কর্ণাটক এবং কর্ণাটকে মুসলমান উপস্থিতির ইতিহাস
১০। কর্ণাটক ভাগাভাগির যুদ্ধ
মহম্মদ খান লোদি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে মাথায় আঘাত পেয়ে মারাগেলেন এবং তার কাটামাথা বীজাপুরী সেনাদের উল্লাসভরে দেখানো হল। প্রবল এই যুদ্ধে মীর জুমলার বহু সেনা নিহত হয়। বাজী ঘোরপাড়ে মীর জুমলাকে গাণ্ডিকোটা থেকে তাড়িয়ে দিলে গাণ্ডিকোটাবাসী পাহাড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। বিজাপুরী ঐতিহাসিক উচ্ছ্বাসভরে লিখেছেন, ‘কুতুব শাহী রাজত্বের শক্তিশালী আমলা মীর জুমলা, যিনি রাজার বিরুদ্ধে প্রবল যুদ্ধেও স্থির থাকেন, তিনি এক সাধারণ উজির বাজী ঘোড়পাড়ের কাছে হার মানলেন, হাতের মুঠো খুলে যেমন ধুলো ছুঁড়ে দিলে আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে যায়, ঠিক তেমনিভাবে বিপক্ষের সেনা চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পালিয়ে গেল’। গাণ্ডিকোটার কলঙ্কিত হারের পর মীর জুমলা, খান মহম্মদের সঙ্গে একজন উকিলের মাধ্যমে শান্তি চুক্তি করতে উদ্যত হন এই শর্তে — ১) মীর জুমলার পক্ষ থেকে আড়াই লক্ষ হুন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, যতক্ষণনা এই অর্থ পুরোপুরি আদায় হচ্ছে, মীর জুমলার প্রশাসনের আধিকারিকদের জামিন হিসেবে থাকতে হবে, ২) গাণ্ডিকোটা দুর্গ এবং কোকানুর গ্রাম মীর জুমলাকে দেওয়া হবে এবং তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। চুক্তিপত্র শেষ হচ্ছে ‘তার জীবনদান দেওয়া হল’ বাক্যবন্ধে।
আদিল শাহের স্বার্থ দিকে লক্ষ্য রেখে বিজয়ী পক্ষ মীর জুমলার উকিলকে সম্মান জানিয়ে স্বাগত জানালেন এবং তাদের আবেদন সুলতানের কাছে পাঠিয়ে দিলেন এই মন্তব্য করে যে চুক্তির এই শর্তগুলো মেনে নেওয়া ভাল কারণ মীর জুমলাকে শাস্তি দেওয়ার অর্থ হল দুর্গ আর কুতুব শাহী সেনাবলকে ধ্বংস করা এবং মীর জুমলা দীর্ঘকাল ধরে যে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করে দুর্গে জমা করে রেখেছেন সে সব তার হাত থেকে বেরিয়ে গিয়ে তাকে নিঃস্ব করে দেওয়া। আদিল শাহ শান্তিচুক্তিতে সম্মতি দিয়ে ১৬৫২ সালের জানুয়ারি ১৪ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যের কোনও একটা সময় তিনি লিখলেন, ১) মীর জুমলাকে তার বিজিত অংশ — গাণ্ডিকোটা দুর্গ এবং কোকানুর গ্রাম ফেরত দেওয়া হোক; ২) তিনি খান মহম্মদকে ৫ লক্ষ ৫০ হাজার হুন আর ৪ টি হীরে (যে পালিশ ছাড়া হীরে এখনও কোন মণিকারের চোখে পড়েনি) ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেবেন; এই সব আদিল শাহের দরবারে পাঠিয়ে দিতে হবে।
মীর জুমলাকে হারিয়ে বীজাপুরী সেনানায়ক খান মহম্মদ, উজানি কর্ণাটকের (আপল্যান্ড কর্ণাটক) রাজধানী পেনুকোণ্ডা দখল করারর উদ্দেশ্যে এগোলেন। পেনুকোণ্ডা থেকে ৪ ফারসাখ দূরে রুডের কসবায় শিবির ফেললেন। সিদ্দি রাইহান শোলাপুরীর পুত্ররা (যাদের অভিভাবক অম্বর কলাকে সুলতানের নির্দেশে হত্যা করা হয়েছে) সেরায় বিদ্রোহ ঘোষণা করে মহীশূরের স্থানীয় রাজাদের সঙ্গে বিশেষ করে মহীশুরের রাজার সঙ্গে শত্রুভাবাপন্ন বন্ধুত্ব স্থাপন করল — যার সেনাপতি মুস্তাফা খান জগদেব দেশ দখল করেছিলেন এবং ৪ লক্ষ সেনা আর ৪০ হাজার হাতি সমন্বয়ে কর্ণাটক আর মালন্দে বৈপ্লিবিক পরিবর্তন, ইনকিলাব এনেছিলেন। খান মহম্মদ এই সবে মাথা ঘামালেন না, রাজার পূর্বজদের রাজধানী পেণ্ডুকোটায় অবরোধ চালিয়ে গেলেন। রাজা ক্ষমা চেয়ে অবরোধকারীদের শর্তে রাজি হয়ে ১৬৫২-র মার্চে দুর্গ হাত বদল করে কন্দর্পিতে চলে গেলেন — পেণ্ডুকোটার নতুন নাম হল তাকতইমুবারক।
কর্ণাটকে খুব তাড়াতাড়ি যুদ্ধ থামার লক্ষ্মন দেখা যাচ্ছিল না — যুদ্ধের প্রভাব আগের মতই ধ্বংসাত্মক এবং তীব্র হয়ে স্থানীয় মানুষদের জীবন ছারখার হয়েও গেল, একালার পর এলাকা জনশূন্য হয়ে গেল। খান মহম্মদ যুদ্ধ থেকে বিরতি নিয়ে রাজধানীতে বিশ্রাম নেওয়ায় মহীশূরের রাজার সাথে হাত মিলিয়ে শ্রীরঙ্গ রয়াল কিছুটা হারানো জমি উদ্ধার করলেন। আক্রমনে যাওয়া কুতুব শাহী সেনাকেও তাড়িয়ে দেওয়া হল। মহীশূরের রাজার অগ্রগতি রুখতে খান মহম্মদ জগদেব দেশ, কৃষ্ণগিরি দুর্গ আর মহীশূর দুর্গ অবরোধ করলেন, এবং শেষ পর্যন্ত রাজার চারটে দুর্গ দখলে নিলেন। জিঞ্জি যাওয়ার পথে গোলকুণ্ডা সাম্রজ্য এলাকার ওপর দিয়ে যাওয়ার জন্যে বিজাপুরী সেনাপতি মীর জুমলার অনুমতি চাইলেন। মীর জুমলা সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেন। মীর জুমলা দেখছেন পেন্নার উপত্যকার পেনুকোণ্ডা অঞ্চলে বিজাপুরী সেনার সাফল্য; তারা সক্রিয় হয়ে উঠলে তাঁর কর্ণাটক দখলদারির স্বপ্ন ভেস্তে যাওয়াও অসম্ভব নয়। তিনি মহীশূরের নায়কদের বিজাপুরী সেনার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে মহীশূরের রাজার সঙ্গে আলাপ আলোচনার রাস্তা খোলা রাখলেন। মহীশূরের নায়ক বিজাপুরী বিদ্রোহী সিদ্ধি রাইহান এবং অন্যান্য আদিল শাহী সেনাপতির সঙ্গে যোগ দিলেন মুস্তাফার দখল করা দুর্গ দখল নিতে। মীর জুমলার প্রতিশ্রুতিতে রয়েল ভেলোরে বিশাল বাহিনী গড়ে তুললেন বিশাল পরিশ্রমে। ঝাহুরবিনঝাহুরী লিখছেন, ‘শ্রীরঙ্গ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে ভেলোর দুর্গে, আদিল শাহ চিঠির মাধ্যমে নির্দেশ দিয়ে জানালেন মীর তার তার উকিল হবেন এবং তিনি তাঁর থেকে মুঘলদের ৫০ লক্ষ হুণ আর ৪৫টি হাতি পেশকাশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। মীর জুমলা মুঘলদের সব রকমভাবে ওসকাতে লাগলেন’।
মীর জুমলার দৌত্য প্রচেষ্টা বীজাপুরকে নতুন কূটনৈতিক রণনীতি নিতে বাধ্য করল। বিশ্রাম নিতে দরবারে আসা বীজাপুরী সেনানায়ক খান মহম্মদকে তড়িঘড়ি অকুস্থলে ফেরত পাঠিয়ে জগদেব দেশ এবং দুর্ভেদ্য দুর্গ কৃষ্ণগিরিসহ চারটে দুর্গ নিয়ন্ত্রণ করা মহীশূরের নায়কের সঙ্গে আলাপআলোচনা চালানোর নির্দেশ দিলেন বীজাপুরের সুলতান। তার নির্দেশ হল আপাত কিছু দিন মহীশুর সমস্যা দূরে রেখে শ্রীরঙ্গকে কব্জা করে ভেলোর জয় করা দরকার। তিনি খান মহম্মদকে নির্দেশ দিলেন গোপনে কুতুব শাহের সাহায্য নিয়ে ভেলোর আক্রমন করতে চাওয়া রয়ালকে আক্রমন করতে, যাতে সে মীর জুমলার সঙ্গে যোগ না দিতে পারে। দীর্ঘ অবরোধের পর ১৬৫৪-র ৭ নভেম্বরের কাছাকাছি সময়ে বিজাপুরী সেনাপতি খান মহম্মদ ভেলোর দখল করলেন। রয়াল তার সঙ্গে চুক্তি করে চন্দ্রগিরি এবং কিছু জেলার রাজস্ব তাঁর হাতে তুলে দিতে বাধ্য হলেন। চন্দ্রগিরি এখন বিজয়নগরের গর্ব। রয়াল উত্তর তাঞ্জোরের আদিবাসী অধ্যুষিত জঙ্গলে আশ্রয় নিলেন (আকল নায়েকের জঙ্গল)। সঙ্গীসাথী ছেড়ে রাজত্বহীন হয়ে রাজা সেখানে জঙ্গলে তীব্র কষ্টে দিন কাটাতে লাগলেন; শেষ পর্যন্ত তিনি একদা তার অধীনস্থ মহীশূরের রাজার কাছে আশ্রয় পেলেন।
চন্দ্রগিরি আর মহীশূরের রাজারা গোলকুণ্ডার অভিযান অঞ্চলগুলো দখলে নিল।। রয়ালকে তিরুমালা উদ্ধার করার সুযোগ না দিয়ে, মাদুরার নায়েক, খান মহম্মদকে অনুরোধ করলেন আক্রমনকারী মহীশূরের সেনাকে তাড়িয়ে দিতে। তিনি গিরিপথগুলো খুলে দিয়ে বিজাপুরের সেনাকে মহীশূর আক্রমনের পথ করে দিলেন। মাদুরার অধীনে থাকা আতুরে শিবির করে মহীশূর লুঠ করলেন বীজাপুরের বাহিনী। রাজা, বীজাপুরের সেনাপতি বালাজি হইবত রাওকে খান মহম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠালেন। খান মহম্মদ বালাজীর বিরুদ্ধে সিদ্দি মাসুদকে সেনাপতি হিসেবে পাঠান। বালাজী হারলেন এবং তার মাথা কাটা গেল। রাজাকে ক্ষমা করা হল বিপুল বিশাল ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে (১৬৫৩)। মাদুরার রাজা নগদ মুদ্রা, পণ্য এবং ৫০টা যুদ্ধ হাতি উপহার পাঠালেন। শ্রীরঙ্গ শেষ বন্ধুকেও হারালেন।
১৬৫৩-র মধ্যে দক্ষিণের শেষ হিন্দু রাজত্ব শেষ হয়ে গেল নিজেদের দুর্মতি ঝগড়া আর ব্যক্তিস্বার্থের মিলিত শক্তি এবং মুঘল সহায়তায় বীজাপুর গোলকুণ্ডার আক্রমনের বন্যায়। এর শেষ জ্যোতি কিছুটা মহীশূর আর মাদুরায় টিকেছিল। তার রণনৈতিক দক্ষতা আর রাজনৈতিক দৌত্যে দক্ষতা ব্যবহার করে দক্ষিণের মানচিত্র থেকে বিজয়নগরের নাম মুছে দেওয়ার প্রক্রিয়া সফল করতে ক্রমশ সক্রিয় হয়ে উঠবেন অকুতোভয় এক আর্দিস্তানি, মীর জুমলা।
অধ্যায় ১
কর্ণাটকে মীর জুমলার প্রশাসন
১। কর্ণাটক বিজয়ে মীর জুমলার আবিসংবাদী আধিপত্য
অসাধারণ বীরত্ব, অক্লান্ত শক্তি স্ফূর্তি, গভীর কূটনৈতিক দক্ষতা, ইওরোপিয় গোলান্দাজদের দক্ষতা নির্ভর করে গড়ে তোলা প্রশিক্ষিত বিশাল বাহিনী নিয়ে মীর জুমলা পূর্ব উপকূলের বিস্তীর্ণ মাদ্রাজ বা পূর্ব কর্ণাটকই শুধু দখল করেন নি, বিজাপুরি কর্ণাটকেও গভীরভাবে দাঁত ফুটিয়েছিলেন। ৩০০ মাইল লম্বা আর ৪০ থেকে ২০০ মাইল চওড়া এই বিপুল ভূমিখণ্ডে অসংখ্য হিরের খনি, ৪৩ লক্ষ টাকা বাৎসরিক রাজস্ব, সুরক্ষিত কেল্লায় সাজানো কাঠামো আবদাল্লা কুতুব শাহের হাতে পাকা ফলের মত খসে পড়ল। নতুন সম্পদ পাওয়ার খুশিতে আর দুর্ভেদ্য গণ্ডিকোটা দখলের আনন্দে তিনি মীর জুমলাকে উপহারের ডালি সাজিয়ে দিলেন। কুতুব শাহের থেকে মীর জুমলা পেলেন নওরোজইখিলাত উপাধি, কর্ণাটকের বহু ওয়াকফ গ্রামের মুতাওয়ালি আর সামগ্রিকভাবে কর্ণাটক সরকারের তরফদারি বা মূল প্রশাসকের পদ।
মীর জুমলার চালচলন দেখে মনে হত তিনি যেন সুলতানি রাজ্যের সরইলস্কর বা সুলতানের প্রধান সেনাধ্যক্ষ। তিনি সুলতানকে লিখলেন, ‘আপনার রাজত্বের প্রত্যেক উজির, জমিদার, মানিওয়ার, সর্দার এবং মধ্যসত্ত্বভোগী এই সামরিক অভিযানে শেষ ক্ষমতা টুকু নিংড়ে দিয়েছেন। আপনার পাঠানো সম্মানিত উপহারগুলো সেই ক্লান্ত মানুষদের হাতে তুলে দিতে পেরে ধন্য হয়েছি। তারা আপনার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করেছেন। প্রত্যেকেই আপনার কৃপাদৃষ্টি অর্জন করতে উৎসুক। আমি চাই প্রত্যেকে যুদ্ধের মাঠে তার ক্ষমতা দেখিয়ে, পরীক্ষা দিয়ে আপনার কৃপাদৃষ্টির যোগ্য হয়ে উঠুক। আমার জ্ঞাতসারে, আমি এই অঞ্চলের প্রশাসন চরম দক্ষতায় চালিয়েছি, রসদ জোগাড় করিয়েছি, ছোট বড়’র ভালবাসা অর্জন করেছি, সেনা, প্রজা এবং পরাজিত এবং বন্দীদের মুখে হাসি ফুটিয়েছি। প্রত্যেকটা কাজে আমার সক্ষমতার প্রতিটা বিন্দু উজাড় করে দিয়েছি। মহামহিমের কাছে আমার বিনীত প্রার্থনা, আপনি আমায় পথ প্রদর্শন করুণ।’ ১৭ জানুয়ারি ১৬৫১-র ব্রিটিশ কোম্পানি ওয়াল্টার লিটন আর ভেঙ্কট ব্রাহ্মণকে নবাবের কাছে দৌত্যে পাঠিয়েছিল। তারা সেখানে আবিষ্কার করে, নবাব (মীর জুমলা) বছরে ২০ লক্ষ প্যাগোডা পরিমান রাজস্ব রাজার (সুলতান) কাছে পাঠাচ্ছে।
কূটনৈতিক দক্ষতা আর সুচতুর পদক্ষেপে মীর জুমলা ক্রমে ক্রমে বিজিত এলাকার সমগ্র ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিজের তাঁবেতে নিয়ে এলেন। সেন্ট জর্জ দুর্গের কুঠিয়াল লিখছেন (৪ জানুয়ারি, ১৬৪৭)), ‘যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মন্বন্তর এই এলাকায় থানা গেড়ে বসেছে। আনা বব (নবাব) মীর জুমলা পুলিকান (পুলিকট) আর সেন্ট থোম দখল করায় সারা দেশ তার কব্জায় এসেছে…’। ব্রিটিশদের ভাবনা পুলিকটে ডাচ ক্যাপ্টেনকে কুতুব শাহের জারি করা নির্দেশনামার (হাসবুল হুকুম) উদ্দেশ্যর সঙ্গে মিলে যায়। এই নির্দেশনামায় সুলতান ডাচেদেরকে সরাসরি মীর জুমলার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিটি পালনের নির্দেশ দেন যাতে ‘এই অঞ্চলের কসবা, কেল্লা আর পুলিকট বন্দরের আশেপাশের অঞ্চল কুতুব শাহী প্রশাসনের আওতায় চলে আসে।’ মীর জুমলা মাদ্রাজের ওপর ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করলেন। ব্রিটিশেরা মাদ্রাজের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছিল ১৬৩৯-এর দারমালা ভাইদের আর ১৬৪৫-এর শ্রী রঙ্গার দেওয়া পাট্টা থেকে।
সুলতান আর সেনাপতির মধ্যে দীর্ঘ ভৌগোলিক দূরত্বের ফলে তলেতলে একটা নীরব ঘটনা ঘটে চলছিল। মীর জুমলা ক্রমশ কর্ণাটককে সুলতানি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে এসে নিজের খাস তালুক বানাবার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার কাজ নীরবে চালিয়ে যাচ্ছিলেন। মীর জুমলার এই ভাবনা তার পরবর্তীকালের পদক্ষেপে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। পারস্যের উজির খালিফাইসুলতানকে লেখা এক চিঠিতে মীর জুমলা বলবেন, ‘এই অঞ্চলের (অর্থাৎ কর্ণাটকের) সব রাজা এবং বিদ্রোহী আমার আওতায় এসেছে।’ চন্দ্রগিরির রাজাকে প্রথমে কুতুব শাহ নিয়ন্ত্রণ করলেও পরের দিকে চন্দ্রগিরি রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজের আওতায় নিয়ে আসেন মীর জুমলা।
২। মীর জুমলার প্রশাসন
মীর জুমলার প্রশাসনিক ব্যবস্থা তার রাজত্বের দ্বৈতসত্ত্বার প্রকাশ। প্রাক্তন বিজয়নগর রাজ্যের পূর্ব কর্ণাটক অঞ্চল জয়ের ফলে সেই অঞ্চল তাঁর নিয়ন্ত্রণে এল। ফলে আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি, বিজয়নগর এবং নায়কদের প্রশাসনিক কাঠামো তিনি অনেকটাই বজায় রেখেছিলেন। তবে তাতে কিছুটা পরিবর্তনও আনেন – প্রবাদ আছে রাজা পরিবর্তন হলে প্রশাসনের চরিত্র ও কর্মশক্তিরও বদল হয়। এছাড়া তার নিয়ন্ত্রণে থাকা কুতুব শাহী জায়গিরগুলিকে স্বাধীন রাজ্যে রূপান্তরিত করলেন। গোলকুণ্ডার প্রশাসনিক কাঠামোটিও সে সব অঞ্চলে প্রয়োগ করলেন।
বিশদে আর গভীরে গিয়ে কর্ণাটকে মীর জুমলার প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয়। মাথায় রাখতে হবে তার হাতে এত অবসর ছিল না যে তিনি তার অনপণেয় কর্মদক্ষতার ছাপ প্রশাসনে অঙ্গীভূত করতে পারেন। তিনি কোন দিনই থিতু হয়ে বসার ফুরসৎ পাননি। সারা জীবনই দৌড়ে বেড়িয়েছেন। একদিকে যুদ্ধের পর যুদ্ধ করে সুলতানের হয়ে কর্ণাটক দেশ জয়ের পরিকল্পনা করা; তার পরে সুলতানের সঙ্গে ক্রমাগত বিরোধ তৈরি হাওয়া আর সম্পর্কের অবনতি; সব শেষে কর্ণাটক তালুক ছেড়ে মুঘল সাম্রাজ্য কাঠামোয় যোগ দেওয়া।
আমাদের ধারণা মীর জুমলা বিজয়নগর সাম্রাজ্যের গ্রামীন সংগঠনের ধারাটি গ্রহন করেছেন, কেননা বহু ইওরোপিয় নথিতে বিজয়নগর রাজ্যের প্রশাসনের যে সব পদের নাম পাওয়া যায় — যেমন নটবর বা নাড়ু বা কয়েকটি গ্রামের প্রধান, বা কারনাম বা কাণক্কপিল্লাই বা হিসেব রক্ষক, তালয়ারি (স্থলওয়ার) বা টুকরি বা গ্রাম রক্ষক, পোলিগার বা পুলিশ প্রধান, ইত্যাদি, তার প্রশাসনেও ব্যবহার করেছেন তিনি।
গাণ্ডিকোটা ছিল মীর জুমলার প্রশাসনিক কেন্দ্র। সেখান থেকে দুটি রাজপথ বেরিয়েছে, এক দিকে হায়দারাবাদ (কাম্বম, মাছরেলা, দাবারকোণ্ডা এবং হায়াতনগর হয়ে) পর্যন্ত একটি রাস্তা, আরেকটি রেয়াস্তা মাদ্রাজ পর্যন্ত ছড়ানো। ব্রিটিশ কুঠি নথি সূত্রে আন্দাজ করা যায় যে, মীর জুমলার দখল রাখা এলাকাগুলো বিশেষ করে মাদ্রাজের আশেপাশের এলাকাকে কতগুলো ছোট ছোট প্রশাসনিক এলাকায় ভাগ করেছিলেন এবং প্রত্যেক এলাকায় প্রশাসক (গভর্নর) নিযুক্ত করেছেন।
ব্রিটিশ নথি সূত্রে পাচ্ছি, মাল্লাপ্পা, সৈয়দ ইব্রাহিম তিম্মাজি বালা রাউ এবং মীর সৈয়দ আলি, মীর জুমলার প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৬৫৫-৫৮তে ব্রিটিশ কুঠিয়ালদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। উইলিয়ম ফস্টার এবং মিস্টার লাভ, মাল্লাপ্পা আর তিম্মাজির সম্পর্কে লিখেছেন, মাদ্রাজ কুঠিতে (চোল্ট্রি) তারা ছিলেন নবাবের আদিগর বা প্রতিনিধি। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার মাল্লাপ্পা শুধু যে মাদ্রাজে নবাবের আদিগর পদে কাজ করতেন তাই নয়, তিনি পুনামাল্লির প্রশাসকও ছিলেন। ১৬৪৭-এর জুন মাসে শ্রীরঙ্গ ব্রিটিশদের বাণিজ্য সুবিধে দেওয়ার পরে মীর জুমলা মাল্লাপ্পা এবং ব্রিটিশ এজেন্টকে মাদ্রাজে পাঠিয়েছিলেন তার প্রশাসন দেখাশোনা করতে। মাল্লাপ্পা সেখানে পূর্বের প্রশাসকের মতই সাত বছর ধরে প্রশাসন কার্য পরিচালনা করেন। সৈয়দ ইব্রাহিম, মাল্লাপ্পার জায়গায় পুনামাল্লিতে প্রশাসক নিযুক্ত হলেন। তিনি তিম্মাজীকে নবাবের আদিগর হিসেবে মাদ্রাজে পাঠালেন। ১৬৫৩-তে জুলফিকার আস্তারাবাদীর পুত্র রুস্তম বেগ, পুনামাল্লির হাবিলদার নিযুক্ত হন।
মীর জুমলা যে শুধু দেশ নায়ক ছিলেন তাই নয়, তিনি দক্ষ আর্থিক প্রশাসকও ছিলেন। তিনি কর্ণাটকের আর্থিক শৃঙ্খলার ভার গোলকুণ্ডা নিয়োগী নামক ব্রাহ্মণ প্রশসাকদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। কর্ণাটক থেকে সারা বছরে ৪৩ লক্ষ টাকা রাজস্ব তুলতেন। তার রাজত্বে আয়ের সূত্র ছিল ১) ভূমি রাজস্ব, ২) কর্ণাটকজোড়া লুঠ, ৩) হীরের খনি, ৪) একচেটিয়া ব্যবসা সহ রাজত্বের উতপাদন আর ব্যবসা থেকে আয়, ৫) আমদানি-রপ্তানি শুল্ক, ৬) পথ কর, ৭)দাস ব্যবসা চালানোর পঞ্জিকরণ, 8) উপহার সামগ্রী, ৯) অন্যান্য কর আদায় (ইম্পোজিসন্স)।
তিনি চাষ থেকে রাজস্ব আদায়ের ওপর জোর দিয়েছিলেন। ইসলামি আইনে জমি আর জমির সঙ্গে জুড়ে থাকা মানুষের চরিত্র আর শ্রেণী বদলে যাওয়ার কারনে জমির পরিমাণ অনুযায়ী গ্রামের সম্পত্তি আর জমির রাজস্ব নির্ধারণ করা হল। (চলবে)