| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা : জগদীশ নায়ারণ সরকার (১০ম কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৩৮০ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ৪ নভেম্বর, ২০২২

দ্বিতীয় অধ্যায়

কর্ণাটকে মীর জুমলা

প্রথম পর্ব

কর্ণাটক এবং কর্ণাটকে মুসলমান উপস্থিতির ইতিহাস

ক। বীজাপুর

৮। গাণ্ডিকোটা

১৫১৭-র ভিক্রিতি শকে বা ১৬৫০এ মীর জুমলা গোলকুণ্ডা থেকে গাণ্ডিকোটার দিকে বিপুল বাহিনী নিয়ে এগোতে এগোতে জাম্বুলামাদক তালুকের মাইলাভরম গ্রামে উপস্থিত হন। সেখান থেকে একটাই রাস্তা দিয়ে কেল্লা পর্যন্ত পৌঁছনো যায়। রাস্তাটির সব থেকে চওড়া অংশ ২০ থেকে ২৫ ফুট আর সব থেকে সরু অংশ ৭-৮ ফুট। থেভেনট বলছেন কখনও কখনও গুঁড়ি দিয়ে সে দুর্গে পৌঁছতে হয়। পাশেই খাড়া পাহাড়, আর পাশে দুটি খরস্রোতা নদী। পাহাড়ের মাথায় একটা ছোট সমতল ভূমি – সেখানে ছোট ছোট ঝর্ণার জলে ধান আর বজরা চাষ হয়। তাভার্নিয়ে লিখছেন, ‘দক্ষিণের সমতলে শহরটা এমন সুরক্ষিতভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে কেল্লাটিকে সহজে দখল নেওয়া না যায় — এক দিকে খাড়া পাহাড় আর দুটি নদী, তিনদিক পাথরের বিশাল দেওয়ালের সুরক্ষায় ঘেরা। শহরে ঢোকার জন্য সমতলের দিকে রয়েছে একটিই দরজা আর তাঁর পাশে পরিখা কাটা। দুর্গে মাত্র দুটি কামান রয়েছে, একটি ১২ পাউণ্ডের (নাম রামাবনম) দরজার সামনে বসানো, অন্যটি ৭-৮ পাউণ্ডের দুর্গ প্রাচীরের ওপরে বসানো।’ রাজা তিম্মা নায়ার এই অঞ্চলের সুকৌশলী সেনা নায়কদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর পাশে ছিল রেড্ডি রাজারা। ঘেরাও হলে ১২ বছরের খাদ্য পানীয়ের সমস্যা হবে না এমন অবস্থা তৈরি করে রাজা মীর জুমলার বশ্যতা অস্বীকার করে যুদ্ধে আহ্বান করলেন। ছোট ছোট গেরিলা আক্রমনে স্থানীয়েরা মীর জুমলার বাহিনীর বিপুল ক্ষতি করতে থাকে। অবাক হয়ে এক সময় মীর জুমলা দেখেন তাঁর বাহিনীর ৩,০০০ সেনা এই চোরাগোপ্তা আক্রমণে নিহত হয়েছে। মীর জুমলাকে শিবির পিছিয়ে গুদেমচেরুভু আর গোরিগানুরুতে নিয়ে যেতে হয়। মুসাফির থেভেনট, আবদুল্লার রাজত্বে গোলকুণ্ডা এসেছিলেন। তাঁর লেখনী আর তেলুগু সূত্র থেকে পরিষ্কার মীর জুমলার জয় বাহুবলে হয় নি, বরং ছলে-কৌশলে তাঁকে জিততে হয়। তাভার্নিয়ে বলছেন, শেষ পর্যন্ত মীর জুমলা পাহাড়ের চূড়ার উচ্চতা পর্যন্ত কামান বয়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি রাজার ফরাসী গোলান্দাজদের চার মাসের সাধারণ বেতনের থেকে অনেক বেশি বেতনের অর্থ দক্ষিণার টোপ দিয়ে কাজটা করাতে পেরেছিলেন। চারটি কামান পাহাড় সমান উচ্চতায় তুলে দুর্গটিতে গোলা দাগা হল; সদর দরজার কাছে থাকা কামানটিকেও অকেজো করে দেওয়া হল। সুরক্ষিত দরজাটি প্রায় ধ্বংস হয়ে পড়ছে দেখে দুর্গের অধিবাসীরা তাদের দৈহিক সুরক্ষার শর্তে দুর্গ ছেড়ে চলে যায়। তাভার্নিয়ে বলছেন, গাণ্ডিকোটায় মীর জুমলা সফল হয়েছেন ফরাসী গোলান্দাজদের দক্ষতার জন্য, খারাপ ব্যবহার পেয়ে এরা ডাচেদের ছেড়ে তাঁর বাহিনীতে চলে এসেছিল। তাদের সঙ্গে ব্রিটিশ ডাচ ২/৩ জন ইতালির গোলান্দাজও ছিল। আবার তেলুগু সূত্র বলছে — বহিদিন ধরে অবরোধ করেও যখন দুর্গটি দখল করা সম্ভব হল না, তখন মীর জুমলা প্রস্তাব দিলেন তাদের গুটি দুর্গের সঙ্গে এই দুর্গটি বদল করার। কিফায়তিতে যে কারণ দেওয়া হয়েছে তা যদি সত্য নাও হয়, মীর জুমলার কূটনৈতিক চাল যে কাজ করেছে তার উদাহরণ পাই থেভনটের কথায়, ‘মীর জুমলা বল প্রয়োগে দুর্গটি দখল করতে না পেরে কৌশল আর অর্থ বলে (শান্তি আলোচনায় তাঁর সকাশে আসা নায়েককে) রাজাকে দুর্গের বাইরে বের করে নিয়ে এসে, তাকে দেওয়া শর্ত ভঙ্গ করে নজরবন্দী করে গাণ্ডিকোটা দুর্গ দখল করেন।’ তাভার্নিয়ে আর থেভনট এই বর্ণনা দিয়েছেন। তাভার্নিয়ের মীর জুমলার ঘুষ দেওয়া বর্ণনা এই ঘটনার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।

কর্ণাটকের অভেদ্য পাহাড়ি দুর্গের পতন মীর জুমলার সাফল্যের অন্যতম শিখর। কিন্তু বিজাপুরী ঐতিহাসিক ঝাউর, এই জয়ে মীর জুমলার কোনও কৌশলকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিতে নারাজ, ‘দুর্গের রাজা বিপুল রত্নরাজি আর সম্পত্তি গর্বে অন্ধ হয়ে মীর জুমলার আক্রমনকে মরুভূমিতে মরীচিকার মত ছোট করে দেখেছিল। মীর জুমলা কেল্লা আক্রমন করা শুরু করলে, প্রথম দিকে তার বাহিনী আত্মগর্বে অন্ধ হয়ে, সেই বিপুল আক্রমণ প্রতিহত করার চেষ্টা করে নি। দুর্গে কেল্লাধিপতি নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে ছিল। বাধা না পেয়ে ক্রমশ মীর জুমলা দুর্গের কাছাকাছি এসে দুর্গটি ঘিরে ফেলেন। প্রতিরোধের চেষ্টা করলে হয়ত রাজা সফল হত, কিন্তু ভিষগের হাতের তলায় যেমন রোগীর নাড়ি ফড়ফড় করে, আদিল শাহের নাম শুনে কোনও প্রতিরোধ ছাড়াই রাজা মীর জুমলার হাতে পরাজয় মেনে নিলেন। যেহেতু তাঁর আশেপাশের সব রাজাই আদিল শাহের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, সেহেতু তিনিও একটা সময় পরে আত্মসমর্পণ ছাড়া অন্য কোনও পথ দেখলেন না।’

মীর জুমলার এই জয়ে উদ্বেল হয়ে কুতুব শাহ তাকে নওরোজইখিলাত উপাধি দেন। তখন সবে মীর জুমলা মধ্য বয়সে পৌছেছেন [১৫৯১-তে তাঁর জন্ম হলে, মীর জুমলার বয়স তখন ৬০এর কাছাকাছি]। যুদ্ধের ধকলে তিনি প্রচুর শক্তিও ক্ষয় করেছেন। এছাড়াও তাঁর দৈহিক অসুস্থতাও (শিকস্তগি) সারানোর দরকার ছিল। তিনি সুলতানের কাছে মক্কা যাবার অনুমতি চাইলেন। কুতুব শাহ যুদ্ধের আগে তাকে উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দীর্ঘ ২০ দিন ধরে অজীর্ণ রোগে ভুগেছেন এবং ক্রমাগত বমি করে একের পর এক নিদ্রাহীন রাত কাটিয়েছেন। বিগত পাঁচ বছর নিত্যদিনের যুদ্ধে যাওয়ার কারণে তাঁর দীর্ঘ প্রয়োজনীয় অবসর এবং রোগ সারানোর জন্যে সময় দরকার ছিল।

[মীর জুমলা আদৌ মক্কায় গিয়েছিলেন কী না, সে বিষয়ে জগদীশ নারায়ণ সরকার তাঁর বইতে নির্বাক। কিন্তু অন্য একটা সূত্রে আমরা তাঁর মাক্কা যাওয়ার কথা এবং ফেরার সময় দুর্ঘটনার সংবাদ পাচ্ছি। The Identity of a Mystic : The Case of Sa’id Sarmad, a Jewish-Yogi-Sufi Courtier of the Mughals প্রবন্ধে Nathan Katz দারা শুকো খ্যাত নির্মোক ফকির শরমাদের জীবন গবেষণা প্রবন্ধে বলছেন তিনি আর তার পুরুষ সঙ্গী অভয় চাঁদ রাজধানী শহরে কিছু দিন কাটিয়ে দক্ষিণের হায়দারাবাদে আসেন। বিখ্যাত কবি মহসিন ফনির দাবিস্তানইমজহব সূত্রে জানতে পারছি, তিনি যেহেতু ইহুদি ছিলেন, তাই দক্ষিণে রাব্বি হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। শাসক কুতুবশাহী বংশ শরমাদের অনুগামী হয়। কুতুবশাহী সাম্রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী, ব্যবসায়ী শেখ মহম্মদ খান, যাকে আমরা পরে মুঘল উজির আর আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা নামে চিনব, তাঁর সঙ্গে সরমাদের বহুবার দেখাসাক্ষাৎ হয়। সরমাদ তাঁর অতীতের দিনগুলো এবং ভবিষ্যতে মক্কা থেকে ফেরার পথে সমুদ্রে জাহাজ ভেঙে মৃত্যুর সম্ভাবনা বিষয়ে মন্তব্য করে তাঁর মন জিতে নেন। এর পরের সময়ে মীর জুমলার উত্থান শুরু হয়। ক্ষমতাসীন মীর জুমলাকে উদ্দেশ্য করে তিনি কবিতাও লিখলেন O Shaikh, thou encompasseth the heavenly orbit like a circle—/May hundreds of heavens wait upon thee as slaves./Turn this poor man’s night into bright day,/As thou enjoyeth the sun-shine favours of King Kutub Shah। ১৬৪৯-৫০-এ দাবিস্তানের লেখক মোবিদ শাহ সরমাদের সঙ্গে দেখা করেন। — অনুবাদক]

৯। গাণ্ডিকোটা পরবর্তী জয়রথ

গোলকুণ্ডা থেকে ৬০ মাইল দূরে উত্তর-পূর্বে অনন্তপুর জেলায় মীর জুমলা গুটি দুর্গ দখল করলেন। জয়ের তারিখ জানা যায় না। প্রেমাদুর স্মৃতি কথায় বলা হচ্ছে গুটির পতন হয় ১৬৪৬-এ। কিন্তু ১৫৭২ শক বা ১৬৫০-এর তেলুগু লেখমালা বলছে এই অঞ্চল মীর জুমলা শাসন করেছিলেন (হাজারাতি নবাবৌ বা রাজাধিরাজা রাজাপরমেশ্বর), অন্য দিকে তাভার্ণিয়ের ১৬৫২-র গাণ্ডিকোটা যাত্রা সূত্রে জানা যাচ্ছে, মীর জুমলা শুধু গুটি তালুকের বজ্রকারুর হীরে খনিগুলোরই মালিক ছিলেন।

গুটি থেকে মীর জুমলা, দক্ষিণ পূর্বের রাচুতি হয়ে গুরুমকোণ্ডা দখল করেন। সেই দিকে আরও দক্ষিণ পূর্বে এগিয়ে উত্তর আর্কোট জেলার চন্দ্রগিরি এবং তিরুপতি পর্যন্ত পৌঁছে যান। ৬০০ ফুট উঁচু উপত্যকার মাথায় তিরুমালা পাহাড়ের দক্ষিণ দিকে গ্রানাইট পাথরে কাঠামোয় যাদব বংশের তৈরি চন্দ্রগিরি দুর্গ পাথরের দেওয়ালে (১০০০-এ তৈরি) এবং একটি বিশাল পরিখায় অভূতপূর্বভাবে সুরক্ষিত। বিজয়ী সেনাপতি এখানে মাটির প্রাসাদ তৈরি করান। ২৬ আগস্ট ১৬৫২-তে তিরুপতিতে তাঁবু ফেলা তাভার্নিয়ে দেখেছেন প্রচুর সেনা যেতে … কারোর কারোর হাতে বল্লম, কারোর হাতে বন্দুক, কারোর হাতে ভাল্লা, এরা মীর জুমলার কৌরুয়ার শিবির পাতা সেনার সঙ্গে যোগ দিতে যাচ্ছিল… সেনা দলে বহু মূর্তিপুজক রাজা ছিল’। পরে সেখানে তিনি গিয়ে মীর জুমলার সঙ্গে দেখা করেন এবং দেখেন মীর জুমলার সেনাপতিরা হিন্দু রাজাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় রত।

১০। কর্ণাটক ভাগাভাগির যুদ্ধ

সীমান্ত ভাগাভাগি চুক্তি শুধু যে চন্দ্রগিরির রাজার বিপক্ষে গিয়েছে তাই নয়, এই চুক্তিতে আদিল শাহের থেকে বেশি লাভ হয়েছে কুতুব শাহএর। যুদ্ধের বেশি ক্ষতি সহয় করতে হয়েছে আদিল শাহের রাজ্য — অন্তত এই ধারণা আদিল শাহের মনে বদ্ধমূল হয়ে গেঁথে যায়। অস্থায়িত্বই ছিল চুক্তিটির মৌল চরিত্র। এই সময়ে দাক্ষিণের রাজনীতি একটি নির্দিষ্ট খাতে, নির্দিষ্ট দিকে না বয়ে এলোমেলোভাবে বয়ে চলেছিল; বিশেষ করে দক্ষিণের দুই সুলতানি রাজ্যের মধ্যে সম্পর্কর রাজনীতির অস্থিতিশীলতা দক্ষিণের সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীল্পতার ওপর প্রভূত প্রভাব ফেলেছে। দু-পক্ষের মধ্যে যে গভীর অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল বহু কাল ধরে, সেই সমস্যা শুধু চুক্তি করে ওপড়ানো সম্ভব ছিল না। দুজন দুজনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অবিশ্বাসের আঙ্গুল তুলতে থাকেন। জিঞ্জি অবরোধের সময় আবদুল্লা, পাদশাহকে একটা নাকি সুরে লেখা কান্না ভরা চিঠিতে বলেছিলেন, ‘আদিল শাহ কিন্তু তাঁর চরিত্র অনুযায়ী সম্রাটের তৈরি করা চুক্তির নির্দেশ মানবে না এবং যে ভাগাভাগির শর্ত হয়েছে তাও লঙ্ঘন করবে।’

কুতুব শাহ তাঁর দিল্লির উকিল (এজেন্ট) ফাসিউদ্দিন মহম্মদকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, পাদশাহ যাতে দুজন আমিন – একজনকে বিজাপুর অন্যজনকে গোলকুণ্ডায় নিযুক্ত করেন, অথবা তিনি যেন গোলকুণ্ডায় আওরঙ্গজেবের দূত মীর মহম্মদ তাহিরকে ঠিকভাবে তদন্ত করে বিষয়টি সমাধানের কঠোর নির্দেশ জারি করার বার্তাটা দেন। কুতুব শাহ যুদ্ধের (জিঞ্জি ঘেরাওয়ের আগে) আগে একজন আমিন চাইলেন, আদিল শাহ যাতে গণ্ডগোল না করতে পারে সেটা দেখার জন্যে। অন্য আরেকটি চিঠিতে কুতুব শাহ পাদশাহকে অভিযোগ করে লিখলেন, বিজাপুর যে চুক্তি ভঙ্গ করেছে, সেটি ইসলাম খান জানেন, এবং ভেতরে ভেতরে বিভেদ যাতে আরও বাড়ে সে ব্যবস্থাও তিনি করে রেখেছেন। কুতুব শাহ চুক্তির কতগুলি বিষয় পুনর্বিবেচনা করতে অনুরোধ করলেন, ১) রাজপরিবার, নায়ক রাজ্য লুঠে যে নগদ, গয়না-রত্ন, হাতি এবং জিনিসপত্র পাওয়া গিয়েছে, সেগুলির ভাগাভাগির পুনর্মূল্যায়ন করা হোক, এবং কুতুব শাহ উদার মনে চান আদিল শাহ নিজে এগুলি মূল্যায়ন করুন; ২) কর্ণাটকে কুতুবশাহী দখল করা অঞ্চল অর্ধেক অংশ বাঁটোয়ারার চুক্তি হয়েছে। কিন্তু এই চুক্তি পাদশাহ দ্বারা প্রত্যায়িত নয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইসলাম খান প্রাথমিক চুক্তির শর্তগুলো জানতেন, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর (নভেম্বর ১৬৪৭) সুযোগ নিয়ে আদিল শাহ শাহজীর অধীনে উজির পাঠিয়ে কর্ণাটকের হিন্দুদের সাহায্য করেন, বিশেষ করে রয়াল এবং অন্যান্য জমিদারকে সহায়তা করেন; কিন্তু মীর জুমলা সব শত্রু পরাজিত করে বিজাপুরীদের বিদরের সীমান্তে তাড়িয়ে দেন; এবং আদিল শাহ নিজে বিদরে আসেন। বিদর আসলে যৌথ সীমান্ত; অভিযোগ তিনি চুক্তি এবং প্রতিশ্রুতি অমান্য করে জোর খাটিয়ে কুতুব শাহের অধিকৃত জায়গা দখল করেন। আদিল শাহের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ তিনি তাড়াহুড়ো করে দুই-তৃতীয়াংশ ভাগ নিয়ে নিতে চেয়েছেন, অথচ কুতুব শাহের পাওনা (তিনি যে পাদশাহকে এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন তা না জেনেই) আটকে দিয়েছেন এবং তাঁর যা পাওনা সেটা তো দেনই নি, বরং অনেক বেশি তিনি কেড়ে নিয়েছেন। ব্রিটিশ সূত্র এই তথ্য প্রমান করে যে ভেলোর (১৬৪৭) দখলের সমস্ত ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রাপ্ত অর্থ বিজাপুর নিয়েছে।

দুই সুলতানি রাজ্যের দ্বন্দ্ব খুব পুরোনো নয়, কিন্তু গভীর। শুরু হয়েছে জিঞ্জি অবরোধের সূত্রে – যদিও মুস্তাফা আর মীর জুমলা এই চুক্তি সম্পাদন করেন, কিন্তু আবিশ্বাসের মাত্রা এতই গভীর আর তীব্র ছিল যে, সেই চুক্তির শর্তের বোঝাপড়ার বাস্তবতা এড়িয়ে নতুন গোলযোগ পেকে উঠল। এবারে গোলকুণ্ডার বিরুদ্ধে বিজাপুরী উজির খান মহম্মদ সম্পর্ক ভাঙ্গার অভিযোগ আনলেন। পাদশাহকে আদিল শাহ লিখলেন, তাঁর নির্দেশ ছাড়া এবং তাঁকে অন্ধকারে রেখে কুতুব শাহ গোণ্ডিকোটা দখল করেছেন। তাঁর আরও অভিযোগ মীর জুমলা যুদ্ধে সাফল্য পেয়ে কুতুব শাহকে জানিয়েই বিজাপুরের বিরুদ্ধে অস্ত্র শানাতে শুরু করেছেন। ঝাউর লিখছেন ‘দুটি-তিনটি জয়ের পর (ভুল বোঝাবুঝির জন্য হয়েছিল), যা আসলে হাজারটা পরাজয়ের থেকেও কলঙ্কের, মীর জুমলা তাঁর কাজকর্ম গোলকুণ্ডার সুলতানকে না জানিয়েই সম্পাদন করতে শুরু করেন। এই শয়তানি যুদ্ধ তাঁর প্রভুর নির্দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সে এলাকা দখল করতে করতে আদিল শাহের এলাকায় ঢুকে আসত। কুতুব শাহ কাজকর্ম সম্পাদনের নিয়ন্ত্রণ একজন ভয়ানক মানুষেরর হাতে ছেড়ে দিয়েছেন দেখে আদিল শাহ মুচকি হেসেছেন এবং মীর জুমলার কাজকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।’ বিজাপুরী ঐতিহাসিকদের অভিযোগের মূল বয়ানটা হল মীর জুমলা মুলুন্দ আর কর্ণাটকে গোলযোগ সৃষ্টি করছেন। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছেন, গোণ্ডিকটার বিজয় ঘটেছে আদিল শাহের বাহিনী ছেড়ে যাওয়ার জন্য। এছাড়াও বিজাপুর কুতুব শাহের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আদিল শাহ যে ক্ষমা প্রদর্শন করেছেন, সেই কাজ কুতুব শাহ করেন নি — বিশেষ করে জিল্লালা এবং নান্দিয়ালের দুটি গ্রাম দখল বিষয়ে গোয়েন্দাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের পরেও। আর সর্বশেষ অভিযোগ, একতরফা গুটি দখল করায় গোলকুণ্ডার সঙ্গে তাদের বিরোধ বেড়েছে।

অন্যদিকে কুতুব শাহ তার দিল্লির প্রতিনিধি, উকিল দূত মুল্লা আবদুস সামাদকে নির্দেশ দিলেন আদিল শাহের মিথ্যে অপবাদ সম্রাটকে অবহিত করতে। আর গাণ্ডিকোটা দখলের বিরুদ্ধে তিনি যে অভিযোগ এনেছেন সেটি সত্য নয়, এটি কুতুবশাহের আইনি অধিকার। আদিল শাহ মীর জুমলার বিরুদ্ধে যেভাবে নিয়মিত অভিযোগ করে চলেছেন তাতে সুলতানের ব্যক্তিগতভাবে মানহানি হয়েছে। তিনি বরারই আদিল শাহের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন সেটা সম্রাট জানেন। প্রতিনিধিকে সম্রাটকে প্রশ্ন করে জানতে বলেন তার এবার কি পথ নেওয়া উচিত।

কিন্তু সমস্যা হল, ঐতিহাসিকদের ভাষায় দুই প্রাক্তন জোট-বন্ধুর মধ্যে চিঠির লড়াই খুব তাড়াতাড়ি মুখোমুখি অস্ত্র যুদ্ধে পরিণত হল। ফোর্ট সেন্ট জর্জের ১৬৫২র ১৪ জানুইয়ারির ডেসপ্যাচে ঘটনার বিশদ বিবরণ আছে, ‘গোলকুণ্ডা আর ভিজাপুরের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে, বেচারা জেন্টুদের (রয়াল) আশা ছিল উভয় শক্তিই ধ্বংস হবে এবং তাদের ভাগ্য ফিরবে…’।

আদিল শাহ, খানইখানান খান মহম্মদ লোদিকে জয় করা দুর্গ অধিকারে আনতে মীর জুমলার বিরুদ্ধে অভিযানে পাঠালেন। গাণ্ডিকোটার দিকে যাওয়ার সময় খান মহম্মদ ৪ ফারসাখ দূরত্বের চন্দ্রগুটি দুর্গ দখল করলেন। হামলাদারেরা দুর্গের দরজায় গোলা দাগতে থাকলে কেল্লা থেকেও গোলায় উত্তর আসতে থাকল। কিন্তু কেল্লার ওপর আদিল শাহী সেনারা এত গোলা ছুঁড়ছিল যেন যেন শয়তান স্বয়ং দুর্গ দখলের সাক্ষী হয়ে রইল। খানইখানান আর দুর্গ অবরোধ চালালেন না, তিনি গাণ্ডিকোটায় মীর জুমলার বাহিনীকে আক্রমন করে শহরের বাড়ি আর প্রাসাদ ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

মীর জুমলা, তাঁর অর্জিত অযুত সম্পদ ব্যবহার করে বহুকাল ধরে প্রচুর পরিশ্রম করে মুঘল, আফগান, পাঠান এবং রাজপুত সমন্বয়ে বিপুল বাহিনী বানিয়েছেন। সেই বাহিনীর দক্ষতার জন্যে তিনি গর্ব বোধ করেন। তিনি অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধের জন্য তৈরি হলেন। কেল্লার চারপাশে সেনাদের বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে নানান জায়গায় রাখলেন। সাহসী, বিশ্বাসী সেনাপতি মহম্মদ খান লোদি বড় বাহিনী নিয়ে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হলেন। তিনি বিজাপুরী বাহিনীর সেনাপতি বাজী ঘোড়পাড়ের (মুধলের) মুখোমুখি হলেন। বিজাপুরী বল্লমধারী অশ্বারোহীরা (lancer) দুপাশ দিয়ে মীর জুমলার বাহিনীকে আক্রমন করে বল্লম দিয়ে আর তীর মেরে মীর জুমলার বহু সেনা নিহত করল। ১৬৫২-র ১৪ জানুয়ারির চিঠিতে মাদ্রাজী কুঠিয়াল জানাচ্ছে, ‘দুদিন ধরে লড়াই চলেছে। আমাদের কাছে খবর আছে, নবাব তার সেনাবাহিনী নিয়ে গোলকুণ্ডা পাহাড়তলী আক্রমন করছে। ভিজাপুরী বাহিনীর প্রবল চাপে তিনি আরও নিরাপদ যায়গায় সরেগেছেন’। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev