মহম্মদ বেগ যে সুবিধে পায় সেগুলি অর্পন করে রাস্তা দেখাশোনার দায়িত্ব দিলেন। রাজার ১২ বছরের পুত্রের কপালে টিকা দিয়ে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতালেন। দখিনকোলের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ জমিদার ডীমারুয়া রাজের মায়ের সঙ্গে সেই সন্ধ্যায় দেখা করেন তিনি এবং যদিও তার মা বললেন, অসুস্থতার জন্য পুত্র তার সঙ্গে আসতে পারেন নি। তারা এই ছুতো বিশ্বাস করেন নি। সকলে পাণ্ডুতে তার সঙ্গে দেখা করে বিদায় নিল।
১১ ফেব্রুয়ারি খুব অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি কামরূপের প্রশাসনিক পরিকল্পনা ঠিক করে যান। ১২ ফেব্রুয়ারি ফৌজদার পদে নিয়োগ করেন রশিদ খানকে, বক্সী আর ওয়াকিয়ানভিশ হিসেবে মহম্মদ খলিলকে, এবং জামিনদারদের দেখাশোনায় দায়িত্ব দিলেন ফৌজদারকে। ৫০০ সেনা আর ১০টি নৌকোর বহর কাজলিতে রাখা হল মহম্মদ বেগের নেতৃত্বে, দেওয়ান মীর সৈয়দ মহম্মদ নির্দেশ দিলেন (১১ ফেব্রুয়ারি), ১) অহোমদের হাতে বন্দী কিন্তু এখন মুক্ত কামরূপ সরকারের জমি, যারা অসম থেকে স্বেচ্ছায় এসেছে, সেই সব রায়তদের মধ্যে ভাগ করে করে দেওয়ার হল, ২) কারিগর, গোলান্দাজ, শিল্পীদের সাম্রাজ্যের সেবায় স্টাইপেন্ড দিয়ে নিয়োগ করা হল। দেওয়ানের নির্দেশে বাংলার একটি সরকারের জমিতে যেখানে ৩০০ মনের ধান ফলে সেই পরগণাটি দেওয়ান বাদুলি ফুকনকে দেওয়ার নির্দেশ জারি করলেন।
মীর জুমলা কোচবিহারের যাওয়ার রাস্তায় (২৮ ফেব্রুয়ারি) বারিতলা পৌঁছলেন। পাঁচ ছ দিন পরে অসমে থাকা বাকি সেনা তাঁর সঙ্গে যোগ দিল। কোচবিহারের ঘোড়াঘাটে তার জন্য অপেক্ষা করা ইসফান্দিয়ার খান, আকসার খান, রাজা ভারোজ তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। যদিও তার রোগ বাড়ছিল দ্রুতহারে কিন্তু তিনি কোচবিহার দখল করা মনস্থ করেন। তার অবস্থা দ্রুত খারাপ হওয়ায় কোচবিহার দখলের চিন্তা ছাড়তে হয়। এই কাজটি তিনি দিলির খান আকসার খান, রাজা ভারোজের ওপর ছেড়ে যান। কোচবিহার দখল না হওয়া পর্যন্ত তিনি বারিতলায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তার পরে তাকে খিজিরপুরে যাওয়ার নিদান দেওয়া হলে তিনি এই কাজটি আসকার খানের ওপর ছেড়ে যান।
মীর জুমলার অসম অভিযানের তাতপর্য, অহোমদের বিরুদ্ধে তার বিজয়ের কারণ
জীবনের শেষতম অভিযান ছিল মীর জুমলার রাজনৈতিক-সামরিক জীবনে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সেনা অভিযান। মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষে তার প্রথম এবং শেষ অভিযান। মীর জুমলার অসম অভিযান মুঘল সাম্রাজ্যকে অসমের শেষ সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। ইখতিয়ারুদ্দিন মহম্মদ ইবন বখতিয়ারের সময় থেকে মুসলমান শাসকেরা উত্তরপূর্বে মুঘলদের শাসন এলাকা বাড়াবার পরিকল্পনা সফল করলেন মীর জুমলা। রণনীতিগতভাবে এটি অসাধারণ যুদ্ধ অভিযান। দিল্লি থেকে মহম্মদ বিন তুঘলক এবং বাংলার হুসেন শাহ যে অসম অভিযানে চরম ব্যার্থ হয়েছেন সেখানে মীর জুমলাই একমাত্র সফল হলেন। জাহাঙ্গীরের সময়ে মুঘল অভিযান প্রাথমিকভাবে সফল হলেও শেষ পর্যন্ত ব্যার্থ হয়েছিল। রাজার সঙ্গে শোলাগড়ের শান্তিচুক্তির দরকষাকষির সময় মীর জুমলা মন্তব্য করেছিলেন, রাজা যেন তাকে পূর্বের মুঘল বাহিনীর ব্যর্থ সেনানায়কদের মত না ভাবেন। তারা হেরে ফিরে গিয়েছিলেন, তিনি কিন্তু জিততে এসেছেন। শিহাবুদ্দিন তালিশ লিখছেন, ‘অতীতে কোনও বিদেশি রাজা অসমের এত ভিতরে ঢুকে আসতে পারে নি, এবং কোনও বিদেশি অসম দেশ জিততে পারে নি। মহম্মদ কাজিম লিখছেন, অতীত আসমের রাজারা আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে মাথা নোয়ায় নি, দেশের সব চেয়ে শক্তিশালী শাসককেও রাজস্ব দেয় নি। আজ কিন্তু তারা দেশের সব থেকে বড় সাম্রাজ্য শক্তির মাথা হেঁট করেছে। একদা বিশ্ববিজেতার আসাম জয় করতে এসে জেতার পথ হারিয়ে ফেলেছিল’।
মীর জুমলা একমাসের মধ্যে মুঘল কামরূপ জয় করেন। ভয়ানক, দুর্বোধ্য অসম জয় করেছিলেন আড়াই মাসেই। কোচবিহার থেকে অবাধে অহোম রাজধানীতে পৌঁছনোটাই বিজয় যাত্রার সমতুল ছিল। অহোম রাজা তার বিপুল বাহিনী, সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষার গড়, সমাধায় জড়ো করেছিলেন। তার ধারণা ছিল অতীতে যেভাবে অহমিয়ারা আক্রমণকারীদের হঠিয়ে দিয়েছে, এবারেও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। অতীতের অভিযাত্রীরা জয় না পেলেও, মীর জুমলা আসাম জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন। ডাচ শল্য চিকিৎসক জানাচ্ছেন, মীর জুমলার পরিকল্পনা এবং সৈন্য সাজানোর পরিকল্পনা এমনই দুর্ভেদ্য এবং উতসাহদায়ী ছিল যে অসম দেশ জেতার পরে তিনি পেগু হয়ে চিন অভিযানেরও পরিকল্পনা করেফেলেছিলেন। সাম্রাজ্যের বাহিনী ছ’মাসের জন্য সব কিছু বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, সে জন্য তাকে চরম দুর্ভোগও পোয়াতে হয়েছে। মন্বন্তর, বন্যা, মহামারী কোনটারই নিদান মীর জুমলার হাতে ছিল না। তার বাহিনী অহোমদের হাতে হারে নি, প্রকৃতির হুঙ্কারে বশ মেনেছে। মীর জুমলার অভিযানের প্রাবল্য এতই তীব্র ছিল যে অহোম রাজারা চরম ভয়ে দিল্লির শাসন মাথা পেতে নিতে বাধ্য হয়েছে। অতীতের কোন অসম রাজাই হার স্বীকার করে নি। অসমের ইতিহাসে মীর জুমলার নাম বরাবরের জন্য লেখা থাকবে। বুরুঞ্জীতে তার পাকা স্থান হয়ে গিয়েছে।
পুরোনো সাফল্যের অহোমেরা মনে করেছিল এবারেও তারা জিতবে। জমিদারদের থেকে মীর জুমলা দেশের যথাযথ খবর পাবেন, এটা তাদের আশা ছিল না। প্রত্যেক অঞ্চলে অহমিয়া প্রতিরোধ তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়ে, পঞ্চতরন এবং সিমলাগড় ছাড়া তারা মুখোমুখি যুদ্ধে যায় নি, এবং যুদ্ধে তাদের বড় ক্ষয়ক্ষতিও হয় নি। যোগিগুপায় মহামারী আর শ্রীঘাটে পিছনের সৈন্য আসায় দেরি হয়েছিল বটে, কিন্তু অহোমেরা যদি বর্ষা আসার সময় পর্যন্ত কঠোরভাবে নিজেদের প্রতিরোধ বেঁধে রাখতে পারত তাহলে হয়ত তালিশ বলছেন মুঘলেরা একটাও দুর্গ দখল করতে পারত না।
অহোমদের প্রখ্যাতি তাদের শৌর্য আর রণকুশলতায়। তারা সারাক্ষণ নজরদারি চালাত। সেনানায়কদের মত তাদের দুর্গও কঠোর কঠিন পাথরে তৈরি। অসমিয়াদের বিশাল বাহিনী ছিল, সম্পদ ছিল এবং যুদ্ধ করার যথেষ্ট রসদও ছিল, সিমলাগড়ের মত দুর্ভেদ্য দুর্গও ছিল, অসম সাঁজোয়া বাহিনী আর তাদের বারুদের গুণমানও অত্যাশ্চর্য ছিল। তবে এত সব সম্পদ যুদ্ধে জেতার জন্যে জরুরি হলেও, যথাযথ নেতৃত্ব ছাড়া একযোগে এত সম্পদ জড়ো হলেও বাস্তবে কার্যকরী হয় না, যদি না সেনানায়ক সেনানীদের মনে জেতা নিয়ে অতিরিক্ত জেদ চাপিয়ে দিতে পারেন। রাজা জয়ধ্বজের দোদুল্যমানতা, রাজধানীতে শত্রু আসার আগেই পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছার জন্য অসম বুরুঞ্জীতে তার (বদ)নামই হয়ে গেল ভাগানিয়া রাজা। তিনি কখনো মীর জুমলার মত নেতার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন না। প্রথম শিখ যুদ্ধ সম্বন্ধে কানিংহ্যাম যা বলেছেন, ঠিক সেই কথা ১৬৬১-৬২ সালের অহোমদের সম্বন্ধেও বলা যায়, বিদ্রোহীর হৃদয় ছিল, লড়াই করার হাজারো মানুষ ছিল, কিন্তু সবাইকে একসঙ্গে করে পথ দেখাবার মানুষটাই ছিল না।
কামরূপের বিভিন্ন সুরক্ষিত শিবির থেকে পশ্চাদপসরণ কিন্তু অহোমদের উদ্দেশ্যপূর্ণ রণনীতি ছিল না। মানস থেকে গুয়াহাটি পর্যন্ত যেসব অহোম সেনানায়ক বিভিন্ন বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন, তাদের রাজার প্রতি অনাস্থা এবং শিবির বদলে রাজাকে বাধ্য হতে হয়েছিল পশ্চাদপসরনের সিদ্ধান্ত নিতে। মুঘল কামরূপে তাংচু সান্দিকৈওএর থেকে প্রচুর মালপত্র গুয়াহাটির মুঘল প্রশাসক দখল করেছে, এমন একটা খবর পেয়ে রাজা নিম্ন অসমের সেনা বাহিনীর জন্য একজন অনঅসমিয়া মনথির ভরালী বরুয়াকে অসম বাহিনীর সেনানায়ক এবং প্রশাসক নিযুক্ত করেন। রাজার এই পদক্ষেপে অসমের প্রশাসন এবং সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ৪০০ বছরের অসমিয়া নেতৃত্ব দেওয়ার ঐতিহ্যে ছেদ ঘটল। প্রত্যেকটা দুর্গের দায়িত্বে থাকা অহমিয়া সেনাধ্যক্ষরা প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে গেল বা কোনও রকম প্রতিরোধ দিলই না। তারা নাকি মন্তব্য করেছিল, ‘বেজদলইরা এবারে যুদ্ধ করে দেখাক’। রাজার নিজের শ্বশুর রাজশাহুর বরফুকনই রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুঘল বাহিনী যাতে অপ্রতিরোধ্যভাবে নওগাঁয় ঢুকতে পারে গোপনে সে সুযোগ করে দিয়েছিল। রাজাকে ছেড়ে যাওয়া সেনানায়কেরা একে একে মুঘল বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে শাহী বাহিনীকে লাখাউ এবং গড়গাঁওএর দিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এছাড়াও তারা সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম দখল করার কাজে অথবা নির্দিষ্ট খবর দিয়ে নির্দিষ্ট কবর খুঁড়ে দামি ধনরত্ন উদ্ধারের কাজে সাহায্য করে। অজানা ডাচ সেনানায়ক (এখন আমরা জানি তার নাম হেডেন — অনুবাদক) অহোমদের মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ার তত্ত্বে খুব একটা গুরুত্ব দেন নি। তিনিও বলছেন, ‘আমরা যখন শত্রুর রাজ্যে ঢুকলাম, অসাধারণ ত্রাস শত্রু পক্ষকে গ্রাস করল, এবং নবাবের ভাগ্য সুপ্রসন্ন করতে অহমিয়ারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়াল’। বলা দরকার অসমিয়াদের রণনৈপুন্য আর মাথা না নামানো ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের আত্মসমর্পনের চরিত্রটি ঠিক খাপ খায় না।
মীর জুমলা অসমের কৃষকদের ওপর সেনাবাহিনীর অত্যাচার না করতে দেওয়ার যে মানবিক অথচ রণনৈপুন্যের নীতি নিয়েছিলেন সেটি দুর্দান্ত কাজ দিয়েছিল, তিনি থানেদারদের স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে কথা বলে তাদের বিরোধিতা দূর করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। স্থানীয় প্রজারা বহু সময়ে অহমিয়া বিদ্রোহী সেনানায়কদের ধরিয়ে দিয়েছে। অহোমদের পোড়ামাটি নীতিতে যে সব গ্রামবাসী গ্রাম থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, তারা মুঘলদের প্রতিশ্রুতিতে ফিরে এসে ঘরদোর তৈরি করেছে, নিজেদের জীবিকা ফিরে পেয়েছে ফলে তারা মুঘলদের রসদ সংগ্রহে সহায়তা করেছেন। অসমের রাজার যুদ্ধ জনগণের যুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে নি। গড়গাঁওতে থাকাকালীন মুসলমান প্রজাদের থেকে অহোমদের বহু গুপ্ত তথ্য পেয়েছেন মীর জুমলা।
দিলির খান দাউজায়ির মত একঝাঁক দৃঢবল সেনানায়ক মীর জুমলার সেনা বাহিনীতে ছিলেন যারা প্রত্যেক যুদ্ধক্ষেত্র এবং দুর্যোগ তুচ্ছ করে জয় ছিনিয়ে আনতে পারেন। ছিলেন ফারাদ খান, মহম্মদ বেগ, রশিদ খান, ইয়াগদার খান উজবেগ এবং তাদের বাহিনীর দৃঢ মনোভাবের সেনানীরা। মীর জুমলা তাদের ওপর যে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, সেটা অন্য কোন সেনানায়ক করে উঠতে পারেন নি। তার নেতৃত্ব, রণনীতি, শৃঙ্খলা, যুদ্ধের পরিকল্পনার সঙ্গে মন্বন্তর এবং মহামারী মোকাবিলা করার ক্ষমতা বাহিনীকে এক করে রেখেছিল। দুর্যোগের সময়ে ঠাণ্ডা মাথা, প্রজ্ঞা, প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনীয় সাহায্য পাঠানো, ১৬৬২-র বর্ষার দুর্যোগে তার সেনা সংগঠনের উদ্যম তাকে এবং তার বাহিনীকে বহু দুর্যোগ থেকে বাঁচিয়েছিল। তাই তিনি সব শেষে জয়ের রেখা দেখতে পেয়েছেন। তিনি অসম্ভবভাবে সুশৃঙ্খল — বর্ষায় যেমন, তেমনি অসম ছেড়ে চলে আসার সময়েও। তার কঠোর মনোভাব বাদুলি ফুকনের মত অদম্য সেনা নায়ককে শিবির বদল করতে বাধ্য করেছিল।
বাদুলি ফুলন তার রাজাকে ছেড়ে মীর জুমলার বাহিনীতে এসে ৩-৪ হাজার সেনা জোগাড় করে শোলাগুড়ি আর টিপামে মুঘলদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছে। তাঁকে পূর্ব অসমের গড়গাঁও এবং নামরূপের মধ্যে এলাকার ডেকা-রাজা নামে অভিষিক্ত করেন মীর জুমলা। তিনি রাজা এবং অন্যান্য অমাত্যকে ধরে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরিকল্পনাটা পথভ্রষ্ট হয়ে যায় অতন বরগোহাঁইর জন্য। বাদুলির নির্দেশে তার ভাই মাউপিয়া মেকুরিখোয়ায় নিজের দেশের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। বাদুলির পথ ধরে জগন্নাথ ডেকা, রঘুনাথ মজুমদার এবং পুত্র মনোহর, উদ্ধব দুরিয়া এবং ডাংধরা বা অন্যান্যরা শিবির পালটে তার দেশকে মুঘলদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, বাদুলিকে অসমের নবাব বানানোর শর্তে। মীর জুমলা সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেছিলেন, আমি যা চইছি সেটা পাওয়ার যথেষ্ট তথ্য-প্রমান পেলে আপনারা যা চাইছেন পাবেন। এমনকি মন্থির ভরালি বরুয়া মীর জুমলার বাহিনীতে যোগ দেন জয়ধ্বজকে ধরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে।
তবে অস্বীকার করা উচিৎ হবে না, মীর জুমলাকে আসাম জয়ের জন্য প্রচুর মূল্য দিতে হয়েছিল। তার বাহিনী অভূতপূর্ব দুর্যোগের মধ্যে পড়েছিল। ১৬৬২-র দুর্যোগের কথা স্মরণ করে তালিশ লিখছেন, ‘জলের থেকে লোহাকে গ্রেফতার করা সহজ’। মীর জুমলার মৃত্যুতে সম্রাটের নতুন দেশ বিজয় বিস্বাদ হয়েগিয়েছিল। যার জন্য তাকে দোষ দেওয়া যায় না, কিন্তু তার কাছের ওয়াকিয়ানবিশ কিন্তু এই বিজয়ে চোনা ফেলে লিখলেন ফাতিয়া-ই-ইব্রিয়া (বিজয় পুস্তক, যার নাম হুঁশিয়ারি) নামক চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো ইতিহাস। (চলবে)